সালটা ২০১৭। সময় – উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। মোদীবিরোধী প্রধান দলগুলি স্লোগান তুললো ‘ইউ পি কে লড়কে’ অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশের ছেলেরা। কারণ সেবার রাজ্যের নির্বাচনে হাত ধরাধরি করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব যৌথভাবে ভোট চাইতে বেরিয়েছিলেন খোলা গাড়িতে চেপে। ফল বেরোলে দেখা গেল বিপর্যয়ের ছবি। কংগ্রেস ২০১২ সালে পেয়েছিল ২৮ আসন, কমে দাঁড়িয়েছে সাতে। আর সমাজবাদী পার্টি পেয়েছিল ২২৪ আসন, কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭। ফলে তারা ক্ষমতাচ্যুত। ২০২২ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দুটি আসন আর সমাজবাদী ১১১।

এখন ২০২৪, এসে গেছে লোকসভা নির্বাচন। হয়ত বিধানসভার সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না, কিন্তু যে পথে জোটের যাত্রা শুরু হয় সেবার, যেন তারই প্রতিচ্ছবি দেখা গেলো এবারেও। প্রথমে মন কষাকষি, তারপর দরাদরি, শেষকালে সমঝোতা। দেখা যাক কী হয় এবারের ফলাফল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পাশের রাজ্য বিহার, যেখানে ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলি মহাগঠবন্ধন নামে রাজনৈতিক জোট তৈরি করেছিল। তাতে যোগ দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন ইত্যাদি দলগুলি। অবশ্যই তারা জনতা দল (ইউনাইটেড) নেতা নীতীশ কুমারকেই মুখ করে মাঠে নেমেছিল। কিছুদিন আগে নীতীশবাবু বিজেপির হাত ধরে এনডিএতে ফিরে গেছেন।

যদিও সেবার বিজেপি ভাল ফল করে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় জনতা দল ৭৫টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসাবে জয়লাভ করে। বিজেপি ৭৪টি আসন পায় আর মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নীতীশের দল জেডিইউ তৃতীয় সর্বোচ্চ, অর্থাৎ ৪৯টি আসনে জয়ী হয়। চমক ছিল বামেদের উত্থান। তিন বাম দল মিলে ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৬টিতে জয়লাভ করে, কংগ্রেস ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতে মাত্র ১৯টি। এবার নীতীশবিহীন ইন্ডিয়া জোট কি লোকসভা নির্বাচনে কোনো নতুন চমক দেখাতে পারবে? দেখা যাক।

বিহারের লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গ, একটু দূরে পাঞ্জাব আর সুদূর কেরালার ঘটনাবলী দেখাচ্ছে যে লোকসভা নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি ইন্ডিয়ার পক্ষে সব ক্ষেত্রে সহজ নয়। কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনকে টার্গেট করছে এই জোটেরই শরিকরা। কংগ্রেস রাহুল গান্ধীকে পুনরায় মনোনীত করার আগেই কেরালার ওয়ায়নাড় কেন্দ্রে সিপিআই তাদের জাতীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এবং দিল্লিতে দলের অন্যতম প্রধান নেতা অ্যানি রাজাকে প্রার্থী ঘোষণা করে বসে। তিনি আবার সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজার স্ত্রী। তারপরেই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেন। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত বহরমপুরে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দাঁড় করান গুজরাটের ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে।

মমতা প্রথমে বাংলায় দুটি আসন ছাড়তে রাজি ছিলেন, তবে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বলেন তিনি নাকি দার্জিলিংয়ের মত আরও তিনটি ‘অনিশ্চিত’ আসন শেষপর্যন্ত ছেড়ে দিতেন। বাদ সাধল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের বামফ্রন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং তৃণমূলবিরোধী আচরণ। তাছাড়াও তিনি নাকি বিনিময়ে আসাম, মণিপুর ও মেঘালয়ে কিছু আসনে লড়তে চেয়েছিলেন। মেঘালয়ে কংগ্রেস একতরফা প্রার্থী ঘোষণা করায় নাকি মমতা ক্ষুব্ধ হন। উপরন্তু আগে রাজীব গান্ধী এবং এখন সোনিয়ার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক থাকলেও রাহুলের সঙ্গে মমতার কোনোদিনই তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি। মাঝেমধ্যেই রাহুলকে চাতক পাখি বলে থাকেন তৃণমূল নেত্রী। তার উপর আবার বাংলার কংগ্রেস সভাপতি অধীরের সম্পর্কে হামেশাই কটাক্ষ বিনিময় করতে দেখা যায় মমতাকে। কাজেই সমঝোতা দূর অস্ত।

তাই মুসলমানপ্রধান বহরমপুর কেন্দ্রে অধীরের কিস্তি মাত করার জোগাড় করলেন মমতা। এই প্রবীণ কংগ্রেস নেতাকে ১৯৯৯ সালের পর থেকে বহরমপুরে কেন্দ্রে কেউ হারাতে না পারলেও ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি উল্লেখযোগ্য জমি হারিয়েছেন। গত লোকসভা নির্বাচনে তিনি ৪৫.৫% ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে ২০১৪ সালে পান ৫০.৫% ভোট। এদিকে ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে তৃণমূলের ভোট ছিল ১৯.৭%, যা ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছিল ৩৯.৩%। তেমনই ২০১৪ সালে যেখানে অধীরের জয়ের ব্যবধান ছিল সাড়ে তিন লাখের বেশি, তা ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছিল ৮১ হাজারেরও কম। বহরমপুরে লোকসভার জনসংখ্যার প্রায় ৬৭% মুসলমান। কিছু বিশ্লেষকের মতে, তাঁরা কংগ্রেসের চেয়ে তৃণমূলকেই বিজেপির বেশি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বলে মনে করেন। সম্প্রতি কংগ্রেস দেশজুড়ে জমি হারাচ্ছে। এই কেন্দ্রেও হয়ত তার ছায়া দেখতে পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন ভারত বনাম ইন্ডিয়া: আমাদের সেই তাহার নামটি

আবার কেরালার তিরুবনন্তপুরমে কংগ্রেস প্রার্থী এবং তিনবারের সাংসদ শশী থারুরের বিরুদ্ধে বাম জোট পান্নান রবীন্দ্রনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। একদিকে যেমন তা নিয়ে দুপক্ষে মন কষাকষি চলছে, তখন বিজেপির তরফে ওই কেন্দ্রে প্রার্থী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব চন্দ্রশেখর। পাশাপাশি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালকে আলাপুঝা থেকে সিপিএম সাংসদ এ এম আরিফের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। বেণুগোপাল ওই কেন্দ্র থেকে আগে দুবার জিতেছেন, কিন্তু গতবার কংগ্রেসের শানিমোল উসমান দশ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হন।

এইসব ঘটনার মাঝে সিপিআই আবার ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আসন্ন নির্বাচনে ঝাড়খণ্ডে ১৪টি লোকসভা আসনের মধ্যে আটটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে জানিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে ওই রাজ্য থেকে কিন্তু সিপিআইয়ের লোকসভায় কোনো সাংসদ নেই। তাও একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।

এসবের খানিকটা প্রতিফলন দেখা গেল মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে ইন্ডিয়া আয়োজিত ১৭ মার্চের সমাবেশে, যেখানে সিপিএম এবং সিপিআইয়ের কোনো জাতীয় স্তরের নেতা উপস্থিত ছিলেন না। তা কি কংগ্রেসের জোট ধর্ম পালন না করার প্রতিবাদে? যদিও সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি জানিয়েছেন, ত্রিপুরায় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল আর ডি রাজারও সেদিন নাকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। হতেই পারে। পার্টির সর্বভারতীয় সম্পাদকের সময়সূচি ও পরিকল্পনা অনেকদিন আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে। তবুও এই মুহূর্তে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের উদ্রেক করে।

উপসংহারে হয়ত এটুকু বলা যায় যে ৪ জুন নির্বাচনের ফল ঘোষণা হবার পর যদি নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ লোকসভায় অর্ধেকের কম আসন পায়, তখন হয়ত এই জোটের সব সদস্য মিলে একটা রফা করতে পারে। কিন্তু তা হবে কি? হলেও প্রধানমন্ত্রী হবেন কে? মনে পড়ে ১৯৭৭ সালের সেই জনতা পরীক্ষানিরীক্ষার ফল?

এবার শুধু ৪ জুন দুপুরের অপেক্ষা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.