It rechristened its territories as the ‘Banana Republics’
and over the sleeping dead, over the restless heroes
who brought about the greatness, the liberty and the flags,
it established the comic opera:
abolished the independencies,
presented crowns of Caesar, unsheathed envy, attracted
the dictatorship of the flies’

~The United Fruit Company, Pablo Neruda

লাতিন আমেরিকা। প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদে সমৃদ্ধ লাতিন আমেরিকা। সোনায় মোড়া ইনকা সাম্রাজ্যের লাতিন আমেরিকা, জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রগামী মায়া সভ্যতার লাতিন আমেরিকা। ‘পাইতিতি’ আর ‘এল ডোরাডো’-র প্রবাদের টানে স্বর্ণলোভী শত শত স্প্যানিশ কঙ্কিস্তোদোরকে টেনে এনেছিল যে মহাদেশ, সেই লাতিন আমেরিকা। বিশ্বের অন্যতম নিদারুণ অসাম্যের মহাদেশ — যেখানে ‘যাদের আছে’ আর ‘যাদের নেই’, তাদের মধ্যে বিশাল ব্যবধান — সেই লাতিন আমেরিকা। ‘যাদের নেই’-এর পক্ষে সিমোন বলিভার থেকে চে গেভারার মতো বিপ্লবীর তরবারি ঝলকে উঠেছে বারেবারে যে মহাদেশে – সেই লাতিন আমেরিকা। ইতিহাস সাক্ষী বারবার লাতিন আমেরিকা শোষিত, দলিত, শৃঙ্খলিত হয়েছে আর বারবার সেই লাতিন আমেরিকাই দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছে “লিবের্তাদ হে মুর্তে!” (“মুক্তি অথবা মৃত্যু!”)

