হপ্তা তিনেক আগে কলকাতায় এসেছিলেন ডাঃ কাফিল খান। সেই কাফিল, যিনি আদিত্যনাথশাসিত উত্তরপ্রদেশে নিজের পেশাগত দায়িত্বের ঊর্ধ্বে উঠে পকেটের পয়সা দিয়ে মরণাপন্ন শিশুদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই শিশুদের মৃত্যুতে তাঁকেই অপরাধী সাজিয়ে কারাবাস করিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাফিল কলকাতায় এসে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার নিন্দা করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারও নিন্দা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় – ‘চলতি প্রতিবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রশংসা প্রাপ্য, কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্রুদ্ধ ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন। আপনারা এখন যতই রেগে থাকুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে আজও বাংলায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। এটা উত্তরপ্রদেশ হলে সমস্ত প্রতিবাদীকে জেলে পোরা হত আর তাদের নামে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেওয়া হত।’
কাফিলের দোষ নেই। তিনি এ রাজ্যের মানুষ নন, রাজনীতির লোকও নন। ফলে এখানকার আন্দোলনের ইতিহাস বা তৃণমূল কংগ্রেস আমলে আর কী কী ঘটেছে – সেসব জানা তাঁর থেকে প্রত্যাশিত নয়। উপরন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাংলা না জানা এবং এ রাজ্যের ইংরিজি জানা মানুষের বিজেপি-বিরোধিতা এবং/অথবা সিপিএম-বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার সফলভাবে নিজেদের যাবতীয় কুকীর্তি বাকি ভারতের কাছে ঢেকে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কাফিলের কানে নিশ্চয়ই এ খবর পৌঁছয়নি, যে এ রাজ্যেও সরকারবিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মনে হয় না কাফিলকে যাঁরা কলকাতায় এনেছিলেন তাঁরা আনিস খানের কথাও জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে কোনো দাবিতে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই শাসক দল সেই প্রতিবাদকে মানুষের চোখে হেয় করার চেষ্টা করে রাজনীতির জুজু দেখিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতদিন বলা হত ‘এর পিছনে বিজেপি আছে’। যেহেতু আর জি কর আন্দোলনে বিজেপি বহু চেষ্টা করেও পা রাখতে পারেনি এবং সকলেই টিভির পর্দায় লাইভ দেখে নিয়েছেন যে অভিজিৎ গাঙ্গুলির মত বিজেপি নেতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে কীভাবে তাঁদের বিতাড়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা; সেহেতু এখন বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পিছনে সিপিএম আছে, অতিবাম শক্তি আছে। যেন এরা সব নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা সংবিধানে লেখা আছে বিরোধীরা কোনো আন্দোলনে মদত দিতে পারবে না। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে ভাবা যাক যে আনিস তো বিজেপি, সিপিএম বা কংগ্রেস করতেন না। তবু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে তাঁকে মরতে হয়েছে এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই সত্ত্বেও তাঁর পরিবার আজও বিচার পায়নি। বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যেও পুলিস অনেককে বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। নৈহাটির মত শারীরিক আক্রমণের কথা না-ই বা বললাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদের মরুদ্যান – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
মমতা প্রতিবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এই প্রথম যাননি। ২০১৪ সালের হোক কলরব আন্দোলনও শেষ হয়েছিল তিনি শেষপর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করার পরে। ২০১৯ সালেও লোকসভা নির্বাচনের মুখে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে মমতা গিয়েছিলেন আন্দোলন তুলে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু দুবারই সেটা করেছিলেন আন্দোলন দমন করতে না পেরে, শেষে নিরুপায় হয়ে। এর কৃতিত্ব আন্দোলনকারীদের, এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রীকে মমতাময়ী আখ্যা দিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। এবারেও মমতা নানা টালবাহানার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অনন্যোপায় হয়ে। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সেই বৈঠকের পর মমতার যাবতীয় ঘোষণা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ডাক্তাররা একাধিক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পরিণামেই চলতি অনশন। ইতিমধ্যে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে (এসএসকেএম) দুদল দুষ্কৃতীর মারামারিতে এক রোগীর আত্মীয়ও আহত হয়েছেন। সুতরাং এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জেলে পোরেন না, আলোচনা করেন – এই সন্তোষ হাস্যকর। তেমনই হাস্যকর মুখ্যমন্ত্রীর ধূর্ততা বুঝতে না পারা। সমাধান করতে আলোচনা করা আর ধামাচাপা দিতে আলোচনা করা – দুটোই একইরকম প্রশংসাযোগ্য হতে পারে না। ২০১৯ সালে ভোট মিটলেই চাকরি হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা যে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের ২৯ দিনের অনশন প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আজও যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন।
