মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটভূমির যাঁরা একটুও খোঁজখবর রাখেন, বার্নি স্যান্ডার্সের নাম তাঁদের সকলের জানা। প্রগতিশীল বাম বা বাম ঘেঁষা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে আমেরিকায় তো বটেই, বিশ্বরাজনীতিতে যে কয়েকজন শিবরাত্রির সলতের মতন জ্বলছেন, স্যান্ডার্স তাঁদের অন্যতম। এখনকার উগ্র দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী এবং/অথবা নির্লজ্জ পুঁজিবাদী রাজনীতির যুগেও বার্নির ‘ধনতন্ত্র নিপাত যাক’ গোছের সভাগুলোতে আক্ষরিক অর্থেই জনজোয়ার দেখলে বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না, বরং একটু নড়েচড়ে বসি। আবার পরক্ষণেই খেয়াল হয় – ভদ্রলোকের বয়স ৮৩। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রী রাজনীতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মত বার্নির কোনো উত্তরসূরি দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বার্নির সহযোদ্ধা আলেকজান্দ্রা ওকাসিও-কর্তেজের (এওসি) মত কেউ কেউ রয়েছেন। তিনি, ইলহান ওমর, রশিদা তায়িব, প্রমুখ বাম রাজনীতির পথযাত্রী মার্কিন সংসদের নিম্নকক্ষের অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী ‘দ্য স্কোয়াড’ যথেষ্ট জনপ্রিয়ও বটে। তবু, জনগণের মধ্যে বার্নির যে গ্রহণযোগ্যতা দশকের পর দশক ধরে জন্মেছে, তা ওঁদের এখনই থাকবে – এমনটা আশা করা অন্যায়। উপরন্তু বার্নি একজন সাদা চামড়ার পুরুষ। শুনতে খারাপ বা অবাক লাগলেও, মার্কিন দেশে এখনো এই দুটো বৈশিষ্ট্য থাকলে একজন নেতার গ্রহণযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত বেশি হয়। হয়ত তাই শ্বেতাঙ্গ পুরুষরা এখনো রাজনীতিতে (এবং অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে) সংখ্যাগুরু।
তার মানে এই নয় যে জনপ্রিয়তা বার্নির প্রাপ্য নয়। ওঁর আজকের বিশ্বাসযোগ্যতার পিছনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছরের লড়াইয়ের ইতিহাস অনস্বীকার্য। হাজার হোক, গত নভেম্বরে মুখ থুবড়ে পড়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির যে কয়েকজন এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করার প্রচেষ্টা, উদ্যম এবং পরিকল্পনা দেখিয়েছেন, তাকে কিছুটা বাস্তবায়িতও করেছেন, তাঁদের মধ্যে বার্নিই সবচেয়ে অগ্রগামী।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
জোহরন মামদানিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বার্নিকে নিয়ে এতগুলো বাক্য ব্যয় করলাম কেন? মূলত দুটো কারণ। প্রথমত, নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ে স্যান্ডার্স মামদানির পাশে আছেন – এই খবরটা কয়েকদিন আগে খেয়াল করলাম। আসলে আমরা যারা রাজনীতির টুকটাক খবর রাখি, তারা অনেকক্ষেত্রেই খবর পাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনলাইন আপডেট থেকে। যেহেতু বার্নি সংক্রান্ত খবরাখবর একটু পড়ার অভ্যাস আছে, তাই গুগল মশাই, বিং ভাইরা ওঁর সম্পর্কে আরও খবর পাঠাতে থাকেন। সেভাবেই মামদানিকে বার্নির সমর্থন করার খবর চোখে পড়ল। বলতে লজ্জা লাগলেও, ভদ্রলোকের নামটাও বোধহয় তখনই প্রথমবার খেয়াল করলাম। বার্নির প্রসঙ্গ টানার দ্বিতীয় কারণ ক্রমশ প্রকাশ্য।
