ভোলা দাস আর মহম্মদ হাসান দীর্ঘদিনের বন্ধু। মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান পৌরসভার এই দুই বাসিন্দা কেবল একে অপরের প্রতিবেশীই নন, ব্যবসাও চালান একসঙ্গে। একটা ফুল আর একটা ফলের দোকান আছে তাঁদের। গত ১১ এপ্রিল, শুক্রবার, সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদ চলাকালীন হঠাৎ হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে, ভাংচুর চলে বেশ কিছু জায়গায়। ভোলা-হাসানের দোকানও রক্ষা পায়নি।
ঘটনার দুদিন পর, ১৩ এপ্রিল, যেদিন এই প্রতিবেদক মুর্শিদাবাদে গিয়ে পৌঁছলেন, জঙ্গিপুর মহকুমার সামশেরগঞ্জ, সুতি, ধূলিয়ানে পরিস্থিতি তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সামশেরগঞ্জ ও সুতি – এই দুই জায়গাতেই ১১ আর ১২ এপ্রিল জুড়ে নানা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সুতি ২ নম্বর ব্লকের ওমরপুরে পুলিসের গুলিতে স্থানীয় বাসিন্দা ইজাজ আহমেদের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। দাঙ্গা অবশ্য তার আগে থেকেই শুরু হয়েছে। পুলিসের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনার জেরে সে ‘দাঙ্গা’ আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোয়। হিংসার বলি হন সামশেরগঞ্জের দুই প্রতিমা শিল্পী হরগোবিন্দ দাস এবং তাঁর ছেলে প্রসেনজিৎ দাস। সম্পত্তিগত ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়নি। হিন্দু অধ্যুষিত ঘোষপাড়া আর রতনপুরেও পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। সামাল দিতে হিংসা-কবলিত এলাকাগুলিতে ব্যাপক সংখ্যায় পুলিস ও নিরাপত্তা বাহিনি মোতায়েন করা হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ইজাজের বাড়িতে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান। ইজাজের চোদ্দ মাসের কন্যা শৈশবেই পিতৃহারা হল, ইজাজের বাবা মানারুল শেখ কৃষক। মা সায়েমা বিবি বিড়ি শ্রমিক। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তার আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস উপদ্রুত এলাকা সফরে গিয়ে হরগোবিন্দদের বাড়িতে গেলেও ইজাজের বাড়িতে যাননি। নিহতের মা বলেছেন ‘রাজ্যপাল আমাদের বাড়ি আসবেন এটা আশা করেছিলাম, কিন্তু আসেননি। আমাদের বাড়ি থেকেও তো তরতাজা যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন ‘ও বাইরে কাজ করত। তাতেই সংসার চলত। আমার ছেলে তো চলে গেল। ওর সন্তান রয়েছে, বউ রয়েছে। ওরা চলবে কী করে? মুখ্যমন্ত্রী ওর সন্তানের দিকে তাকাক।’
উল্লেখ্য, পুলিস ইতিমধ্যেই হরগোবিন্দ ও প্রসেনজিৎকে খুন করার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
যা জানা যাচ্ছে, সদ্য পাশ হওয়া সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছিল, সেখান থেকে হঠাৎই গণ্ডগোল শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী আসিফ মণ্ডল এই প্রতিবেদককে বলেন, ১১ এপ্রিল বেশ কিছু মুসলমান সংগঠন, ইমাম ও মুয়াজ্জিম মিলে একটা প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেন। তাঁর কথায় ‘মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন সাধারণ সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষজনই, কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন নয়। বরং একাধিক দল সেখানে অংশ নিয়েছিল।’ সামশেরগঞ্জ থানার সামনে শুরু হয়ে মিছিলটা ডাকবাংলো মোড়ের দিকে এগোচ্ছিল।
ওয়াকফ আইনবিরোধী বিক্ষোভ থেকে কীভাবে হিংসা ছড়াল, তার সঠিক কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর (এমনকি পুলিস সূত্রেরও) বয়ান অনুযায়ী, অশান্তির নেপথ্যে কয়েকজন ১৬ থেকে ২২ বছর বয়সী যুবক।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে হাসান বলেন ‘মিছিল প্রথমে শান্তিপূর্ণই ছিল; প্রচুর লোকও হয়েছিল। কোথাও কোনো ঝামেলা ঘটেনি।’ কিন্তু তারপরেই জনতার একটা অংশ হঠাৎ ডাকবাংলো মোড়ের দিকে না গিয়ে পিছিয়ে আসতে শুরু করে, তার ফলে চূড়ান্ত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। হাসানের বক্তব্য ‘ওরা এসে একটার পর একটা দোকানে ঢুকে ভাংচুর শুরু করে দিল। লুঠপাটও চলল। আমাদের দোকানও বাদ যায়নি। আমরা (দোকানদাররা) বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, লাভ হয়নি। জোয়ান ছেলেপুলেদের সঙ্গে পারব কেন…অনেক ফল নষ্ট হয়েছে। দোকানে টাকাপয়সা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু যতটুকু ছিল, তাও কেড়ে নিয়েছে।’
তাঁর বন্ধু ভোলা যোগ করলেন ‘বহু বছর ধরে একসঙ্গে ব্যবসা করছি। এরকম কখনো হয়নি। ঈদের সময়ে বেশ ভালো বিক্রিবাটা হয়েছে। সব গেল।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন সকলেরই মুখ ছিল কাপড়ে ঢাকা। তার উপর গণ্ডগোলের পরই অলিগলি ঘুরে তারা নদীর দিকে পালিয়েছে। ফলে চেনার উপায় ছিল না। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিসকর্মী এই প্রতিবেদককে বলেন, তাঁদের ধারণা এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তাদের অনেকেই নদী পেরিয়ে পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে পালিয়েছে। তবে ভোলা বা আসিফের মত স্থানীয়দের অভিযোগ, ধূলিয়ানের পুরো ঘটনার সময়ে পুলিস ছিল নীরব দর্শক। কারণ মিছিলের উপর নজর রাখতে নিরাপত্তা বাহিনি এমনিই মোতায়েন ছিল, লুঠপাটের ঘটনা তাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। অন্যদিকে পুলিসের দাবি – কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
একই দিনে, অর্থাৎ ১১ এপ্রিল, দাঙ্গা হয় সুতিতে। ওমরপুরের কাছে এক প্রতিবাদ মিছিলকে ঘিরে অশান্তি ছড়ায়। দীর্ঘক্ষণ অবরোধের পর পুলিস বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে দুপক্ষে হাতাহাতি শুরু হয়। পুলিসের গাড়িতে আগুন ধরানো হয়, সংঘর্ষে আহত হন ১৮ জন পুলিসকর্মী। প্রত্যুত্তরে পুলিস গুলি চালায়। প্রাণ হারান ২১ বছর বয়সী ইজাজ।
ধূলিয়ানের ঘটনার সঙ্গে গুলিচালনার আপাত যোগাযোগ না থাকলেও দুটি আলাদা ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয় বিভ্রান্তি, ভয়। তারই বীভৎস পরিণতি দেখা গেল আশপাশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে – অকালে ঝরে গেল দুটি প্রাণ, ঘরছাড়া হলেন আরও শতাধিক মানুষ।
হত্যা ও বাস্তুচ্যুতি
১২ এপ্রিল, শনিবার, সকালে সামশেরগঞ্জের জাফরাবাদে উন্মত্ত জনতার হাতে নিজেদের বাড়িতেই খুন হন প্রতিমা শিল্পী হরগোবিন্দ (৭৪) আর তাঁর ছেলে প্রসেনজিৎ (৪০)। পরিবারের সদস্য পিঙ্কি দাস জানিয়েছেন, খুন হতে পারেন আশঙ্কা করে পুলিসের সাহায্য চেয়েছিলেন দুজনে, কিন্তু পুলিস কোনো সাহায্য করেনি।
এমনকি খুনের প্রায় তিন ঘন্টা পর মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিছুদিন পরে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিম তাঁদের বাড়িতে যান। এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, হরগোবিন্দ আর প্রসেনজিৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোখার চেষ্টা করেই খুন হন। তাঁদের খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন। গত ১১ ও ১২ এপ্রিল একাধিক জায়গায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাড়িতেই হামলা চলেছে। আক্রমণের ভয়ে বহু পরিবার, বিশেষত শিশুদের নিয়ে মহিলারা, নদী পার হয়ে মালদার বৈষ্ণবনগরের পারলালপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
ঘোষপাড়ার বাসিন্দা মালতী ঘোষ তাঁর সাত বছরের সন্তানকে নিয়ে পারলালপুর হাইস্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ ‘শুক্রবার বিকেলে আমাদের বাড়িতে হামলা হয়। পুকুরের জলেও বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই। সেজন্যেই পালিয়ে এসেছি।’ তিনি আরও জানান, বাড়িতে আগুন লাগাতে গুন্ডারা তাঁর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের সিলটি খুলে দিয়েছিল। তাঁর স্বামী কাজের সূত্রে বিদেশে থাকেন, সন্তানও জ্বরে কাহিল। উপায় না দেখে অসুস্থ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়ি ছাড়েন।
অস্থিরতার পর থেকে হিন্দু মন্দিরে হামলা ও মূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। ধূলিয়ান পৌরসভার বাসিন্দা সাগর সেখ কিছু কিছু ভাংচুরের কথা স্বীকার করেছেন বটে, তবে তিনিও বলেছেন, ধূলিয়ানে যেসব মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে তা স্থানীয় লোকেদের কাজ নয়। আগন্তুকরাই এসব ঘটিয়েছে। তিনি আরও জানান, পরে স্থানীয়রাই মন্দিররক্ষার দায়িত্ব সামলেছে।
‘কতবছর ধরে আমরা এখানে বাস করছি! আমরা সবাই এখানে মিলেমিশে থাকি। হিন্দুরা এখানে সংখ্যায় কম, তাই তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের। তাছাড়া আমরা এও জানি, এই ধরনের ঘটনা কী ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক বিপদ ডেকে আনতে পারে। যারা এসব ঘটাল, তারা প্রত্যেকে বহিরাগত। আমরা ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি। এখন আমরা নিজেরাই মন্দির পাহারা দিচ্ছি।’
ঘটনার পর হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে বিরাটসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনি মোতায়েন করা হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনির (বিএসএফ) সূত্র অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় বাহিনির ১৫টি কোম্পানিকে নামানো হয়। অশান্তিপ্রবণ এলাকার খুব কাছেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। স্থানীয়রা তো বটেই, নিরাপত্তা বাহিনির কাছেও এই বিষয়টি এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদিকে রাজ্য পুলিসের শীর্ষকর্তারাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন, যথাসম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনাই লক্ষ্য এখন। ১২ এপ্রিল সন্ধেবেলায় ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছন রাজ্য পুলিসের ডিজি রাজীব কুমার, বিএসএফের সঙ্গে মিটিংও করেন। সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনি রুট মার্চ করেছে, সঙ্গে ছিল বিশাল পুলিসবাহিনি। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। পুলিসকর্তারা বলেছেন, শান্তি বজায় রাখতে স্থানীয় মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই দোকানপাট খুলেছে, অনেকে ঘরেও ফিরেছেন।
অশান্তির রাজনীতি: দাবি ও পাল্টা দাবি
বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিন্দু অধ্যুষিত ঘোষপাড়া। তাদের দাবি, যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত বা বাস্তুহারা, তাঁরা সকলেই হিন্দু আর আক্রমণকারীদের সকলেই মুসলমান। ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারকেই সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে বিজেপি। সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসনও। ইতিমধ্যেই ঘরছাড়াদের ফেরাতে তৎপর হয়েছে পুলিস। জঙ্গিপুরের পুলিস সুপারিন্টেন্ডেন্ট অন্নদা রায় বলেন ‘যাঁরা বাড়িঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, পুলিস তাঁদের ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। তাঁরা যদি ফিরতে চান, পুলিস তাঁদের সর্বতোভাবে সাহায্য করতে রাজি।’
বিজেপি যতই দাবি করুক শুধুমাত্র হিন্দুরাই বিতাড়িত হয়েছেন, এলাকা ঘুরে দেখে অন্তত এটা পরিষ্কার যে সে তালিকায় মুসলমান পরিবারও রয়েছে। জেলার সংখ্যালঘু নেতা এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়ার (এসডিপিআই) সর্বভারতীয় সম্পাদক তায়েদ উল-ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘হিন্দুদের উপর আক্রমণ হয় শুক্রবার (১১ এপ্রিল), অন্যদিকে মুসলমানরা আক্রান্ত হন শনিবার (১২ এপ্রিল)। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। পুলিস কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখায়নি বটে, কিন্তু পুলিসের উর্দি পরে এসে যারা গুন্ডামি করল তাদের লক্ষ্যই ছিলেন মুসলমানরা।’
বহু মুসলমান ব্যবসায়ী, দোকানদারের বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। সোনার দোকান, মিষ্টির দোকান, বড়ো স্টেশনারি দোকান, মুদির দোকানে লুঠপাট চলছে। বেশকিছু গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি, ঘরদোর ভাঙচুর হয়েছে। ধূলিয়ানের বহু বাড়ি এখনো জনমানবহীন, খাঁ খাঁ করছে। তবে ধীরে ধীরে ঘরছাড়াদের একাংশ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন।
ধূলিয়ান মালদহ দক্ষিণ লোকসভা আসনের অধীন। জঙ্গিপুরের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ খলিলুর রহমানের বাড়ি এই এলাকায়। কাছাকাছিই থাকেন ফরাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম। দুজনের বাড়িতেই হামলা হয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জঙ্গিপুর যাচ্ছিলেন খলিলুর। পথেই তাঁকে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। পরে তিনি একটি টিভ চ্যানেলকে বলেন ‘একদল অল্পবয়সী ছেলে ওয়াকফ আইন সম্পর্কে কিছু না জেনেই আন্দোলনে নেমেছে। তাদের মাথার উপরে না আছে কোনো নেতা, না কোনো ব্যানার। আমি তাদের ফিরে যেতে বলায় উলটে আমার দিকেই তেড়ে এল।’
মনিরুল সংবাদমাধ্যমকে জানান, সামশেরগঞ্জ থানা থেকে তাঁর বাড়ি মাত্র ১০০ মিটার দূরে, তা সত্ত্বেও তাঁর বাড়িতে গুন্ডারা হামলা করার সাহস পেয়েছে। তিনি বলেন “আমার পরিবারের লোকজন অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তবে যা-ই ঘটুক, আমি এখানেই আছি…যদি আমাদের মত নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আক্রান্ত হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? পুলিস প্রশাসন দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি এও জানিয়েছেন যে, দুষ্কৃতীরা তাঁর বাড়িতে আগুন ধরাতে চেয়েছিল। ভীত সন্ত্রস্ত বিধায়ক থানায় ছুটে যান, তাঁর পরিবার এলাকা ছেড়ে পালায়।
মুর্শিদাবাদেই কেন?
মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে আমরা দুভাগে দেখতে পারি। ১১ এপ্রিল অবধি ঘটনাপ্রবাহ মোটামুটি ওয়াকফ আইনবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচিতেই আটকে ছিল। কিন্তু ১২ এপ্রিল থেকে তা সাম্প্রদায়িক চেহারা নেয়।
লক্ষণীয়, সেইসময় মুর্শিদাবাদের অন্যান্য অংশ কিন্তু শান্তই ছিল। সুতি, ধূলিয়ান, সামশেরগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় এই ধরনের উত্তেজনা ছড়ায়নি। তাহলে কিছু নির্দিষ্ট জায়গাতেই উত্তেজনা ছড়াল কেন? এর উত্তর পেতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের ওয়াকফ আইনবিরোধী আন্দোলনের বৃহত্তর চিত্রটার দিকে আমাদের তাকানো প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গে ওয়াকফ আইনবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ছিল একমুখী। তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর নেতৃত্বে অনেকগুলি সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন এক হয়ে আন্দোলন শুরু করে, কলকাতায় বিরাট প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। অনায়াসেই সিদ্দিকুল্লা এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মুখ হিসাবে উঠে আসেন। যদিও তিনি অবিসংবাদী নেতা নন। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের অশান্তির পর তাঁর নেতৃত্বের বিরোধিতা করছেন সংখ্যালঘুদেরই এক বড় অংশ। আন্দোলনের শুরুর দিকে কলকাতায় মিছিল চলাকালীন জোর করে একটি বাসের জানলা থেকে হনুমানের পতাকা খুলিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ওয়াকফ আইনবিরোধীদের নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। পালটা প্রতিবাদে রাজ্যজুড়ে বাস ও ট্যাক্সিতে হনুমানের পতাকা লাগিয়ে মিছিলের ডাক দেয় গেরুয়া শিবির।
আরো পড়ুন সিএএ নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন নয়, নাগরিকত্বের মরীচিকা
এবার আসি মুর্শিদাবাদের প্রসঙ্গে। এ জেলার মোট জনসংখ্যার ৬৬% মুসলমান। বাকি রাজ্যের মতই মুর্শিদাবাদেও যে সংগঠনগুলি ওয়াকফ-বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল, তাদের একটি অংশ সিদ্দিকুল্লার ঘনিষ্ঠ। কিন্তু সকলে তা নয়। আন্দোলনকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল জমিয়ত উলেমা-এ-হিন্দ, বেশ কয়েকটি ইমাম মুয়াজ্জেমদের সংগঠন, এবং এসডিপিআই ও ওয়েলফেয়ার পার্টির মত স্থানীয় স্তরে শক্তিশালী কিছু রাজনৈতিক দল। এই জেলায় প্রায় ৪,৫০০ ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই চাষের জমি। তবে অভিযোগ আছে, এগুলির মধ্যে ৫০০টিরও বেশি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা। স্থানীয়দের দাবি, এই দখলদারির পিছনে আছেন ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তিরাই।
রবিবার, ১৩ এপ্রিল, একাধিক ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সংগঠন রাজীব কুমারের কাছে দাবি তোলে, দখলীকৃত ওয়াকফ সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিক।
সামশেরগঞ্জের এক ইমাম-মুয়াজ্জেম সংগঠনের নেতা নুরুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন ‘মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে যারা কোটি টাকার ওয়াকফ সম্পত্তি ভোগ করছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে, আইনি উপায়ে সেসব সম্পত্তি তাদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।’ ওয়াকফ বিল-বিরোধী প্রতিবাদে সামিল ছিল তাঁর দলও।
আরও একটি সংগঠনের সম্পাদক আব্দুর রজ্জাকও বলেন ‘মুর্শিদাবাদে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, যার অনেকগুলোই দখল হয়ে গিয়েছে। যারাই ক্ষমতায় এসেছে, এই সম্পত্তিগুলোর উপর নজর দিয়েছে। রাজ্য সরকারের উচিত সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করা, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।’
আরেকটি সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক নিজামুদ্দিনের দাবি ‘মুর্শিদাবাদে প্রায় এক লক্ষ একরের কাছাকাছি ওয়াকফের জমি রয়েছে। পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে সরকারের কী ভূমিকা? সরকার যদি তার কাজ ঠিকভাবে না করে, জনরোষ এমনিই বাড়বে।’ এই বক্তব্যগুলি থেকে একথা পরিষ্কার যে, ওয়াকফের বিরুদ্ধে যতই সর্বভারতীয় স্তরে প্রতিবাদ গড়ে তোলার কথা বলা হোক না কেন, স্থানীয় স্তরের এই বিষয়গুলিও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সাংসদ খলিলুর (যিনি ওয়াকফ বোর্ডের সদস্যও বটে) বলেন ‘যাঁরা ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করেছেন, তাঁরা সেগুলি স্বেচ্ছায় বোর্ডের কাছে ফিরিয়ে দিন। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অস্বীকার করছি না, বেশকিছু তৃণমূল সদস্যও এতে জড়িত আছেন। কিন্তু যে-ই নিয়ে থাকুন, উচ্ছেদ নিয়ে ওয়াকফ বোর্ডের কোনো আপত্তি নেই। আমাদের রাজ্য সরকারও সেটাই চায়। কিছু কেসে আইনি জটিলতা রয়েছে, তবে রাজ্য সরকার এ ব্যাপারে সিরিয়াস।” সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল এবং বহুমাত্রিক।
মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ইতিহাস
একসময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল এই জেলা। দীর্ঘকাল বহরমপুরের সাংসদ ছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সিপিএম এবং আরএসপিও সক্রিয় ছিল। কিন্তু সেসব দিন আর নেই।
কংগ্রেস ও বামেরা আজ দুর্বল, তৃণমূল কংগ্রেসেরই প্রভাব বেশি। তবে কংগ্রেসের মত তৃণমূল কংগ্রেসের একজন অধীর চৌধুরী নেই, যিনি গোটা জেলার সংগঠনকে একা হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। জেলা তৃণমূল কংগ্রেস বহুধাবিভক্ত। মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ। তাঁদের মধ্যে বহরমপুরের ইউসুফ পাঠান ভিনরাজ্যের লোক, নামী প্রাক্তন ক্রিকেটার। তৃণমূল স্তরের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো যোগ নেই। মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ আবু তাহেরের বয়স হয়েছে, তিনি অসুস্থও। জঙ্গিপুরের খলিলুর ব্যবসায়ী, কিন্তু জননেতা নন। স্বাভাবিকভাবেই সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দল, পুরো চাপ এসে পড়ছে পুলিস প্রশাসনের উপর। স্থানীয় তৃণমূল এবং সংখ্যালঘু নেতাদের একাংশের অভিযোগ, পুলিস প্রশাসনের একটি অংশও তলে তলে গেরুয়া শিবিরের হয়ে কাজ করছে।
ওদিকে মুসলমান-প্রধান জেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় দাপট বেড়েছে বিজেপির। বিধানসভার দুজন বিধায়কও তাদের। বেসামাল তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুসংবদ্ধ বিজেপি এই মুহূর্তে অনেক বেশি শক্তিশালী, তাদের প্রোপাগান্ডাও স্পষ্ট। রাজ্য বিজেপির বিরুদ্ধে অবশ্য ভুয়ো খবর ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। ১৩ এপ্রিল, রবিবার, বঙ্গ বিজেপি বেশ কিছু পুরনো হানাহানির ছবির কোলাজ সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে। দাবি করে ওগুলো মুর্শিদাবাদেরই সাম্প্রতিক ছবি। যথারীতি বিভ্রান্তি ছড়ায়। পরে পুলিস সূত্রে জানানো হয়, বেশিরভাগ ছবিই সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের, বাকি ছবি অন্যান্য রাজ্যের নানা ঘটনার।
মুর্শিদাবাদ কি বাংলার রাজনীতিতে একটি স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারল? সংখ্যাগুরু সমাজের মধ্যে যে মুসলমানবিদ্বেষের চাষ বহুদিন ধরে চলছে, গত দেড় সপ্তাহে তা কি পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও সময় দরকার। তবে একথা ঠিক যে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিসরে গেরুয়া শিবিরের বয়ান এতখানি গ্রহণযোগ্যতা আগে পায়নি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিভাজন যে তীব্রতর হবে তা বলাই বাহুল্য। নির্বাচনের ফল এতে প্রভাবিত হোক বা না হোক, বাংলার সমাজ যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








