এই আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটা বড় প্রশ্ন হল, এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? নাকি এটা গণআন্দোলন? ৯ অগাস্টের পর থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃতার ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে, রাজ্য সরকারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা একে নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছেন। আর যে কোনো গণআন্দোলনই আদতে রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই দ্বিধায় ভুগছেন বলে মনে হয়। নয়ত মাঝেমাঝেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের রাজার বিধবা পিসির লাউতে চিংড়ি আছে অভিযোগ শুনে ‘ছি, ছি, ছি’ বলে আর্তনাদ করার মত কোনো কোনো ডাক্তার নেতা ‘আমাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক’ বলছেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই যে সিপিএম কর্মীরা কদিন আগে ধর্মতলায় দলীয় পতাকা নিয়ে না গেলেই পারতেন। কিন্তু গেছেন বলে মঞ্চ থেকে উত্তেজিত সাফাই গাওয়ারই বা দরকার কী? যে আন্দোলন স্পষ্টত সরকারের বিরুদ্ধে এবং যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে, সেখানে কে কোন পতাকা নিয়ে এল না এল – তার দায়িত্ব জুনিয়র ডাক্তাররা নেবেন কী করে এবং কেন? ভয় কি তৃণমূলের প্রোপাগান্ডা মেশিনারিকে? সে তো দিনরাত চলছেই। মঞ্চের সামনে পতাকা এসে পড়ার আগেও চলছিল, পরেও চলছে, না এলেও চলত। সরকার যে দলের হাতে তারা তো চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ এই আন্দোলনকে হেয় করতে। তা নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিচলিত হবেন কেন, যদি তাঁদের চোখ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মত দশ দফা দাবিতেই নিবদ্ধ থাকে? আন্দোলন রাজনৈতিক মানেই অবৈধ – এই যুক্তিই বা তাঁরা মেনে নেবেন কেন? একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে পৃথিবীর কোনো আন্দোলন কোনোদিন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন উদ্যোগ না নিলে আর জি কর আন্দোলনও যতটা ছড়িয়েছে তা ছড়াত না। ফলে ডাক্তারদের আন্দোলন এই গুরুত্ব পেত না। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। এসএসসি, টেট, মাদ্রাসার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে।

বলা বাহুল্য, ডাক্তারদের আন্দোলনকে এত বড় আন্দোলনের রূপ দিয়েছে যে দল এবং সংগঠনগুলো, তারা সকলেই কোনো না কোনো মতের বামপন্থী। কারণ ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা পাল, সজল ঘোষরা আর জি কর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও মিইয়ে গেছেন বহুদিন হল। বস্তুত অদ্ভুতুড়ে সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের পর থেকেই বিজেপি বুঝে উঠতে পারছে না এই আন্দোলন নিয়ে কী করিতে হইবে। কারণ একে দাঙ্গা করার অভিজ্ঞতা হিন্দুত্ববাদীদের যতখানি, তার দু আনাও আন্দোলন করার ব্যাপারে নেই। তার উপর হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে বিস্তর বিষ ছড়িয়েও ব্যাপারটাকে কিছুতেই হিন্দু-মুসলমান বাইনারিতে ফেলা যায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ডাক্তারদের অবস্থানে যোগ দিতে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের। ফলে কখনো শুভেন্দু অধিকারী একেবারে তৃণমূল নেতাদের সুরেই আন্দোলনকারীদের নেশাখোর বলছেন, আবার কখনো তৃণমূলবিরোধী ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সরকারি কার্নিভালের পালটা কার্নিভালকে সমর্থন করছেন। বিজেপির কুখ্যাত আই টি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ৩ অক্টোবরের একখানা দুর্গার সঙ্গে আর জি কর মেলানো জগাখিচুড়ি ভিডিও পিন করে রেখেছেন। এই আন্দোলন নিয়ে মোটেই পোস্ট করছেন না। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর পোস্টগুলোতে রাজ্য সরকারের চেয়ে বেশি আক্রমণ করছেন সিপিএমকে। টিভি স্টুডিওতে আসা বিজেপি মুখপাত্রদের কথাবার্তা শুনলেও বোঝা যাচ্ছে তাঁরা তৃণমূলকে কিছু সাধারণ গালাগালি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। কোনোভাবেই যেন ডাক্তারদের আন্দোলনের উপরে ফোকাস না চলে যায় – সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক। বাকি রইল কংগ্রেস, যাদের কর্মী সমর্থক রাজ্যের খুব ছোট একটা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এমতাবস্থায় নিজেদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয় বলে চেঁচামেচি করার কোনো দরকার আছে কি? আন্দোলনকারী ডাক্তাররাও তো অধিকাংশই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? এই প্রশ্নের আরও একটা দিক আছে, যেদিক থেকে এই আন্দোলনের সমালোচনা হওয়া দরকার।

