সায়ক ঘোষ চৌধুরী

ভারতের নির্বাচন কমিশন পাঁচটি রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের সূচী প্রকাশ করেছে। উত্তরপ্রদেশে সাত দফায় নির্বাচন হবে। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই নির্বাচন চলবে, ফলপ্রকাশ আগামী ১০ মার্চ। উত্তরপ্রদেশ ছাড়া উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া এবং মণিপুরেও নির্বাচন হচ্ছে।

এই নির্বাচন কয়েকটি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

(১) ২০২২-এর এই নির্বাচনগুলি ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকে বলেন, “দিল্লি যাওয়ার রাস্তা উত্তরপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে।” সেক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশে কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গড়তে পারলে, দিল্লি দখলের লড়াইয়ে তারা এগিয়ে যায়।

(২) ভারতীয় জনতা পার্টি, সরকারপন্থী মিডিয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করুক আর না-ই করুক, বিভিন্ন কারণে নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনভিত্তির গ্রাফ নিম্নমুখী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করেও বিজেপির হার বিরোধী দলগুলির মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তার সঙ্গে নোটবন্দী থেকে শুরু করে জিএসটি-র ভ্রান্ত ব্যবহার, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ — যা যা মোদী সরকার দেশের জনতাকে লাভজনক বলে বুঝিয়েছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে যে তার অনেকগুলিই ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু কৃষক আন্দোলন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কেন্দ্রে এবং রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকারগুলিকে এমন বেকায়দায় ফেলেছে, যা মোদীর আট বছরের শাসনকালে কোনোদিন হয়নি। যেন মনে হচ্ছে মোদীর রথচক্র মাটিতে বসে যেতে শুরু করেছে। এ কথা যদিও অনস্বীকার্য, যে প্রচারের গুণেই হোক বা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে, এখনো ভারতে জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীই। কিন্তু হিন্দিভাষী রাজ্যগুলির বাইরে সেই জনপ্রিয়তা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে এখন ঋণাত্মক হয়ে গিয়ে বিজেপিবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। দিল্লি সংলগ্ন এলাকায় লাগাতার কৃষক আন্দোলনের ফলে উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ও কি মোদী তথা বিজেপির হাতছাড়া হয়ে যাবে? এই প্রশ্নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী পরীক্ষা হবে এবার।

রাজ্যগুলির মধ্যে ৪০৩টি বিধানসভা বিশিষ্ট উত্তরপ্রদেশের লড়াইয়ের ময়দানে প্রধান দলগুলি হল শাসক দল বিজেপি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস এবং কোনো কারণে ময়দানে কিছুটা অনুপস্থিত আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি। ভারতের সবচেয়ে বেশি মানুষের রাজ্য উত্তরপ্রদেশ জাতপাত, ধর্ম এবং সামাজিক টানাপোড়েনের একটি জটিল রাজনৈতিক চিত্রপট। এখানে নির্বাচনে লড়তে গেলে ইতিহাস, ভূগোল, রসায়নের সঙ্গে সঙ্গে পাটিগণিতও জানা প্রয়োজন। সে কারণেই এই রাজ্যের নির্বাচন অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক।

সবার আগে জাতের বিন্যাসটি বয়ান করা প্রয়োজন। সবর্ণ/উচ্চবর্ণ (ব্রাহ্মণ, রাজপূত/ঠাকুর, বৈশ্য, কায়স্থ, ভূমিহার) — ১৪.২% , ওবিসি (যাদব, রাজভর, নিষাদ, সাইনি, লোধ, জাঠ, গুর্জর, কুর্মি প্যাটেল ইত্যাদি) — ৪৪%, দলিত (জাতভ/চামার, পাশি, বাল্মীকি) — ২০.৪%, মুসলমান — ২০%। রাজনৈতিক দলগুলি এই জনবিন্যাসকে সামনে রেখেই নির্বাচনে গুটি সাজায়। যেহেতু জাতের নামে ভোট হয়, উন্নয়নের নিরিখে উত্তরপ্রদেশ পিছিয়ে যায়। মনে করা হয়, রাম জন্মভূমি আন্দোলন এবং তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা মন্ডল রাজনীতির কারণে উচ্চবর্ণ, যা আগে কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক ছিল, এখন বিজেপিকে ভোট দেয়। ২০০৭ সালে শুরুর দিন থেকে উচ্চবর্ণ বিরোধী মায়াবতী ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা দেওয়ার একরকম রাজনীতি করেছিলেন। তাতে ফলও পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন বিজেপি উত্তরপ্রদেশে এতটা সংগঠিত ছিল না, যা ২০১৪ সালে মোদীর উত্থানের ফলে হয়েছে। ২০২২ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে তাই বিজেপি আবার ‘অযোধ্যা-মথুরা-কাশী’ প্রচার করে উচ্চবর্ণের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব,করোনার ফলে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যা জনমানসে বিজেপি সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এর পাল্টা হিসাবে ২০% মুসলমান সমাজবাদী পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