বিংশ শতকে লাতিন আমেরিকার শৃঙ্খল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বারে বারে বিশ্বে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী ও রক্ষাকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার নির্বাচিত বামপন্থী গণতান্ত্রিক সরকারগুলির পতন ঘটিয়েছে এবং তার স্থানে প্রতিষ্ঠা করে গেছে গণতন্ত্রের শবের উপর উড্ডীন ভনভনে মাছির মতো একের পর এক গণহত্যাকারী একনায়ক। চিলের আউগস্তো পিনোচে, আর্জেন্টিনার হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা, বলিভিয়ার হুগো বাঞ্জের, ব্রাজিলের কাস্তেলো ব্রাঙ্কো, গুয়েতেমালার কাস্তিলো আর্মাস — তালিকা অতি দীর্ঘ। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থীরা যখনই ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, “গণতন্ত্র রক্ষা”-র গুরু দায় সামলাতে ব্যস্ত স্যাম কাকা সিআইএ-র খাতির যত্ন সহযোগে তাদের সজোরে পদাঘাত করে বিদায় দেওয়ার পবিত্র কর্তব্যে ভুলেও কখনো বিচ্যুতি প্রদর্শন করেনি। ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের সাফল্য ষাট-সত্তরের দশকে লাতিন আমেরিকার বামপন্থীদের তাই আকর্ষিত করেছে বুলেটের রাস্তায়। সেই রাস্তাতেও একমাত্র নিকারাগুয়ার উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া, তাঁরা সফল হননি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পেরুর ‘শাইনিং পাথ’ বা কলম্বিয়ার ‘ফার্ক’-এর মতো সংগঠন দীর্ঘ সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ দশকের পর দশক চালিয়ে গিয়ে নিজেরা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে এবং অন্যান্য বামশক্তিকেও সক্রিয়ভাবে আক্রমণ করে দুর্বল করেছে। কিন্তু ৯০-এর দশক থেকে এই অবস্থা পাল্টাতে থাকে। একে একে দক্ষিণ আমেরিকার মাছিদের টোকা মেরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী ও মধ্য-বামপন্থী সরকারগুলো ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সাফল্য এসেছিল তীব্র গণ আন্দোলনের পথে। ব্রাজিলে শ্রমিকদের জঙ্গি আন্দোলনের মধ্যে থেকে উঠে আসেন লুলা দা সিলভা, বলিভিয়ায় কোকো চাষীদের সংগঠিত করে আদিবাসী জাগরণের মুখ হয়ে ওঠেন ইভো মোরালেস, ভেনেজুয়েলায় বলিভারিয়ান বিপ্লব সম্পন্ন করেন উগো চাভেস, চিলেতে মিশেল বাশলের নেতৃত্বে মধ্য-বাম সোশালিস্ট পার্টির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, ইকুয়েডরে ক্ষমতায় আসেন রাফায়েল কোরেয়া।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকে একবিংশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘গোলাপি জোয়ার’ বা ‘পিঙ্ক টাইড’ বলে। গোলাপি, লাল নয়। কারণ এই ঢেউয়ে সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন যাঁরা, তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন মধ্য-বাম সামাজিক গণতন্ত্র বা সোশাল ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসী, তাঁরা কেউ বামপন্থী র‍্যাডিকাল ছিলেন না। যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে র‍্যাডিক্যাল ছিলেন, যেমন ইভো মোরালেস বা লুলা দা সিলভা, তাঁরাও ক্ষমতায় এসে মধ্য-বাম নীতিই গ্রহণ করেন। তাঁরা অনেকেই দক্ষিণপন্থী বিভিন্ন শক্তি, যেমন গির্জা বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে আপোষমুখী নীতি নেন, দক্ষিণপন্থী দলগুলির সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী হন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও খুব বৈপ্লবিক কোন পুনর্গঠন কর্মসূচী গ্রহণ না করে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা জাল এবং জনগণের সাধারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্যের বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন। তবুও এই অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী নীতি গ্রহণের পরেও ‘গোলাপি জোয়ারের’ এক দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্য সমগ্র লাতিন আমেরিকার বাম ও মধ্য-বাম শাসিত দেশেই রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস পায়, বেকারত্বের হারও বহুলাংশে কমে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারও বাড়তে থাকে। এমন সব অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক অধিকারের স্বীকৃতি লাতিন আমেরিকার দরিদ্র, অবহেলিত, শোষিত মানুষ লাভ করেন, যা এক দশক আগেও কল্পনার অতীত ছিল।

কিন্তু কবি লিখেছেন “চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়”। একবিংশ শতকের প্রথম দশক জুড়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বাম ও মধ্য-বাম সরকারগুলোর চেয়ে গভীরভাবে এই প্রবচনের অর্থ খুব কম লোকই উপলব্ধি করেছে। দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গোলাপি জোয়ারের রাষ্ট্রনায়করা কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এক দশক পরেই স্পষ্ট হয়ে গেল, দক্ষিণপন্থীদের এতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। উগ্র জাতীয়তাবাদের ও অতি-দক্ষিণপন্থার সাইরেন ধ্বনি লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ব্রাজিলে দিলমা রুসেফ রাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইম্পিচড হলেন, দুর্নীতির অসত্য (বর্তমানে যা প্রমাণিত হয়েছে) মামলায় লুলার হাজতবাস হল, ক্ষমতায় এলেন জাইর বলসোনারু। চিলেতে পিনেরা, কলম্বিয়ায় মার্কেজ।

হন্ডুরাস আর বলিভিয়ায় ক্যু সংগঠিত হল। ভেনেজুয়েলার উপর নেমে এল মার্কিন অবরোধ ও হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার। এই পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে বোলিভিয়ায়, মোরালেস সরকারের পতনের পর অনেক পর্যবেক্ষকই ধরে নিয়েছিলেন লাতিন আমেরিকায় এক দশকের যে বাম ও মধ্য-বাম জাগরণ হয়েছিল, তা ছিল সাময়িক। লাতিন আমেরিকার দক্ষিণপন্থী রাজনীতির তিনটি প্রধান স্তম্ভ — সেনাবাহিনী, রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং নার্কো অর্থ দ্বারা পুষ্ট কন্ট্রার মতো মিলিশিয়া — আঙ্কেল স্যামের আশীর্বাদ নিয়ে বামপন্থার এমন কবর রচনা করবে, যে তা ভেঙে খাড়া হয়ে আবার দাঁড়াতেই বামেদের কয়েক দশক সময় লেগে যাবে। যদি মধ্য-বাম সরকার কোথাও প্রত্যাবর্তন করেও, তারা আগের তুলনায় অনেক সংযত ও আরও মধ্যপন্থী নীতি গ্রহণ করবে।

২০১৯ সালে আর্জেন্টিনায় আলবের্তো ফার্নান্দেজের মধ্য-বাম সরকার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর যে নীতিগুলো গ্রহণ করে, তা এই পর্যবেক্ষণকেই মান্যতা দেয়। ইতিপূর্বে যখন আর্জেন্টিনায় মধ্য-বাম সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখনও যে নীতি তারা বলিষ্ঠভাবে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি, এইবার তাদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাসের বিলক্ষণ ঘাটতি ছিল। লাতিন আমেরিকায় গোলাপি জোয়ারের অবসান ঘটেছে — এই সিদ্ধান্তে এসে আত্মসন্তুষ্টির চওড়া হাসি হেসেছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে ফোর্বস-এর মতো সব পত্রিকা।

কিন্তু এই চওড়া হাসি বোধহয় সময়ের একটু আগেই হেসে ফেলা হয়েছিল। ২০২০ সালে ইলন মাস্কের “We will coup whoever we want! Deal with it” বাণীর ঔদ্ধত্যের জবাব বলিভিয়ার জনতা দিল ক্যু পরবর্তী নির্বাচনে MAS-এর প্রার্থী লুইস আর্সেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। দক্ষিণপন্থীরা আশা করেছিল ইভো মোরালেসকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে, বাম কর্মী সমর্থকদের উপর চূড়ান্ত নিগ্রহ নামিয়ে এনে আর আদিবাসী আত্মমর্যাদাকে জুতোর নীচে পিষে তারা ঘড়ির কাঁটা পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবে। তাদের সেই আশায় ছাই পড়ল। ইতিমধ্যে বলিভিয়ার প্রতিবেশী চিলেতে প্রথমে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন বাম দলগুলির, বিশেষ করে চিলের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিণত হল পিনোচে আমলের সংবিধান পরিবর্তন করার উত্তাল গণআন্দোলনে, যা ২০২০ সালে তার লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হল। এ বছর সংবিধান সভায় অধিকাংশ আসনে বামপন্থীদের জয়লাভ এবং আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনমত সমীক্ষায় কমিউনিস্টদের প্রথম স্থান অধিকার বুঝিয়ে দিল, পিনোচে শাসনে যে চিলের বামপন্থী ও বামপন্থাকে নিশ্চিহ্ন করার এত প্রচেষ্টা হয়েছে, সেই চিলের ভবিষ্যৎ রচনা করবেন বামপন্থীরাই।

ব্রাজিলে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে নতুন উদ্যমে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন লুলা দি সিলভা। তাঁর আগুন ঝরা বক্তৃতা, তাঁর শরীরী ভাষাই বুঝিয়ে দিচ্ছে তিনি একুশ শতকের প্রথম দশকে দক্ষিণপন্থীদের জন্য যে ভেলভেটের দস্তানায় ঢাকা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই পথে তাঁর আর আস্থা নেই। বলসোনারুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে লুলার ভরসা ইস্পাতে গড়া লৌহ মুষ্টি। যতদিন এগিয়েছে লাতিন আমেরিকার এই সামগ্রিক গোলাপি, না, গোলাপি বলা ভুল, লাল জোয়ারে বামপন্থার শুষ্কপ্রায় খাঁড়িতে বান ডেকেছে। একের পর এক জঙ্গি গণআন্দোলন গড়ে উঠছে সমগ্র মহাদেশ জুড়ে। হন্ডুরাস থেকে কলম্বিয়া, চিলে থেকে ব্রাজিল — সাধারণ মানুষ অস্ত্রধারী মিলিটারি, পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়াচ্ছে অকুতোভয় হয়ে। শ্রমজীবী ও কৃষক শ্রেণি লড়াকু মেজাজে বুঝে নিচ্ছে তাদের অধিকার।

