এইচপিইইউয়ের তরফে প্রতিদিনের মত সেদিনও ফের বিশাল সংখ্যক শ্রমিক জমায়েত করা হয়। সেই জমায়েতের সিংহভাগ ছিলেন নারী। শ্রমিক ভবন ঘিরে তাঁরা মানববন্ধন করেন, জীবনের গানে-দাবির স্লোগানে-আসন্ন দেউসুরে পরবের তালে ২০% বোনাসের দাবিতে গোটা চত্বর মাতিয়ে দেন। রোদবৃষ্টির ভ্রূকুটিকে পাত্তা না দিয়ে রাত পর্যন্ত চলে সুশৃঙ্খল ধরনা। ওদিকে দীর্ঘ বৈঠকের শেষে মালিকরা ধাপে ধাপে প্রস্তাব বাড়িয়ে ১২% পর্যন্ত বোনাস দিতে রাজি হয়, কিন্তু ইউনিয়নগুলি ২০ শতাংশের দাবিতে অনড় থাকে। বৈঠক ভেঙে যায়। ফের বাগানে বাগানে গেট মিটিং চলতে থাকে। বিভিন্ন বাগানে এইচপিইইউয়ের তরফে ম্যানেজমেন্টকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আমাদের দাবি ২০%, এবং যেহেতু আলোচনায় আমাদের সামিল করা হচ্ছে না, তাই ওই ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত মানতে আমরা বাধ্য নই।
বোনাস মিটিং আবার ডাকা হয় ২৭ তারিখ। সেদিনও শ্রমিকরা জড়ো হন। দিনের পর দিন, প্রতিটি বৈঠকের অকুস্থলে তাঁরা হাজির। শ্রমিকরা নিজেরাই স্লোগান দিচ্ছেন, পরিকল্পনা করছেন, আন্দোলনের বাঁক নিয়ে শলাপরামর্শ করছেন, মতামত দিচ্ছেন, অনবদ্য ভঙ্গিতে এবং ভাষায় রাখছেন নিজেদের জীবনযন্ত্রণা কিংবা দাবিদাওয়ার কথা, কিংবা গান গাইছেন সমবেত কণ্ঠে। ‘কলম কাটি হাতৈমা ঠেলানি’-র মত বাগানজীবনের দুঃখ ও সংগ্রামের গান কিংবা ‘ঘরবার ছোড়ের লৈ লৈ’-এর মত বিগড়ে যাওয়া বাগান ছেড়ে পরদেশে যাওয়ার মত মাটির গান শ্রমিকদের কণ্ঠস্থ। পাশাপাশি তরুণ কর্মীরা গান রচনা করছে, গাইছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সেদিন শেষপর্যন্ত মালিকদের প্রস্তাব ১২% থেকে বেড়ে ১৩% হয়। যে শ্রমিকরা প্রতিদিন চাঁদা তুলে, পাহাড়ের নানা কোণ থেকে গাড়ি-ক্যান্টার-পিকআপ-ট্রাক ভাড়া করে এই লড়াইয়ে এসেছেন, তাঁদের কথা ভাবুন একবার। উৎসবের দিনগুলোয় পরিবারে এক টুকরো হাসি পৌঁছে দিতে তাঁদের এই অভাবনীয় কষ্ট সওয়া বাগানজীবনের দৈনন্দিন কষ্টের চেয়েও বেশি। আরামে থাকা মালিক আর সরকারি বাবুরা কী করে বুঝবে এই আগুনকে?