বস্তুত, কোনো প্রতিবাদ, কোনো আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়াই তৃণমূল সরকারের ট্রেডমার্ক। আরও অনেককিছুর মত, এখানেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মিল। নরেন্দ্র মোদীও ভেবেছিলেন কৃষকদের পাত্তা দেবেন না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে তিনটে কৃষি আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন, প্রয়োগ করা ঠেকায় কে? চাষাভুষোরা থাক না রাস্তায় বসে। পাত্তা না দিলেই হল। উলটে তাদের পথে ব্যারিকেড বসিয়ে দাও, কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দাও, রাস্তায় আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দাও। দিল্লির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে একসময় সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কৃষকরা মাঠেঘাটে কাজ করে অভ্যস্ত। পাঞ্জাবের ধনী কৃষকরাও নিজের জমিতে গায়ে গতরে খাটেন। ফলে শারীরিক কষ্ট তাঁদের অত সহজে কাবু করতে পারে না, যতটা বাঙালি ভদ্রসন্তানদের পারে। তার চেয়েও বড় কথা, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পাকা মাথার অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা। তাঁরা যেমন আক্রমণাত্মক হতে জানেন, কখন পিছিয়ে আসতে হয় তাও জানেন। ফলে সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। মোদী দিল্লি সীমান্তে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়েছিল, আইনগুলো প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বিজেপির সদস্য, সমর্থক ছাড়া কেউ তার জন্যে মোদীর প্রশংসা করে না। বলে না যে আজও ভারতের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে তারপর প্রতিবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর জন্যে, কখনো বা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার জন্যে শাসকের প্রশংসা করার ন্যাকা রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের আর কোথাও চলে না।
কিন্তু যেহেতু কৃষক আন্দোলনের কথা এসে পড়ল এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতের বাইরে নয়, সেহেতু চলমান আন্দোলনের ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। শনিবার দুপুরে মুখ্যসচিবের ফোনে অনশনকারীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সোমবার বৈঠকের পরে হয়ত এই অনশন শিগগির উঠে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই আলোচনা প্রয়োজন।
#
আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা শুক্রবার সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দশ দফা দাবি পূরণ না করলে মঙ্গলবার তাঁরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করবেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার তাঁদের দাবিগুলোতে মোটেই আমল দেয়নি। আর জি করের ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের তরফে (যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মুখ্যমন্ত্রীর বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়া), এখন আর তাও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সবটাই টিভি স্টুডিও আর সোশাল মিডিয়া থেকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোয়, হুমকি দেওয়ায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় স্তরেও তৃণমূল দলের কোনো কর্মসূচি নেই এই আন্দোলনকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্যে অথবা দাবিগুলোকে অসার প্রমাণ করার জন্যে। এর দুটো কারণ থাকতে পারে – ১) তৃণমূল মনে করছে এই আন্দোলন তাদের বৃহত্তম ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলছে না। অতএব ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরুক গে; কিছু এসে যায় না। ২) এই দশ দফা দাবি পূরণ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। উদাসীনতার ভান না করলে কথাটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না।
প্রথম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, যতই অমানবিক হোক। ২০২৪ সালে এসেও এই সরকারের কাছে মানবিকতা আশা করার কোনো মানে হয় কি? যে সরকার বারবার ধর্ষণের মত ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা, প্রেম ছিল, খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর দরাদরি নিয়ে ঝামেলা ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আজ হঠাৎ মানবিক হবে কী করে? আর মানবিক নয় বলেই ডাক্তারদের আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। এ হল ব্রহ্মাস্ত্র। আর কে না জানে, ব্রহ্মাস্ত্র রেখে দিতে হয়ে শেষ যুদ্ধের জন্য। যখন অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তূণ থেকে বার করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্দোলনের সেই অবস্থা হয়েছিল কি? যতদিন কর্মবিরতি চালু ছিল, ততদিন তবু শাসক দল ডাক্তারদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার মত কিছু পাচ্ছিল। কারণ সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ সম্পূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছিলেন না, তার কাঠামোগত ত্রুটির কারণ আড়াল করে গোটা দোষটা ডাক্তারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। এই আন্দোলনের পিছনে বেসরকারি হাসপাতালের লবি কাজ করছে – এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও বাজারে চালানো যাচ্ছিল। কিন্তু কর্মবিরতি উঠে যাওয়ার পরে তো সেসব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেও গত শুনানিতে ফের ধমক খেয়েছে রাজ্য সরকার। কেবল হাসপাতালের সুরক্ষায় নয়, সামগ্রিকভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিচারপতিরা। এমতাবস্থায় অনশনে বসা ছাড়া কি অন্য কোনো রাস্তা ছিল না? হ্যাঁ, একজন ডাক্তারও অনশন করতে গিয়ে মারা গেলে সরকারকে অভূতপূর্ব বিপদে পড়তে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, নির্মম শাসক দল একের পর এক ডাক্তারের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আর অন্য কারোর অনশনে বসা দেখে বুঝে ফেলেছে যে এখানে কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এ সম্পর্কে যে স্বভাবসিদ্ধ অসভ্য মন্তব্য করেছেন – তাতেই তাঁর দল এবং সরকারের এই মনোভাব পরিষ্কার। অর্থাৎ ডাক্তারদের ব্রহ্মাস্ত্র সরকার হজম করে ফেলেছে। ব্রহ্মাস্ত্রের পর যে অস্ত্রই প্রয়োগ করা হোক, তার প্রভাব কম হয়। ফলে এখন একদিনের ধর্মঘটকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে বলা মুশকিল। এই ধর্মঘট অনশনের আগে ডাকা হলে ফল অন্যরকম হতে পারত।
এখানে প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, তা কি মিথ্যা, নাকি অপ্রাসঙ্গিক? মিথ্যা তো নয় বটেই, কিন্তু সরকার হয়ত প্রাসঙ্গিক মনে করছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্ভবত আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোট ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার ভারতের গণতন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণেই কুণাল ঘোষ বুক ফুলিয়ে বলতে পেরেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুক যে মানুষ তাদের পক্ষে।
যেমন ২০০২ সালের পর থেকে গুজরাটে বিজেপি হারেনি, তাই সেবছরের গণহত্যা সঠিক ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে যত বড় বড় কেলেঙ্কারিই প্রকাশিত হয়ে থাকুক, তৃণমূল হইহই করে ভোটে জিতেছে। অতএব সব ঠিক আছে। একইভাবে উপনির্বাচনে সাতটা আসনের অধিকাংশ জিতলেই কুণালরা বলে দেবেন, আর জি করে সরকারের কোনো অন্যায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও কোনো গোলমাল নেই। ‘সব চাঙ্গা সি’। এরকম মানসিকতার সরকারের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী?
আরো পড়ুন সুপ্রিম কোর্টে ইতিমধ্যেই যা জানা গেছে: গণ্ডগোল, বিস্তর গণ্ডগোল
একটা কথা সত্যি, যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনশন ব্যাপারটার এমন স্থান রয়েছে যে অনশন যে-ই করুক, যে কারণেই করুক, মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের জন্য অনশন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী অনশনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। কারণ এতে অন্য কারোর ক্ষতি করা হয় না, নিজের ছাড়া। ফলে মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বাধ্য যে অনশনকারী নিজের ফায়দার জন্যে আন্দোলন করছে না। পরের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করছে। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসসচেতন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যতীন দাসের কথাও মনে রেখেছেন। ফলে অনশনে বসলে গরিব-বড়লোক, গেঁয়ো-শহুরে সব ধরনের মানুষের সহানুভূতিই পাওয়া যায়। মমতা স্বয়ং একসময় পেয়েছেন, আন্না হাজারের মত ভণ্ড আন্দোলনকারীও পেয়েছেন। ফলে ভাবা অমূলক নয় যে কর্মবিরতির সময়ে যত মানুষ ডাক্তারদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ অনশন চালু হওয়ার পরে তাঁদের প্রতি নরম হয়েছেন। কিন্তু তাতে তো সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে সুবিধা হবে না। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, দুনিয়া জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট তো এটাই, যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রভু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপরন্তু একথাও মনে রাখা দরকার, যে গান্ধীর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, অহিংসা-অসহযোগ-অনশন নীতি সফল হতে পারে ‘অডিয়েন্স’ থাকলে, নচেৎ নয়। অরুন্ধতীর কথাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়। তৃণমূল সরকার যে খুব সহানুভূতিশীল ‘অডিয়েন্স’ নয়, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অনশন মঞ্চের অনতিদূরে নির্বিকার কার্নিভালে প্রমাণিত, আজ মুখ্যমন্ত্রী যে সুরে ফোনে কথা বলেছেন, তাতেও প্রমাণিত।
শেষাংশ আগামীকাল
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








[…] নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত […]