গত সপ্তাহে নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে খারিজ করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের মতে, এই বন্ড নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। নির্বাচনী বন্ড বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার এবং তথ্য জানার অধিকারের পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ কেবল বন্ডকে অসাংবিধানিকই বলেনি, নির্বাচনী বন্ড বিক্রি বন্ধ করার জন্য স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াকে নির্দেশও দিয়েছে। যেসব নির্বাচনী বন্ড রাজনৈতিক দলগুলি এখনো ভাঙায়নি, সেগুলি দাতাকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্টেট ব্যাঙ্ককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে এর থেকে কোন রাজনৈতিক দল কত অর্থ পেয়েছে, বন্ড কেনার তারিখ, ক্রেতার নাম, বন্ডের মূল্য – এসবের (অর্থাৎ বন্ড কিনে কারা কোন দলকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে) যাবতীয় তথ্য আগামী ৬ মার্চের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন সেই তথ্য ১৩ মার্চের মধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর), কমন কজ, রাজনৈতিক দল সিপিএম এবং কংগ্রেস নেত্রী জয়া ঠাকুর বন্ডের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। সেই মামলাতেই সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়। ২০১৭-১৮ সালের বাজেট পেশ করার সময়ে নির্বাচনী বন্ড ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বিজ্ঞপ্তি জারি করার পর সেই বছরের মার্চ মাস থেকে লেনদেন শুরু হয়। তখন থেকেই নানা মহলে এই বন্ড নিয়ে আপত্তি ওঠে। কোন ব্যক্তি বা সংস্থা কোন রাজনৈতিক দলকে কত টাকা চাঁদা দিল তা এই বন্ডে গোপন থাকে। তথ্যের অধিকার আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে যে এর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সরকারের নীতি নির্ধারণে কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। অবৈধ লেনদেন, হিসাব বহির্ভূত কালো টাকা সাদা করারও সুবিধা হবে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে শাসক দলের চাঁদা পাওয়ার সুবিধা অনেক। কিন্তু বিরোধী দলগুলি, বিশেষত ছোট দলগুলি, বঞ্চিত হচ্ছে। প্রথম থেকেই অভিযোগ ছিল, এই বন্ডের জন্য রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আয়ের অসাম্য যেমন বাড়বে, তেমন বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোই বিপন্ন হবে। তথ্যের অধিকার আইন, নির্বাচনী সংস্কারের দাবি নিয়ে কাজ করা বহু সমাজকর্মী এবং সংস্থা প্রথম থেকেই এই বন্ডের বিরোধী। সিপিএম ঘোষণা করেই এই বন্ডের মাধ্যমে অর্থ নেয়নি। জাতীয় দল না হওয়ায় সব বাম দল এর সুযোগ পায় না, কিন্তু এটি বাতিলের দাবিতে প্রতিটি বাম দলই সোচ্চার হয়েছে। নির্বাচনী বন্ডের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একমাত্র সিপিএমই অন্যতম মামলাকারী ছিল। কংগ্রেস অর্থ নিলেও, প্রথম থেকে এই বন্ডের বিরোধিতা করে আসছে।

জনসমক্ষে না এলেও স্টেট ব্যাঙ্ক কিন্তু নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কারা কোন দলকে কত টাকা দিচ্ছে তা জানতে পারে। দ্য কুইন্ট নামে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল, বন্ডের উপরে থাকা নম্বর বিশেষ পদ্ধতিতে পাঠ করা সম্ভব, যার মাধ্যমে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এই তথ্য জানতে পারে। ব্যাঙ্ক মারফত শাসক দলের হাতে এই তথ্য যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা বিরোধী দল থাকে অন্ধকারে।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে এই অভিযোগগুলিই মান্যতা পেল। আদালতের মতে, ভোটারকে তথ্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অসাংবিধানিক। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারা প্রভাব খাটাতে পারে, তারা কোনো দল পরিচালিত সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করছে কিনা – তা জানার অধিকার ভোটারদের রয়েছে। কে কোন দলকে কত চাঁদা দিল সেই তথ্য গোপন রাখলে ভোটাররা তা জানতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য এই যে ব্যক্তি আর সংস্থা এক নয়। কোনো সংস্থা চাঁদা দেয় ব্যবসায়িক স্বার্থে। ঢালাও কর্পোরেট অনুদান অবাধ, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সাম্যের পরিপন্থী।

নির্বাচনী বন্ডকে আইনি বৈধতা দিতে জন প্রতিনিধিত্ব আইন, আয়কর আইন, কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়েছিল। জন প্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধন করে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলি এই বন্ডের মাধ্যমে যে চাঁদা পাচ্ছে তা প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। আয়কর আইন সংশোধন করে দলগুলিকে নির্বাচনী বন্ড থেকে আয়ের তথ্য পেশে ছাড় দেওয়া হয়। আগে কোনো কোম্পানি তাদের মোট মুনাফার একটা অংশ রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে পারত। লাভজনক ও লোকসানে চলা কোম্পানির মধ্যে তফাত রাখা হয়েছিল। নির্বাচনী বন্ডে সেই ফারাক এবং চাঁদা দেওয়ার ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিতে কোম্পানি আইন সংশোধিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট এই সমস্ত সংশোধনীও অসাংবিধানিক বলে খারিজ করে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং অন্য অনেক ব্যাঙ্কও এই বন্ডের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সব স্বাধীন সংস্থাই কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্যের শিকার। সংবিধানের তোয়াক্কা না করে, নির্বাচন কমিশন ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আপত্তি অগ্রাহ্য করে একরকম সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভে সরকার নির্বাচনী বন্ড চালু করে দেয়। একদিকে নাগরিকদের যাবতীয় তথ্যের উপর নজরদারি বাড়ানো, অন্যদিকে সরকারি তথ্য নাগরিকদের থেকে গোপন রাখার স্বৈরাচারই বিকশিত ভারতের নমুনা। ভোট ব্যবস্থাকে অস্বচ্ছ, ব্যয়বহুল, আড়ম্বরপূর্ণ, কর্পোরেট প্রভাবাধীন করে সংসদীয় ব্যবস্থার মূল সুরকেই তারা ধ্বংস করে দিতে চায়।

নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে প্রথমে আপত্তি জানিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, বিভিন্ন কোম্পানি বেনামে কোম্পানি খুলে এর মাধ্যমে কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ পাবে। চাঁদা দেওয়ার ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া নিয়েও তারা আপত্তি জানিয়েছিল। বন্ডের মাধ্যমে বিদেশি অর্থেরও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনুপ্রবেশের সুযোগ রয়েছে। একদিকে কোনো সংস্থা সরকারবিরোধী ভূমিকা নিলেই তাদের বিদেশি অনুদান দেশের নিরাপত্তার নামে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ইন্ডিয়ার বাণী প্রচার করছেন। অন্যদিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে ভোটে বিদেশি অর্থ খাটার পথ করে দেওয়া হচ্ছে, ভোটের জন্য চাঁদার লেনদেন ডিজিটাল থাকছে না। কর্পোরেট প্রেমই যে বিজেপির কাছে দেশপ্রেম আর কর্পোরেটদের কালো টাকাকে সাদা করাই যে বিজেপির স্বচ্ছ ভারতের আসল মানে – তার বড় প্রমাণ এই নির্বাচনী বন্ড।

নির্বাচনী বন্ডের পক্ষে বড় যুক্তি – কালো টাকার অনুপ্রবেশ বন্ধ করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করা। অথচ তথ্য গোপন রাখলে যে পুরো প্রক্রিয়াটিই অস্বচ্ছ হয়ে দাঁড়ায় তা বলাই বাহুল্য। কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ করে দিয়ে বিজেপি সরকার তাকেই কালো টাকার বিরুদ্ধে অভিযান বলে প্রচারে সিদ্ধহস্ত। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নোটবন্দি। গোদি মিডিয়া আমাদের গিলিয়েছিল, নতুন দু হাজার টাকার নোটে নাকি ন্যানোচিপ রয়েছে, ফলে জাল করা যাবে না। মাটির তলায় লুকিয়ে রাখলেও ধরে ফেলা যাবে।

বাস্তবে দেখা গেল দু হাজার টাকার নোট দিব্যি জাল হচ্ছে। নোটের অঙ্ক বেশি হলে যে কালো টাকা মজুতের সুবিধা হয় তা প্রমাণিত। আমাদের রাজ্যের শাসক দলের নেতা আর ঘনিষ্ঠরাও তা হাতে কলমে করে দেখিয়েছেন। এখন সেই দু হাজার টাকার নোটও পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া হল। এর মাঝে নোটবন্দি ও নতুন নোট ছাপাতে সরকারি কোষাগারে টান পড়া, বাতিল নোট বদলানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে নাগরিকের মৃত্যু, ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের প্রবল ক্ষতি – সবই হল। আর নোট বাতিলের সুযোগে রাতারাতি সমবায় ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে কালো টাকা সাদাও হয়ে গেল।

বিজেপি সরকারের আরেক প্রতারণার নাম পিএম কেয়ার্স ফান্ড। ২০২০ সালে করোনা অতিমারী মোকাবিলার নামে প্রাইম মিনিস্টার্স সিটিজেন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিলিফ ইন এমার্জেন্সি সিচুয়েশনস ফান্ড নামে এই তহবিল গড়া হয়েছিল। বিপর্যয় মোকাবিলায় বা ত্রাণের জন্য তহবিলের ব্যবস্থা থাকলেও কেন নতুন করে আরেকটি ফান্ড গড়ার প্রয়োজন হল তা নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। অনেকের মনে হয়েছিল এ স্রেফ গিমিক। কিন্তু অস্বচ্ছ ভারত গড়াই যে এর প্রধান উদ্দেশ্য তা ক্রমে প্রকাশিত হল।

প্রধানমন্ত্রীর নামে তহবিল, তিনিই এর চেয়ারপার্সন। মন্ত্রীরা ছাড়াও কয়েকজন কর্পোরেট কর্তা এর সদস্য হলেন। সরকারি তহবিলের আবেগকে মূলধন করে কোটি কোটি টাকাও এল। তারপর সরকার জানাল, এটি নাকি সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত তহবিল নয়, স্বেচ্ছাসেবী ট্রাস্ট। তাই তথ্যের অধিকার আইন অনুসারে এর হিসাবনিকাশ জানানো আইনত বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদীর নামে নয়, প্রধানমন্ত্রীর নামে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি তহবিল হল। তারপর আদালতে সরকার বলছে এর তথ্য তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না। ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ – এই তিন বছরে এই তহবিলে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা জমা পড়ে। বিদেশি অনুদান আসে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। মোট অনুদানের ৫৯% আসে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে। প্রধানমন্ত্রীর নামে তহবিলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি সবচেয়ে বেশি অনুদান দিল। অথচ নাগরিকদের সেই তহবিলের তথ্য জানার অধিকার নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এই বেনিয়ম নজিরবিহীন। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় দানের পর আবার পিএম কেয়ার্স ফান্ডের তথ্য প্রকাশের দাবি উঠছে।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে তথ্যে অস্বচ্ছতা থাকলেও, কোন রাজনৈতিক দল কত অর্থ পেয়েছে তা থেকে একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের মার্চে চালু হওয়ার পর ২২২ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড বিক্রি হয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় ৯৫% অর্থ পেয়েছিল বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বন্ড বিক্রি বাড়ে। সেই বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৩,৬২২ কোটি টাকার বন্ড বিক্রি হয়েছিল। এপ্রিল মাসে সর্বাধিক বন্ড বিক্রি হয়েছিল মুম্বাইতে, দ্বিতীয় স্থানে ছিল কলকাতা। মে মাসে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্ড বিক্রি হয়েছিল কলকাতায় – ৩৭০ কোটি টাকার। নির্বাচনী বন্ডের সিংহভাগ বিজেপি পেলেও তৃণমূলও যে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে তা বোঝা যায়।

২০২২-২৩ সালে বিজেপি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পেয়েছে প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা, তৃণমূল ৩২৫ কোটি টাকা। কংগ্রেস তৃণমূলের থেকেও কম – ১৭১ কোটি টাকা। তার আগের বছরেও কংগ্রেসের থেকে তৃণমূল বেশি অর্থ পেয়েছিল। তৃণমূল মাত্র একটি রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় থাকলেও, কংগ্রেস কিন্তু একাধিক রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। তাছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের থেকে কংগ্রেসের গুরুত্ব অনেক বেশি। কর্পোরেট সংস্থাগুলি জাতীয় স্তরে বিজেপিকে ভরসার পাশাপাশি এই রাজ্যে তৃণমূলের প্রতি যে আস্থাশীল এবং জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেসকে ভরসা করতে পারছে না – তা এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়। বিক্রি হওয়া বন্ডের ৯৪ শতাংশই এক কোটি টাকা মূল্যের। এর থেকে আন্দাজ করা যায়, কর্পোরেট সংস্থাগুলিই সিংহভাগ বন্ড কিনেছে। কর্পোরেট সংস্থা কোনো দলকে ভালবেসে নয়, ব্যবসায়িক স্বার্থেই চাঁদা দেবে। যে দল তাদের বেশি সুযোগ দেবে, তার উপরেই ভরসা রাখবে। এইভাবেই নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, সরকারের নীতি নির্ধারণে এদের প্রভাব বাড়ছে। তারাই হয়ে উঠছে নিয়ন্ত্রক।

দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সরকারের নীতিতে কর্পোরেটের প্রভাব যে বাড়ছে তা নানাদিক থেকেই বোঝা যায়। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে জাঁকজমক, আড়ম্বরে বিজেপি সব দলকে টেক্কা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। নির্বাচনী প্রচারের বাহুল্য বেড়েই চলেছে। তারই সঙ্গে বিশেষ কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠীকে যাবতীয় সুযোগ করে দেওয়ার প্রমাণ তো বারবার মিলেছে। এই রাজ্যে তৃণমূলও প্রচারের বাহুল্যে বিজেপিকে টেক্কা দিতে পারে। রাজ্য সরকারও বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানিকে নানা সুযোগ করে দিচ্ছে। নির্বাচনী বন্ডের সিংহভাগ বিজেপির পাওয়া, মাত্র একটি রাজ্যে ক্ষমতায় থেকেও কংগ্রেসকে টেক্কা দিয়ে তৃণমূলের বেশি অর্থ পাওয়ার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের আড়ম্বর, সরকারের নীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

কেবল নির্বাচনী প্রচার ব্যয়বহুল হচ্ছে তা নয়, বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে দল ভাঙিয়ে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়েছে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেন যে দলের প্রার্থীকেই ভোট দিন, সরকার বিজেপিই গড়বে। আজ বিজেপি গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই তামাশায় পরিণত করতে চায়। বিরোধীমুক্ত স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চায়। এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন, যার বড় হাতিয়ার হল নির্বাচনী বন্ড। পিএম কেয়ার্স ফান্ড নিয়েও অনেকের একই আশঙ্কা রয়েছে। এই দুই তহবিলের তথ্য সামনে এলে অনেককিছুই পরিষ্কার হবে।

অন্যদিকে কিন্তু নানা অজুহাতে চলছে সরকারবিরোধীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। গত সপ্তাহেই কংগ্রেসের চারটে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আয়কর বিভাগ বন্ধ করে দিয়েছিল। আয়কর ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে অবশ্য পুনরায় তা চালু করা হয়। অভিযোগ, অতি সামান্য অনিয়মের জন্য আয়কর দফতর কয়েকশো কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করেছে। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন। নিষ্পত্তির আগেই এভাবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া আইনসম্মত নয়। লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধীদের উপর চাপ সৃষ্টি করার এ আরেকটি পদ্ধতিমাত্র।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মেনে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য জনসমক্ষে আনা হবে, নাকি অধ্যাদেশ জারি করে রায়টিকেই বাতিল করে দেওয়া হবে তা কয়েকদিন পরে বোঝা যাবে। এমনিতে অধ্যাদেশ জারি করে অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক পথ নিতে বিজেপি সরকার খুবই দক্ষ। যা-ই ঘটুক, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় কেবল অনৈতিক আর্থিক লেনদেন নয়, গণতন্ত্রের ইতিহাসেও এক মাইলফলক। নির্বাচনে বা সরকারি নীতিতে নাগরিকের বড় ভূমিকা আছে। আমাদের তথ্য জানার, বিচার বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। তা সংবিধান প্রদত্ত মতপ্রকাশের অধিকারেরই অঙ্গ। কোনো কর্পোরেট যে অর্থবলে সেই অধিকার কেড়ে নিতে বা তাকে প্রভাবিত করতে পারে না – তা এই রায়ে স্পষ্ট।

আগামী দিনে ভোট ব্যবস্থা এমন থাকবে কিনা, জনগণের গোপনীয়তার অধিকার কেড়ে নিয়ে সরকার ও কর্পোরেটের তথ্য গোপন রাখার একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা – সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আজকের ভারত। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা দলটি বহুবার বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিরোধিতা করেছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা আমূল বদলে রাষ্ট্রপতিশাসিত রাষ্ট্রের ধাঁচে নির্বাচনের কথা বলেছে। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কর্পোরেট প্রভাব বাড়ানো তারই অঙ্গ। সুপ্রিম কোর্ট কেবল একে বাতিলই করেনি, আমাদের অধিকারগুলিও আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। ক্রমাগত আক্রমণের মুখে আমরা সেসব ভুলতে বসেছি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.