একেই মূলধারার সংবাদমাধ্যম বিজেপিকে প্রায় জিতিয়েই দিয়েছে এবারের লোকসভা নির্বাচনে। তার উপর আয়কর আদায়ের নামে প্রথমে কংগ্রেসের ১৩৫ কোটি টাকা কেড়ে নিয়ে এবং পরে ১৮২৩.০৮ কোটি টাকা জমা দেওয়ার নোটিস পাঠিয়ে ব্যাপক চাপ তৈরি করা হয়েছে। এই দুইয়ের মাঝে ফেঁসে গিয়ে ছন্নছাড়া অবস্থা কংগ্রেস পার্টির।
কয়েক মাস আগে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে চার রাজ্যেই কংগ্রেস সরকার হয়ে যাবে ভেবে ইন্ডিয়া জোটের বারোটা অনেক আগেই বাজিয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। শুরুটা ভাল করেও দাদাগিরি করার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়া জোটের দফারফা করে দিয়েছে রাহুল গান্ধীর দল। অনেকে বলতেই পারেন এতে শাপে বর হয়েছে। কারণ এই সুযোগে জল ঘোলা করে নীতীশ কুমার থেকে মমতা ব্যানার্জি যে যার মত করে নিজের ঘর গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এঁরা কেউ মন থেকে ইন্ডিয়া জোট চাননি। তবু সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে উত্তরপ্রদেশে জোট করে পরিস্থিতি সহজ করার একটা চেষ্টা হয়েছিল, আপের সঙ্গেও আসন সমঝোতা হয়েছে। বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বামেদের সঙ্গে জোট দেরিতে হলেও সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে না হোক, বামেদের সঙ্গে জোট করার শেষ চেষ্টাটাও জলাঞ্জলি দিয়েছেন কংগ্রেস নেতারা। মহারাষ্ট্রেও উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং এনসিপির সঙ্গে জোট ভেঙে গেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাজনীতি মানুষের মনে ছাপ ফেলার খেলা। যেখানে বিজেপির প্রার্থী তালিকা শুরুই হয় নরেন্দ্র মোদীকে বারাণসীর প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে, সেখানে উল্টোদিকে জল্পনা চলতে থাকে রাহুল গান্ধী এবারও আমেথি থেকে লড়বেন না ওয়ায়নাড় থেকে, নাকি দুটি আসনেই মনোনয়ন জমা দেবেন। যদিও বা ওয়ায়নাড়ের প্রার্থী হিসাবে রাহুলের নাম ঘোষণা হয়, আমেথি ও রায়বেরিলি আসন নিয়ে জল্পনার অবসান হয় না। অথচ এই দুটি আসনের সঙ্গে গান্ধী পরিবার জুড়ে রয়েছে বহু দশক ধরে। এবার সোনিয়া গান্ধী লোকসভা ভোটে লড়বেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর বদলে কে লড়বেন তা নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে কেন দ্বিধাগ্রস্ত হবে কংগ্রেস?
বিজেপির অন্যতম শক্তি হল, খারাপ কাজও তারা বীরদর্পে করে এবং বারবার করে। রাজ্যে রাজ্যে সরকার ভাঙার খেলাই হোক আর নির্বাচনে প্রচার – কোনো ক্ষেত্রেই কিন্তু নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহরা পিছিয়ে থেকে শুরু করেন না। সব কিছুতেই তাঁরা সদর্পে এগিয়ে যান। যেটুকু দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে, তা নিজেদের পোষা মিডিয়া বা সোশাল মিডিয়ার প্রচারে ঢেকে দেন। একবার অসফল হলেও হাল ছাড়েন না। ২০১৪ সালের পরে এটাই শাসক দলের প্রবণতা।
কী সুচারুভাবে তারা ব্যাঙ্কে রাখা কংগ্রেসের কোটি কোটি টাকা আটকে দিয়েছে! বিজেপি দল নয়, একটি সরকারি দফতর এই পদক্ষেপ নিয়েছে, ফলে কেউ খুঁত ধরতে পারবে না। আয়কর দফতর প্রায় ৩০ বছরের পুরনো বকেয়া টাকা আদায় করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ঘুরে কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ফ্রিজ করে দিল। আয়কর দফতর বলছে ফ্রিজ নয়, লিয়েন। অর্থাৎ অনাদায়ী কর বাবদ ১১৫ কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা যাবে না। কংগ্রেসের বক্তব্য, তাদের অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই এই মুহূর্তে। আয়কর বিভাগের এই পদক্ষেপ অভিসন্ধিমূলক হতেই পারে, কিন্তু আয়কর আইন মেনেই নোটিস, আইন-আদালত, বকেয়া টাকার উপর সুদ এবং শেষে টাকা আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমন নয় যে কংগ্রেস আদালতে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আদালত কংগ্রেসের পক্ষে রায় না দিলে কী করা যাবে? এসব হচ্ছে কিন্তু ঠিক ভোটের মুখেই। এখন কংগ্রেস খাবি খাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারের জন্য টাকা জোগাড় করতে গিয়ে।
এখানেই শেষ নয়। মহারাষ্ট্রের রামটেক সংরক্ষিত আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রশ্মী বারভের বর্ণ সংক্রান্ত শংসাপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তি দাবি করেন বারভের শংসাপত্র নাকি সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়নি। সেই দাবির ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায় বিভাগের কাস্ট সার্টিফিকেট স্ক্রুটিনি কমিটি তাঁর শংসাপত্র বাতিল করে দিয়েছে। বম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি কংগ্রেসের। এখন নির্বাচন কমিশনও যদি বারভের শংসাপত্র বাতিল করে, তাহলে ওই আসনে কংগ্রেসের প্রতীকে কেউ লড়তে পারবেন কিনা তা অনিশ্চিত।
রাহুল জোরদার দ্বিতীয় দফায় জোর ভারত ন্যায় যাত্রা করলেন। এতে নিজের ভাবমূর্তি ঠিক করার পাশাপাশি অবশ্যই কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহিত করা হল। যাত্রার মাঝেই এবারের নির্বাচনে পাঁচটি ন্যায়ের ঘোষণা করলেন অনেকটা ইশতেহারের মত করেই। কিন্তু তারপর দিল্লিতে ফিরে প্রার্থী বাছাই, জোটসঙ্গীদের সঙ্গে রফা করতে গিয়ে যাত্রার জোশে নিজেই জল ঢেলে দিলেন। মালদা-মুর্শিদাবাদের যে মুসলমান যুবকরা রাহুল গান্ধীর কাছে ন্যায় চাইলেন, তাঁরা কংগ্রেসের প্রার্থী ও জোটসঙ্গী বাছাই নিয়ে টালবাহানা দেখে কি সত্যিই কংগ্রেসের উপর শেষপর্যন্ত ভরসা রাখতে পারবেন?
অন্যদিকে উধমপুর আসন থেকে কাঠুয়া গণধর্ষণ ও হত্যার সমর্থনকারী চৌধুরী লাল সিংকে প্রার্থী করে বিপাকে পড়েছে কংগ্রেস। বিজেপি ২০১৮ সালে লাল সিংকে দল থেকে বের করে দিয়েছিল ওই ঘটনা সমর্থন করার জন্যই। তাঁকেই কেন প্রার্থী করতে হল, তা নিয়ে ধন্ধ থেকেই যায়। আবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিরূপ মন্তব্য করা সুনীল শর্মাকে জয়পুরে প্রার্থী করেও পিছু হটতে হয়েছে কংগ্রেসকে। তাঁকে সরিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী প্রতাপ সিং কাছারিয়াসকে প্রার্থী করেছে দল।
বিজেপির অবস্থাও কিন্তু সুবিধাজনক নয়। ওড়িশাতে নবীন পট্টনায়কের বিজেডি এবং পাঞ্জাবে শিরোমণি অকালি দলের সঙ্গে জোট করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বিজেপিকে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে পবন সিংকে প্রার্থী করার পর তিনি নির্বাচনে লড়বেন না বলে পিছিয়ে এসেছেন। কর্ণাটকে দশজন বর্তমান সাংসদকে এবার আর টিকিট দেয়নি বিজেপি। তা নিয়ে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব তুঙ্গে। ছেলেকে দল টিকিট না দিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাইকে টিকিট দিয়েছে বলে বিজেপি নেতা কেএস ঈশ্বরাপ্পা নির্দল হিসাবে লড়বেন বলে হুমকি দিচ্ছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডিভি সদানন্দ গৌড়া এবার প্রার্থী হতে না পেরে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। তবুও দলীয় প্রার্থীদের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করিয়ে, সেই কথোপকথন প্রকাশ্যে এনে তা প্রচারের আলোয় রেখে এই সব ঝামেলা আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বিজেপি।
প্রায় দুশো লোকসভা আসনে যখন কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে মুখোমুখি লড়াই হবে, তখন বিরোধী আসনে বসা কংগ্রেসের ছন্নছাড়া ভাব ভোটারদের মনে কখনোই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বিজেপি যখন ‘মোদী কা গ্যারান্টি’ বলে প্রচারে নেমে পড়েছে, তখনো কংগ্রেস আক্রমণের বা প্রচারের অভিমুখ ঠিক করতে পারছে না।
দুবার যাত্রায় বেরিয়ে রাহুল যে হাততালি কুড়িয়ে এলেন, সেই হাত তো ইভিএমে পড়তে হবে। হাত চিহ্নে আঙুল না পড়লে আর কতদিন অদৃশ্য শক্তির আশায় বসে থাকবেন রাহুল? কোন অদৃশ্য শক্তি মোদীকে সরিয়ে বিরোধীদের হাতে সরকার তুলে দেবে? আশার কথা, আজকের পরিস্থিতিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করার উপযোগিতা কংগ্রেস শুক্রবার বুঝতে পেরেছে। সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল স্বাক্ষরিত অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির এক চিঠিতে সমস্ত প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিকে শনিবার ও রবিবার সারা দেশের রাজ্য ও জেলা সদরে গণআন্দোলন সংগঠিত করতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থীদেরও নিজ নিজ এলাকায় প্রতিবাদে নামতে বলা হয়েছে, মশাল মিছিলের কথাও রয়েছে চিঠিতে।
যখন গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সংবাদমাধ্যম তাদের বিরুদ্ধে, তখন ব্যাপক আন্দোলন ছাড়া আর কোন রাস্তাই বা খোলা আছে কংগ্রেসের সামনে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








