আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে বিহারের ৪০টি আসনের ফলাফল। অনেক টালবাহানার পরে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলোর মধ্যে সেখানে আসন সমঝোতা সম্পূর্ণ হয়েছে। এই জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সিপিআইএমএল লিবারেশন দলের, যারা বিহারি লব্জে মালে বলেই বেশি পরিচিত। সেই দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নাগরিক ডট নেটকে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিহারের ইন্ডিয়া জোট তথা ভারতের ইতিহাসে ২০২৪ নির্বাচনের গুরুত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বললেন। নাগরিকের পক্ষে থেকে কথা বলেছেন অর্ক ভাদুড়ি।
আটের দশকের একদম শেষে, ১৯৮৯ সালে, বিহারের আরা লোকসভা আসনে জয়ী হয়েছিলেন সিপিআইএমএল লিবারেশনের তৎকালীন প্রকাশ্য সংগঠন ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্টের প্রার্থী রামেশ্বর প্রসাদ। তারপর এই প্রথম বিহার থেকে সংসদে লিবারেশনের সদস্য যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্য বামপন্থীরাও লড়াইয়ে আছেন। আপনি এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নিঃসন্দেহে বিহারের বামপন্থী আন্দোলন এবং আমাদের পার্টির জন্য গত কয়েকটি বছর নির্বাচনী রাজনীতির বিচারে বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। তবে এই ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি বা বিহারের মহাজোট – সবই পরিস্থিতির দাবি। তাই আমি বিষয়টিকে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দেখতে চাইছি। এবারের নির্বাচন হচ্ছে অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে। এমন সংকট ভারতীয় রাজনীতিতে খুবই কম এসেছে। আমরা এই নির্বাচনকে ২০০৪ বা ১৯৭৭ সালের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। আমার মনে হয়, এই নির্বাচনে আসল লড়াইটা লড়বেন জনগণ। পার্টি বা জোট – এগুলি সেই সংগ্রামের মাধ্যম। কিন্তু বিজেপিকে পরাস্ত করার এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের আসল কুশীলব এই দেশের জনগণ। তাঁরাই নির্ণায়ক ভূমিকায় রয়েছেন। আমাদের কাজ হল, জোটকে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা।
আমরা এই নির্বাচনকে ২০০৪ বা ১৯৭৭ সালের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। আমার মনে হয়, এই নির্বাচনে আসল লড়াইটা লড়বেন জনগণ।
বিহারে আসন বণ্টন নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হল। বিধানসভা নির্বাচনে আপনাদের দুর্দান্ত সাফল্য, দারুণ স্ট্রাইক রেট। সেই অনুযায়ী কি আসন পেলেন?
না, বামপন্থীদের যতগুলি আসনে লড়া উচিত ছিল, আমরা তা পাইনি। বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বিস্তর আসনে লড়েছিল, সেই তুলনায় তাদের স্ট্রাইক রেট ছিল অত্যন্ত কম। আমাদের দল ১৯টি আসনে লড়ে ১২টিতে জিতেছিল। আমরা বামপন্থীরা সবাই মিলে ২৯ আসনে লড়ে জিতেছিলাম ১৬টিতে। অথচ লোকসভায় কংগ্রেস লড়ছে নটি আসনে, আমরা বামপন্থীরা লড়ছি পাঁচটি আসনে। এটা ঠিক হয়নি। যা-ই হোক, বিজেপিকে হারাতে আমরা বদ্ধপরিকর। তার জন্য আমরাই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করলাম।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই। কংগ্রেসের ১৯ জন বিধায়কের মধ্যে দুজন দলত্যাগ করে বিজেপির হাত ধরেছেন। আরজেডির পাঁচজন বিধায়কও তাই করলেন। অথচ একজনও বামপন্থী বিধায়ক দলত্যাগ করেননি। আমাদের তরুণ বিধায়ক, দলিত যুব নেতা মনোজ মঞ্জিলকে মিথ্যা অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিধায়ক পদ বাতিল হয়েছে। সবমিলিয়ে আমরাই বিজেপির বিরুদ্ধে, এনডিএর বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ হিসাবে রাস্তায় আছি। আসন বণ্টনে সেই বাস্তবতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি।
পূর্ণিয়া আসন নিয়ে এখনো রীতিমত ডামাডোল চলছে। আরজেডি কিছুতেই কংগ্রেসকে আসনটি ছাড়তে নারাজ। অন্যদিকে পাপ্পু যাদব এই আসনে লড়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ইন্ডিয়া জোট প্রার্থী ঘোষণা করতেও দেরি করল। এগুলো কি বিজেপিকে সুবিধা করে দেবে না?
আমাদের দল বা সার্বিকভাবে বিহারের বামপন্থীরা যেভাবে এই অভূতপূর্ব সংকটজনক পরিস্থিতিকে অনুধাবন করতে পেরেছেন, অন্যদের সেক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। আঞ্চলিক দলগুলির অধিকাংশেরই আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে যে আচরণ, তা চলমান রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পশ্চিমবঙ্গে যেমন তৃণমূল কিছুতেই ইন্ডিয়া জোট করল না। বিহারেও পরিস্থিতি তেমন না হলেও খুব ভাল কিছু নয়। কংগ্রেসের আচরণও সমস্যাজনক। এইসব নিয়েই চলতে হবে। আবারও বলছি, অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি আমরা। দেশ বিপন্ন। সংবিধান বিপন্ন। এই অবস্থায় জোট করাটা বাধ্যবাধকতা। আমাদেরও বাধ্যবাধকতা, আরজেডি বা কংগ্রেসেরও তাই। আমাদের যা সাংগঠনিক শক্তি বা বিজেপির বিরোধিতায় যে রাজনৈতিক ভূমিকা, সেই অনুযায়ী আসন পাইনি। কিন্তু আমাদের প্রায়রিটি বিজেপিকে, এনডিএকে হারানো। এই রাজনৈতিক পরিপক্কতার অভাব আছে বিরোধী শিবিরে।
পাপ্পু যাদব যে শেষ পর্যন্ত কী করবেন, তা নিয়ে আমার রীতিমত সংশয় রয়েছে। মহাজোট প্রার্থী ঘোষণায় দেরি করায় খানিকটা সমস্যা তো হবেই। গোটা বিষয়টাই নির্ভর করছে জনগণের উপর। তাঁরা কতখানি লড়বেন, পরিবর্তন চাইবেন, তার উপরে অনেককিছু নির্ভর করছে।
তাহলে কি বিহারে লোকসভা নির্বাচনে জোট দুর্বল অবস্থায় আছে?
যে ধরনের আন্দোলনমুখী জোট দরকার ছিল, তা হয়নি। এটা দুর্বল জোট। বোঝাপড়ার বিস্তর অভাব রয়েছে। তবে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমার মনে হয় জোট সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে ছাপিয়ে যাবে জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং পরিস্থিতির চাহিদা। বিজেপি কড়া জবাব পেতে চলেছে বিহারে।
বিহারে আপনারা তিনটি আসনে লড়ছেন। তার মধ্যে কি আরা এবং কারাকাটে এগিয়ে থেকে শুরু করবেন?
আমি এভাবে বলতে চাই না। তিনটি আসনই অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আবার তিনটি আসনেই লড়াই কঠিন।
আরা আসনটির ইতিহাস আপনি জানেন। এখানে আমাদের পার্টির সুদীর্ঘ সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ১৯৮৯ সালে রামেশ্বর প্রসাদ এখান থেকে জয়ী হয়েছিলেন। সেইসময় এই অঞ্চলে লড়াইটা ছিল দলিতদের বুথে আনার। তাঁদের ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করার। ভোটে জেতার পরেই আমাদের গণভিত্তির উপর নৃশংস আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছিল। গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল। নয়ের দশকে আমরা লড়েছি রণবীর সেনার বিরুদ্ধে। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এখানে আমাদের দৃঢ় সংগঠন। গত লোকসভা নির্বাচনে (২০১৯) আমরা এই আসনে আরজেডির সমর্থনে লড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলাম।
আরা লোকসভা আসনের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভার পাঁচটিতেই মহাজোটের বিধায়ক আছেন। কারাকাটেও আমরা ভাল অবস্থায়। এই লোকসভার অন্তর্গত একটি বিধানসভাতেও গত নির্বাচনে এনডিএর কেউ জয়ী হননি। সকলেই মহাজোটের বিধায়ক। দেখা যাক কেমন ফল হয়।
নীতীশ কুমারের দুর্গ নালন্দায় কি লড়াই একটু কঠিন?
নালন্দায় নিঃসন্দেহে কঠিন লড়াই। তবে অসম্ভব কিছু নয়। হ্যাঁ, একথা ঠিক যে এই আসনটিকে বলা হয় জনতা দল ইউনাইটেডের তথা নীতীশ কুমারের গড়। ১৯৯৬ থেকে টানা জিতছে জেডিইউ। প্রথমে সমতা পার্টির টিকিটে জর্জ ফার্নান্ডেজ জিতেছেন। তারপর থেকে জেডিইউ। নীতিশ নিজে জিতেছেন। এমনকি ২০১৪ সালে যখন জেডিইউ খুব খারাপ ফল করল, তখনো আলাদা লড়ে তারা এই আসনে জিতেছিল।
কিন্তু যেটা মাথায় রাখা দরকার, নীতীশের ভাবমূর্তি ভীষণ নিম্নগামী। এতখানি খারাপ রাজনৈতিক ইমেজ তাঁর আগে কখনো হয়নি। জেডিইউয়ের সাধারণ সমর্থকরাও এই বারবার জোট পরিবর্তনে বিরক্ত।
আপনারা ঝাড়খণ্ডের কোডারমায় ইন্ডিয়া জোটের তরফে লড়ছেন। এই আসনে ২০১৪ সালে আপনাদের প্রার্থী দুর্দান্ত ফল করেছিলেন। জেল থেকে লড়ে আড়াই লক্ষাধিক ভোট পেয়ে দ্বিতীয়। ২০১৯ সালে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ ফল হল। এবার কী হবে?
কোডারমা আমাদের নিবিড় কাজের জায়গা। এই প্রথম আমরা জোট করে লড়ব, এর আগে চিরকাল একা লড়েছি৷ ২০১৪ তো বটেই, ২০০৯ সালেও আমরাই ছিলাম প্রধান বিরোধী শক্তি। গত লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আরজেডি নেত্রী অন্নপূর্ণা দেবী যাদব বিজেপিতে যোগ দিয়ে টিকিট পান। বাবুলাল মারান্ডি তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী হন। গোটা সমীকরণটাই ঘেঁটে যায়। আমাদের ভোট অনেকখানি কমে। এখন বাবুলাল বিজেপিতে। বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ।
যেটা মাথায় রাখা দরকার, নীতীশের ভাবমূর্তি ভীষণ নিম্নগামী। এতখানি খারাপ রাজনৈতিক ইমেজ তাঁর আগে কখনো হয়নি। জেডিইউয়ের সাধারণ সমর্থকরাও এই বারবার জোট পরিবর্তনে বিরক্ত।
আপনি বলছিলেন অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে এবার লোকসভা নির্বাচন হতে চলেছে। অনেকে বলছেন নির্বাচনের আগেই যা হচ্ছে, যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে বিরোধীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে নির্বাচনটাই প্রহসনে পরিণত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থাকছে।
নরেন্দ্র মোদী চাইছেন নির্বাচনটা একতরফা হোক। বাংলাদেশে ইদানীং যেমন ভোট হয়, বা পুতিনের রাশিয়ায়, ভারতেও তেমন নির্বাচন হোক। এই পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে হবে। সেই কারণেই তো এত ভিন্নতা নিয়েও জোট করার চেষ্টা। পরিস্থিতির দাবি। আগে আমরা, আমাদের দল, বামপন্থীরা আক্রান্ত হতাম। এখন সকলেই আক্রান্ত হচ্ছেন। আম আদমি পার্টি, কংগ্রেস – কেউ বাদ নেই। দুজন মুখ্যমন্ত্রী জেলে। এমন দুর্দিন ভারতের ইতিহাসে সত্যিই বিরল। এই বিশেষ পরিস্থিতির ডাকে সাড়া দিতে হবে। সেই অনুযায়ী লড়াই করতে হবে।
আরো পড়ুন হেমন্তের হাওয়ায় ভরসা পেতে পারেন বিজেপিবিরোধী মুখ্যমন্ত্রীরা
পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন কারণেই বামপন্থী আন্দোলন সাময়িক বিপাকে পড়ে গিয়েছে। রাজপথে থাকা, আন্দোলন গড়ে তোলা এবং প্রধান বিপদকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেই বামপন্থার পুনর্জাগরণ সম্ভব।
পশ্চিমবঙ্গে সাড়ে তিন দশক বামপন্থী সরকার ছিল। গত কয়েক বছরে সেখানে বামপন্থীরা নির্বাচনী বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ বিহারে বামপন্থার উত্থান ঘটছে। পাশাপাশি দুই রাজ্যের মধ্যে এই ফারাক কেন?
বিহারে আমরা গণতন্ত্রের প্রহরী হিসাবে কাজ করছি। আজ থেকে নয়, দীর্ঘদিন ধরে। আমরা একটা সময় বিধানসভায় শূন্য হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু রাজপথ ছাড়িনি। লাগাতার আন্দোলনে, সংগ্রামে ছিলাম। প্রধান শত্রু চিনতেও বিহারে ভুল হয়নি। ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে সংগ্রামটাই যে এই সময়ের প্রধান লড়াই, বিহার তা উপলব্ধি করেছে। আপনি বিহারে যে বামপন্থার উত্থান দেখছেন,সেটা কিন্তু নির্বাচনী উত্থান। নির্বাচন ছাড়াও বিহারে আমরা গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পাহারাদারের মত লড়ছি, এবং এই লড়াইটা লাগাতার। পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন কারণেই বামপন্থী আন্দোলন সাময়িক বিপাকে পড়ে গিয়েছে। রাজপথে থাকা, আন্দোলন গড়ে তোলা এবং প্রধান বিপদকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেই বামপন্থার পুনর্জাগরণ সম্ভব।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








