সুস্মিতা মাহাতো

গ্রামবাংলার তৃণমূল স্তরের জনস্বাস্থ্যের ভার আজ আশাকর্মীদের ওপর। কার জ্বর হয়েছে, কোন মায়ের কী অবস্থা, কে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত, শিশুদের আয়রন খাওয়ানো, টিকার ব্যবস্থা করা। গর্ভবতী মাকে দিনে রাতে যখনই হোক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, করোনা রোগীর বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, প্রতিদিন অক্সিজেন টেস্ট করা। সুগার, প্রেশার, হার্টের রোগী শনাক্ত করা, টিবি রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো ইত্যাদি নানা কাজে ২৪ ঘন্টা পরিষেবা দিয়ে চলেছেন আশাকর্মীরা। তাঁরা নিজেরা কেমন আছেন? খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এল এক করুণ চিত্র।
পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে পিছিয়ে পড়া জেলা পুরুলিয়ার বরাবাজার ব্লকের বান্দোয়ান সেন্টারের আশাকর্মী দ্রৌপদী মাহাতো। নিজে সুগারের রোগী, এইসব কাজ করতে করতেই একদিন জ্বরে পড়লেন। প্রসঙ্গত কাজ করতে করতে আশাকর্মীরা এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে নিজেদের রোগ অসুখকে পাত্তা দেন না। সামান্য জ্বর ভেবে প্রথম দিকে গুরুত্ব দেননি, কাজ করে গেছেন। ছ’দিন পর খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শয্যাশায়ী অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার চার দিনের মাথায় শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয় তাঁর। বাড়িতে দুই নাবালক সন্তান। তাঁর স্বামী আমাকে ফোন করেছিলেন, খবরটা দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন “দিদি সরকারি কোন সাহায্য পাওয়া যাবে কি?” অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাই যে কর্মরত অবস্থায় আশাকর্মীর মৃত্যু হলে তার পরিবারের জন্য সরকারের কোন ব্যবস্থা নেই।
আশাকর্মীর কাজ করতেন হাওড়া জেলার রেহানা কাজি। ব্রেন স্ট্রোক হয় তাঁর। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরেও সরকার পাশে থাকেনি। চিকিৎসা চলাকালীন অসুস্থতার জন্য কাজ করতে পারেননি বলে তাঁর সাম্মানিক ভাতাটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বলা হয় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা। রেহানা একা নন। এমন অসংখ্য আশাকর্মী দিনের পর দিন চরম সরকারি বঞ্চনা সহ্য করে চলেছেন।
মাসে মাত্র ২০০০ টাকা বেতন দিয়ে হাসপাতালে দিশা ডিউটি চালু করেছে রাজ্য সরকার। আশাকর্মীদের বাধ্যতামূলক একমাস ব্লক হাসপাতালে কাজ করতে হয়। সদ্যোজাত শিশু ও মায়েদের পরিষেবা দেওয়া, হাসপাতালে নার্সদের ফাইফরমাশ খাটা- এই রকম সব কাজ করতে হয়। আট ঘণ্টা ডিউটি, লকডাউনে যানবাহন বন্ধ। গত বছর হৃদরোগে আক্রান্ত ৫২ বছর বয়সী ঝালদার এক আশাকর্মীকে প্রতিদিন ২২-২৩ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে ডিউটি করতে যেতে আসতে হয়েছে। এক বছর আগে পুরুলিয়ার কোটশিলা ব্লকের আশাকর্মী সুভদ্রা মাহাতো হাসপাতালে ডিউটি করতে আসার পথে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠরত তাঁর ১৮ বছরের মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল “মাসি, মায়ের উপার্জনের টাকাতেই আমাদের পরিবার চলত। আমার আর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনাও চলত ওই টাকাতেই। এখন কী করে চলবে? যদি মায়ের চাকরিটা পাওয়া যায় একটু দেখো।” বোকা মেয়ে জানত না, মা ছিলেন সরকারের স্বেচ্ছাসেবিকা। দায়িত্ব অস্বীকার করার জন্য নিয়োগের সময়ই আশাকর্মীদের ‘ভলান্টিয়ার’ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। চাকরি তো দূরের কথা, মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত এক পয়সাও নেই।
এমন চিত্র অসংখ্য। গত বছর পশ্চিম মেদিনীপুরের এক আশাকর্মী কাজ করতে করতে করোনায় আক্রান্ত হন। তাঁরও হৃদরোগ ছিল, বাইপাস সার্জারি করতে হয়। ডাক্তার তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলেন। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় সাম্মানিক ভাতা। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার মানবাজার ২ নং ব্লকের এক আশাকর্মী গতবছর লকডাউনের সময় যানবাহন নেই বলে দুর্গম ব্লক হাসপাতালে মিটিং-এ আসতে চাইছিলেন না। আধিকারিকদের হুমকিতে তাড়াহুড়ো করে বাইক নিয়ে আসতে গিয়ে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। কর্মরত অবস্থায় এরকমভাবে পশ্চিমবঙ্গের বহু আশাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য দপ্তরে বারবার প্রত্যেকটা ডেপুটেশনে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুর জন্য পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তোলা হয়, কিন্তু কি কেন্দ্র কি রাজ্য, কোন সরকারই কর্ণপাত করে না।
NRHM (national rural health mission) এর অন্তর্গত ASHA প্রকল্প চালু হয় ২০০৫ সালে কেন্দ্রের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে। প্রসূতি ও শিশুর মৃত্যুতে ভারত তখন বিশ্বে প্রথম সারিতে। গ্রামীণ ভারতের বেশিরভাগ মা তখনও বাড়িতেই শিশুর জন্ম দিতেন। মা ও শিশুকে হাসপাতালমুখী করা, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। ২০০৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে ২০১১ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত ব্লকে আশাকর্মী নিয়োগ করা হয়। রাজ্যে এখন প্রতি ১২০০ জনে একজন, সবমিলিয়ে ৫৪,৮৪৮ জন আশাকর্মী কাজ করেন। এঁরা সকলেই গ্রামাঞ্চলের অভাবী সংসারের মেয়ে বউ, অনেকেই বিধবা। অনেকের পরিবারের আর কোন রোজগেরে সদস্য নেই, আশাকর্মীর উপার্জনেই সংসার চলে। শুরুতে মা ও শিশুদের নিয়ে ৫-৬ ধরনের কাজ করতে হত। সাম্মানিক ভাতা ছিল ৮০০ টাকা, দৈনিক ভাতা ২৬ টাকা । কেন্দ্রে তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার, রাজ্যে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার। নিয়োগের সময় থেকেই আশাদের স্বেচ্ছাসেবিকা আখ্যা দিয়ে শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কেন্দ্রের সরকার। রাজ্য সরকারও নীরব ও উদাসীন থাকে।
এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বহু রক্তক্ষয়ী লড়াই আন্দোলনের দ্বারা ভারতবর্ষে শ্রমিকরা কিছু অধিকার অর্জন করেছিল। যেমন প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশন,মেডিকেল ভাতা,ছুটি, মেডিকেল ছুটি, ইএসআই এবং আট ঘন্টা শ্রম দিবস। আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক হলেও রাষ্ট্রের সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। এই মালিক শ্রেণির বেশি মুনাফা লাভের স্বার্থে কেন্দ্র বা রাজ্যের ক্ষমতায় যে দলই এসেছে, তারাই মালিকদের স্বার্থে শ্রমিকদের এই অর্জিত অধিকারগুলো এক এক করে ছাঁটাই করতে শুরু করে। বিভিন্ন সরকার এক এক করে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে ভেঙে ভেঙে ঠিকাদার মালিকদের হাতে দিয়ে দেওয়া শুরু করে। এই ঠিকাদারি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই সরকার নিজেও নিজের অধীনস্থ কর্মচারীদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুরু করে। স্থায়ী কর্মচারীর বদলে চুক্তিভিত্তিক, ঠিকা শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবক ইত্যাদি নামে নিয়োগ শুরু করে। স্থায়ী কাজের বদলে প্রকল্পভিত্তিক কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পভিত্তিক কর্মচারীদের একেবারে নামমাত্র সাম্মানিক ভাতা দিয়ে ওই সংক্রান্ত সরকারি সমস্ত কাজ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শুরু হয়। ন্যাশনাল রুরাল হেলথ মিশনের অন্তর্গত আশাও এই ধরনের একটা প্রকল্প। এই আশাকর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশন, মেডিকেল ভাতা, ছুটি, মেডিকেল ছুটি,ইএসআই — কোনকিছুই নেই। ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নিয়মে কাজ করতে হয়।
২০১১ সালে আশাকর্মীদের জন্য চালু হয় ফরম্যাট সিস্টেম। এই ফরম্যাটে ৪২ ধরনের পরিষেবার কাজ করতে বলা হয়। এর মধ্যে আছে মা ও শিশুর পরিষেবা সংক্রান্ত ২৬ রকমের কাজ; যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, প্রেশার, সুগার, হার্টের রোগ ইত্যাদি ১৬ রকমের কাজ। এ ছাড়াও পালস পোলিও, ফাইলেরিয়া, ব্লক হাসপাতালে ডিউটি, ভোটের ডিউটি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ডিউটি, ব্লকের যে কোন সরকারি মেলায়, দুয়ারে সরকারে, কোভিড ভ্যাকসিন ডিউটি, কোয়ারেন্টাইন জোনে ডিউটি, পরিযায়ী শ্রমিকদের দেহের তাপমাত্রা মাপার ডিউটি রয়েছে। এছাড়াও হঠাৎ হঠাৎ ব্লক মেডিকাল অফিসার অফ হেলথ (বি এম ও এইচ) যখন যেখানে দরকার আশাকর্মীদের পাঠিয়ে দেন, বিডিও অফিস থেকে তাঁদের বিভিন্ন কাজ করার জন্য বলা হয়। না করলেই জবাবদিহি করতে হয়। অথচ এই বাড়তি সরকারি কাজের জন্য আশাকর্মী কোন পারিশ্রমিক পান না। উপরন্তু এই সমস্ত কাজের জন্য নিজস্ব ফরম্যাটের কাজ করতে না পারলে ফরম্যাটের টাকা কাটা যায়। না পারলে কিংবা প্রশ্ন করলেই আধিকারিকরা কাজ ছেড়ে দিতে বলেন।
চব্বিশ ঘন্টা স্বাস্থ্য পরিষেবার এত ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আশাকর্মীদের পারিশ্রমিক খুবই কম — মাসে ছয় সাত হাজার টাকার বেশি হয় না। তার প্রধান কারণ, ফরম্যাট সিস্টেমে এমন কিছু নিয়ম আছে যার ফলে আশাকর্মীদের কাজের ফলাফল ১০০% নিশ্চিত না হলে ফরম্যাটের টাকা দেওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, কাজ বেশি, কাজের পারিশ্রমিক কম। যেমন নানা ধরনের সার্ভে লিস্ট আশাদের তিনটে রেজিস্টারে প্রতিদিন নথিভুক্ত করতে হয়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং পরিষেবা পেয়ে ১০০% সুস্থ না হচ্ছে, ততক্ষণ আশাকর্মী কোন টাকা পান না। মা ও শিশুর পরিষেবার ক্ষেত্রে সমস্ত টিকা দেওয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিশেষ বিশেষ দিনে করতে হয়। কোন কারণে ওই নির্দিষ্ট দিনে না করতে পারলে অথবা সাতটার মধ্যে একটা টিকা না দিতে পারলে বাকি টাকা কাটা যায়। সাধারণত প্রসবের সময় বেশিরভাগ নতুন মা বাপের বাড়ি চলে যান, ফলে আশার কাজ সম্পূর্ণ হয় না। যার ফলে মায়ের পরিষেবার সমস্ত টাকা কাটা যায়।
রাজ্যের বেশিরভাগ আশাকর্মীর বয়স এখন পঞ্চাশের কিছু কম বা বেশি। অনেকেই প্রেশার, সুগার, হার্ট, কিডনি, থাইরয়েড ইত্যাদি নানা রোগে আক্রান্ত। আর আশাদের কাজটাও সবসময় রোগ ও রোগী নিয়ে। তার উপর এত ধরনের কাজের চাপে তাঁরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গ্রামাঞ্চলে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এই লকডাউনে অনেককেই অসুস্থতা নিয়েও ২০-২২ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ব্লক হাসপাতালে দিশা ডিউটি করতে যেতে হচ্ছে। রাতে প্রসূতির সঙ্গে ব্লক হাসপাতালে এসে তাঁকে ভর্তি করে সারারাত হাসপাতালে বসে থাকতে হয়, ফিরে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। পরের দিন সকালে কোনরকমে বাড়ি ফেরা। তারপর রান্নাবান্না করে কোনরকমে দুটি খেয়ে আবার কাজে বেরিয়ে পড়া।
