ছাতিমের গন্ধ যেন উৎসব-পরবর্তী বিষণ্ণতাকে আরও তীব্র করে তোলে। আমার বিষণ্ণ মন তখন মা, মাসি, পিসিদের স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে বেড়ায়।
আদিগঙ্গার পাশে ছোট্ট কলোনি নাকতলা সেকেন্ড স্কিম। আমার মামাবাড়ির পাড়া। সেকেন্ড স্কিমের বারোয়ারি পুজোর বয়স এখন ৭৫ বছরের বেশি। এটা সেই সময়কার গল্প, যখন সবাই লোকের বাড়িতে দল বেঁধে বিজয়া করতে যেত। এখন সেসবের পাট চুকে গেছে। কলোনিগুলোও স্বাবলম্বী হয়ে গেছে। অপর্ণা মাসি, কুমকুম পিসিদের বাড়িগুলো রাতারাতি ফ্ল্যাট হয়ে গেল। পাড়ায় অনেক নতুন মানুষ এল বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে সেই আত্মীয়তা আর হল কই?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ফিরে যাচ্ছি বছর পঞ্চাশেক আগের এক দশমীর দিনে। প্রতিবছর আমার মামা, মাসিরা হইহই করে আদিগঙ্গায় ঠাকুর বিসর্জন দিতে যেত। ফিরে এসে বাড়ির চৌকাঠ ডিঙানোর সময়ে নারকোল পাক দেওয়ার গন্ধে ওদের মন উৎফুল্ল হয়ে উঠত। আমার মামাবাড়ির পিছনের লাল বারান্দায় পাপু, অর্থাৎ আমার মেজমাসি, মানি (বড়মাসি), দাদাবাবা (আমার দাদু) আর বুম্মা (আমার দিদিমা) একসঙ্গে বসে আখের গুড় দিয়ে নারকোল পাক দিচ্ছে, ক্ষীরের চাকতি কেটে নিচ্ছে, চিনির সিরা থেকে সুতো তুলে পরখ করছে আর বড় হাঁড়িতে মটর সেদ্ধ করছে। গুড়ের নাড়ু, গোকুল পিঠে, জিভে গজা আর ঘুগনি বানানো হবে। দশমীর পরেই বিজয়া লেগে যাবে, অতএব একাদশীর সকাল থেকেই বাড়িতে লোকসমাগম শুরু হবে। লাহিড়ী বাড়ির ছেলেমেয়েরাও হাতে পুঁটুলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রণাম করবে। ওদের সঙ্গের পুঁটুলিতে জমতে থাকবে নাড়ু, মোয়া, নিমকি, চন্দ্রপুলি, নারকেল ছাপা – আরও কত কী।
বাঙালির ঘরোয়া মিষ্টির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ঘরে ঘরে মা, ঠাকুমারা সেই কোন কাল থেকে স্নেহ মমতা মাখা হাতে মিষ্টি তৈরি করে আসছে। সে তো শুধু মিষ্টি নয় যেন একেকটা শিল্প, রূপকথার গল্প। সেই সব রূপকথার মধ্যে ইচার মুড়া, গঙ্গাজলি, নারকেল চিঁড়া, নারকেল জিরা – এসব নাম বারবার আসবে।
পুববাংলার কোনো কোনো জায়গায় চিংড়িকে ইচা মাছ বলা হয়। খুব সূক্ষ্ম করে নারকেল কেটে নিয়ে চিনির সাথে পাক দিয়ে সেই মিশ্রণ থেকে চিংড়ি মাছের মাথার আকারে গড়ে নিতে হয়। সেই চিংড়ির মাথা ঘিয়ে ভেজে নিতে হয়। পোড়া পোড়া রং ধরে, তাই অনেক অঞ্চলে ইচা পোড়াও বলা হয়ে থাকে। আমার বাড়িতে একসময় লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদে ইচার মুড়া দেওয়া আবশ্যিক ছিল।
বাংলার মিষ্টি মানচিত্র থেকে আজ ইচার মুড়ার নাম প্রায় মুছে গেছে। কারণ? মানুষের সময় এবং ধৈর্যের অভাব। সূক্ষ্ম করে নারকেল কাটা বড়ই কঠিন কাজ আর ইচার মুড়ো ঘিয়ে ভাজা তার চেয়েও কঠিন। খুব সাবধান থাকতে হয়, যেন ভেঙে না যায়।
নারকেলের চিঁড়ার কথা বলতে গেলে আমাকে ফিরে যেতে হবে দেশভাগ পূর্ববর্তী নোয়াখালী সদরে। আমার ঠাকুমার বাপের ভিটেতে। আমার ঠাকুমার দিদি, অর্থাৎ মাসিদিদা, আর মেসোদাদুর দেখা হয় ঢাকায়, দুই তরফের এক আত্মীয়ের বিয়েতে। প্রথম দেখাতেই প্রেম। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব উন্নত ছিল না, আর ঢাকা থেকে নোয়াখালী অনেক দূরের পথ। তবু মেসোদাদু মাসিদিদাকে কথা দিয়ে বলে ‘আমি চাকরি পাইয়াই তোমার লগে যোগাযোগ করুম।’ তারপর অনেকগুলো দিন পেরিয়ে যায়, মধ্যে চিঠি লেখালিখি চলতে থাকে। মাসিদিদা অসম্ভব সুন্দরী এবং গুণী ছিলেন। বয়স বাড়ার কারণে বাড়ির লোক চিন্তিত হয়ে পড়ে। অনেক সম্বন্ধ মাসিদিদা ফিরিয়ে দেয় এবং বলে যে বিয়ে করলে সেই ছেলেটিকেই করবে। এদিকে মেসোদাদুর বাবা এই বিয়েতে রাজি নন, কারণ আমার ঠাকুমার পরিবার জমিদার হলেও কুলীন ব্রাহ্মণ নয়। তবে শেষমেশ তিনি রাজি হন এবং মাসিদিদাকে নোয়াখালীতে দেখতে আসেন। মাসিদিদার অপূর্ব গান আর নিপুণ হাতের কাজ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। শেষে মাসিদিদার বানানো নারকেলের চিঁড়া দেখে তিনি মাসিদিদাকে বাড়ির বউ বলে সম্বোধন করে বসেন। দুগ্ধশুভ্র নারকেলের চিঁড়া একটি অপরূপ শিল্পকর্ম।
আরো পড়ুন একজন হার না মানা তওয়াইফ অথবা মনীশের মা
ও জিনিস আজ আর তেমন বানানোই হয় না। বিজয়ার সঙ্গে নারকেলের চিঁড়া বা জিরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিজয়ার পর আমার বড়মাসির শাশুড়ি, আমার দাদাবাবা, অর্থাৎ তাঁর বেয়াইকে, এক কৌটো নারকেলের চিঁড়া উপহার দিয়েছিলেন। সেই কৌটো ভরা চিঁড়া দাদাবাবা অনেকদিন সাজিয়ে রেখেছিল। আজকাল ধৈর্যের অভাবে কেউ আর নারকেলের চিঁড়া বানায় না।
নারকেলের চিঁড়া বানানোর প্রথম ধাপ খুব পাতলা করে চিঁড়ার আকারে নারকেল কাটা। নরুণ ব্যবহার করলে ভাল। জাঁতি দিয়ে জিরা কাটা হত। চিনির সিরা তৈরি করে খুব অল্প আঁচে চিঁড়া সাঁতলে নিলেই মুচমুচে নারকেলের চিঁড়া তৈরি। বরাক উপত্যকার সিলেটিদের মধ্যে বিয়ের তত্ত্বে নারকেলের চিঁড়া আর জিরা দেওয়ার প্রচলন ছিল। তাও এখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
বাংলার ঘরোয়া মিষ্টিতে ক্ষীর আর নারকেলই ব্যবহার করা হত, কারণ ছানার তৈরি মিষ্টি অনেকদিন অবধি পুজোয় প্রসাদ হিসাবে গুরুত্ব পায়নি।
উৎসব ফুরালে সবার নিজের কাজে ফেরার পালা। কুয়াশা মাখা বিষণ্ণ বিকেল, চামড়ায় হালকা টান ধরা, ঝরা কাশফুলের চিহ্ন নিয়ে হেমন্তের আগমনে সবাই যে যার কাজের শহরে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাবে। মা বয়ামে ভরে কুচো নিমকি, এলোঝেলো, নাড়ু, নারকেল ছাপা গুছিয়ে দেবেন। সেই বয়ামের মধ্যেই ভরা থাকুক বিজয়ার উষ্ণতা, হারানো ঘরোয়া মিষ্টির স্বাদ।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








