রমজান মাস শুরু হল। সংযমের মাস। দেশে দেশে রোজা রাখতে শুরু করেছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। তবে বহু প্যালেস্তিনীয়ের বাধ্যতামূলক উপবাস শুরু হয়েছে ঢের আগেই। কারণ খাবার নেই। সমস্ত গাজায় ভয়ানক খাদ্যসংকট। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গাজার এক চতুর্থাংশ মানুষ এই মুহূর্তে দুর্ভিক্ষের কবলে, প্রতি ছজন শিশুর মধ্যে একজন তীব্র অপুষ্টির শিকার।
বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পাঠানো খাদ্যসামগ্রী আটকে রয়েছে সীমান্তে, গাজায় ঢুকতে পারছে না। প্যালেস্তাইনের নাগরিকদের কাছে খাদ্য, পানীয়, ওষুধ পৌঁছনোর পথ আটকে রাখছে ইজরায়েল। ইজরায়েলি চেক পয়েন্টে ঘন্টার পর ঘন্টা খাদ্যসামগ্রীবাহী ট্রাকগুলিকে আটকে রাখা, ত্রাণ নিয়ে যাওয়া কর্মীদের হেনস্থা, খাদ্যসামগ্রী লুঠ – কোনোকিছুই বাদ রাখছে না তারা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
শুধু তাই নয়, এই খাবারের জন্যে হাহাকারকে কাজে লাগিয়ে তারা নামিয়ে আনছে প্রাণঘাতী আক্রমণ। কিছুদিন আগেই ইজরায়েলি সেনার গুলিতে মারা গিয়েছেন ত্রাণের জন্য অপেক্ষারত ১১৮ জন প্যালেস্তিনীয়, আহতের সংখ্যা সাড়ে সাতশোর বেশি। সেদিনও ময়দার বস্তা নিয়ে ট্রাক আসবে বলে পথের উপর ভিড় করেছিলেন কাতারে কাতারে মানুষ। দেড় ঘন্টা ট্রাকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। পরিবর্তে এসে উপস্থিত হয় ইজরায়েলি ট্যাঙ্ক। আচমকা গুলিবর্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বহু মানুষ। লুটিয়ে পড়া আহত, নিহত প্যালেস্তিনীয়দের উপর দিয়েই এগিয়ে যায় ট্যাঙ্ক। যে প্রত্যক্ষদর্শীরা জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছেন, তাঁরা ভবিষ্যতে আবার ত্রাণ নিতে যেতে হবে ভেবেই ভয় পাচ্ছেন।
একই কায়দায় আরও দুটি আক্রমণের ঘটনা ঘটে তার পরপরই, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাধারণ প্যালেস্তিনীয়দের হত্যা করার জন্য এই অভিনব অমানবিক কৌশল ব্যবহার করছে ইজরায়েল। ক্রমাগত টহল দিয়ে দিয়ে এখানে ওখানে একজন-দুজন করে মারার চেয়ে খাবারের আশায় ভিড় জমানো অনেক মানুষকে একসাথে মেরে ফেলা সুবিধাজনক বইকি।
রমজান মাসে যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, ও মিশরের মধ্যস্থতায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার একটি প্রস্তাবে রাজি হয় – হামাসের হাতে বন্দি সমস্ত ইজরায়েলি নারী ও শিশুকে ছেড়ে দেবার শর্তে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। অর্থাৎ ছয় সপ্তাহ পরে ইজরায়েলের ধ্বংসলীলা পুনরায় শুরু হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানায় এবং এই প্রস্তাবে নেতানিয়াহুকে রাজি করানোর কৃতিত্ব দাবি করতেও ভোলেনি। হামাস সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তারা চায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
ইতিমধ্যে রমজানের আগের সন্ধ্যায় আল আকসা মসজিদে প্রার্থনার জন্য ভিড় জমানো দর্শনার্থীদের ব্যাটনের বাড়ি মেরে ছত্রভঙ্গ করেছে ইজরায়েলি সেনা। রমজানের প্রথম সন্ধ্যায় ইজরায়েলি বিমানহানায় মারা গিয়েছেন অন্তত তিনজন। রাফাতে পরিকল্পিত আক্রমণের কথা ইজরায়েল জানিয়েছে অনেকদিন আগেই। কাজেই রমজান মাসে শান্তির আশা এখনো দুরাশাই। উপরন্তু রমজানের গোড়াতেই আল আকসা মসজিদে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের অধিবাসী প্যালেস্তিনীয়দের প্রবেশাধিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে ইজরায়েল। কেবলমাত্র ৫৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ, পঞ্চাশের বেশি বয়সী মহিলা এবং দশ বছরের কমবয়সী শিশুরাই মসজিদে ঢুকতে পারবে এবং সমস্ত মুসলিম দর্শনার্থীর কাছে ইজরায়েলের ইস্যু করা বিশেষ পরিচয়পত্র থাকতে হবে।