দলিতরা প্রায় সবাই আগে মায়াবতীকে ভোট দিতেন। কিন্তু গত কয়েকটি বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে দেখা গেছে, দলিতদের মধ্যে থেকে পাশি ও বাল্মীকি সম্প্রদায়কে বিজেপি নিজেদের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের ২০.৪% দলিতের মধ্যে জাতভ/চামার ৫৬%। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। মায়াবতী নিজেও জাতভ। কেবল এঁরাই মায়াবতীর ভোটার হিসাবে অবশিষ্ট আছেন। এবারের নির্বাচনে মায়াবতীকে প্রচার করতে দেখা না গেলেও ১২-১৫% ভোট যে পাবেনই, এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এই পরিস্থিতিতে লড়াই শুরু হয়েছে ওবিসি, অর্থাৎ অন্য পিছিয়ে পড়া জাতির ভোট নিয়ে। মোট ৪৪% ওবিসির মধ্যে ১০% যাদব ভোটে সমাজবাদী পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্য। দুই শতাংশ লোধ ভোটে বিজেপির আধিপত্য। বাকি ভোট নেতা নির্ভর হয়ে নির্বাচন বিশেষে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে। এই ভোটগুলিকে ধরতেই বিজেপি এবং সমাজবাদী পার্টি লাফিয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে বহুজন সমাজ পার্টি থেকে বিজেপি হয়ে সমাজবাদী পার্টিতে সদ্য আগত স্বামীপ্রসাদ মৌর্য ৪-৫% মৌর্য-সাইনি ভোটে প্রভাব ফেলতে পারেন।

ভারতের নির্বাচন যে এমন জটিল পাটিগণিতে পরিণত, উন্নয়ন আর মাপকাঠি নয়, তা বলতে খারাপ লাগে। কিন্তু এটিই উত্তরপ্রদেশের বাস্তব। এসবের মাঝখানে পড়ে কংগ্রেসের সমস্যা জটিল। উত্তরপ্রদেশকে সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণ মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছে কংগ্রেস, প্রভাবশালী মুসলমান বা ওবিসি নেতারাও এক সময়ে কংগ্রেস থেকেই এসেছেন, দলিত ভোট ছিল কংগ্রেসের একচেটিয়া। সবই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। কেউ গেছেন মায়াবতীর দিকে, কেউ সমাজবাদী পার্টি, তো কেউ বিজেপির দিকে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস পর্যবেক্ষক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবার একটি নতুন ধরনের সদর্থক রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন উত্তরপ্রদেশের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটকে লক্ষ করে।

“লড়কি হুঁ লড় সক্তি হুঁ” স্লোগান দিয়ে তিনি মহিলাদের জন্যে ‘গোলাপি ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেছেন। সেখানে মহিলাদের উন্নয়নের একাধিক প্রতিশ্রুতি আছে। স্কুটি, মোবাইল ফোন ইত্যাদি একাধিক সুবিধা দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি আছে। এতে উনি কতটা সফল হন তা-ও দেখার। কারণ খানিকটা পশ্চিমবঙ্গ বাদ দিলে মহিলাদের আলাদাভাবে নিজের মত করে ভোট দেওয়ার প্রবণতা ভারতের কোনো নির্বাচনে তেমন দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের ভোট মমতা ব্যানার্জীর কারণে তৃণমূল পায়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে মহিলারা এর আগে কোনোদিন নিজেদের সমস্যার কথা ভেবে ভোট দেননি, পরিবারের প্রধান পুরুষের কথাতেই ভোট দেন। প্রিয়াঙ্কা সেই জায়গায় খানিকটা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন মহিলাদের প্রর্থীতালিকায় ৪০% সংরক্ষণ দিয়ে।

তবে এখনো পর্যন্ত অ্যাডভান্টেজ বিজেপি। কারণ তাদের ভোটের হার গত আট বছরের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ৪০ শতাংশের আশেপাশে থেকেছে, সমাজবাদী পার্টি কোনোদিন ৩০% পেরোতে পারেনি। মায়াবতী কেবল ২০০৭ সালে ব্রাহ্মণ ভোটের সহায়তায় ৩০% ভোট পেয়েছিলেন। তখন বিজেপি উত্তরপ্রদেশে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই কারণে যাদবদের ক্ষমতায়ন ঠেকাতে ব্রাহ্মণরা বহুজন সমাজ পার্টির দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

তবে বিজেপির ভোট ১০% কমে গেলেই সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। বিজেপির উচ্চবর্ণের ভোটে কংগ্রেস থাবা বসালেও ভোটের ফল অনেকটা বদলে যেতে পারে।

উত্তরপ্রদেশের পাশের রাজ্য, ৭০টি বিধানসভা আসনের উত্তরাখণ্ডে, পাঁচ বছর পরে পরে সরকার পরিবর্তন হয়। কংগ্রেস আর বিজেপিই প্রধান দুটি পক্ষ, কিন্তু বহুজন সমাজ পার্টির অস্তিত্ব আছে। বর্তমানে আম আদমি পার্টিও এসে পড়েছে। যদিও ওপিনিয়ন পোলগুলির মতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, তবু কংগ্রেসই যেন বেশি শক্তিশালী। কংগ্রেস নেতা হরিশ রাওয়াত রাজ্যের জনপ্রিয়তম রাজনীতিবিদ। কিন্তু ছোট রাজ্যে ভোটের প্রবণতা বদলাতে বেশি সময় লাগে না। যদিও বিজেপি গত তিন বছরে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে, অর্থাৎ নড়বড়ে অবস্থা; একাধিক বিজেপি নেতার দলবদল করে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া কাদের পক্ষে যাবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন আছে।

উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড বাদ দিলে সামান্য বড় রাজ্যগুলির মধ্যে নির্বাচন হচ্ছে পাঞ্জাবে, যেখানে বিজেপি সবচেয়ে দুর্বল। তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রধানত ১১৭টি বিধানসভা আসনের পাঞ্জাব থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই এই রাজ্য থেকে বিজেপির মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রায় চার দশকের সঙ্গী অকালি দল (বাদল) বিজেপিকে ত্যাগ করেছে। অকালিরাও অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে। প্রায় বিরোধীশূন্য এই প্রদেশে কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরা অত্যন্ত সহজ হত। কিন্তু গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং ন বছরের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংয়ের দল ছেড়ে বিজেপির সঙ্গে জোট তৈরি করা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। আর এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে জনমানসে আবার জায়গা করে নিয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। কিন্তু নতুন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিংহ চান্নির ফিরোজপুর কান্ড পরবর্তী ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কংগ্রেসকে এ যাত্রায় উতরে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আম আদমি পার্টির মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্যে কোনো মুখ নেই। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেই বারবার পাঞ্জাবে গিয়ে এটা, ওটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসতে হচ্ছে। এটি বহিরাগত রাজনৈতিক দখল বিরোধী পাঞ্জাবিরা কতটা মেনে নেন তা দেখার। চরণজিৎ সিংহ চান্নির দলিত শিখ পরিচয় রাজ্যের ৪০% দলিত শিখের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। স্বাধীনতার পরে পাঞ্জাব এই প্রথম দলিত মুখ্যমন্ত্রী পেল, যা মাজহাবী-রাবিদাসিয়া শিখ সমাজে প্রভাব ফেলতেই পারে। মাত্র চার মাসের কার্যকালে চান্নি পাঞ্জাবের জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন।

