বখতিয়ার আবিদ চৌধুরী

বহুকাল আগে সুপ্রিয় চৌধুরীর লেখা দ্রোহজ উপন্যাসটি পড়েছিলাম। উপজীব্য ছিল নকশালবাড়ি আন্দোলন। সেই উপন্যাসের একটি অংশ ছিল এমন ‘কলকাতা শহরতলির একটি স্কুলের একদল ছাত্র নিজেদের স্কুলভবনকে দুর্ভেদ্য এক ঘাঁটিতে রূপান্তর করে। একদিন সে ঘাঁটি পুলিশের তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হয়। চারদিক থেকে যখন পুলিস বৃষ্টির মতো গুলি করছিল, তখন স্কুলের কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রতিবারের চ্যাম্পিয়ন, নজরুল ভক্ত তন্ময় নামের চরিত্রটি আবৃত্তি করছিল,

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

‘পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যূহ?
উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ’?

লেখক এই চরিত্রের বর্ণনায় বলছেন, ‘তুখোড় মেধাবী, জীবনে একটি পিঁপড়ে না মারা এই ছেলেও ঝাঁপ দিয়েছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনের আগুনে। হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র’।

উপন্যাসের এই অংশের সাথে অতি সম্প্রতি সংঘটিত বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত বহু শিক্ষার্থী মিলে যায়। পেশার সূত্রে এমন অনেক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎ পেয়েছি যারা এর আগে কখনো মিছিলেই হাঁটেনি। তারুণ্যের সময়টিতে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে সহজাত প্রবণতা থাকে, তারই তাড়নায় জীবনের পরোয়া না করে স্রেফ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই ছাত্রছাত্রীরা।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথাই ধরা যাক। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরাই এখানে পড়াশোনা করে। তথাকথিত মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা, ক্যাম্পাসে কোনোরকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ছাত্র সংগঠন প্রবেশের বিরুদ্ধে সকলে এককাট্টা হয়ে যাওয়ার চিত্রটিই স্বাভাবিক এখানে। এতদিন ধরে তাই হয়ে আসছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলির তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটু কড়াকড়ি বেশি। কতৃপক্ষের নজরদারিও বেশ আঁটোসাটো। তাই এখানকার শিক্ষার্থীদের সাতে পাঁচে থাকার বিশেষ সুযোগ ছিল না।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য দেখা গেল। সারা দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সম্মুখে থেকে লড়াই করেছে, অকাতরে শহিদ হয়েছে। দেশবাসী অবাক হয়ে দেখেছে লড়াইয়ের ময়দানে কীভাবে তারা মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে। যারা একসময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আড়ালে আবডালে নানা ঠাট্টা করত, তারাও কুর্নিশ জানাতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের উপর যখনই বৈষম্য আর দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, তখন ছাত্রসমাজ থেকেই প্রতিরোধের ডাক এসেছে। আর তাদের শান্ত করতে আলোচনার টেবিলের বদলে লাঠি, গুলি আর কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে কোনো শাসক বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পেরেছে, কিন্তু পরবর্তীকালে দ্বিগুণ শক্তিতে আবার এগিয়ে এসেছে তারা। কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ত এই জায়গায় আসত না, এত প্রাণও অকালে ঝরে যেত না, যদি সরকার অতি আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর হয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ জ্ঞান না করত। তাদের সাথে আলোচনায় বসার কোনো চেষ্টাই সরকার করল না।

আন্দোলনের শুরু থেকে ছাত্রদের যেভাবে রাজাকার, জামাত, শিবির ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সঙ্গে বারবার তুলনা করা হয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায় কি শুধুই আওয়ামী লীগের সম্পত্তি? আপামর জনগণের নয়? কারণ যে সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধিত্ব করে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের থেকে এমন কোনো বক্তব্য আসেনি যাতে প্রমাণিত হয় তারা মহান মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবে খাটো করে দেখেছে। বাংলাদেশের পতাকা মাথায় বেঁধে, শরীরে জড়িয়ে যে ছাত্ররা রাজপথে নেমে এসেছে তারা কি জানত না, এই পতাকা তাদের রক্ষাকবচ হতে পারবে না? তাদের উপর ছাত্রলীগ, পুলিশের আক্রমণ নেমে আসবে? অবশ্যই জানত। তারা এই পতাকা সঙ্গে রেখেছিল দেশকে হৃদয়ে ধারণ করে বলেই।

ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দিকে সশস্ত্রভাবে এগিয়ে দেওয়া হল। তারপর যখন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে ছাত্রলীগ বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলো ছাড়তে বাধ্য হল, তখন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পুলিস ও আধাসামরিক বাহিনী বিজিবিকে আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ তো বটেই, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর তারা যেভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে তা একুশ শতকে বিরলতম উদাহরণ। একটু স্পষ্ট করে বললে, এই শতাব্দীতে এটাই প্রথম উদাহরণ হয়ে থাকবে পৃথিবীতে।

আরো পড়ুন এটা বাংলাদেশ না প্যালেস্তাইন?

কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিসের গুলিতে মৃত্যুবরণ করা রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ এই আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিল। আবু সাঈদ যেভাবে দুহাত প্রসারিত করে দেশের মানচিত্রের মত বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিল পুলিসের রাইফেলের সামনে, তাতে একথা তো অনুমান করাই যায়, যে সাঈদের বিশ্বাস ছিল তার দেশের পুলিস তার বুকে গুলি করবে না। কিন্তু তার বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করে খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি ছুঁড়েছে পুলিস।

দেশের এক শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী, কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন এবং পরবর্তীকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (২৭ জুলাই, ২০২৪ পর্যন্ত) অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা ২০৯, আহত হাজারের বেশি। এই সংখ্যা নিয়ে বহু কথা বলার অবকাশ থেকে যায়। আহত অনেকেই চিরদিনের মত পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, অন্ধ হওয়ার পথে অনেকেই। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, সাধারণ পথচারী, নিজের ঘরে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ১১ বছরের শিশু – সকলেই আছেন এই মৃত্যুমিছিলে। পুলিসের গুলিতে আহত অনেকেই বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে তাঁদের খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা এবং সোশাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়ার আগে পর্যন্ত অনেক ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিস আন্দোলনকারীদের উপর সরাসরি গুলি চালাচ্ছে।

কিন্তু আন্দোলনকারীদের প্রাণঘাতী কোনো অস্ত্র বহন করতে দেখা যায়নি। তবুও কেন পুলিসকে এভাবে নির্বিচারে গুলি চালাতে হয়েছে এবং কারা সেই নির্দেশ দিয়েছে – সে বিষয়ে স্পষ্ট করে পুলিস কিছু বলতে পারেনি। পুলিসের যে সদস্যরা গুলি চালিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যা করেছে এবং যারা নির্দেশ দিয়েছে, তাদের কি আদৌ বিচারের মুখোমুখি করা হবে? অদূর ভবিষ্যতেই বা সেই সম্ভাবনা কতটুকু? এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদের যদি বিচারের মুখোমুখি না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে – এটাই স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত শুধুই আন্দোলনকারী সন্দেহে গণগ্রেফতার চলছে, তাদের দমন করাই মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

গত ১৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের জন্য এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করা হলো’। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান এই কমিশনের একমাত্র সদস্য। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিচারবিভাগীয় কমিশন কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গত ১৬ জুলাই হামলা এবং সহিংসতায় ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করবে। কিন্তু ওই ছয়জনের বাইরে অন্যান্য মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত বিষয়ে কমিশন প্রধান বলেছেন, ‘এই বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্যই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। এখন কবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় আর তা কতটুকু স্বচ্ছতা ধরে রাখতে পারে তা দেখার।

নিবন্ধকার সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.