এই রমজানে তাই ইফতারের আয়োজন নেই, প্রার্থনাই সম্বল গাজার প্যালেস্তিনীয়দের। উত্তর গাজার তিন চতুর্থাংশ বসতবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাটিতে মিশে গেছে অন্তত সাড়ে তিনশো স্কুল। শেষ বিশ্ববিদ্যালয়টাও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জানুয়ারি মাসে। হাসপাতালগুলোর উপর নামিয়ে আনা হয়েছে নজিরবিহীন আক্রমণ। গাজার অভুক্ত মানুষের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য স্বাস্থ্যকর্মীও। রেড ক্রস, রেড ক্রেসেন্টের মত সংস্থার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যেও অনেকে ইজরায়েলি আক্রমণে নিহত।
পঁচাত্তর বছর ধরে প্যালেস্তিনীয় উদ্বাস্তুদের সাহায্যার্থে কাজ করে চলেছে সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের UNRWA নামক শাখা সংস্থা। তাদের ১২ জন কর্মীর বিরুদ্ধে ৭ অক্টোবরের ঘটনায় হামাসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে এই সংস্থাটিকেও বিকল করার চেষ্টা করেছে ইজরায়েল। তদন্তের সময় ইজরায়েল কিন্তু এই অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। অথচ অভিযোগ আসামাত্র UNRWA-র অর্থ সরবরাহ বন্ধ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অধিকাংশ প্রথম বিশ্বের দেশ। তবে সম্প্রতি সুইডেন ও কানাডা পুনরায় অর্থ সরবরাহ চালু করেছে।
প্যালেস্তিনীয়দের সপক্ষে সরব কানাডিয়ান মুসলিম জাতীয় পরিষদ রমজান মাসকে ব্যবহার করছে যুদ্ধবিরতির দাবি জোরদার করতে। গাজাতে আশু যুদ্ধবিরতির আহ্বান, ইজরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা, ইজরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নিন্দা প্রভৃতি পাঁচটি দাবিতে সরব হয়ে রাজনীতিকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে তারা। যেসব জনপ্রতিনিধি জনসমক্ষে এই দাবিগুলিকে সমর্থন করবেন না, রমজান উপলক্ষে আয়োজিত কোনো জমায়েতে তাঁদের বলতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরিষদ সদস্যরা।
রমজান মাসের শুরুতে গাজার মানুষের দুর্দশা স্মরণ করে বক্তব্য রেখেছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনও। কিন্তু মুশকিল হল, ইজরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে গলা ফাটিয়ে তাদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার ব্যাপারে এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অবস্থান নিয়ে এসেছেন বাইডেন, যে তাঁর এই সমবেদনাকে কুমীরের কান্না ছাড়া আর কিছু ভাবা অতি বড় মূর্খের পক্ষেও অসম্ভব। ৭ অক্টোবরের পর থেকে যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধনিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিনটি সুপারিশ রুখে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা জন কির্বি তাঁর বক্তব্যে বারবার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তাঁরা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে নন। কেবলমাত্র হামাসের হাতে বন্দি ইজরায়েলিদের উদ্ধারের স্বার্থে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পক্ষে। এও বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সাম্প্রতিককালে, বিশেষত ত্রাণপ্রার্থীদের হত্যার ঘটনার পর, গাজার দুর্দশা নিয়ে ঘনঘন উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ইজরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অকুণ্ঠ এবং নিঃশর্ত সমর্থন প্রকাশ করতে বাইডেন তাঁর একবারও ভোলেননি। সুতরাং দরাজ দক্ষিণ হস্তে ইজরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ আর কুণ্ঠিত বাম হস্তে গাজাকে ময়দা সরবরাহ করার নাটকটুকুই শুধু মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে।
রহমতের মাসে গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্যে বোমার শব্দ এবং বিশ্বাসীর জন্যে আছে আল জাজিরার ওয়েবসাইটে একটি বিশেষ বিভাগ – গাজার নিহত শিশুরা। ০, ১, ২…১৬, ১৭… বয়স ধরে ধরে অসংখ্য নামের তালিকা রয়েছে সেখানে (এই সাংবাদিকতাকে কুর্নিশ)। স্ক্রল করে করে তল পাওয়া যায় না। যখন যায়, তখন জানা যায় এ কেবল সরকারি হিসাবে নিহত শিশুদের অর্ধেকের নাম।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