 গত বছর থেকে শুরু হয়েছে করোনা অতিমারী। সরকার গ্রামাঞ্চলের করোনা রোগীদের সমস্ত দায়িত্ব আশাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করা, কারো জ্বর হলে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করা, করোনা পজিটিভ হলে ওষুধ বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, প্রতিদিন অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেন মাপা, ভ্যাকসিনের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা, সমস্ত রিপোর্ট প্রতিদিন সেন্টারে গিয়ে অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফ (এএনএম)-কে দেওয়া। এই সমস্ত কাজই এখন আশাকর্মীদের।
তারপর প্রধানমন্ত্রী সেদিন ঘোষণা করলেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা রোগীদের করোনা টেস্ট নাকি এবার আশাদের দিয়ে করাবে সরকার। অথচ নেই মাস্ক, নেই স্যানিটাইজার,করোনা প্রতিরোধের অন্য সাজসরঞ্জাম। নিজেদের টাকা খরচ করে মাস্ক, স্যানিটাইজার কিনতে হচ্ছে। গত বছর একটা করে মাস্ক, টুপি, চাদর আর ১০০ মিলিলিটার স্যানিটাইজার দেওয়া হয়েছিল। এ বছর তা-ও নয়। এইসব কাজ করতে গিয়ে এ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের এক হাজারের বেশি আশাকর্মী কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। গতবছর অতিমারীর এই সমস্ত কাজের জন্য কেন্দ্র সরকার মাসে ১০০০ টাকা বরাদ্দ করেছিল। তা-ও ছ মাস পর বন্ধ করে দেয়। রাজ্য সরকার গত বছর করোনা পজিটিভ স্বাস্থ্যকর্মীদের এক লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত এ টাকা অধিকাংশ আশাকর্মীই পাননি।
আগেই বলেছি আশা প্রকল্প যখন চালু হয় তখন কর্মীদের সাম্মানিক ভাতা মাসে ৮০০ টাকা ছিল, অর্থাৎ দৈনিক মজুরি ২৬ টাকা। সেই সময় সম্ভবত সরকার স্বীকৃত দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ছিল ১০০ টাকা। কি রাজ্য কি কেন্দ্র, কোন সরকারই ন্যূনতম মজুরিটুকু দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি। উপরন্তু স্বেচ্ছাসেবক লেবেল লাগিয়ে ভবিষ্যতের পথও বন্ধ করেছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকার বদলায়, আসে বিজেপি সরকার। এমন ভাঁওতাবাজি আর কখনো হয়নি। বারবার আশাকর্মী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আশাকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবকের বদলে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়, কিন্তু সরকার কর্ণপাত করেনি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে ২৮শে জানুয়ারি সারা ভারতবর্ষের আশাকর্মীরা দিল্লি অভিযান করেন। তার পাঁচদিন পর বাজেটে আশাকর্মীদের জন্য বেতন দ্বিগুণ করার ও অসংগঠিত শ্রমিকদের মত আশাকর্মীদের পেনশন প্রকল্প চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়। ঘোষণায় বলা হয় মার্চ মাস থেকে অনলাইনে পেনশন প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা কার্যকর করা হয়নি।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন হয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর থেকে আরও কাজের বোঝা বেড়ে যায় আশাকর্মীদের। ফরম্যাটের বাইরে স্বাস্থ্য দপ্তরের বহু কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করতে বলা হতে থাকে। ফরম্যাটে নতুন নতুন নিয়ম চালু হতে থাকে, যার ফলে আশারা কাজ করলেও নিয়মের ফাঁদে পড়ে ফরম্যাটের টাকা কাটা যেতে থাকে। আশাকর্মীরা বারবার বলা সত্ত্বেও কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ২০১৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রায় ৪০,০০০ আশাকর্মী কলকাতার ধর্মতলার রানী রাসমণি রোডে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ধর্মতলার পুরো চত্বরটা সেদিন বেগুনি আগুনের শিখায় জ্বলতে থাকে। এই বিক্ষোভ দমন করার জন্য পরদিনই স্বাস্থ্য দপ্তর আশাকর্মীদের এবং সমস্ত আশা আধিকারিকদের অগণতান্ত্রিকভাবে শোকজ করে। আধিকারিকরা আশাকর্মীদের নানারকম হয়রানি করে এবং ভয় দেখাতে থাকে, কিন্তু বিক্ষোভ বেড়ে চলে। বাধ্য হয়ে রাজ্য সরকার ২০১৮-১৯ সালে আশাদের সাম্মানিক ভাতা দুই ধাপে দেড় হাজার টাকা বাড়ায়।
