প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি বিরোধী অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলির ব্লক ‘ইন্ডিয়া’র পরবর্তী বৈঠক হবে রাজধানী দিল্লীতে, আগামী মঙ্গলবার, ১৯ শে ডিসেম্বর। শোনা যাচ্ছে এই সাড়ে-চতুর্থতম বৈঠকের থিম হবে “ম্যায় নেহি, হাম”, অর্থাৎ “আমি নয়, আমরা”। থিমটি শুনতে খুবই ভালো, কিন্তু পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের ভরাডুবির ফলে “আমরা সবাই রাজা” -র থিম যখন ইন্ডিয়া ব্লকের অন্দরে চড়া সুরে বেজে উঠেছে, সেখানে সাড়ে-চতুর্থতম বৈঠকে কি আদৌ কোনো রফা হবে?

আগে দেখা যাক এটি সাড়ে-চতুর্থতম বৈঠক কেন? এই ইন্ডিয়া ব্লকের প্রথম মিটিং হয় পাটনায়, গত ২৩শে জুন। দ্বিতীয়টি হয় বেঙ্গালুরুতে, ১৭-১৮ জুলাই, তৃতীয়টি মুম্বইতে, ৩১ অগাস্ট-১ লা সেপ্টেম্বর। প্রথম বৈঠকের আহ্বায়ক ছিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, দ্বিতীয়টির আহ্বায়ক ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃতীয়টির ব্যবস্থাপনায় ছিলেন এনসিপি সভাপতি শরদ পাওয়ার। চতুর্থ বৈঠকটি আবার ডাকেন খাড়গে, দিল্লিতে, গত ৬ই ডিসেম্বর। এবার বেঁকে বসেন অন্যান্য দলের অনেক নেতারাই। ‘যাচ্ছি-যাব’, ‘যাব কি যাব না’ করতে-করতে এসে গেল ৩ ডিসেম্বর – অর্থাৎ চার রাজ্যের ভোটের ফলঘোষণার দিন। দেখা গেল, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে ক্ষমতাচ্যুত হলো কংগ্রেস এবং মধ্যপ্রদেশে আবারও জয়ী হল বিজেপি। কংগ্রেসের রাজনৈতিক ক্ষতে খানিকটা মলম দিলো তেলেঙ্গানা। কিন্তু যা হবার তা হলই। কংগ্রেস পিছলে পড়লো ভারতের মধ্যভাগের ‘গো-বলয়ে’, যে এলাকা থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ সাংসদ নির্বাচিত হন লোক সভায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, নীতিশ কুমার যতটা গুরুত্ব পাওয়ার আশা করেছিলেন এই ইন্ডিয়া ব্লকে, ততখানি জমি তাঁর জন্য ছাড়া হয়নি। শোনা যাচ্ছে, নিদেনপক্ষে স্থায়ী অফিসিয়াল আহ্বায়কের স্থানটি না পাওয়ায় তাঁর গোঁসা হয়েছে। সেই কারণেই নাকি মুম্বইয়ের বৈঠকের মাঝে, সাংবাদিক সম্মেলনের আগেই, তড়িঘড়ি পাটনা ফিরে যান তিনি।

যাই হোক, ভোটের রেসের মাঠে পিছলে পড়তেই ব্লকের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে পিছিয়ে পড়েছে কংগ্রেস দল। হিমাচল প্রদেশ এবং কর্ণাটকের জয় যেমন ইন্ডিয়া ব্লকের কিছু নেতাদের চাপা বিরোধিতা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে এই বিরোধী জোটের ‘স্বাভাবিক নেতা’ বানিয়ে ফেলেছিল, এই তিনটি রাজ্যের ভোটের ফল এবার তাদের টেনে নিচে নামিয়ে আনল। অতঃপর আবার সুর উঠল ‘আমরা সবাই রাজা’র (অথবা রানী)।

ইন্ডিয়া ব্লকে রয়েছে মোট ২৬টি দল। অথচ গত ৬ ডিসেম্বর কংগ্রেসের ডাকা নৈশভোজে ৯/১০টি দল ছাড়া অন্য দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন না। অনুপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, জেডিউ, ডিএমকে-সহ আরও অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ দলের নেতৃবৃন্দ। কাজেই দিল্লিতে গত ৬ ডিসেম্বরের বৈঠক, এক বিরোধী নেতার কথা ধার করে বলা যায়, প্রকৃত অর্থেই ছিল ‘…less than half, with lesser consequence…” অর্থাৎ “…অর্ধেকেরও কম কিছু, যার ফলাফল হয়েছে আরো কম…”|

একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ কিছু শীর্ষ বিরোধী নেতারা এই সমন্বয় বৈঠকে “সংক্ষিপ্ত নোটিশ” -এর ভিত্তিতে আহুত হওয়ায় আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে সিপিআইএম ঠিক সেই সময়ই সমালোচনা করে যে, কংগ্রেসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে মতবিরোধ কেন্দ্রে ব্লকের ঐক্যকে প্রভাবিত করছে। কাজেই ৬ ডিসেম্বরের সেই বৈঠকটি সীমিত সংখ্যক সদ্স্য নিয়ে করা হয় “সংসদীয় দলের নেতাদের সমন্বয় সভা” হিসাবে। তাই এটি শেষ অবধি পরিণত হল একটি “অর্ধেক-বৈঠকে”। সেই কারণেই হিন্দি বলয়ে আপাতত অস্তিত্বহীন কংগ্রেসের ডাকা ইন্ডিয়া ব্লকের নেতাদের আগামী মঙ্গলবারের বৈঠকে “আমরা সবাই রাজা” (বা রানী)-র থিমটাই জোরালো হয়ে উঠবে- এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

এই বৈঠক লোকসভা নির্বাচনে সমন্বয়ের জন্য হলেও, অধিকাংশ দলের নেতারা কিন্তু প্রদেশ কেন্দ্রিক নেতৃবৃন্দ। যেমন ধরুন, পশ্চিমবঙ্গে ৪২ টির মধ্যে ক’টি লোকসভা আসন বাম-কংগ্রেসের হাতে তুলে দেবেন মমতা বন্দোপাধ্যায়? শোনা যায়, অনেক কংগ্রেস সমর্থক নাকি বিধানসভা নির্বাচনে জোট থাকা সত্ত্বেও বামপন্থী প্রার্থীদের ভোট দেননি, তেমনই তৃণমূল-বাম-কংগ্রেস সমর্থকরা কি আদৌ একজোটে ভোট দেবেন? ওদিকে তো মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির সঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ছবি দেখে পশ্চিমবঙ্গের কিছু বামপন্থী নেতারা বেশ অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। যদিও ইয়েচুরি এই মুহূর্তে পলিটিক্যালি কারেক্ট না হলেও হক কথাটি বলছেন। তিনি বলেছেন, প্রথমত, সমন্বয় বা জোট হলেও তা রাজ্যভিত্তিক হবে। দেশব্যাপী জোটও হতে পারে, কিন্তু সেটি লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর। অর্থাৎ, যদি বিরোধী পক্ষ ২৫০-র বেশি আসন জিততে পারে, তবেই তারা ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট হতে পারবে।

ইয়েচুরির দল কেরল সরকারের প্রধান দল। তারা কখনওই সেখানে প্রধান বিরোধীপক্ষ কংগ্রেসের সঙ্গে রাজ্য-স্তরে জোট করতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে বাম-কংগ্রেস জোট গড়াকালীন এই নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয় সিপিআইএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে। কাজেই সে রাজ্যে ইন্ডিয়া ব্লকের নির্বাচনী জোটের গুড়ে বালি! আবার উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদব প্রায়ই কংগ্রেসকে কটাক্ষ করতে ছাড়েন না। একবার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে রাহুল গান্ধীর হাত ধরে নির্বাচনে নেমে ভোট খুইয়েছেন অখিলেশ। আর না! অনেকবার এই বার্তা দিয়েছেন তিনি। কাজেই সে রাজ্যেও জোট-গুড়ে বালি! আবার দিল্লিতে মাত্র সাতটি লোকসভা আসনে কি অরবিন্দ কেজরিওয়াল আসন ভাগাভাগি করতে রাজি হবেন? সুতরাং সে গুড়েও সম্ভবত বালি ! এই অবস্থা প্রায় সব রাজ্যে। ওড়িশার নবীন পট্টনায়ক, অন্ধ্রের ওয়াই এস জগন মোহন রেড্ডির মতো নেতারা ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে হাত মেলাবেন বলে আশা করাই যায় না। এখানেই চলে গেল ৪৬টি আসন। ওদিকে প্রায় ২৫০ টি আসনে কংগ্রেস-বিজেপির সরাসরি লড়াই। সেখানেই বা কতটা আপস করবে কংগ্রেস?

অতঃ কিম? আপাতত ‘চলো দিল্লী’র দামামার সঙ্গে “ম্যায় নেহি, হাম”-এর একযোগে কুচকাওয়াজ হবে কিনা সে দিকে নজর রাখা ছাড়া উপায় নেই।

-মতামত ব্যক্তিগত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.