গোয়া একটি ছোট রাজ্য, মাত্র ৪০টি বিধানসভা আসন, যেখানে ঘোড়া কেনাবেচা এবং দলবদলের ইতিহাস রয়েছে। বিধানসভা পিছু ভোটার সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় কিছু কিছু বিধানসভা কেন্দ্রে পার্টির চেয়েও ব্যক্তির প্রভাব বেশি। প্রচুর নির্দল বিধায়ক নির্বাচনে জেতেন । ২০১৭ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে উঠে এসেছিলো ১৭টি আসন জিতে, কিন্তু সরকার গড়ে ১৪ টি আসন জেতা বিজেপি। কংগ্রেস ও বিজেপি বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দল হল গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি, মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি এবং আম আদমি পার্টি। এ বছর মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে ও প্রশান্ত কিশোরের পরিকল্পনায় তৃণমূল কংগ্রেসও গোয়ার নির্বাচনে লড়ছে। লুইজিনহো ফালেইরো, চার্চিল আলেমাও, আলেক্সিও রেগিনাল্ডো লাউরেন্সোর মতো কিছু কংগ্রেস নেতাকে দলে টেনেছে। মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টির সঙ্গে জোট করা এবং বিজ্ঞাপনের পিছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা সত্ত্বেও নির্বাচনে লক্ষ্মীলাভ হবে কিনা এই নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ লুইজিনহো নিজে বিধানসভায় লড়ছেন না, রাজ্যসভায় ঢুকে বসে আছেন। চার্চিল এবং রেজিনালডোর মধ্যে একমাত্র কুর্তোরিম বিধানসভা থেকে রেজিনালডোর জেতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল, বাকিদের জেতা প্রায় অসম্ভব। গোয়াতে বিজেপিবিরোধী আবেগ অত্যন্ত প্রবল, বিশেষ করে ২৭% খ্রিস্টান ভোটারের মধ্যে। কোঙ্কন অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির গির্জা ভেঙে দেওয়া, খ্রিস্টানদের উপরে অত্যাচার এবং অবৈধ দখলদারি এর কারণ।

ষাটটি বিধানসভা আসনের মণিপুরেও কংগ্রেস, বিজেপির মুখোমুখি লড়াই। যদিও বিজেপি এখানে মেঘালয়ের দল কনরাড সাংমার এনপিপি এবং নাগাদের দল এনপিএফের সঙ্গে জোটবদ্ধ। অন্তত কংগ্রেসের ২৮টি আসনের বদলে নিজেরা ২২টি আসন জিতে মণিপুরে সরকার গঠনের সময় তেমনই ছিল। কিন্তু তারপরে হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বে টাকার খেলা বিজেপির থেকে এনপিপিকে দূরে সরিয়েছে। বিজেপি কংগ্রেস বিধায়কদের ভাঙিয়ে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড় করেছে। ফলে এনপিপি বিজেপির বীরেন সিং সরকার ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এবারের নির্বাচন শক্ত লড়াই বলে মনে করা হচ্ছে, এবং টাকা এই রাজ্যে সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, এই পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ভারতের ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন এবং তার পরের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে গভীর প্রভাব ফেলবে। মোদীর যে TINA (দেয়ার ইজ নো অল্টারনেটিভ) ভাবমূর্তি এতদিন সফলভাবে ভারতীয় নির্বাচনগুলোতে চলছিল, কৃষক আন্দোলন তাতে কত বড় ছিদ্র করতে পারল তা এই নির্বাচনেই প্রমাণ হয়ে যাবে। যদি বিজেপি অন্তত তিনটি রাজ্যে সরকার গঠন করতে না পারে, এবং উত্তরপ্রদেশে ব্যাপক শক্তিক্ষয়ের সম্মুখীন হয়, নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী ও অমিত অনিলচন্দ্র শাহের ভারত শাসন শেষের দিন গুনতে শুরু করতে হবে। ওঁদের ভাবমূর্তির পুনরুদ্ধার আর সম্ভব হবে না।

মতামত ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.