একদিন বাদে ২৯ সেপ্টেম্বর, রবিবার, ফের মিটিং ডাকা হল। শ্রমিকদের ভিড় সংখ্যায় যেন দ্বিগুণ হল। ততদিনে পাহাড়ের বড় পার্টিগুলোর পার্টিবাজি, কাদা ছোড়াছুড়ি পেরিয়ে শ্রমিকরা, তাঁদের হাতে কোনো ঝাণ্ডা থাক আর না-ই থাক, ২০% বোনাসের চড়া সুরে বেঁধে ফেলেছেন নিজেদের। ভিতরে পুরনো ইউনিয়নগুলি লড়তে থাকে, আর বাইরে এইচপিইইউ সহ অন্যরা। বারবেলায় শুরু হওয়া বৈঠক সন্ধে পর্যন্ত গড়ালেও মালিক পক্ষ অনড় থাকে। বাইরের স্লোগান গর্জনে পরিণত হল, সমবেত গান হয়ে উঠল করুণ আর্তি। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! মালিকরা ১৩ শতাংশেই আটকে থাকল। ইউনিয়নগুলির প্রতিনিধিরা বিরোধিতা করে বেরিয়ে আসেন। সব ইউনিয়ন একইরকম ইমানদার না হলেও, বাইরের কলরোলের সামনে আর কিছু বলার উপায়ও ছিল না। পরদিন পাহাড় বনধের ডাক উঠে আসে।
গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে বনধ দেখে অভ্যস্ত পাহাড়ে বহু যুগ বাদে শ্রমজীবী মানুষ উঠে এলেন গণউদ্যোগের কেন্দ্রে। অবদমিত জাতিসত্তার মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার ‘জয় গোর্খা’ স্লোগানে মুখর পাহাড় অনুরণিত হল তনুজা তামাং-অজন্তি টিগ্গা-মিন্টু রায়দের সমবেত ‘জয় শ্রমিক’ ধ্বনিতেও।
৩০ সেপ্টেম্বর সর্বাত্মক বনধ হয় পাহাড় জুড়ে। কালিম্পংয়ের চা বলয়ে এবং পুরো দার্জিলিং-কার্শিয়াং-মিরিক জুড়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভাগিদারীর এমন বনধ বহুদিন দেখেনি পাহাড়। গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে বনধ দেখে অভ্যস্ত পাহাড়ে বহু যুগ বাদে শ্রমজীবী মানুষ উঠে এলেন গণউদ্যোগের কেন্দ্রে। অবদমিত জাতিসত্তার মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার ‘জয় গোর্খা’ স্লোগানে মুখর পাহাড় অনুরণিত হল তনুজা তামাং-অজন্তি টিগ্গা-মিন্টু রায়দের সমবেত ‘জয় শ্রমিক’ ধ্বনিতেও। বোনাস আন্দোলনের এ এক অভূতপূর্ব অর্জন। মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গেই ছিলেন সেদিন, বন্যা পরিস্থিতি তদারক করতে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে দৃশ্যতই বিরক্ত দেখায় তাঁকে। বনধের বিরোধিতা করে, পাহাড় অশান্ত করার জন্য বিরক্তি দেখিয়ে, তিনি সমস্যা মেটানোর দায় চাপিয়ে দেন অফিসারদের ঘাড়ে।
আসলে যুগসঞ্চিত বঞ্চনার শিকার পাহাড়ের চা-শ্রমিকরা এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন বলেই পাহাড়ে ঢেউ উঠেছে। এর চেয়ে আনন্দের কথা আর কী হতে পারে? বনধের অভিঘাতে সেদিনই গভীর রাতে ইমেল মারফত শ্রমিক সংগঠনগুলিকে জানানো হয় যে পরের দিনই সকাল সাড়ে দশটায় ফের বৈঠক হবে। নিঝুম রাত পেরিয়ে পরদিন ভোরে পাহাড় জানতে পারে এই সভার কথা। তবু ফের জড়ো হয়ে গেলেন প্রচুর শ্রমিক। মালিক-ইউনিয়ন-সরকারের প্রতিনিধিরা এলেন, সঙ্গে দেখা গেল প্রচুর র্যাফ জওয়ানদের। সভার শুরুতেই ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল সরকারি ‘অ্যাডভাইসরি’। তাতে লেখা আছে ১৬% বোনাসের কথা। আরও বলা আছে, মালিকদেরকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে বোনাস বিলি করে দিতে হবে। আর কোনো অমীমাংসিত বিষয় থাকলে উৎসবের মরশুম শেষ হলে বিবেচনা করা হবে। দেখা গেল সরকারি নির্দেশিকার গতি জেট প্লেনের মত। দূরদূরান্তের বাগান মালিকদের কাছে এক রাতের মধ্যেই পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ মালিকপক্ষ ও সরকারের যোগসাজশে নীল নকশা তৈরি ছিল, শুধুমাত্র ইউনিয়নগুলির সিলমোহর পাওয়ার জন্য বৈঠকের দেখনদারি।
ইউনিয়নগুলি এই ধাপ্পাবাজির বিরুদ্ধে বৈঠকেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়, বাইরে চলতে থাকে তুমুল বিক্ষোভ। ইউনিয়নগুলির প্রতিনিধিরা উঠে চলে যান। শ্রমিকদের রোষানল এড়াতে মালিকরা ভিতরেই বসে থাকে বহুক্ষণ। শ্রমিক জনতা আর শ্রমিক ভবনের মাঝখানে প্রাচীর তুলে দাঁড়ায় পুলিস এবং সশস্ত্র র্যাফ। ‘পত্তি টিপনে আমা হো/নাফা খানে মালিক হো’-র মত স্লোগান কয়েক ঘন্টা পেরোবার পর দলা পাকানো কান্না হয়ে বেরোতে থাকে। ঘৃণার আগুনে মালিকদের ব্যবস্থাকে জ্বালিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা শ্রমিকের মন পুড়তে থাকে হতাশায়, অভিমানে। শ্রমিক ভবন ক্রমশ খালি এবং ভয়াল হতে থাকলে শ্রমিকরা পরের দিন উত্তাল বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ওই রাতেই বহু বাগানে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে ঢোকে ১৬% বোনাসের টাকা। মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা।
দেখা গেল সরকারি নির্দেশিকার গতি জেট প্লেনের মত। দূরদূরান্তের বাগান মালিকদের কাছে এক রাতের মধ্যেই পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ মালিকপক্ষ ও সরকারের যোগসাজশে নীল নকশা তৈরি ছিল, শুধুমাত্র ইউনিয়নগুলির সিলমোহর পাওয়ার জন্য বৈঠকের দেখনদারি।
পরের দিন, ২ অক্টোবর, পাহাড়ে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। কুড়ি শতাংশ বোনাসের দাবিতে দার্জিলিং শহরে দলীয় ঝাণ্ডা ছাড়াই হয় বিশাল শ্রমিক-জুলুস। পাশাপাশি বিভিন্ন রাস্তায় শ্রমিকরা ধরনায় বসে পড়েন। মিরিকে, রোহিণী গেটে, কুমাইয়ে, তাকদায়। সোনাদা ভ্যালির বাগান থেকে ট্রাকে করে শ্রমিকরা ওইসব ধরনায় যোগ দিতে বেরোলে কার্শিয়াংয়ে আটকে দেওয়া হয় তাঁদের, ধর্না শুরু হয় সেখানেই। চারদিক অচল হয়ে যায়।
রোহিণী গেটে মোতায়েন ছিল বিশাল পুলিশবাহিনী। বন্দুক, কাঁদানে গ্যাস তো ছিলই, সাথে পোর্টেবল সাউন্ড বক্স থেকে হুমকি দেওয়া হতে থাকে ‘আপনাদের কথা শুনে ১৬% বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে। সবাই মেনে নিয়েছে। রাস্তা ছেড়ে দিন, নাহলে গ্রেফতার করা হবে’। শ্রমিকদের ধরনা চলাকালীন গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে, ছবি তুলে সবার নামে মামলা ঠোকার ভয় দেখিয়ে, পুরনো মামলায় গ্রেফতারের কথা বলে, পর্যটকদের অসুবিধার অজুহাত দেখিয়ে কয়েক ঘন্টা পরে ধরনা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। লং ভিউয়ের শ্রমিকরা দার্জিলিংয়ের মিছিলে যেতে চাইলেই কেবল তাদের রাস্তা দেওয়া হবে বলা হয়েছিল প্রথমে। পরে অবরোধ তুলে নিলে তাও অস্বীকার করে পুলিশ। দিনটা ছিল গান্ধী জয়ন্তী। শ্রমিকরা গান্ধীগিরি করে গলায় ‘খদা’ পরিয়ে দেয় নির্লজ্জ পুলিসকে।
