জয়মালা বাগচী

‘আমরা যথেষ্ট কষ্ট করেছি,’ বললেন আশা (নাম পরিবর্তিত) ‘আমি চাই আমার ছেলে একটা ভালো চাকরি পাক আর আমার মেয়ের একটা ভালো পরিবারে বিয়ে হোক। আমার শ্বশুরকে দেখেছি ধোঁয়ায় কাজ করে করে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের অসুখে ভুগতে। এখন আমার স্বামীর শরীরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ছেলেরও একই অবস্থা হোক চাই না।’

আশা কলকাতার এক সৎকার কর্মীর স্ত্রী। তাঁর মেয়ে বারো ক্লাস পাশ করেছে আর ছেলে স্নাতক স্তরে লেখাপড়া করছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কলকাতার শ্মশানগুলোতে ভোর হওয়ার আগে থেকেই ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। লোহার স্ট্রেচারের ঘটাং ঘট শব্দে টের পাওয়া যায় আরও একটা মৃতদেহ এসেছে। এখানে এক প্রাচীন পেশার চেহারা বদলে যাচ্ছে এখন। কিছুটা বদলাচ্ছে বিদ্যুতের কারণে, কিন্তু স্থানীয় মানুষ বলছেন বেশিরভাগটাই বদলাচ্ছে পৌরসভার ব্যবস্থা আর সরকারি মাইনের কারণে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম মড়া পোড়ানোর কাজ করে আসছিলেন ডোম সম্প্রদায়ের মানুষ, এই কাজের প্রশিক্ষণ পারিবারিকভাবে তাঁরা পেতেন। ডোমরা (২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক বিজ্ঞপ্তির পর থেকে তাঁদের সৎকার কর্মী বলা হয়) তফসিলি জাতিভুক্ত এবং ঐতিহাসিকভাবে তাঁদের পেশা হিসাবে ভাবা হয় মড়া পোড়ানো এবং সাফাইয়ের কাজকে। চিতা ঘিরে যেসব আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়, নদীর পাড়ে যে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায় এবং যেসব কর্মী বাবার কাছ থেকে এই কাজ শেখেন, তাঁদের মধ্যে কলকাতার শ্মশানগুলোতে এই ইতিহাস এখনো জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। সৎকার কর্মীরা বলছেন, ছবিটা গত কয়েক দশক ধরে বদলাচ্ছে। মড়া পোড়ানোর কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার, পৌরসভার ব্যবস্থা এবং নতুন পেশায় যাওয়ার উচ্চাশা ধীরে ধীরে এই পেশার ভোল বদলে দিচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে এই বদলের মানে হল, এ কাজ তাঁদের পরের প্রজন্ম আর করবে না।

একসময় এই কাজটা ছিল বর্ণাশ্রমভিত্তিক এবং মৃতের পরিবারের লোকেদের দেওয়া সামান্য টাকাপয়সার উপর নির্ভরশীল। তবে কলকাতায় ক্রমশ এটা পৌরসভার মাস মাইনের চাকরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সাবেকি কাঠের চিতার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ফার্নেসেও মড়া পোড়ানো হয় এবং ঘাটে যাওয়ার জন্যে পাকা রাস্তা বানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো এই রূপান্তরে এক ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। একদিকে কিছু সৎকার কর্মী সরকারি মাইনে পান এবং বেশি সামাজিক স্থায়িত্ব উপভোগ করেন, অন্যদিকে অনেকেই চুক্তির ভিত্তিতে সামান্য মজুরিতে কাজ করেন। তাঁদের তেমন নিরাপত্তা নেই। এছাড়া এই পেশার বিরুদ্ধে সামাজিক ছুতমার্গও রয়েছে। সরকারি চাকরির তকমা পাওয়ায় সেটা খানিকটা কমলেও পুরোপুরি দূর হয়নি।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পেশা

এই শহরের ইতিহাসের অনেকটা সময় জুড়ে সৎকার কর্মীরা মোটের উপর সেইটুকু টাকার উপরেই নির্ভর করে থেকেছেন যা মৃতের পরিবারের লোকেরা তাঁদের দিতেন। এক কর্মী বললেন ‘আগে কোনো বাঁধা পেমেন্ট ছিল না। যে যা দিত সেটাই আমাদের রোজগার ছিল।’ ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় সেই রোজগার কত সামান্য ছিল। মিউনিসিপাল ক্যালকাটা: ইটস ইনস্টিটিউশনস ইন দেয়ার ওরিজিন অ্যান্ড গ্রোথ (১৯১৬) বইয়ে কলকাতা কর্পোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান এস ডব্লিউ গুড বিশ শতকের প্রথমদিকের কলকাতার শ্মশানগুলোর কাজকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন। সে যুগে মাত্র দুজন ডোম সরকারিভাবে নিযুক্ত ছিলেন মড়া পোড়ানোয় সাহায্য করার জন্য। পরে সংখ্যাটা বাড়ানো হয়।

গুড লিখেছেন, মড়া পোড়ানোর খরচ ছিল প্রাপ্তবয়স্ক মৃতদের জন্য তিন টাকা, দু আনা আর নয় পয়সা; অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এক টাকা আর আট আনা। গরিব পরিবার হলে পয়সা নেওয়া হত না। ১৯১৩-১৪ সালে কলকাতার সবচেয়ে পুরনো মড়া পোড়ানোর জায়গা নিমতলা ঘাটে ১০,৩৪৪ খানা মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছিল। তখন একজন ডোমের মাসোহারা ছিল আড়াই টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকার মধ্যে। তারপরে বহু দশক ধরে এই পেশা মোটের উপর বংশগত ছিল। ছোটরা বাবাকে বা অন্য আত্মীয়দের কাঠ জড়ো করা, চিতা সাজানো এবং দাহকার্যের বিভিন্ন আচার পালন করতে দেখে কাজ শিখত। কাজটা পরিশ্রমসাধ্য ছিল এবং সমাজে এই সৎকার কর্মীরা ছিলেন অচ্ছুত।

আরো পড়ুন বঙ্গে দলিতদের মন্দিরে ঢুকতে না দেওয়া আকস্মিক ঘটনা নয়

ছাপ্পান্ন বছর বয়সী মানিক মল্লিক উত্তর কলকাতার কাশী মিত্র বার্নিং ঘাটে কাজ করছেন ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে। তিনি সেই সময়ের কথা বললেন যখন শ্মশানের চেহারা একেবারে অন্যরকম ছিল। ‘একটা কম পাওয়ারের বালব ছিল আর এক জায়গায় কাঠ জড়ো করে রাখা থাকত। শ্মশানের আশেপাশে ট্যাক্সি আসত না, লোকজনের আনাগোনাও খুব কম ছিল।’ কর্মীদের বক্তব্য, বিধিবদ্ধ সরকারি চাকরি ক্রমশ আরম্ভ হয় ১৯৯০-এর দশকের শেষদিক থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত। তখনই সৎকার কর্মীদের কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের মাইনে করা কর্মচারীতে পরিণত করা হয়। বহু নিয়োগ হয়েছিল বংশগতভাবে, শ্মশানে কর্মরত বাবার মৃত্যু অথবা অবসর (৬২ বছর বয়সে) গ্রহণের পর।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেতন কাঠামো অনুযায়ী স্থায়ী সৎকার কর্মীরা এখন ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্ভিসেস (রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাউয়েন্সেস) রুলস, ২০১৯-এর অধীনে পে লেভেল ১-এর অন্তর্ভুক্ত। মাসে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা মাইনে পান গ্রেড এবং অ্যালাউয়েন্সের উপরে ভিত্তি করে। মানিকবাবু জানালেন ‘আমি যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখন মাসে ৬০০ টাকা পেতাম। তিরিশ বছরের বেশি পেরোবার পরে ওটা ৩৫,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। এ থেকেই বোঝা যায় কতকিছু বদলেছে।’