দশ দফা দাবি নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা অনশনে বসার কিছুদিন আগেই এই আন্দোলনের সমালোচক এক বন্ধু বলছিলেন ‘ওটা ডাক্তারদের আন্দোলন। আর কারোর আন্দোলন নয়।’ তাঁর উষ্মা অকারণ ছিল না। সে পর্যন্ত ডাক্তাররা যা যা দাবি করছিলেন তার সবই নিজেদের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত। তিনি বলছিলেন, গত শতকের আটের দশকের ডাক্তারদের আন্দোলনের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলছেন না। সে কাজ না করলে এই আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজিত হওয়া ভুল। নিম্নলিখিত দশ দফা দাবির পরে আর সেকথা বলা চলে না।

প্রথম দাবি সম্পর্কে সরকার বলতেই পারে যে এর সুরাহা আদালতের হাতে। দ্বিতীয় দাবি সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে এতে রোগীদের কিছু এসে যায় না। তবে সবকটা দাবিই জরুরি এবং ন্যায্য, ২-১০ পূরণ করাও সরকারের হাতে। কিন্তু ৩-৭ একেবারেই রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলোর যা হাল তাতে এগুলোর চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু হতে পারে না রোগীদের পক্ষে। এই দশ দফা দাবি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে হলে তৃণমূল সরকার যেসব দালাল চক্র, কুচক্রের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো ভাঙতে হবে। তার চেয়ে নিজের সরকার নিজে ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়া সহজ। শুধু তাই নয়, ৩-৭ নম্বর দাবি পূরণ করলে একথা প্রকাশ্যে আসবে যে যেখানে যত ডাক্তার থাকা উচিত তত ডাক্তার নেই। যত শয্যা একটা হাসপাতালে আছে বলে দাবি করা হয়, তাও নেই। ফলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে সর্বরোগহর বড়ি হিসাবে দেখানো যে আসলে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁক গোপন করতে, তাও প্রমাণিত হবে।

ডাক্তারদের আন্দোলন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূল তো বটেই, স্বঘোষিত বামেরা অনেকেও বলে চলেছেন যে এই আন্দোলনকে আসলে চালাচ্ছে কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা, যাতে তাদের কাছে আরও বেশি সংখ্যক রোগী যায়। একে এই লেখার গোড়ার দিকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলেছি। কারণ প্রথমত, একথা তথ্য দিয়ে কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। যেমন প্রয়াত রতন টাটা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারেননি যে মমতার সিঙ্গুরে কারখানা হতে না দেওয়ার আন্দোলনের পিছনে টাটার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোর হাত ছিল। দ্বিতীয়ত, মূলত যে শ্রেণির মানুষ আজও সরকারি হাসপাতালে যান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারবেন না। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বাড়িতেই মরতে দেবেন নিকটাত্মীয়কে। কারণ ওই হাসপাতালগুলোতে প্রথমবার গেলে যে ‘পেশেন্ট রেজিস্ট্রেশন’ করাতে হয় তার খরচই কোথাও হাজার টাকা, কোথাও দু হাজার টাকা। অথচ ওই শ্রেণির মানুষের অনেকের গোটা মাসের পারিবারিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ওই হাসপাতালগুলোতে মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে দৌড়লেও এমার্জেন্সিতে ঢুকিয়েই আগে ‘ডিপোজিট মানি’ দিতে হয়। তার অঙ্কটা ওই শ্রেণির মানুষের বাড়িঘর বেচে দিলেও আসবে কিনা সন্দেহ। ফলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে আর তার আগে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছিল – এমন আষাঢ়ে গপ্প কার্তিক মাসে একেবারেই অচল।

হঠাৎ এমন ভান করা হচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর ভীষণ বিরোধী। ব্যাপারটা সত্যি হলে চমৎকার হত। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করার দরকারই ছিল না। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিদিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ডাক্তারদের আন্দোলন চলাকালীন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের খরচ বেড়ে গেছে। তা থেকে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে এর কারণ এই পর্বে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানো।

এখানে চেপে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল, আপনার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে এখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবেন, কিন্তু বেশকিছু খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে না, কোনোরকম অস্ত্রোপচারও হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকেই সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের খরচও দেওয়া হয়। অথচ এই প্রতিবেদনে কেবল সরকারের খরচ বেড়েছে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতাল থেকে কত টাকার ‘ক্লেম’ এসেছে তা লেখা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের সবটাই যে বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া খরচ, তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর্থিক বর্ষের মাঝখানে, এত নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের সরকারি জমা, খরচের হিসাব এভাবে পাওয়া যায় কিনা, কে করল এই সমীক্ষা, সেসব প্রশ্ন না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

কিন্তু যে কথা বলার, তা হল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করা হয়েছে মানেই সরকার তো মেনে নিয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যের সব মানুষের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে বেসরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর খরচও সরকার জোগাচ্ছে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে সরকার কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কীভাবে কমানো যায় তা দেখছে না কেন? এর উত্তর সরকারপন্থীদের ঠোঁটস্থ থাকা উচিত। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল যে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে লাগাম পরানো হবে। সেই অনুযায়ী কলকাতায় ঘটা করে মালিকদের সঙ্গে অন-ক্যামেরা সভা করেছিলেন স্বয়ং মমতা। এমনকি জেলা সফরের সময়ে সেখানকার নার্সিংহোমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সভা করেন দফায় দফায়।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কলকাতার টাউন হলের সভায় মমতা রীতিমত বকাঝকা করেছিলেন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের। তাদের যাবতীয় অনিয়ম, আকাশছোঁয়া বিল নিয়ে সরকারের কাছে অনেক অভিযোগ আছে বলে জানা গিয়েছিল। সেসব আটকাতে কমিশন তৈরি, আইন পাস করা ইত্যাদি অনেক কাণ্ড হয়েছিল। খুব ভাল কথা। কিন্তু তাহলে সাতবছর পরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ একইরকম রয়ে গেল কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের অসাধুতা, ডাক্তারদের অসাধুতার যে অভিযোগ এখন সরকারপন্থীরা তুলছেন সেগুলোরই বা সুরাহা হল না কেন? তার মানে ওখানেও ফাঁকি? একথা সত্যি যে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাক্তার না থাকার সমস্যা ২০১১ সাল থেকে তৈরি হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো লুডো খেলতে দেওয়ার জন্য সরকার বদলে ফেলেননি? তাহলে এতদিন এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে বারণ করেছিল কে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ডাক্তাররা এই আন্দোলনেও চাইতে পারলেন না।

এছাড়াও কিছু প্রশ্ন আছে, যার জন্যে জবাবদিহি সরকারের পাশাপাশি ডাক্তার-সমাজকেও করতে হবে। যেমন ডাক্তাররা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুললেও নার্স এবং আয়াদের কথা কিন্তু তুললেন না। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মানুষমাত্রই জানেন, রোগীর সারাদিনের পরিচর্যা থাকে ওঁদের হাতেই। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার এতই অপ্রতুল যে রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ রাখার জন্যে দক্ষ শ্রমিক নার্স আর অদক্ষ শ্রমিক আয়াদের ভূমিকা বিরাট। এঁদের দাবিদাওয়া বাদ দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে কোনো সংস্কার অপূর্ণই থেকে যাবে।

দ্বিতীয়ত, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না তো বটেই; কয়েকশো পুলিস দিয়েও নিশ্চিত করা যাবে না, যদি রোগীর বাড়ির লোক আর ডাক্তারদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ থাকে। এই বাতাবরণ তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকখানি দায়ী সরকার। কারণ বহু হাসপাতালে ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকে না, ওষুধপত্র থাকে না। উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন রোগীর বাড়ির লোকেরা বোঝার অবস্থায় থাকেন না যে এতে ডাক্তারের কিছু করার নেই। তাঁরা ডাক্তারকে সামনে পান বলে তাঁকেই ধরে পিটিয়ে দেন। কিন্তু এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার পিছনে ডাক্তারদেরও খানিকটা দায় আছে। রোগী যখন দেখেন সিনিয়র ডাক্তাররা গুরুতর অবস্থার রোগীকেও দিনে একবার দেখতে আসেন, অথচ বাইরে চেম্বার আর নার্সিংহোম কামাই যায় না, তখন তাঁদের ভিতরে ক্ষোভ জমা হয়। সেই ক্ষোভের মার তারপর এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তার আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।

তৃতীয়ত, সংখ্যার বিচারে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশ শতাংশের কম হলেও, সিনিয়রদের বাইরের ব্যস্ততার কারণে তাঁরাই এই ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের বিরুদ্ধেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষের নানা অভিযোগ থাকে। ‘যত্ন করে দেখেন না’, ‘ছোট ডাক্তারবাবুর ব্যবহার খারাপ’ ইত্যাদি। আর জি করের যে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছেন তিনি যে টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করে তারপর শুতে গিয়েছিলেন তা এখন আমরা সকলেই জানি। বস্তুত অধিকাংশ জুনিয়র ডাক্তারেরই ওটাই রুটিন। নাওয়া-খাওয়া দূরের কথা, শোয়ার সময়ও নেই। তেমন একজনের রোগীর প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি ব্যবহার ভাল হবে – এমন আশা করাই অন্যায়। যত্ন করে দেখবেন – এও প্রায় আবদারের পর্যায়ে পড়ে। বরং রোগী দেখতে গিয়ে যে রোজই ওঁরা চরম ভুলভাল করেন না তার জন্যেই প্রশংসা করা উচিত। এর সুরাহা কিন্তু অনেকটাই সিনিয়র ডাক্তারদের হাতে। তাঁরা যেভাবে আজকের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেভাবে যদি বছরে ৩৬৫ দিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে খেপ খেলা বন্ধ করে সরকারি হাসপাতালে সময় দেন, তাহলেই জুনিয়ররা অনেকটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পাবেন। রোগীর পরিবারেরও অসন্তোষ কমবে।

চতুর্থত, বহু হাসপাতালের বহু বিভাগে ডাক্তারের অভাবের একটা কারণ যেমন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে, বদলি; বিজ্ঞাপন দেওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্র জমা না পড়াও একটা কারণ। কেন জমা পড়ে না আবেদনপত্র? সাধারণত বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ সামাজিক। তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে। ১৯৮০-র দশক থেকে বাঙালি বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা মৌলিক বদল এসেছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছেন। মানুষের সেবা করবে বলে নয়, অনেক টাকা কামাবে বলে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে সকলেরই। আজকাল অনেক শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকও তো নিজের চারচাকার গাড়ি না থাকলে জীবন বৃথা মনে করেন। আজ হ্যাচব্যাক হলে কাল সেডান কিনতে চান। নইলে মনখারাপ হয়। সেখানে একজন ডাক্তার উচ্চতর বেতন, বিদেশযাত্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের হাতছানি এড়িয়ে আউটডোর, ইন-পেশেন্ট মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগী সামলানোর ঝামেলা ঘাড়ে নিতে সরকারি হাসপাতালে ঢুকবেন কেন?

#

অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে আসা হল মনে হচ্ছে তো? রাজ্য সরকারও ঠিক এই কথা বলেই এসব মৌলিক প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে, যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে অভয়া কাণ্ড আবার হবে। এবারে একজন ডাক্তারের উপর অমন আক্রমণ হয়েছে, কাল একজন নার্সের উপর হতে পারে, পরশু কোনো আয়ার উপর হতে পারে, তার পরদিন কোনো শয্যাশায়ী রোগীর উপরেও হতে পারে। ডাক্তাররাও কি স্থিতাবস্থাই বজায় রাখতে চান স্রেফ নিজেদের কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করে নিয়ে? নাকি আমূল পরিবর্তন চান? এই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমূল পরিবর্তনে সেইসব মানুষের স্বার্থ জড়িত। কথাটা কিন্তু ডাক্তারদের মাথায় রাখতে হবে।

তবে এত কিছু বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই করার দায়িত্ব একা তাঁদের নয়। অনেকখানি দায়িত্ব সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের। উপরন্তু দলমত নির্বিশেষে যত মানুষ এতদিন ধরে লড়ছেন, দায়িত্ব তাঁদেরও। ডাক্তাররা বা রাজনৈতিক নেতারা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের সবার লোভ, লালসা বজায় থাকবে আর ডাক্তাররা নিষ্কাম কর্ম করবেন, নেতারা কেবল আমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যাবেন – এমন হয় না।

মতামত ব্যক্তিগত

প্রথম ভাগ

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.