প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে পদচ্যুত করেছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি জগমোহনলাল সিনহার রায়, ১৯৭৫ সালের ১২ জুন। সেই রায়কে স্বাগত জানাতে কোনো অসুবিধা হয়নি সেই সময়ের জনসঙ্ঘ এবং আরএসএস নেতাদের। তার পর প্রায় ৫০ বছর কেটে গিয়েছে। জনসঙ্ঘ বদলে নতুন নাম হয়েছে বিজেপি। পঞ্চাশ বছরে দেখা যাচ্ছে সেই হিন্দুত্ববাদী নেতারা অনেকটাই পাল্টে গিয়েছেন। সেদিন সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ে অসুবিধা না হলেও ২০২৫ সালে কিন্তু তামিলনাড়ুর রাজ্যপালকে নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই সদস্যের বেঞ্চের রায় মানতে নারাজ আজকের বিজেপি নেতারা।

বহু দশক ধরে চলতে থাকা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সাংবিধানিক সমাধানের উদ্দেশ্যে, বলা যায় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এমন একটি রায় ঘোষণা করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। এই রায় ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের মনোমত হয়নি, তা তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের সংবিধানে বলা নেই একজন রাজ্যপাল তাঁর কাছে সম্মতির জন্য রাজ্য বিধানসভায় পাস হয়ে আসা একটি বিল কতদিন আটকে রাখতে পারেন। সংবিধানে এই সংক্রান্ত ধারায় শুধু ‘অ্যাজ সুন অ্যাজ’ কথাটা লেখা আছে। কিন্তু এটি একটি অস্পষ্ট নির্দেশ।

তামিলনাড়ু বিধানসভায় পাস হওয়া দশটি বিল প্রায় এক বছর ধরে আটকে ছিল সে রাজ্যের রাজ্যপাল আর এন রবির কাছে। তামিলনাড়ু সরকার এই নিয়ে বিচার চেয়ে শীর্ষ আদালতে যায়। সুপ্রিম কোর্টে এই নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ায় রাজ্যপাল রবি বিলগুলিকে পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেন। বিল ফেরত আসায় নতুন করে সেই সব বিল আবার বিধানসভায় পাস করিয়ে ফের পাঠানো হয় রবির কাছে সম্মতির জন্য। এবার সংবিধান মতে সম্মতি দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ ছিল না তাঁর। তিনি কিন্তু সম্মতি না দিয়ে এবার সেগুলি পাঠিয়ে দেন রাষ্ট্রপতির কাছে, তাঁর সম্মতির জন্য।

বিল নিয়ে এই ধরনের সমস্যা যে শুধু তামিলনাড়ুর, তা নয়। প্রায় সব কটি অবিজেপি রাজ্য সরকারের রাজ্যপালদের সঙ্গে এই ধরনের বিরোধ প্রতিনিয়ত হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে সমস্যাটা কয়েক গুণ বাড়লেও অতীতে কংগ্রেস আমলে বা ইউপিএ শাসনেও ভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে এই ধরনের বিরোধ হয়েছে।

সংবিধান অনুসারে কোনো রাজ্যপাল তাঁর কাছে সম্মতির জন্য আসা বিল নির্দিষ্ট কয়েকটি কারণে বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে পারেন, কিন্তু সেটা তিনি পারেন প্রথমবার যখন তাঁর কাছে বিলটি আসবে শুধু তখনই। একবার যদি বিল পুনর্বিবেচনার জন্য রাজ্যের কাছে ফেরত পাঠান এবং রাজ্য বিধানসভা যদি সেই বিল ফের বিধানসভায় পাস করিয়ে রাজ্যপালের কাছে সম্মতির জন্য পাঠায়, তখন তিনি সেটা আর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে পারেন না। অথচ এই কাজটিই করেছেন তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রবি। তাঁর পাঠানো বিলগুলি যায় রাষ্ট্রপতির দফতরে। এই কাজকেই সংবিধানবিরোধী বলে উল্লেখ করেছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি আর মহাদেবনের দুই সদস্যের বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ে বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা তামিলনাড়ু সরকারের দশটি বিল, রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের দফতর থেকে বৈধ সিলমোহর নিয়ে ফিরে না এলেও ওই সব কটি বিল সম্মতি পেয়ে গিয়েছে ধরে নিতে হবে। ফলে ওই সব বিলের আইনে রূপায়িত হওয়ার পথে আর কোনো বাধা নেই। এই রায় বেরনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওই দশটি বিলকে আইনে রূপায়িত করা সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি তামিলনাড়ু সরকার জারি করে দিয়েছে। ভারতে এই প্রথম এমন ঘটল, যেখানে রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়াই দশটি বিল আইনে পরিণত হল। এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর ফলে এমন প্রশ্নও উঠল যে, তাহলে রাজভবনের আর কী কাজ পড়ে রইল!

আরো পড়ুন কেন্দ্র-রাজ্য যুদ্ধ হয়, শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ যায়

বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি মহাদেবনের বেঞ্চ তাঁদের ৪১৫ পাতার রায়ে বলেছেন, রাজ্যপাল রবি বিধানসভায় পাস হয়ে যাওয়া দশটি বিল নিয়ে যা করেছেন, তার পিছনে কোনো সাংবিধানিক কারণ নেই। রায়ে বলা হয়েছে, রাজ্যপালকে বিল আটকে রাখতে কোনও ‘ভেটো পাওয়ার’ প্রয়োগ করার ক্ষমতা সংবিধান দেয়নি। একবার ফেরত পাঠানোর পর সেই বিল যদি বিধানসভা থেকে নতুন করে পাস হয়ে তাঁর কাছে আসে, তারপর আর সেই বিলে সম্মতি না জানিয়ে সেটিকে তিনি সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে পারেন না। সংবিধান সেই অনুমতি রাজ্যপালকে দেয়নি। একথা সংবিধানে খুব স্পষ্ট। কোনো রাজ্যের বিধানসভায় পাস হওয়া একটি বিল রাষ্ট্রপতির কাছে বিবেচনার জন্য রাজ্যপাল যখন পাঠাবেন, রাষ্ট্রপতিও তা সম্মতির জন্য আটকে রাখতে পারেন না, যদি না সেই বিলে এমন কিছু থাকে যা আইনে পরিণত হলে কেন্দ্রের কোনো আইনের সঙ্গে সংঘাত হবে।

এত যে বিতর্ক এবং কথা হচ্ছে এই রায় নিয়ে তার কারণ, সুপ্রিম কোর্ট শুধু এইটুকু বলেই থামেনি। রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে – কতদিনের মধ্যে একজন রাজ্যপাল এবং রাষ্ট্রপতিকে এই ধরনের বিলের বিষয়ে বিবেচনা এবং ব্যবস্থা গ্রহণ (consider and take action) করতে হবে। সংবিধানে এই ধরনের কোনো সময়সীমা লিপিবদ্ধ নেই। সুপ্রিম কোর্ট তা করে দিল সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে। সেখানে বলা হয়েছে ‘The supreme court in the exercise of its jurisdiction may pass such decree or make such order as is necessary for doing complete justice in any cause or matter pending before it, and any decree so passed or order so made shall be enforceable throughout the territory of India in such manner as may be prescribed by or under any law made by parliament and, until provision in that behalf is so made, in such manner as the president may by order prescribe.”

এখন সমালোচকদের প্রশ্ন – ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতির জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া কি বিচারবিভাগের নিজের কাজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নয়? রাষ্ট্রপতি চলেন প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে। সুপ্রিম কোর্ট কি পারে রাষ্ট্রপতির জন্য সময় বেঁধে দিতে?

সবিনয়ে পাঠককে জানাতে চাই, আমি একজন সাংবাদিক হিসাবে এই সাংবিধানিক বিষয়ে নিজেকে মতামত দেওয়ার যোগ্য মনে করি না। এই নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দুরকম মত শোনা যাচ্ছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং দ্য ট্র্যান্সফরমেটিভ কনস্টিটিউশন সহ সংবিধান বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক গৌতম ভাটিয়ার মত আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। আমার মনে হয়েছে তিনি এই নিয়ে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কয়েকটি কথা বলেছেন।

তাঁর মতে, আমাদের সংবিধান রচয়িতাদের উপর ঐতিহাসিক কারণেই কিছু ‘কলোনিয়াল’ ভাবনার প্রভাব পড়েছিল। ফলে সংবিধানে বেশকিছু ক্ষেত্রে একটি বিকেন্দ্রীকরণবিরোধী মানসিকতা কাজ করেছে। যেখানে শেষ কথা বলছে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত ‘ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ’। এটি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর আদর্শের বিরোধী। এই কারণেই রাজ্যে বিধানসভা এবং রাজভবন – দুটি কেন্দ্রকে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সংবিধানে যে কখন কে শেষ কথা বলবে, তা নিয়ে তর্ক শেষ হয় না। নিয়মিত আইন আদালত, বাকবিতণ্ডা চলতেই থাকে দুই পক্ষের মধ্যে। এই সমস্যা কে মেটাতে পারে? অবশ্যই একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট পারে। সুপ্রিম কোর্টই পারে সেই ত্রুটি মেরামত করতে, যার জন্য কোথাও কোথাও এমন অস্পষ্টতা তৈরি হয় বা নিয়মিত হতে থাকে, যার ধাক্কা সুপ্রিম কোর্টকেই সামলাতে হয় একের পর এক মামলায়। যেমন এই রাজ্যে রাজ্যে রাজ্যপাল বনাম রাজ্য সরকারের মামলা। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতেই এই রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি। শোনা যাচ্ছে এই রায়ের রিভিউ চাইবে মোদী সরকার। ইতিমধ্যেই বিজেপি সাংসদদের কেউ কেউ, এমনকি উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করেছেন এই বলে যে সুপ্রিম কোর্ট নিজের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে এই রায়ে।

যা-ই হোক না কেন, রাজভবনের রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচিত সরকারের বিকল্প হয়ে ওঠা যে গণতন্ত্রবিরোধী একধরনের কাণ্ডকারখানা, তা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই রায়। ফলে এই নিয়ে বিতর্ক শুধু কাম্য নয়, জরুরিও। সবসময় যে এমন ঘটে তা নয়, কিন্তু মাঝে মাঝেই ঘটে, এবং আমাদের মানতেই হবে, এই রায়েও সাংবিধানিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সুপ্রিম কোর্টের শক্তির পরিচয় পাওয়া গেল। এই ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের সাহস বাড়ে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা বাড়ে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.