যা-ই হোক, প্রথমবার মামদানির কথা জানা আর আজকের দিনটার মাঝে জল অনেক গড়িয়েছে। মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র পদের নির্বাচনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে হারিয়ে নভেম্বরের মূল নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদ মোটামুটি সুনিশ্চিত করে ফেলেছেন। কুওমো নিজের পরাজয় প্রকাশ্যে মেনেও নিয়েছেন (তবে তিনি মেয়র হওয়ার দৌড়ে হয়ত থাকবেন, কারণ ওঁর ‘প্ল্যান বি’ নাকি স্বাধীন প্রার্থী হিসাবে লড়া)। ফলত গত কয়েকদিন মামদানিকে নিয়ে প্রচুর লেখালিখি, বিচার-বিশ্লেষণ, আলাপ-আলোচনা, নিন্দা-প্রশংসা নিরন্তর চলছে আমেরিকার এবং সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে, সোশাল মিডিয়ায়, রোজকার কথাবার্তায়। আগেই বলেছি যে আমি রাজনীতিজ্ঞ নই, মামদানিকে নিয়ে যেটুকু ঘাঁটাঘাঁটি করছি তাও নিজের কৌতূহলবশত, এখনো হয়ত অনেককিছুই জানা বাকি। তবু কিছু বিষয় যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক এবং তাত্ত্বিক মাহমুদ মামদানি এবং চিত্র পরিচালক মীরা নায়ারের মত বাবা-মার ছত্রছায়ায়, ধরে নেওয়া যায় স্বচ্ছল অবস্থার মধ্যেই জোহরান বড় হয়েছেন। উগান্ডায় তাঁর জন্ম এবং সপরিবারে মার্কিন দেশের বাসিন্দা হয়ে যাওয়ার সময়ে জোহরানের বয়স সাত। ভারতীয় হিসাবে মীরা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জানা থাকলেও, জোহরানের বাবার নামটা হয়ত আমাদের অনেকের কাছেই অচেনা। ভারতীয়-উগান্ডান বংশোদ্ভূত মাহমুদ দুটো স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আইন ও কূটনীতিতে। ১৯৭৪ সালে হার্ভার্ড থেকে ডক্টরেট হন। ওঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা থিসিস ছিল ‘উগান্ডার রাজনীতি এবং শ্রেণি নির্মাণ’ নিয়ে। বর্তমানে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হারবার্ট লেহমান প্রফেসর অফ গভমেন্ট। একইসঙ্গে নৃতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা বিদ্যা (MESAAS) বিভাগের অধ্যাপক। তিনি রাজনীতি ও সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্ক, ঔপনিবেশিকতা ও তার প্রভাব, আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ এবং গণহত্যার ইতিহাস, ঠান্ডা যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং মানবাধিকারের গোড়ার কথা ও তত্ত্ব ইত্যাদি ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে তিনি তানজানিয়ার দার-এস-সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, উগান্ডার মাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বহু প্রবন্ধের রচয়িতা এবং পুরস্কার প্রাপক মাহমুদ।
মীরা হার্ভার্ড থেকে বিএ পাস করেন ‘ভিজুয়াল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ’ নিয়ে। সিনেমায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর কথা অনেক ভারতীয়ই জানেন। এই লেখায় প্রাসঙ্গিক তথ্য হল, তিনি ২০১৩ সালে হাইফা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন নীতির প্রতিবাদে।
এসব কথা বলা জোহরানের পারিবারিক মতাদর্শ বোঝার জন্যে। যদিও সবসময় সন্তানের ভাবনাচিন্তা যে মা-বাবার মতই হয় তা নয়। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা কেমন ছিল তার আঁচ পাওয়া যায় এ থেকে। আর হ্যাঁ, আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু ভারতীয় পরিবারের মতই জোহরানও একমাত্র সন্তান।
অনেকেই জানেন যে জোহরানের রাজনৈতিক আদর্শ বা দর্শন হল গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী (‘ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্ট’)। পুরো নাম জোহরান কোয়ামে মামদানি। কোয়ামে নামটা রাখা হয়েছে ঘানার বিপ্লবী, প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি ফ্রান্সিস কোয়ামে ক্রুমার নামে। হার্ভার্ড ও কলম্বিয়ার মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মা-বাবার বর্তমান ও অতীতের সংযোগ সত্ত্বেও মেইন রাজ্যের একটা লিবারাল আর্টস কলেজে পড়ার সিদ্ধান্তও লক্ষণীয়। ওই বউডিন কলেজে পড়ার সময়ে স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্তাইন সংগঠনের একটা শাখা জোহরান প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজ পাস করে তিনি কিছুদিন নিউ ইয়র্ক শহরের কুইন্সে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করেন, যাতে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ আটকানো যায়। সম্ভবত, সেই অভিজ্ঞতাই মামদানিকে অনুপ্রাণিত করে রাজনীতিতে নামতে, যাতে সাধ্যাতীত বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য অন্যায্য আইনকানুনের মোকাবিলা করা যায়। কাজেই, ওঁর মেয়র হওয়ার প্রচারাভিযানের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো – শহরে বিনামূল্যের বাস এবং বাড়িভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে না দেওয়া, সরকার পরিচালিত অন্তত পাঁচটা সস্তা মুদির দোকান, বরো প্রতি একখানা – এগুলো একেবারেই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা। জোহরান রাজনীতিতে নামার আগে কিছুদিন আবার গানবাজনার চর্চাও করেছেন এবং মায়ের ছবিতে সঙ্গীতের দিকটা দেখাশোনা করেছেন। প্রথমে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং একাধিক ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর হয়ে প্রচার করেন ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত। ২০২০ সালে নিজে প্রার্থী হয়ে নিউ ইয়র্ক রাজ্যের অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন। সেবারেও ডেমোক্র্যাটদের প্রাইমারিতে চারবারের বিজয়ী আরাভেল্লা সিমোতাসকে পরাজিত করেছিলেন।
আরো পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে
যে কারণে এত কিছু লেখা, সেই নভেম্বরের মেয়র নির্বাচনে সম্ভবত রিপাবলিকান বিরোধী ছাড়াও, ব্যালটে থাকবেন নানা কেলেঙ্কারিতে লিপ্ত প্রাক্তন মেয়র (প্রাক্তন ডেমোক্র্যাট) এরিক অ্যাডামস, স্বাধীন প্রার্থী হিসাবে। এছাড়া যৌন কেলেঙ্কারির জন্যে কুখ্যাত যে কুওমোকে হারিয়ে জোহরান ডেমোক্র্যাটদের মেয়র পদপ্রার্থী নির্বাচিত হলেন, তিনিও স্বাধীন প্রার্থী হিসাবে লড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যদিও প্রাথমিকে প্রায় ৪৪% ভোট গেছে জোহরানের ঝুলিতে আর কুওমো পেয়েছেন ৩৬%, মনে রাখা ভাল যে সাধারণ নির্বাচনে অনেক বেশি সংখ্যক এবং এই প্রাইমারির তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ ভোটদান করবেন। কাজেই জোহরানের লড়াই সহজ নয়।
বিরোধীরা গায়ে প্যালেস্তাইনপন্থী তকমা এঁটে দিয়ে ভোটারদের ভয় দেখাতে চেয়েছেন। তার তোয়াক্কা না করে ইজরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের কথা বারবার স্মরণ করানোর পাশাপাশি জোহরান ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘটা নানা বিদ্বেষমূলক ঘটনাবলীরও দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা করেছেন। সোজা কথায়, মামদানি সমস্ত বিদ্বেষমূলক অপরাধ আটকাতে শুধু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নন, সে কাজে অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ করার অঙ্গীকারও করেছেন। যেহেতু ইজরাইল-প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গে হয় মেরুকরণ তীব্র, তাই জোহরান পরিষ্কার জানিয়েছেন, তিনি গাজায় ইজরায়েল রাষ্ট্রের অত্যাচারের বিরোধী, কিন্তু ইহুদিবিরোধী নন। বলা বাহুল্য, আমেরিকার অভিবাসী মহলে বর্তমানে যে ত্রাসের সঞ্চার হয়েছে ফেডেরাল সরকারের ধরপাকড়ের ফলস্বরূপ, জোহরান তার ঘোরতর বিরোধী। অভিবাসীবিরোধী উগ্র জনমতের উপর ভর করে বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর নিকটবর্তীদের প্রতিহিংসামূলক, উস্কানিমূলক রাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচক জোহরান। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ব্যতীত সামাজিক ন্যায়বিচার চাওয়া অনেকটা এক হাতে তালি দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে তিনি মনে করেন।
কীভাবে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে ইন্দ্রপতন ঘটালেন তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, চলবেও। বব হার্ডট, নিউ ইয়র্কের স্পেকট্রাম নিউজ চ্যানেলের রাজনৈতিক বিভাগের প্রধান, মনে করেন যে এবছরের শুরুর দিকে দশ শতাংশের কম ভোট দিয়ে শুরু করে প্রাইমারি জিতে নেওয়ার অসাধ্যসাধন সম্ভব হয়েছে জোহরানের সোশাল মিডিয়ার সদ্ব্যবহার, কঠোর পরিশ্রম এবং বাম ঘেঁষা রাজনীতির কারণে। ভোটের আগের প্রায় সমস্ত সমীক্ষায় মামদানি কুওমোর থেকে পিছিয়ে ছিলেন। দলীয় সদস্য, সমর্থকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, নিজের নিরলস প্রচার, ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পিছপা না হওয়াই হয়ত জোহরানকে এ যাত্রায় সমস্ত হিসাবে উল্টে দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে ছিল বার্নি আর এওসি-র সমর্থন। আগেই বলেছি, প্রাইমারিতে জিতলেও নভেম্বরে কী হবে বলা কঠিন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায়, তিনিই নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচিত হবেন, অনেকে মনে করছেন আসল পরীক্ষা শুরু হবে তারপর। কারণ জোহরানের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি হল মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনের জিনিসগুলোর দাম সাধ্যের মধ্যে আনা। কাজটা সহজ হবে না, কারণ রাজ্যের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত গভর্নর এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের হাতে। গভর্নর ক্যাথি হোকাল ডেমোক্র্যাট হলেও বড় বড় কোম্পানি এবং সবচাইতে ধনী রাজ্যবাসীদের কর বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা জোহরান করেছেন, রাজ্যপাল তার পক্ষপাতী নন।
তাহলেও বিশেষজ্ঞরা মানছেন, প্রাইমারির এই জয় বলে দেয় যে ডেমোক্র্যাট ঘেঁষা তরুণ প্রজন্ম সত্যিকারের পরিবর্তন চায়। এদের অনেকেই হতাশ হয়ে রাজনীতিবিমুখ অবস্থান নিতে নারাজ। উল্লেখ্য, নভেম্বরে জিতলে জোহরান গত ১০০ বছরে নিউ ইয়র্কের কনিষ্ঠতম মেয়র হবেন। লন্ডনের সাদিক খানের পর জোহরান মেয়র হলে বিশ্বের দুই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের দায়িত্বে থাকবেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় বংশোদ্ভূত এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মতাবলম্বী রাজনীতিবিদ। যদিও সাদিক মতাদর্শের দিক থেকে এত সোচ্চার নন।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিজের দলের অপেক্ষাকৃত দক্ষিণপন্থী বা মধ্যপন্থীদের আপত্তি, রিপাবলিকানদের বিষোদ্গার, বিশেষত রাষ্ট্রপতির গরমাগরম গালিগালাজ তো থাকবেই। সঙ্গে নানা আন্তর্জাতিক বিষয়ে বক্তব্য রাখার কারণে নিন্দা এবং প্রশংসা – দুটোরই সম্মুখীন হতে হবে জোহরানকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে এসেছেন এমন মানুষ নিউ ইয়র্ক শহরে প্রচুর। কিন্তু তাঁরা সকলেই জোহরানের প্রতি নরম – এমন ভাবা হবে অতিসরলীকরণ। এই যেমন একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে জোহরান ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ইজরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, দুজনেই গণহত্যার জন্য দায়ী।
নিঃসন্দেহে এই মত তাঁকে অনেকের কাছে ভীষণ সাহসী ও স্পষ্টবাদী এবং অন্য অনেকের কাছে ঘৃণার পাত্র করে তুলেছে। এই প্রসঙ্গে উনি আরও বলেছিলেন, ২০০২ সালের দাঙ্গা পরবর্তী গুজরাটের পটভূমিতে ওঁর বাবা গুজরাটি মুসলমান শুনলে অনেকেই অবাক হয়ে ভাবে, গুজরাটি মুসলমানও হয়!
অনেক ভারতীয় দেশভক্ত এর প্রতিবাদে তেড়েফুঁড়ে উঠেছেন। বলছেন, মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা তো গুজরাটে ১০%, অল্প কোথায় – এরকম সব বিচিত্র যুক্তি। এই ভারতীয়দের মনের কথা বোধহয় এইরকম ‘দশ শতাংশ আছে তো, আবার কত থাকবে? ওই কটা মুসলমান যে আছে এই ঢের।’ অনেকে আবার জোহরানকে পাকিস্তানি বলেও দেগে দিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, অনেক ভারতীয় আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে ভারতবিদ্বেষী তকমা দিয়েছিলেন, কোনো রাজনৈতিক কারণবশত নয়। আমার এক বন্ধু খুব সরল করে বুঝিয়েছিলেন যুক্তিটা। লোকটার মাঝের নাম ‘হুসেন’ অতএব মুসলমান, আর কোন মুসলমান কবে ভারতের মঙ্গল চেয়েছে ইত্যাদি। মাঝের নাম যা-ই হোক, ওবামা যে খ্রিস্টান সেটা জানানো হলেও সেই দেশপ্রেমিক বন্ধুটি সন্তুষ্ট হননি। অনেকে আবার বলছেন, জোহরান তো ‘নেপো বেবি’। তাঁদের অবগতির জন্য বলে রাখা ভাল, ‘নেপোটিজম’-এর পোস্টার বয় ছিলেন কুয়োমো, যাঁকে জোহরান হারালেন। অ্যান্ড্রুর বাবা নিউ ইয়র্কের গভর্নর ছিলেন, তাঁর নামে সেখানে সেতু-টেতু আছে।
অনেকেই মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় মাত্রায় গ্রহণযোগ্যতার জন্য আজও জরুরি পুরুষমানুষ হওয়া এবং সাদা চামড়ার অধিকারী হওয়া। এই দুই ব্রহ্মাস্ত্রের মধ্যে একটা জোহরানের আছে, যা সম্ভাবনাময়ী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এওসি বা ইলহানদের নেই। অন্যদিকে আমেরিকার বাইরে জন্ম, ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক। তবে জোহরানের এই সাফল্য যদি বাম ঘেঁষা রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগণের মনে একটা সাবধানী আশাবাদ জাগিয়ে তোলে, ক্ষতি কী? কোনো নতুন দিনের ছাড়পত্র কি আসবে জোহরানের হাত ধরে? সময় জবাব দেবে। আপাতত মনে রাখা যাক জোহরান একটা শহর বলতে কী বোঝেন ‘নিউ ইয়র্ক শহরবাসীর প্রাপ্য সেই মেয়র যাকে দেখা যায়, শোনা যায়, এমনকি চিৎকার করে ডাকা যায়। শহরটা আসলে থাকে রাস্তায়।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