স্থায়ী সরকারি কর্মচারীরা এখন বাঁধা মাস মাইনে পান, কেউ কেউ কোয়ার্টারও পান। রোজগার আগেকার মত অনিয়মিত নেই, যখন মৃতের পরিবারের লোকেদের উপরেই নির্ভর করে থাকতে হত। বয়স্ক কর্মীদের মতে, এই বদল স্থিতিশীলতা এনেছে, যা বহু প্রজন্ম ধরে ছিল না।

লক্ষ্মীচাঁদ মল্লিকের বয়স এখন প্রায় ৭০। তিনি এই পেশায় যোগ দিয়েছেন ১৪ বছর বয়সে, কাজটা শিখেছিলেন তাঁর ঠাকুর্দার কাছ থেকে। বললেন ‘আগে আমরা মড়াকে চান করাতাম, দাহ করার জন্যে রেডি করতাম আর খুব অল্প পয়সা পেতাম। সরকার আমাদের কর্মচারী বলে মানার পরে আর্থিক স্থিতিশীলতা এসেছে। আমাদের সামাজিক অবস্থাও শুধরেছে। আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবন বদলে গেছে।’

সরকারি চাকরিতে পরিণত হওয়ায় এই পেশায় আসা মানুষের মধ্যেও বৈচিত্র্য এসেছে। হিন্দু সৎকার সমিতির সাম্মানিক অছি সঞ্জয় রায় বললেন, মড়া পোড়ানো বহু যুগ ধরে একটাই বর্ণের মানুষের কাজ ছিল। তিনি বললেন ‘আগে একটাই কাস্টের লোক সৎকার কর্মী হত। এখন সরকার মাইনে দিচ্ছে বলে অন্য কাস্টের লোকেরাও আসছে। এখন এটা অনেকটা অন্য চাকরিগুলোর মতই হয়ে গেছে।’ কর্মীরা বলছেন বিধিবদ্ধ নিয়োগের ফলে এই পেশা সম্পর্কে যে ছুতমার্গ ছিল সেটাও কমেছে। কেওড়াতলা মহাশ্মশানের এক চুক্তিভিত্তিক কর্মী জানালেন ‘আগে অস্পৃশ্যতা অনেক জোরালো ছিল। এখন কমেছে।’ তবে শ্মশানের বাইরে যে কমেনি সেকথা বোঝা গেল, যখন তিনি বললেন ‘আমার মেয়েকে ভালো পরিবারে বিয়ে দেওয়া কিন্তু এখনো মুশকিল।’

ঘাটের বদল

গঙ্গার পাড়ে উনিশ শতকের প্রথম দিকে চালু হওয়া কাশী মিত্র বার্নিং ঘাট একদা উত্তর কলকাতার একটা আলো আঁধারি এবং নির্জন জায়গা ছিল। সৎকার কর্মীরা বললেন যে ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে এই এলাকায় যথেষ্ট বিদ্যুৎ ছিল না এবং রাতে বিপজ্জনক এলাকা বলে পরিচিত ছিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে এলাকাটা ক্রমশ বদলাতে থাকে। রাস্তায় আলো লাগানো হয় এবং নদীর ধার ঘেঁষে ছোট চায়ের দোকান ইত্যাদি চালু হয়। আজ উত্তর কলকাতার গঙ্গার ধার বহু মানুষের রোজকার আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর পাড়ে লাইন দিয়ে চায়ের দোকান, খাবারের দোকান। সেখানে কলকাতার বাসিন্দারা প্রায়ই সন্ধেবেলায় গিয়ে বসেন। নিমতলা শ্মশান ঘাট আর কাশী মিত্র শ্মশানঘাট নদীর ধারে পরপর। ওই এলাকায় গেলে দৈনন্দিন জীবন আর দীর্ঘকালের আচার বিচার পালনের জায়গাগুলো পাশাপাশি দেখা যায়। পরিকাঠামোর উন্নতির ফলে এখন ঘাটে মৃতদেহগুলোর আসার পদ্ধতিও বদলে গেছে। আগে সৎকার কর্মীরা প্রায়শই নিজেরা লম্বা পথ দেহগুলোকে বয়ে নিয়ে আসতেন। এখন রাস্তা ভালো হয়ে যাওয়ায় শববাহী গাড়িগুলো সোজা শ্মশানঘাট পর্যন্ত নিয়ে আসে।

লক্ষ্মীচাঁদবাবুর মত কর্মীদের কাছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল বৈদ্যুতিক চুল্লি চালু হওয়া। গঙ্গা অববাহিকার সম্পর্কে পরিবেশ চর্চা বলছে, কলকাতার প্রথম বৈদ্যুতিক শ্মশান কাজ শুরু করে ১৯৬০ সালে। তারপর থেকে ক্রমশ সমস্ত শ্মশানে বৈদ্যুতিক ফার্নেস বসানো শুরু হয়। এই নতুন ব্যবস্থা মড়া পোড়ানোর কায়িক শ্রম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে দেয়। মানিকবাবু বললেন ‘আগে অনেক বেশি খাটনি হত। আমরা বডিগুলো নিজেরা বয়ে আনতাম, চিতা সাজাতাম আর ধোঁয়া খেতাম। পরিকাঠামো এখনকার মত ছিলই না। এখন আমাদের একটু মানুষ বলে ভাবা হয়।’

এই শহরে বৈদ্যুতিক চুল্লি আর সাবেকি কাঠের চিতা এখনো পাশাপাশি কাজ করে। কাঠের চিতায় একটা দেহ পোড়াতে সাধারণত পাঁচ থেকে ছ ঘন্টা লাগে এবং প্রায় ৫০০ কেজি কাঠ লাগে। বৈদ্যুতিক চুল্লিতে খুব বেশি হলে ঘন্টা তিনেক লাগে। ফলে শেষকৃত্যের খরচেরও হেরফের হয়। প্রাপ্তবয়স্ক দেহ কাঠের চুল্লিতে পোড়ানোর খরচ সব মিলিয়ে ২,৩৯২ টাকা। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে পোড়ানোর রেজিস্ট্রেশন ফি ২৫০ টাকা। লক্ষ্মীচাঁদবাবু বললেন ‘কোন পরিবার তাদের লোকের জন্যে কী চায় তার উপরে এটা নির্ভর করে।’

বয়স্ক সৎকার কর্মীদের কাছে মড়া পোড়ানোর কাজ মানে শুধু মেশিন চালানো ছিল না।

বালেশ্বর মল্লিক (৭৫) বললেন, তিনি এই কাজ শিখেছিলেন বাবা-কাকাদের সঙ্গে বহুবছর ধরে কাজ করার মধ্যে দিয়ে। ‘আমার বাবা আর কাকারা আমাদের সবকিছু শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল। কতটা কাঠ ব্যবহার করতে হয়, কখন আগুন ধরাতে হয়, কীভাবে সব আচার অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। কেবল মড়া পোড়ানো কাজ ছিল না। চিতা সাজানো থেকে শেষ আচারটা পালন করা পর্যন্ত সবটাই আমাদের দায়িত্ব ছিল।’

তাঁর ধারণা, অল্পবয়সী সৎকার কর্মীরা প্রথাগত সৎকারের নিয়মকানুন ততটা জানে না। বললেন ‘এখন তো মেশিন চালানোই আসল কাজ।’

ঝুঁকি

প্রযুক্তিগত বদল সত্ত্বেও কাজটা আজও পরিশ্রমসাধ্য। যাঁরা কাঠের চিতায় কাজ করেন তাঁরা এখনো প্রবল ধোঁয়ার শিকার। অন্যরা বললেন দীর্ঘক্ষণ উচ্চ তাপমাত্রার ফার্নেসের কাছে কাজ করার ফলে হিট স্ট্রেস হয়, আর ফার্নেসের দরজা কোনোভাবে আগে খুলে ফেললে হঠাৎ আগুন ছিটকে আসার ঝুঁকি থাকে। কিছু পুরনো ইমারতের খারাপ বায়ু নির্গমন ব্যবস্থা সমস্যা বাড়ায়।

কর্মীরা জানালেন যে সুরক্ষামূলক সাজসরঞ্জাম প্রায় নেই। একজন চুক্তিভিত্তিক সৎকার কর্মী বললেন, তিনি মাসে ১,৮০০ টাকা মাইনেয় কাজ শুরু করেছিলেন। ‘কুড়ি বছরে সেটা বেড়ে মাত্র ১২,০০০ টাকা হয়েছে। কলকাতা শহরে চারজনের সংসার এই টাকায় চালানো অসম্ভব।’ তিনি জানালেন যে চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা বারবার কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের কাছে স্থায়ী নিয়োগ দাবি করেছেন। ‘সবাই আমাদের আশা দেয়, কিন্তু শেষমেশ কিছু হয় না। আমরা এখনো অস্থায়ী কর্মী।’ বললেন, অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ‘ওরা পড়াশোনা শিখছে। ওদের আমি কখনো এই পেশায় ঢুকতে দেব না।’

কলকাতা জুড়ে সৎকার কর্মীরা বৃহত্তর সমাজের নজরে পড়েছিলেন কোভিড-১৯ অতিমারীর সময়ে। নিমতলা, গড়িয়া আর ধাপার শ্মশানঘাট করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তিদের পোড়ানোর জন্যে নির্ধারিত হয়েছিল। কর্মীরা বললেন, সংকট যখন চরমে, তখন দিনে ৩০০ দেহ নিমতলা ঘাটে এসেছে শেষকৃত্যের জন্য। ধাপার কর্মীরা বললেন ‘লাইন আর শেষ হত না। সে অসহ্য দৃশ্য।’ ওই সময়ে বহু কর্মীকে নিয়োগ করা হয়েছিল, অনেককেই চুক্তির ভিত্তিতে। শ্মশানের কর্মীরা অত্যধিক টাকা নিয়েছিলেন, এই অভিযোগও তাঁরা উড়িয়ে দিলেন ‘লোকে নিজে থেকে আমাদের বখশিশ দিয়েছে। আমরা কোনোকিছু দিতেই হবে বলিনি।’

কিছু স্থায়ী কর্মী অবশ্য বললেন যে অতিমারীর বছরগুলোতে আর্থিক অবস্থার খানিকটা উন্নতি ঘটেছে। কেউ কেউ মোটরসাইকেল বা সামান্য জমি কিনতে পেরেছেন। চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা বলছেন তাঁদের অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। একজন বললেন ‘ওটার জন্যে লোকে আমাদের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ শুধরোয়নি।’

নরেশ মল্লিক (৪৬), বললেন তিনি চান না তাঁর ছেলেও এই কাজ করুক। ‘আমার ছেলে বি কম পড়ছে। আমার পরিবারে আমিই শেষ এই কাজ করছি। বি কম পড়ে ও মড়া পোড়াবে কেন? আমাদের পেশার লোকের প্রতি অবিচার কমেছে। ও তার সুযোগ নেবে না কেন?’

অন্য অনেকে আবার কবে ফের এই কাজে নিয়োগ হবে তার অপেক্ষায় আছেন। সৎকার কর্মী ভাগলু বললেন তাঁর চার ছেলে পৌরসভা নিয়োগ শুরু করলেই এই চাকরি পাওয়ার আশায় আছে। এদিকে চার-পাঁচ বছর ধরে সৎকার কর্মী নিয়োগ বন্ধ।

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.