এই প্রেক্ষিতে পেরুতে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল পেরু লিব্রের রাষ্ট্রপতি পেড্রো কাস্তিলোর বিজয় তথাকথিত রক্ষণশীলতার জোয়ারের রূপকথাকে আরেকটা ধাক্কা দিল। লাতিন আমেরিকার সর্বাপেক্ষা রক্ষণশীল, সর্বাপেক্ষা দক্ষিণপন্থী কোন দুটি দেশ যদি থেকে থাকে, তা যথাক্রমে পেরু ও কলম্বিয়া। এই দুই দেশে যা বামপন্থী শক্তি বর্তমান ছিল, তা সশস্ত্র আন্দোলনের পথে গিয়েই চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। বিশেষ করে পেরুর গঞ্জালোর নেতৃত্বাধীন শাইনিং পাথ অন্তিম পর্যায়ে নিরীহ গ্রামবাসী ও সাধারণ মানুষের হত্যাকারী একটি সন্ত্রাসবাদী দলের বেশি কিছু ছিল না। এই কারণে আজও পেরুতে ‘কমিউনিজমো’ শব্দটি ‘টেররিস্টা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদী’-র সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ধারণার সুযোগ নিতে পেরুতে দক্ষিণপন্থীরা চিরকালই নির্বাচনের সময় সংসদীয় বামপন্থীদের শাইনিং পাথের সঙ্গে জড়িয়ে প্রচার করে।

শাইনিং পাথের ব্যক্তিহত্যার, সন্ত্রাসের রাজনীতির বিরুদ্ধে গ্রামের কৃষকরা ৮০-র দশকেই সংগঠিত হতে থাকে মূলত রোন্ডা নামে পরিচিত প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে। তথাকথিত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে গড়ে উঠলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোন্ডাদের মধ্যেও বামপন্থী চেতনার সঞ্চার হয় এবং তাদের বিশেষ বামপন্থী রাজনীতির একটি ধারা গড়ে ওঠে। পেড্রো কাস্তিলো একজন প্রাক্তন রোন্ডা হিসাবে এই নিম্নবর্গের কৃষকদের মধ্যে থেকে উঠে আসা এক বিশেষ ধরণের বাম ধারাকে এবারের নির্বাচনে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। একদিকে এই কৃষক সমর্থন, অন্যদিকে পেরুর খনি অঞ্চলের শ্রমিক সমর্থন আর এর পাশাপাশি আয়ামারা আর কুইচো আদিবাসী সম্প্রদায়ের সমর্থন — এই তিনের সমন্বয়ই এবারের নির্বাচনে প্রাক্তন অতি-দক্ষিণপন্থী একনায়ক আলবের্তো ফুজিমোরির দুহিতা কেইকো ফুজিমোরিকে সর্বশক্তি দিয়ে সহায়তা করা লিমার পুঁজিপতি শ্রেণি, ক্যাথলিক চার্চ ও সেনাবাহিনীর জোটকে পরাজিত করতে সাহায্য করেছে।

আরো পড়ুন কিউবার ‘সংকট’ ও আমেরিকা: তুমি সাপ হয়ে কাটো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো

নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভেরোনিকা মেন্ডোজার নেতৃত্বাধীন শহরকেন্দ্রিক বাম দলগুলির সঙ্গে সমঝোতাও কাস্তিলোকে বাড়তি সুযোগ দিয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে শিক্ষক আন্দোলনের নেতা হিসাবে তিনি বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষকদের সংগঠিত করার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, এই গ্রাম বনাম শহর নির্বাচনে তা তাঁর সহায়ক হয়েছে। তাঁর “ধনী দেশে আর দরিদ্র মানুষ নয়” স্লোগান পেরুর অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফল থেকে বঞ্চিত বিপুল সংখ্যক মানুষকে নাড়া দিয়েছে।

এসবেরই পরিণতি তাঁর এই বিজয়। রাষ্ট্রপতি হিসাবে তিনি কতটা সাফল্য লাভ করবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় যে বৃহত্তর শ্রেণি ও গোষ্ঠী জোট নির্মাণের যে নীল নকশা তিনি দেখালেন, তা লাতিন আমেরিকার বাকি বামপন্থীদের কাছে ভবিষ্যৎ বিজয়ের চাবিকাঠি হিসাবে ধরা দেবে। এই বছর ও আগামী বছর লাতিন আমেরিকার দুটি প্রধান দক্ষিণপন্থার দিকে ঝোঁকা দেশ — চিলে ও কলম্বিয়ায় নির্বাচন আছে। চিলেতে কমিউনিস্ট পদপ্রার্থী ড্যানিয়েল হাউয়ে ইতিমধ্যেই কাস্তিলোর পথ অনুসরণ করছেন এবং বাম ঐক্য গড়ে তুলতে অনেকাংশে সফল হয়েছেন। কলম্বিয়ার বর্তমান সরকারের গণহত্যা (যা সম্পর্কে মানবাধিকার রক্ষায় সর্বদা তৎপর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সাংঘাতিকভাবে নিশ্চুপ) তাকে সাধারণ মানুষের কাছে চূড়ান্ত অপ্রিয় করে তুলেছে। অসম্ভব অর্থনৈতিক অসাম্য মানুষকে বাধ্য করেছে বিক্ষোভে রাস্তায় নামতে।

এই প্রেক্ষিতে প্রাক্তন গেরিলা নেতা গুস্তাভো পেত্রোর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে তুমুল জনপ্রিয়তা ও ‘লিস্ট ফর ডিগনিটি’-র জোটের তলায় দেশের সমস্ত র‍্যাডিকাল বাম শক্তির, এমনকি ফার্কের কিছু অংশেরও সংহত হওয়ার ঘটনা ইতিমধ্যেই লাতিন আমেরিকায় দক্ষিণপন্থার দুর্গ হিসেবে পরিচিত কলম্বিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছে। গ্লোবাল নর্থের মালিকপক্ষ, লাতিন আমেরিকার গ্লোবাল সাউথের “ছোটলোক”-দের দুঃসাহসের অবসান হয়েছে ভেবে যে চওড়া হাসি হেসেছিলেন, তা যে মিলিয়ে গেছে, তা বিভিন্ন সংবাদপত্রের হাহুতাশ দেখেই উপলব্ধি করা যায়। লাতিন আমেরিকা আর ডিক্টেটরশিপ অফ ফ্লাইয়ের আস্তানা নেই, যেমনটি তাঁরা চেয়েছিলেন। বলিভিয়ার আর্সে থেকে পেরুর কাস্তিলোর মত ইতিহাসের অশান্ত নায়করা লাতিন আমেরিকার বুকে “লিবের্তাদ হে মুর্তে !”-র পুনরায় যে ডাক দিয়েছে, তাকে উপেক্ষা করে এই মহাদেশের জনতা ওয়াশিংটন থেকে নিয়ন্ত্রিত কমিক অপেরা যে সহজে আর কোনওদিনই মেনে নেবে না, এই ঐতিহাসিক সত্য উপেক্ষা করার ক্ষমতা আর পৃথিবীর একক মহাশক্তির নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.