বাড়তি কাজের চাপে আশাদের এমনিতেই হিমশিম অবস্থা, তার উপর গত বছর থেকে করোনা অতিমারীর বিপুল কাজের ভার আশাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় কোনরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই। আশাকর্মীদের বিক্ষোভের আগুন আবার জ্বলে ওঠে। শুরু হয় ধর্মঘট, কর্মবিরতি, জেলায় জেলায় বিক্ষোভ প্রদর্শন। রাজ্য সরকার এই বিক্ষোভ শান্ত করার জন্য আশাকর্মীদের কিছু কিছু দাবি মেনে নেয়। দীর্ঘদিনের দাবি মেনে বোনাস ২০০০ টাকা, অবসর ভাতা তিন লক্ষ টাকা, এবং সাম্মানিক ভাতা ১০০০ টাকা বাড়ানো হয়। কিন্তু সরকারি বঞ্চনা শেষ হয়ে যায়নি। কোচবিহারের এক আশাকর্মীর বক্তব্য “আমরা মরে বেঁচে আছি এত কাজের চাপ। কিন্তু আয় মাত্র ৬-৭ হাজার টাকা। জিনিসপত্রের এত দাম, সংসার চালাতে পারছি না। সরকারকে বেতন বাড়াতে বললেই বলে টাকা নেই। অথচ কোটি কোটি টাকা দুর্নীতিগ্রস্তদের বিলাস ব্যসনে ব্যয় হচ্ছে। এত বড় অতিমারীতে সবাই যখন ঘরে আছে তখন আমরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে মরছি, কিন্তু আমাদের বেলায় টাকা নেই।”
নিজেদের বাঁচার লড়াই করতে হয় বলে আশারাও এখন দেশের খবর রাখে। খবরের কাগজ পড়ে, টিভির খবর দ্যাখে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক আশাকর্মী বললেন “সারদা, রোজভ্যালিতে আমাদের সঞ্চিত টাকা গেছে। এখন দেখছি সরকারি মদতে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুঠ করে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে কিছু লোক।”
মালদার এক আশাকর্মীর বাপের বাড়ি মুর্শিদাবাদে. ফোনে বলছিলেন “মা করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নদিন ভর্তি ছিলেন। এক মাস হয়ে গেল এত কাজের চাপ, একবার দেখা করতে যেতে পারিনি। আত্মীয়স্বজন, শ্রাদ্ধ, বিয়েবাড়ি, সংসার — কিছুই নেই আমাদের। একদিন নিশ্চিন্তে কোথাও যেতে পারি না। রাত আটটায় ফোন করে পরের দিন সকাল দশটার মধ্যে বাড়ি বাড়ি সার্ভে করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়।”
হাওড়ার এক আশাকর্মী বলছিলেন “কি রাজ্য, কি কেন্দ্রীয় সরকার, কেউই আমাদের খোঁজ রাখে না। যতদিন আমাদের পরিশ্রম করার ক্ষমতা থাকবে ততদিন ঘাড় ধরে সমস্ত কাজ করিয়ে নেওয়া হবে। আর আমাদের কাজে সুনাম হবে কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারগুলোর।”
বাঁকুড়ার এক আশাকর্মীকে বিধানসভা ভোটের আগে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম “কাকে ভোট দেবে?” উত্তরে সে জবাব দিল “কাউকে না”। কেন জিজ্ঞাসা করায় বলল “ভোট দিয়ে কী হবে? ২০০৮ সাল থেকে আশাকর্মীর কাজ করছি। অনেক সরকার দেখলাম কেন্দ্রে, রাজ্যে। কিন্তু কোনও সরকারই আশাদের কথা ভাবে না। সরকার বদলায়, কিন্তু আশাকর্মীদের অবস্থা বদলায় না। আমাদের দাবি আমাদের লড়াই করেই অর্জন করতে হবে।”
নিবন্ধকার পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের সহ-সভানেত্রী , মতামত ব্যক্তিগত।
ছবি উইকিপিডিয়া ও আমেরিকান ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন ওয়েবসাইটের সৌজন্যে

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply