একটা সাংবাদিক সম্মেলন করার জন্য পুরো ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ভাড়া করে এমন দক্ষযজ্ঞ বাংলার রাজনীতি কখনো দেখেনি। ব্রিগেডে মিটিং মানেই তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকে। এই তৃণমূল কংগ্রেসই ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে ২১ জুলাই শহিদ দিবসের সমাবেশ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে করেছিল। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের ডাকে বিজেপিবিরোধী ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ফ্রন্টের মিটিং হয়েছিল এই মাঠেই। এসেছিলেন দেশের তাবড় বিরোধী নেতারা। ব্রিগেডের কৌলীন্যের অনেকে কাহিনি রয়েছে। কিন্তু সেই কৌলীন্যকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিল গত রবিবারের (১০ মার্চ ২০২৪) তৃণমূলের জনগর্জন সমাবেশ। ব্রিগেডের তুলনায় জনগণকে তো দেখাই গেল না। রাজনৈতিক বার্তার নিরিখেও বড় জোলো দেখালো মমতা ব্যানার্জির মঞ্চ।

লোকসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করে মমতা রাজ্যের ও দেশের মানুষকে একটা কড়া বার্তা দেবেন, দিশা দেখাবেন নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে – এমনটাই আশা ছিল। অনেকে বলতেই পারেন, এমন আশাও ছিল! যে উদ্যমে বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়া জোটের উত্থান হয়েছিল এবং যে দ্রুত গতিতে সেই জোটের পতন পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেল, তাতে এমন আশা না করাই হয়ত উচিত ছিল। কিন্তু তবুও লোকসভা নির্বাচনের আগে শীর্ষ নেতৃত্ব অন্তত দলের নেতা-কর্মীদের কাছে একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেবেন, এমনটা ভাবা অন্যায় নয়। কিন্তু অভিষেক ব্যানার্জিই হোক বা মমতা – দুজনেই যেন বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করলেন!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পুরো ব্রিগেড মিটিংয়ের একটাই সুর – মোদী সরকার বাংলাকে বঞ্চিত করেছে। একশো দিনের কাজের টাকা দেয়নি, আবাস যোজনার টাকা দেয়নি। কাজেই বিজেপিকে ভোট না দিয়ে তৃণমূলকে ভোট দিন। নয়ত ‘আপনার টাকা আনবে কে’ বা ‘আপনার জন্য দিল্লিতে গলা তুলে কথা বলবে কে?’ এই হল পুরো মিটিংয়ের মোদ্দা কথা।

দেশের কী বিপদ, সাম্প্রদায়িকতা বড় বিপদ কিনা, ভারতের সাংবিধানিক চরিত্র বদলে দেওয়ার বিপদ দেখা দিচ্ছে কিনা, অর্থনৈতিকভাবে দেশ কোন বিপদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে; দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, কর্মসংস্থানের কী হাল – এর কোনোটাই হয় আদৌ এল না মমতা-অভিষেকের ভাষণে, নয়ত ১০০ দিনের কাজ আর আবাস যোজনাকে ছাপিয়ে সামনে আসতে পারল না। তাও আবার আবাস যোজনা বা ১০০ দিনের কাজের দুর্নীতির জন্য, বা তার তদন্ত করে তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে না পারার জন্যই যে টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র – তা প্রায় এড়িয়েই গেলেন মমতা-অভিষেক। শিশুসুলভ যুক্তি দিলেন যে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তো টাকাই দেয়নি, তাহলে দুর্নীতি হল কোথায়? তার আগে যে দুর্নীতি হয়েছে সে প্রসঙ্গ কৌশলে পিছনে রাখলেন। দেশের অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেস এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী প্রধান ইস্যু বলতে খুঁজে পেল শুধু বাংলার বঞ্চনা!

এর জন্য অবশ্য তৃণমূলকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। তৃণমূল নেত্রী খুব ভাল করে জানেন, এবারে যদি বিজেপি ১৮-র বেশি আসন নিয়ে চলে যায়, তাঁর শক্তি আরও কমে যাবে দিল্লিতে। সুতরাং নিজের ঘর গোছাও, দেশ ও দশের কথা পরে ভাবা যাবে। ২০১৯ সালে নিজের ঘর গোছানোর চিন্তা অনেক পরে এসেছিল মমতার মনে। ততক্ষণে ব্রিগেডে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার সভা, অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর সভা করে ফেলেছিলেন তিনি। এবার তাই আগে থেকেই সতর্ক। যে ইস্যুতে তাঁর মূল ভোটব্যাঙ্কের চিঁড়ে ভিজবে তা নিয়েই প্রচার করা ভাল।

সেই কারণেই তিনি বাম-কংগ্রেসের কথা মুখেই আনলেন না। যেন বাংলায় তৃণমূল ও বিজেপি – এই দুটোই রাজনৈতিক দল, লড়াই দ্বিমুখী। আসলে মমতা তেমনটাই চান। মেরুকরণের লড়াইয়ে তৃণমূলের সুবিধা। বাম-কংগ্রেসকে কোনো শক্তি বলেই তিনি মনে করেন না। তাদের আক্রমণ না করে, নাম পর্যন্ত উল্লেখ না করে মমতা সেটাই আবার বুঝিয়ে দিলেন।

না পিসি, না ভাইপো – কারোর মনই অবশ্য ইস্যুতে ছিল না। সবার মত তাঁদের মনও ছিল র‍্যাম্পে, আর মন ছিল প্রার্থী তালিকা প্রকাশে চমক দেওয়ায়। মমতার থেকে অভিষেকের হাতে দলের রাশ তুলে দেওয়ার পর্ব যে চলছে, তারই একটা নমুনা রবিবারের ব্রিগেড দেখল। চমকই যার মূল কথা।

তাই প্রথা মত মন্দিরে পুজো দিয়ে, ফুল-মালা-প্রসাদ মাথায় ঠেকিয়ে, পাঁজি দেখে শুক্রবারের দুপুরে কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় মমতার বাড়ি থেকে নয়, ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হল। একে একে র‍্যাম্পে হাঁটলেন প্রার্থীরা। হাত নাড়লেন ব্রিগেডের জমায়েতের তুলনায় গুটিকয়েক সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে। একজনই চমকে দিলেন অনেককে – ইউসুফ পাঠান। বাকি সব গড়পড়তা, জানা বা চেনা প্রার্থী। মমতার কাঁধে ভর দিয়ে অনেকে জিতে গেলেও ধারে ভারে অনেকেই দাগ কাটতে পারবেন না রাজনৈতিক প্রার্থী হিসাবে।

ব্যাস। ওখানেই শোয়ের সমাপ্তি।

কাজেই দেশ উদ্ধার, মোদীর পতন, বিজেপির বিনাশ, কেন্দ্রে বিজেপিমুক্ত সরকার – ওসব নিয়ে অন্যরা ভাবতে চায়, ভাবুক। আপাতত আপনি বাঁচলে তারপর বাপের নাম নেওয়া যাবে।

ইডি তো আর সেনাপতিকে ডাকছে না বা তাঁকে গ্রেফতার করবে বলে তোড়জোড় করছে না। যা হওয়ার সন্দেশখালির শাহজাহানের হয়েছে। তাকে নিয়ে সিবিআই যা করার করুক। আবার ‘শান্তিনিকেতন’-এ ইডি-সিবিআইয়ের গাড়ি না পৌঁছলেই হল।

বাকিটা জোলো ব্রিগেডের পথেই চলুক। ১৮-র বেশি আসন যেন ওদিকে না যায়, এদিকে ২২ থাকুক বা ২৪।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.