রাহুল
একটা গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন মানে শুধু ভোট নয়। নির্বাচন হল ন্যায়বিচার ও সমতার সূচনাবিন্দু – গণতন্ত্রের আত্মা।
আমাদের পূর্বসুরিরা ছিলেন মধ্যরাতের স্বাধীনতার সন্তার, যাঁরা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে ভারতের প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই অতি দরিদ্র ভারতের নেতারাই প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বিক ভোটাধিকার দেওয়ার নীতি অবলম্বন করেছিলেন, যাতে দেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমস্ত নারী পুরুষের মতামত স্থান পায় তার ভোটের মাধ্যমে। ইংরেজ আমলে কিন্তু তা হত না। তখন ভোটাধিকারের ভিত্তি ছিল সম্পত্তির মালিকানা, করদাতা হওয়া এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা। সার্বিক ভোটাধিকার সংবিধান সভায় প্রায় বিনা তর্কে গৃহীত হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সার্বিক ভোটাধিকার ব্যাপারটার বিরোধিতা করেছিল ১৯৪৯ সালে এবং ১৯৫১-৫২ সালে। তাদের মুখপত্র অর্গানাইজার সার্বিক ভোটাধিকারের বিরোধিতা করে একাধিক লেখাপত্র প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আরএসএসের ওজন আপত্তি কলকে পায়নি, কারণ তারা প্রায় কারোর সমর্থন পায়নি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
দেশের প্রথম নির্বাচন কেবল একটা ঘটনা ছিল না, ছিল একটা বিবৃতি – অন্তর্ভুক্তি, অধিকার অর্জন ও সমতার বিবৃতি। অথচ আজ ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে চালিত হচ্ছে। SIR প্রক্রিয়ায় গণহারে ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং বিহারে অঘোষিত এনআরসি চালু হয়ে গেছে।
ভোটাররা যেখানে দেশের গণতন্ত্র থেকে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সেখানে SIR প্রক্রিয়া সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান আপত্তি অগ্রাহ্য করে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াচ্ছেন। কেন এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপত্তি করা হচ্ছে নানা মহল থেকে? দেখা যাক।
ভোটার হওয়ার প্রমাণপত্র হিসাবে গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্রগুলোর তালিকা থেকে ভোটার পরিচয়পত্র, আধার, মনরেগা কার্ড এবং রেশন কার্ডের মত অতিব্যবহৃত নথিকে নির্বাচন কমিশন বাদ দিয়েছে। তার বদলে এমন ১১ খানা নথির তালিকা দেওয়া হয়েছে যা পাওয়া বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই অসম্ভব। বিহারের বিপুলসংখ্যক, ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে এ এক নিষ্ঠুর রসিকতা।
কী কী নথি রয়েছে এই তালিকায়?
১। কেন্দ্রীয় সরকার/রাজ্য সরকার/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারী/অবসর ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দেওয়া পরিচয়পত্র/পেনশন দেওয়ার আদেশপত্র
২। সরকার/স্থানীয় কর্তৃপক্ষ/ব্যাংক/ডাকঘর/জীবন বিমা/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দেওয়া ১.৭.১৯৮৭ তারিখের আগের যে কোনো পরিচয়পত্র/শংসাপত্র/নথি
৩। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা জন্মের শংসাপত্র
৪। পাসপোর্ট
৫। স্বীকৃত বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন/শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র
৬। উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শংসাপত্র
৭। জঙ্গলের অধিকারের শংসাপত্র
৮। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ওবিসি/তফসিলি জাতি/তফসিলি উপজাতি বা অন্য কোনো বর্ণের শংসাপত্র
৯। জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (যেখানে প্রযোজ্য, বিহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)
১০। রাষ্ট্রীয়/স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তৈরি পারিবারিক রেজিস্টার
১১। সরকারের জমি/বাড়ি বরাদ্দ করার শংসাপত্র
এই ১১ খানা নথির অধিকাংশ পাওয়া যাবে না বলে কার্যত দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পাস করার শংসাপত্রই মূল প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে কী হবে সেইসব গরিব দলিত, আদিবাসী, মুসলমান এবং মহিলাদের, যাঁরা কোনোদিন স্কুলেই যাননি?
জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা-২ (NFHS-2) এবং ৫ অনুসারে, বিহারের ১৮-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৪৫%-৫০% দশম শ্রেণির পরীক্ষা পাস করেছেন। ২০১৯-২০ সালে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে এই পরীক্ষা পাস করা মানুষের ব্যবধান ছিল ১০%। ২০১১ জনগণনাতেও বিহারে সাক্ষর মহিলার সংখ্যা ছিল ৫৩ শতাংশের সামান্য বেশি, যা পুরুষদের সাক্ষরতার হারের চেয়ে ২০% কম। যদি দশম শ্রেণির পরীক্ষা পাসের শংসাপত্রই বৈধ ভোটার হওয়ার শর্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গরিব ও শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া জনতার হাত থেকে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে, যা আমাদের দেশের নির্মাতারা দিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন কোথাকার ভোট কোথায় গড়ায়? সন্দেহ দানা বেঁধেছে
এ প্রশ্নও তোলা প্রয়োজন যে দেশের সবচেয়ে গরিব রাজ্য বিহারের মানুষ কি এমন কোনো নথির পিছনে টাকা খরচ করার অবস্থায় আছেন, যা দিয়ে তাঁদের কোনো আর্থিক সুবিধা হবে না? বিহারের বর্ণশুমারি অনুযায়ী, রাজ্যের ৬৩% মানুষ মাসে দশ হাজার টাকার কম আয় করেন। ২০২২ সালের ওই সমীক্ষা বলছে, বিহারের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার নিম্নরূপ:
- তফসিলি জাতি – ৪২.৯৩%
- তফসিলি উপজাতি – ৪২.৭%
- অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি – ৩৩.৫৮%
- পিছিয়ে পড়া শ্রেণি – ৩৩.১৬%
- সাধারণ বিভাগ – ২৫.০৯%
- মুসলমান
- শেখ – ২৫.৮৪%
- পাঠান (খান) – ২২.২%
- সঈদ – ১৭.৬১%
ওই রাজ্যের বহু মানুষ মাসে ছ হাজার টাকার কম, বা দিনে ২০০ টাকার কম আয়ে, জীবন কাটান। ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই যে তাঁরা কোনো সরকারি সুবিধা পাবেন এমন তো নয়। সেক্ষেত্রে এই মানুষগুলো কেন তাঁদের মাসিক আয়ের এক চতুর্থাংশ, অর্ধেক বা গোটা মাসের আয় খরচ করবেন শুধু নাম তোলাতে? তাঁদের কি উচিত কতকগুলো বিরল নথি জোগাড় করতে দোরে দোরে ঘুরে বেড়ানো?
উপরন্তু কয়েক লক্ষ, হয়ত কয়েক কোটি, বিহারি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে কাজ করছেন। তাঁদের কী হবে? এই প্রক্রিয়ায় তাঁদেরও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে না? ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের নাগরিকের প্রতিনিধি হওয়ার আইন কিন্তু পরিষ্কার বলছে ‘A person absenting himself temporarily from his place of ordinary residence shall not, by reason thereof, cease to be ordinarily resident therein.’ অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সাধারণভাবে যেখানে বাস করেন, যদি সাময়িকভাবে সেখানে অনুপস্থিত থাকেন, তাতে তিনি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন এমন বলা চলবে না। নির্বাচনী ম্যানুয়ালগুলোতে আরও বলা আছে যে সাময়িকভাবে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের ততদিন পর্যন্ত সাধারণ বাসিন্দা হিসাবেই ধরতে হবে যতদিন পর্যন্ত তাঁদের ফিরে আসার ক্ষমতা আছে এবং ইচ্ছা আছে।
এসবের তোয়াক্কা না করেই নির্বাচন কমিশন এই নতুন প্রক্রিয়া চালু করেছে, তাও নির্বাচনের কয়েক মাস আগে। এটা খোদ গণতন্ত্রের উপরেই আঘাত ছাড়া কী? এই গা জোয়ারি নীতিকে সামাজিক বিন্যাসে একেবারে নিচের ধাপে থাকা মানুষকে বাদ দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল ছাড়া কী-ই বা বলা যায়?
ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত।
নিবন্ধকার ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে লেখালিখি করেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