রাস্তা অবরোধের জন্য কেস দায়ের করে পুলিস। রোহিণী গেটের কেসে চারজন, কার্শিয়াংয়ের জন্য সাতজন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন সঙ্গীতা ছেত্রী, লক্ষ্মী ছেত্রীর মতো লং ভিউ শ্রমিক, এইচপিইইউ নেতা সুমেন্দ্র তামাং, ছেওয়াং ইয়ঞ্জন, নানা চা বাগানের যুব ও সহযোগী সাথীরা। আরও বহু জায়গায় রাস্তা রোকো হয়েছে, রাস্তা আটকে মিছিল হয়েছে, কিন্তু কেস হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
শ্রমিকদের বক্তব্য – ত্রিপাক্ষিক আলোচনা এড়িয়ে চাপিয়ে দেওয়া ১৬% বোনাসের সরকারী নির্দেশিকার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠেন হাজার হাজার শ্রমিক। কোথাও রাস্তা আটকে মিছিল হয়, কোথাও ধরনা। ফের সরকারি নোটিস আসে – ৬ নভেম্বর কলকাতায় বোনাস বৈঠক হবে। এহেন অমীমাংসিত ইস্যুতে আন্দোলনরত শ্রমিক তথা নাগরিকদের বিরুদ্ধে পুলিস কীভাবে মিথ্যা মামলা করল? সম্প্রতি, আর জি কর মামলার শুনানিতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কি পুলিশকে বলেননি, জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহযোগিতা করতে?
মিথ্যে মামলা ঠুকলে শ্রমিকরা বা সংগ্রামী সাথিরা কি ভয় পাবে বলে ভেবেছিল পুলিশ? তাহলে তারা বিলকুল ভুল করেছে। বহু বাগানে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে গেট মিটিং চালাতে থাকেন, নাকচ করেন মালিকের ফরমান। আট ইউনিয়নের মঞ্চ চায়ের ডেসপ্যাচ বন্ধ রাখার কথা বলে। তাও চলে দিন কতক। তারপর তারা বোনাসের বাকি ৪% পেতে ঘুঁটি সাজাচ্ছে বলে জানায়, ব্যাপক হারে শ্রমিকদের স্বাক্ষর সংগ্রহের কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং অবশেষে কাজে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার কথা বলে। তার দু-এক দিনের মধ্যেই অবশ্য সপ্তমীর দিন ফুলপাতি, বাগানগুলোয় তিনদিনের ছুটি শুরু। বহু বাগানে শ্রমিকরা মনে ক্ষোভ পুষে রেখে কাজে যান, কোথাও বা যেতে অস্বীকার করেন। বোনাস নিয়ে অপ্রাপ্তির বেদনা ছেয়ে থাকে পাহাড়ি চা বাগানগুলির মন জুড়ে।
এইচপিইইউয়ের উদ্যোগে ব্যাজ তৈরি হয় ‘দসৈঁ-তিহার আমাদের মহান চাড় (পরব)/২০% বোনাস আমাদের অধিকার।’ ফুলপাতির শোভাযাত্রা দিয়ে চা বলয়ে উৎসব মরশুম শুরু হয়। এবছর উৎসবের মধ্যেও হকের দাবিতে সোচ্চার থাকবে চা-শ্রমিকরা। ফুলপাতির শোভাযাত্রা থেকে বড়া দসৈঁ পেরিয়ে ভৈলেনি-দেউসি-র তিওহার পর্যন্ত এই ব্যাজ পরবেন শ্রমিকরা। অন্যদিকে, এসবের মধ্যেই বন্ধ চা বাগান ধোত্রের তুংসুংয়ে শ্রমিকদের বার্ষিক আয়ের ২৫% বোনাস বাবদ দেয় শ্রমিকদের কমিটি। আইনি বোনাস সর্বোচ্চ ২০% হয়, কিন্তু বন্ধ বাগানে কিসের আইন? ২০১৮ সাল থেকে এভাবেই চলছে। সগর্বে।
পাহাড়ের দুটো বাগান, রিংটং আর লংভিউতে, এইচপিইইউয়ের উদ্যোগে রিলে অনশন শুরু হয় ৭ সেপ্টেম্বর থেকে। রিংটং বাগানে অনশনের দুদিনের মাথায় ম্যানেজমেন্ট চম্পট দিলে শিলিগুড়িতে মালিকের বাড়িতে পৌঁছয় শ্রমিকদের প্রতিনিধি দল। লিখিত চুক্তি হয় – অবিলম্বে বকেয়া পাক্ষিক মজুরি আর অন্য বকেয়া দিতে হবে, আর ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বোনাসের ১৬% একবারে দিতে হবে। সেই চুক্তির ভিত্তিতে চারদিনের মাথায় অনশন তোলা হয়। ওদিকে, লং ভিউয়ের মালিক আগেভাগেই ৮.৩৩ শতাংশের বেশি বোনাস কিছুতেই দেবে না বলার পর, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ‘২০% এখনই না হলেও, অন্তত সরকারি নির্দেশিকায় বলা ১৬% দিতেই হবে’ বলে লড়াই শুরু হয়। মালিক দু কিস্তিতে ৫% করে দেওয়ার কথা বলেও অদম্য লড়াইয়ের মুখে দশ শতাংশই দিয়ে দেয়। তবু অনড় শ্রমিকরা। কারণ এই মালিক ৬ সেপ্টেম্বরের চুক্তি অনুযায়ী দেয় প্রথম কিস্তির বকেয়া পুরোপুরি মেটায়নি। ফলে বাকি বোনাস দিতেই হবে – এই দাবিতে রিলে অনশন চলতে থাকে। প্রতিদিন শ্রমিকদের নতুন নতুন দল অনশনে বসছে। বড়া দসৈঁয়ের মহান পরবের দিন, অর্থাৎ দশমীতে, রিলে অনশন পঞ্চম দিনে পড়ে। দসৈঁয়ের টিকা লাগানো হয় ওখানেই। অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিকরা এবং বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যক্তিবর্গ প্রতিদিন আসছেন লড়াইয়ের সঙ্গে সংহতি জানাতে।
ধিকধিক করে জ্বলছে চা বাগান, গনগনে হয়ে উঠবে অচিরেই। উৎসবের রেশ কাটতেই ফের লড়াই শুরু হবে বাকি ৪% বোনাসের দাবিতে। ৬ নভেম্বরের আগে ফের শুরু হবে ন্যায্য দাবির সোচ্চার উচ্চারণ। আর প্রস্তুতি চলবে আগামী ফার্স্ট ফ্লাশের মরশুমে বড় লড়াইয়ের জন্য। এবছরের গোড়ায় রাজভবন অভিযান করেছিলেন চা-শ্রমিকরা, ন্যূনতম মজুরি লাগু করার হাইকোর্টের আদেশ মনে করাতে। মাঝে লোকসভা ভোটের ডামাডোলে হারিয়ে যাওয়া চা-শ্রমিকদের ইস্যু ফের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে গত কয়েক মাসে। বোনাসের লড়াই অন্য উচ্চতায় উঠেছে। উৎসবের রোশনাই ছাপিয়েও শোনা যাচ্ছে সেই কোরাস।
এই লেখা যখন লিখছি, তখনই খবর আসছে লং ভিউ চা বাগানে সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক নোটিস দেওয়া হয়েছে। খবর আসছে, শ্রমিকরাও পালটা আরও বড় আন্দোলনের পথে হাঁটছেন। রিলে অনশন চলবে। খবর আসছে, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মালিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে একতরফাভাবে বাগান বন্ধ করার বদলে আলোচনায় এসে মীমাংসা করার জন্য। নয়ত প্রতিরোধ আন্দোলনের তীব্রতা বাড়বে।
কলকাতায় চলছে অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে মরণপণ লড়াই, পাহাড়েও এখন দ্রোহকাল। ‘পাহাড় থেকে সমতলে/লড়াই হবে সমানতালে।’ পড়শি দেশের এই স্লোগানটি যেন সত্য হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গে।
~ তথ্য লেখকের, মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







