সুমন গোস্বামী

কারাগারের আন্ডা সেল। যে ঘরগুলি তৈরি করা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য অথবা সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা করে রাখতে হবে যেসব ‘ভয়ানক’ বন্দিদের – তাদের জন্য। বলা বাহুল্য, এই ব্যবস্থাটি ছিল ব্রিটিশের তৈরি করা। কিন্তু দিব্যি রয়ে গেছে এখনও। রয়ে গেছে স্বাধীনতার ‘অমৃতকাল’ পালন করে ফেলা এই দেশে। তেমনই এক আন্ডা সেলে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াতেন মানুষটি। হামাগুড়ি কেন? কারণ তিনি হাঁটতে পারেন না। ছোটবেলাতেই পোলিও আক্রান্ত হয়ে সে ক্ষমতা তাঁর লোপ পেয়েছে। তাঁর একটি হাতও পক্ষাঘাতগ্রস্ত। কোনওমতে শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে তিনি চলেন। শারীরবিদ্যা অনুযায়ী, এমন মানুষকে ৯০% প্রতিবন্ধী বলে ধরা হয়। তা এমন মানুষ কারাগারের আন্ডা সেলে কী করছিলেন? তাঁকে সেখানে রাখা হয়েছিল, কারণ পুলিশের মতে তিনি একজন ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক ব্যক্তি। বাইরের মুক্ত পৃথিবীতে থা‌কলে তিনি যে কোনো সময় ভয়ানক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। সত্যি! একজন ৯০% প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রের কাছে এতটা ভয়ঙ্কর! এতটাই, যে হাইকোর্ট তাঁকে মুক্তি দেওয়ার পর অতি দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে যেতে হয় মুক্তি আটকানোর জন্য?

এ হল গোকরকোন্ডা নাগ সাইবাবার গল্প। যে গল্প আমাদের কেবল অস্বস্তিতেই ফেলে না, বরং গোটা ব্যবস্থাটার প্রতিই এক ধরনের অবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৬৭ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের পিছিয়ে থাকা এক মফস্বলে সাইবাবার জন্ম। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে এবং কলেজ থেকে স্নাতক হবার পর তিনি প্রথমবারের জন্য নিজের জেলার বাইরে আসেন – হায়দ্রাবাদে। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়ার পর গবেষণাও করেন। সেইসঙ্গে চলে অন্যান্য বিষয়ের পড়াশোনাও। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রেমচন্দ, পেরিয়ারের সঙ্গে বিদেশি সাহিত্যের অধ্যয়নও চলতে থাকে পুরোদমে। অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন দিল্লির রামলাল আনন্দ কলেজে। কলেজের ছাত্র‌ (এবং অধিকাংশ অধ্যাপকও) প্রবল সম্মান করতেন তাঁকে, ভালবাসতেন। কারণ তিনি ছিলেন ছাত্র অন্তপ্রাণ। তাঁদের জন্য শেষ অবধি লড়াই করতে তিনি পিছপা হননি কখনোই। বহু দুঃস্থ ছাত্রকে তিনি আর্থিক সহায়তাও করেছেন। ফলত, এতে বিন্দুমাত্র অবাক হবার কিছু নেই, যে সাইবাবার কলেজ কোয়ার্টার্সে এনআইএ যতবার হানা দিয়েছে, ততবারই সমাজকর্মী-বন্ধুদের পাশাপাশি সহকর্মী অধ্যাপক এবং ছাত্ররা সেখানে ছুটে গিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন হল, এনআইএ বা পুলিস সাইবাবার কোয়ার্টার্সে কেন গিয়েছিল? প্রথমবার তারা যখন যায় এবং ল্যাপটপ, ফোন, হার্ড ডিস্ক সহ বেশ কিছু বই সেখান থেকে নিয়ে চলে যায়, সেইসময় যে ওয়ারেন্ট দেখানো হয় তাতে বলা ছিল, মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলির একটি গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু জিনিস নিতে তারা এসেছে। এরপরেও এনআইএ বেশ কয়েকবার হানা দেয়, কিন্তু প্রচুর মানুষের উপস্থিতির কারণে খালি হাতেই ফিরে যায়। সাইবাবাকে তারা গ্রেফতার (!) করে ২০১৪ সালের ৯ মে। কলেজ থেকে ফেরার সময়ে আচমকাই তাঁর গাড়ি ঘিরে ফেলে কয়েকজন এবং সোজা বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলি। সাইবাবার হুইল চেয়ার ভেঙে যায় এবং তাঁকে একরকম ছুড়ে গাড়িতে ফেলার কারণে তিনি আহতও হন। এইসব চলাকালীন প্রায় ৭২ ঘন্টা তাঁকে মূত্রত্যাগ করতে দেওয়া হয়নি। উচ্চ রক্তচাপের কারণে যে ওষুধগুলি তিনি নিয়মিত খেতেন, সেগুলি পর্যন্ত খেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর নাক ও কান দিয়ে রক্তপাত হচ্ছিল।

নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল সিপিআই (মাওবাদী) দলের কাজকর্মের সঙ্গে সাইবাবা যুক্ত – মোটামুটি এই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ। বহু বিতর্কিত ইউএপিএ আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠোকা হয়। দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে সেশনস কোর্ট। অর্থাৎ নিম্ন আদালত সাইবাবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি সত্য বলে রায় দেয়। অথচ ওই একই অভিযোগ উচ্চ আদালতে ভিত্তিহীন সাব্যস্ত হল। মহারাষ্ট্র হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চ সাইবাবাকে কেবল বেকসুর খালাসই করেনি, উপরন্তু নিম্ন আদালতের রায়কে ‘failure of justice’ (ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা) বলে চিহ্নিত করেছে। কে বলেছে এ কথা? এই রাষ্ট্রেরই এক উচ্চ আদালত। আর এই ছোট্ট ব্যর্থতার ফল কী হল? সাইবাবার জীবন থেকে দশটি বছর কেড়ে নেওয়া হল, তাঁর অধ্যাপনার কাজটি কেড়ে নিল, তাঁর স্ত্রী বসন্তা এবং কন্যার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হল, গোটা পরিবারকেই চরম সংকটে ঠেলে দেওয়া হল। সবচেয়ে বড় কথা, সম্ভবত সাইবাবার প্রাণটিই ছিনিয়ে নেওয়া হল। গত ১২ অক্টোবর সাইবাবা মারা গেলেন।

নব্বই শতাংশ প্রতিবন্ধী একজন মানুষকে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যই বেশ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়, নিয়মিত প্রতিটি ওষুধ সেবন করতে হয়। কারাবাসকালে এই বিষয়গুলি চূড়ান্ত অবহেলিত হয়েছে। কীরকম? আসুন, দেখা যাক।

১) আগেই বলা হয়েছে, সাইবাবাকে রাখা হয়েছিল আন্ডা সেলে এবং একাকী। (পরবর্তীকালে অবশ্য বিস্তর কাঠখড় পোড়ানোর পর তাঁর সঙ্গে সহবন্দি থাকতেন, যাতে তিনি অন্তত কিছুটা সহায়তা পেতে পারেন)। সাইবাবা হাঁটতে পারেন না, গ্রেপ্তারের পর থেকে একটি হাতও অকেজো হতে শুরু করেছিল। এরকম একজন মানুষ সাধারণ শৌচকর্মের জন্যও অন্যের উপর নির্ভরশীল। অথচ তাঁকে একা রাখা হয়েছিল অনেকদিন।

২) তাঁর হুইলচেয়ারটি দেওয়ার জন্যেও পরিবার ও বন্ধুদের অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। অবশ্যই ঘামের সঙ্গে অনেকগুলি দিনও ঝরে যায়।

৩) কেবল বেঁচে থাকার জন্যই সাইবাবাকে বেশকিছু ওষুধ খেতে হত। কারা কর্তৃপক্ষ সেই ওষুধ দেওয়াতেও আপত্তি জানায়। পরে ওষুধের অনুমতি মিললেও তাঁর বিশেষ ডায়েট বন্ধ করে দেয়। অথচ এই পর্যায়ের শারীরিক সমস্যার মানুষের ক্ষেত্রে সঠিক ডায়েটও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৪) কেবল চিকিৎসার কারণে বারবার জামিনের আবেদনও ক্রমাগত নাকচ হয়। হতাশ সাইবাবা একসময় প্রতিবাদে অনশন পর্যন্ত করেন। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অবশেষে বন্ধু, পরিবার মিলে সাইবাবাকে জামিনে মুক্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু কয়েকমাসের মধ্যেই তাঁকে আবার ফিরে যেতে হয় সেই আন্ডা সেলে। একজন ৯০% প্রতিবন্ধীকে পরোক্ষে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া ছাড়া এই ঘটনাকে আর কী বলা যেতে পারে?

আরো পড়ুন গদর (১৯৪৯-২০১৬): মেহনতি জনতার প্রেমকথা

২০০৬ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় গৃহীত হয় Convention on the Rights of Persons with disabilities। ভারত সহ ১৮৪টি রাষ্ট্র সেখানে স্বাক্ষর করে। সেই গৃহীত প্রস্তাবনার ১৫ নং ধারায় ‘freedom from torture or cruel, inhuman or degrading treatment or punishment’-এর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের দেশে প্রতিবন্ধী বা ‘বিশেষভাবে সক্ষম’ মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের নিবৃত্তি ঘটানোর কথা দিয়েছে ভারত রাষ্ট্র। নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ আর কাকে বলে? নাগপুর আন্ডা সেলে সাইবাবার প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাগুলোই তো। অথচ শারীরিক কারণে জামিন পাওয়া, এমনকি শাস্তি মকুব হওয়ার উদাহরণও তো এই দেশেই আছে। বোঝার সুবিধার জন্য আমরা সাইবাবার সমসাময়িক দুটি উদাহরণই না হয় দেখে নিই।

১) ২০০২ সালে গুজরাটের ভয়াবহ গণহত্যার সময়ে বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছিল নারোদা পাটিয়ার ঘটনা। ওই প্রকাশ্য নরমেধ যজ্ঞের মূল কারিগর বাবু বজরঙ্গীকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু চোখের চিকিৎসার প্রয়োজনে বাবুর জামিনপ্রাপ্তি ঘটে। সাইবাবার কিন্তু সে সৌভাগ্য হয়নি।

২) ওই নারোদা পাটিয়ার ঘটনাতেই মূল চক্রী হিসাবে চিহ্নিত গুজরাটের প্রাক্তন মন্ত্রী মায়া কোদনানির ২৮ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে (অন্ত্রের ক্ষয়রোগ, হৃদরোগ এবং অবসাদ) শাস্তি থেকে তাকে পরবর্তীকালে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সাইবাবা কিন্তু জামিনটুকুও পাননি। এমনকি তাঁর মায়ের মৃত্যুতেও তাঁকে শেষ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

সাইবাবা আর নেই। প্রচারমাধ্যম আমাদের জানিয়েছে, গল ব্লাডার অপারেশন পরবর্তী সমস্যাজনিত কারণেই এই মৃত্যু। কিন্তু তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ কাহিনি জানার পর আপনার কী মনে হচ্ছে? সাইবাবা নিজেকে মানবাধিকার কর্মী, গণআন্দোলনের কর্মী বলতেন। সিপিআই (মাওবাদী) দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। হ্যাঁ, রেভলিউশনিস্ট ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট নামক একটি সংগঠনের তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সেই সংগঠন সাইবাবার গ্রেফতারির সময়ে ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশে নিষিদ্ধ ছিল, দিল্লি বা মহারাষ্ট্রে নয়। তবুও তর্কের খাতিরে না হয় ধরে নেওয়া গেল, সাইবাবা মিথ্যে বলেছিলেন। রাষ্ট্র এবং তার পুলিসই কেবল মহান সত্যবাদী। সেক্ষেত্রেও কি সাইবাবা কোথাও কোনোরকম ন্যায় পেয়েছেন? রাষ্ট্র যথাযথ আচরণ করেছে তাঁর সঙ্গে? এক অদ্ভুত প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব দেখা গেছে তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের আচরণে। আসলে ঠিক স্ট্যান স্বামীর মতই ঘটে গেছে একটি পরোক্ষ হত্যা। এছাড়া আর কী-ই বা বলা যায় একে?

অধ্যাপক হ্যানি বাবু কারাবাসের সময়ে একবার কিছুক্ষণের জন্য দেখা করতে পেরেছিলেন সাইবাবার সঙ্গে। তিনি তখন হাসপাতালে। পরবর্তীকালে হ্যানি বাবু জানিয়েছেন, সাক্ষাতের সময়ে স্যালাইনসহ শয্যাশায়ী সাইবাবার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল এক প্রহরী। ভাবখানা এমন, যেন ৯০% প্রতিবন্ধী ওই মানুষটি বুঝি সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাবেন।

কারাবাসকালে সাইবাবার লেখা কবিতাগুলির এক সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। সে বইয়ের নাম Why do you fear my way so much (আমার পথকে তোমার কেন এত ভয়)। সরল সত্য বোধহয় এটিই। শাসকরা আসলে সত্যকে বড্ড ভয় পায়। ভয় পায় যুক্তিকে, প্রশ্নকে। ভয় দেখানো লোকগুলোকেই হাপিশ করে দিয়ে সে আসলে স্বস্তি খোঁজে। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব? উল্লিখিত বইটিতেই জ্বলজ্বল করছে সাইবাবার এই কথাগুলো

I still stubbornly refuse to die
The sad thing is that
They don’t know how to kill me
Because I love so much
The sound of growing grass.

নিবন্ধকার লেখক ও অনুবাদক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.