(মাননীয় পাঠক, এই ধারাবাহিক রচনার বক্তব্য একান্তই এক মাস্টারের যৎসামান্য অভিজ্ঞতা এবং অতি স্বল্প পড়াশোনা প্রসূত। যদি তথ্যগত এবং তত্ত্বগত ভ্রান্তি থাকে, অবশ্যই ধরিয়ে দেবেন)

শিক্ষা শব্দটা বেশ ভারী। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, “তোর আর শিক্ষা-দীক্ষা হল না” । কিন্তু এই শিক্ষা ব্যাপারটা কী? মাথায় মাখার শ্যাম্পু নাকি টুথব্রাশ? নাকি অন্য কিছু?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারী ভারী সংজ্ঞায় যাচ্ছি না, কারণ এটা আমার মাস্টার্সের উত্তরপত্র নয়, আপনিও কর্তা, ইউনিভার্সিটির পরীক্ষক নন। আমার আপনার সঠিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু শেখা আবশ্যিক, তা-ই হল শিক্ষা। এই শিক্ষা আবার তিনরকম — ফর্মাল, মানে যা কিছু আমরা স্কুল, কলেজে শিখি, যা আমাদের কর্ম সংস্থানে কাজে লাগে; ইনফর্মাল, মানে যা আমরা সারাজীবন ধরে শিখি; আর নন-ফর্মাল বলতে মূলত ওপেন, ডিস্ট্যান্স এডুকেশন সিস্টেমকে বোঝায়।

আমাদের দেশে এমনিতেই শিক্ষা নিয়ে ভুল ধারণা অনেক। যদিও মুখে বলি শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার, কাজে সেটা বোঝার চেষ্টা খুব একটা নেই।

এই যে সরকার আমাদের জন্য স্কুল, কলেজ ইত্যাদি খুলে বসে আছে এর কারণটা কি? এটা কি কোনো দাতব্য প্রকল্প, নাকি সরকারের টাকাপয়সা নষ্ট করার মত বেড়ে গেছে?

প্রথম কথা, এই সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো দাক্ষিণ্য নয়। কোনো বিধায়ক, সাংসদ বা সরকার আমাকে, আপনাকে দয়া করছে না। দেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সবার জন্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করাটা অবশ্য কর্তব্য। কারণ, দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠে আপনি দেশের উন্নতিতে অংশগ্রহণ করবেন, এটাই প্রত্যাশা। সুতরাং, আমার বাড়ির কাছে স্কুল থাকাটা আমার অধিকার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দয়া নয়, এইটা বোঝার সময় এসেছে।

আমরা এইখানে কথা বলব মূলত ফর্মাল বা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। আমাদের দেশে প্রথাগত শিক্ষার সাধারণত তিনটে স্তর আছে — প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, আর উচ্চশিক্ষা।
সরকারি স্তরে প্রাথমিক শিক্ষা বলতে ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর অব্দি বোঝায়। যদিও বর্তমানে ক্লাস ফাইভকেও প্রাথমিকের মধ্যে ধরা হচ্ছে। এই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বেশিরভাগ মানুষের ধারণা বাচ্চাদের পড়ানো খুব সহজ কাজ। যে কর্তাব্যক্তিরা নিয়ম নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁরাও কোন মুল্লুকে থাকেন বোঝা দায়।

আমাদের দেশে বারো ক্লাস পাশ করলেই প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া যায়। কীভাবে হওয়া যায় তার কিন্তু কোনো উত্তর নেই। বাচ্চাদের পড়ানো এমনিতেই কঠিনতম কাজগুলোর মধ্যে একটা। আসলে পড়ানোটাই একটা কঠিন কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে ধরেই নেওয়া হয়েছে যে বাচ্চাদের পড়ানো হেব্বি সহজ।
পড়ানো কেন কঠিন বলছি সেটা একটু বোঝা দরকার। একটা খুব পুরোনো এবং ক্লিশে তক্কো হচ্ছে, শিক্ষক হয়ে জন্মায় নাকি শিক্ষক তৈরি করা যায়? কেউ কেউ বলেন শিক্ষকতা একটা প্রবৃত্তি, আর কেউ বলেন শিক্ষক হয়ে উঠতে গেলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দরকার।

সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হচ্ছে দুটোই সমান জরুরি। অর্থাৎ, যাঁরা পড়াতে আসছেন তাঁদের শিক্ষক হবার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, দুটোই সমান দরকারি।

এইবার প্রশ্ন হল, প্রশিক্ষণ আবার কিসের?

ধরুন, কেউ ইংরেজিতে এমএ পাশ করলেন। এই এমএ পাশের সার্টিফিকেট কিন্তু তাঁকে ইংরেজির শিক্ষক হবার যোগ্যতা অর্জন করায় না। কারণ, বাচ্চাদের পড়াতে গেলে তাঁকে আরও কিছু জানতে হবে। জানতে হবে কীভাবে ৫০-৬০ জনের একটা ক্লাস তিনি সামাল দেবেন, যাদের পড়াবেন তাদের মানসিকতা কীভাবে বুঝবেন, কী স্ট্র্যাটেজিতে পড়াবেন, কি ধরণের টিচিং এইডস ব্যবহার করবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এগুলো যে জরুরি তা বোঝার উপায় কী? একটা ক্লাসে তিন ধরণের ছাত্রছাত্রী থাকে — ভাল, মাঝারি এবং খারাপ। ভাল এবং খারাপ, দুটোই মোটামুটি ওই ১০%-১২% কি ১৫% মত, মাঝারি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাই বেশি। শিক্ষক হিসাবে আপনার টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে ওই সংখ্যাগরিষ্ঠ মাঝারি ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু এমন ভাবে পড়াতে হবে যাতে ভাল এবং খারাপ ছাত্রছাত্রীও বঞ্চিত না হয়। একটা জরুরি কথা বলে রাখা দরকার, এইখানে ‘খারাপ’ শব্দটা একান্তই আপেক্ষিক। কোনো ছাত্রছাত্রীই খারাপ হয় না। খারাপ বলতে এখানে কেবল অ্যাকাডেমিক স্কোরশিটে পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের বোঝানো হচ্ছে।

সুতরাং, এই পড়ানো মানে কিন্তু বই হাতে করে ক্লাসে গিয়ে জ্ঞান বিলোনো নয়। আপনাকে মনে রাখতে হবে কাদের পড়াচ্ছেন। ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস ফাইভের চল্লিশটা বাচ্চার পড়ার মানসিকতা থাকবে এমনটা না-ই হতে পারে। তাহলে শিক্ষক হিসাবে আপনাকে আগে ক্লাসের লার্নিং এনভায়রনমেন্ট ঠিক করতে হবে। যদি এমন কোনো টিচিং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে থাকেন যার ফলে যা পড়াচ্ছেন সবই বাচ্চাদের মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাহলে সেটাও পাল্টাতে হবে।

এত কিছু আপনি শিখবেন কোথায়? সবই কি এমএ পাশ করলেই এমনি এমনিই শিখে যাবেন? নিশ্চয়ই না। এই জন্যেই টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রাম। পোশাকি ভাষায় আমরা যাকে বিএড বা ডিএড ট্রেনিং বলে জানি।
গন্ডগোলটা কোথায় জানেন? গত দু-দশকে টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রামের গুরুত্ব ধীরে ধীরে প্রায় লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। লোকে বিএড বা ডিএড পড়তে যায় স্কুলে চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট পেতে মাত্র। এর আর কোনো ব্যবহারিক ভূমিকা নেই।

রাজ্য জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে ডিএড আর বিএড কলেজ। উপযুক্ত পরিকাঠামো ছাড়াই। গুচ্ছের টাকা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হচ্ছে সেসব জায়গায়। প্রায় অধিকাংশ কলেজেই ঠিকঠাক টিচিং ফ্যাকাল্টি নেই। কিছু না পড়ে, কিছু না শিখেই ছাত্রছাত্রীরা বিএড বা ডিএডের সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে যাচ্ছেন।

অপরাধ নেবেন না সার, কিন্তু এরা কি আদৌ ঠিকঠাক পড়াতে পারবেন?

প্রশ্ন ওঠা উচিত যে এতদিন যাঁরা পড়িয়ে এসেছেন তাঁরা সব্বাই কি ঠিকঠাক সাক্ষাৎ বিদ্যাসাগর হয়ে পড়িয়ে এসেছেন?

অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উত্তর দিতে হচ্ছে — না।

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে ছাত্রজীবন কাটিয়ে এসেছি, তারা টেবিলে পা তুলে ঘুমোনো মাস্টারমশাই দেখেছি, আবার ছাত্রদের বাড়ি অব্দি হেঁটে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া মাস্টারমশাই, দিদিমণিদেরও দেখেছি। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। ফাঁকিবাজ কিছু শিক্ষক থাকলেও অনেক শিক্ষকই শিক্ষকতাটাকে ব্রত হিসাবে ধরতেন। যে কারণে সমস্যাগুলো এত প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি।

এমন নয় যে এখনকার শিক্ষকরা শিক্ষকতাকে ব্রত হিসাবে ধরেন না। অনেকেই শিক্ষক হিসাবে যথেষ্ট যোগ্য। সমস্যাটা অন্য। ছাত্রছাত্রীদের মনন এবং চাহিদা গত দেড় দশকে বদলেছে অনেকটাই। কিন্তু তার সাথে মানিয়ে নেওয়ার মত প্রশিক্ষণ শিক্ষকরা পাচ্ছেন কোথায়? কারিকুলাম-সিলেবাস পাল্টালে তা শিক্ষকদের বুঝিয়ে দেওয়ার মত প্রয়োজনীয় ওয়ার্কশপ হয় তো? হয়ত খাতাকলমে হয়, কিন্তু কতটা কাজের কাজ হয় তা নিয়ে সংশয় থাকছে পুরো মাত্রায়।

যেমন একটা হিসাব দিই। ড্রপ আউটের। আপনি সরকারি ডাইস রিপোর্ট দেখুন, দেখবেন ড্রপ আউট প্রায় নেই বললেই চলে। এবার গ্রামের স্কুলে যান, জিজ্ঞেস করুন ড্রপ আউট নিয়ে। দেখবেন প্রতিবছরই গুচ্ছের ছাত্র ড্রপ আউট হয়। কিন্তু তারা ডাইসে যায় কোথায়? তারা তখন শ্রডিঙ্গারের বেড়াল হয়ে যায়। কারণ, ড্রপ আউট দেখালে স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে সরকারি আধিকারিক — সব্বাইকে দৌড়তে হবে সেই বাচ্চার বাড়িতে। এত সময় কি সত্যিই আছে?

বা ধরুন, মুর্শিদাবাদ কি নদিয়ার প্রান্তিক এলাকা। যেখানে ১২-১৫ বছরের ছেলে ছোকরারা বছরে চার মাস স্কুল করে আর বাকি সময়টা বাইরে খাটতে যায়। কিন্তু স্কুলের খাতায় নাম থাকা আর নো ডিটেনশন পলিসির দরুণ তারা সরকারিভাবে ড্রপ আউট হয় না।

তাহলে কি আর সরকারি রিপোর্টে ভরসা থাকে?

তা যাকগে, এই কিস্তিতে মূলত আমরা শিক্ষকতার হাল হকিকত নিয়ে আলোচনা করছি। সেটাতেই থাকি বরং। বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষকতার সংজ্ঞা বদলেছে। বদলায়নি স্রেফ আমাদের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার কর্তাদের মানসিকতা এবং শিক্ষকদের প্রস্তুতি পর্ব।

কারিকুলাম বা সিলেবাস পাল্টাতে হলে যারা তৃণমূল স্তরে পড়াচ্ছেন তাঁদের মতামত নেওয়াটা অন্ত্যন্ত জরুরি। আক্ষেপের বিষয়, যাঁরা ঠান্ডা ঘরে বসে এসব ঠিক করেন, তাঁরা এগুলো প্রয়োজনীয় বলে মনেই করেন না। ঠান্ডা ঘর কথাটা নেহাতই আলংকারিক নয়। কপাল দোষে একটি উচ্চস্তরীয় সরকারী মিটিংয়ে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল এককালে। সত্যিই বেশ জমকালো ঘরে মিটিং হয়, ভাল টিফিন পাওয়া যায়। ওঁরা আবার গাড়িভাড়াও দিয়ে দিয়েছিলেন। কাজের কাজ কিছু হয়েছে বলে মনে পড়ছে না।

প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত। শিক্ষকদের প্রস্তুতিপর্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি। যাঁরা প্রাথমিক স্কুলে পড়াতে যান তাঁরা ধরেই নেন যে বাচ্চাটা বাড়ি থেকে কিছু শিখে এসেছে। অন্তত সে শেখার জন্যে তৈরি আছে। কিন্তু যে বাচ্চার বাড়িতে বাবা-মা প্রথাগতভাবে শিক্ষিত নন, যার বাড়িতে শেখার কোনো পরিবেশই নেই, তাকে তিনি কীভাবে শেখাবেন?

সেই জন্যেই টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রামের গুরুত্ব। যেখানে তাঁকে শেখানো হবে, কী করে পড়াতে হয়। মুশকিল হচ্ছে কর্তাব্যক্তি আর আমরা যারা ম্যাঙ্গো পিপল, তাদের এটা নিয়ে কোনো হেলদোলই নেই।
হেলদোল নেই, কারণ আমরা যারা প্রিভিলেজড, তারা স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একদমই চিন্তিত নই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোটাই টিউশন নির্ভর। আমাদের একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর দশজন প্রাইভেট টিউটার থাকে। গত বছরের Annual Status of Education (ASER) রিপোর্ট অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে থেকে অনেক বেশি।
এর বাইরে যে দু-একজন ছাত্রছাত্রী খুব প্রান্তিক অবস্থা থেকে উঠে আসে, তারা ওঠে নিজেদের কৃতিত্বে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার তাতে খুব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে না। এবং কোথাও না কোথাও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আমাদের অনীহা আছে। এই অনীহা কিন্তু যারা এই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত তাদের মধ্যেও প্রবল। এটা নিয়েও কথা হবে পরে।

এই কোভিডকাল আমাদের প্রিভিলেজড আর নন-প্রিভিলেজডের পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার এত বছর পরেও মানুষ বাড়ি ফেরার পথে রেললাইনে শুয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যেতে পারেন, তারপরেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালে কুড়ি হাজার কোটি টাকার অট্টালিকা তৈরি হতে পারে, খিদের জ্বালায় মৃত মায়ের দেহের পাশে ছোট বাচ্চা অবোধের মত জেগে থাকতে পারে, রাষ্ট্র তখন ব্যস্ত থাকে পোশাক দেখে সন্ত্রাসবাদী চিনতে।

আর এইসব কিছুর বাইরে আমরা, শিক্ষিতরা সুখী মধ্যবিত্ত গৃহকোণে উটপাখি হয়ে বেঁচে থাকি। আয়নার সামনে যে কোনোদিন দাঁড়াতে হতে পারে তা ভাবি না।

(চলবে)

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply