অমিত দাশগুপ্ত
কথায় আছে, ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’। প্রধানমন্ত্রী যখন সাজিয়ে গুছিয়ে হয় কে নয়, আর নয়কে হয় করে চলেছেন রোজ, তখন তাঁর অর্থনীতিবিদ পারিষদরা যে সেসব মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য গবেষণাপত্র পেশ করবেন তাতে আর আশ্চর্য কী? অতি সম্প্রতি প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অংশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে বিজেপি-আরএসএস হইচই লাগিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করেছে – ‘দেখেছ? ১৯৫০ থেকে ২০১৫, এই ৬৫ বছরে ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে ৪৩.১৫%, আর হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে ৭.৮২%।’ যদিও আসলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতের জনসংখ্যায় হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত হ্রাসের হার ৭.৮২% (৮৪.৬৮% থেকে কমে ৭৮.০৬% হওয়া মানে মূলত ৬.৬২% হ্রাস, কিন্তু অঙ্কের আর একটু জটিল হিসাবে তা (৮৪.৬৮-৭৮.০৬)/৮৪.৬৮ = ৭.৮২%)। মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধির হার ৪৩.১৫% (৯.৮৪% থেকে বেড়ে ১৪.০৯% হওয়া মূলত ৪.২৫%, কিন্তু অঙ্কের আর একটু জটিল হিসাবে তা (১৪.০৯-৯.৮৪)/৯.৮৪ = ৪৩.১৫%)। ওই জটিল হিসাব কেউ বুঝতে চাইবেন বলে মনে হয় না। ফলে মোদিজি-শাহজি-যোগীজি-রাজনাথজি-শুভেন্দুজি-সুকান্তজিরা (তিনি নাকি আবার পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক) স্বভাবসিদ্ধ ঢংয়ে মিথ্যা বলে যাবেন – ‘দেখেছ? হিন্দু জনসংখ্যা কমছে, মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে।’
আদতে কী হচ্ছে, কী হয়েছে? মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত অবশ্যই বেড়েছে। তবে মোট হিন্দু জনসংখ্যা ১৯৫১ সালের জনগণনার সময়ে ছিল ৩০.৩৭ কোটি, ২০১১ সালে তা হয়েছে ৯৬.৬৩ কোটি। অর্থাৎ মোট বেড়েছে ৬৬.২৬ কোটি। সমসময়ে মুসলমান জনসংখ্যা ৩.৫৪ কোটি থেকে ১৩.৬৯ কোটি বেড়ে ১৭.২৩ কোটি হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে পাঁচজন হিন্দু বাড়লে একজন মুসলমান বেড়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু পরিসংখ্যানকে এভাবে দেখবে কে, যেখানে শাসক দলের প্রধান, দেশের প্রধানমন্ত্রী মুসলমানদের নিকৃষ্ট দেখানোর জন্য রোজ বক্তৃতা দিচ্ছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মঙ্গলসূত্র, মহিষ মায় সংরক্ষণ – সব মুসলমানদের দিয়ে দেবে বলে গল্প ফাঁদছেন এবং তাঁর শাগরেদরা যথোচিত সঙ্গত করে চলেছে? প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নটি দেশ (সার্ক) নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছেন। সেখানে ওই ৬৫ বছরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাচরণকারীদের মোট জনসংখ্যায় অনুপাতের শতকরা বৃদ্ধি বা হ্রাস দেখানো হয়েছে। যেসব দেশে ওই অনুপাতের হ্রাস বেশি সেখানে সংখ্যালঘুদের ওই অনুপাতের বৃদ্ধি অবশ্যই বেশি। উপদেষ্টাদের (অবশ্যই তাঁরা জ্ঞানীগুণী বিদ্বজ্জন) মতে যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাচরণকারীদের মোট জনসংখ্যায় অনুপাতের শতকরা হ্রাস যত বেশি সেখানে সংখ্যালঘুরা ভালো আছে। তার ফলেই সংখ্যালঘুদের ওই অনুপাতের বৃদ্ধি ঘটেছে। জনসংখ্যার অনুপাতের বৃদ্ধির এই চমকপ্রদ ব্যাখ্যা অবশ্যই সংঘবাদী বুদ্ধিজীবী সুলভ। তবে ওঁরা যেসব কথাবার্তা লিখেছেন ওই তথাকথিত গবেষণাপত্রে, তা কোনো নতুন আবিষ্কার নয়, এদেশে এবং অন্যান্য দেশে প্রাপ্ত জনগণনার প্রতিবেদন থেকেই তা অনায়াসে তৈরি করা যায়।
ওঁদের ব্যাখ্যাকে অনুসরণ করলে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের দেশ মায়ানমার তাদের সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে ভাল রেখেছে, কারণ বৌদ্ধধর্মাচরণকারীদের অনুপাত হ্রাস সেখানে সর্বাধিক। ওই উপদেষ্টারা মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপরে অত্যাচারের ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন কি? উপদেষ্টাদের ব্যাখ্যা অনুসারে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা মায়ানমারে রসেবশে আছে। তবে একটা ধন্দ তৈরি হয়েছে – তাই যদি হয়, তাহলে বিজেপি প্রচারিত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের গল্পটার কী হবে? ওই ব্যাখ্যার একই মানদণ্ডে আফগানিস্তানে সংখ্যাগুরুবাদ প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ সেখানে সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত বৃদ্ধির হার নগণ্য। ফলে তালিবানরা অত্যন্ত সহৃদয় মুসলমান বলতে হবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও প্রায় তেমনটাই বলা চলে। ওখানেও সংখ্যালঘুরা সুখেই আছে। ওই একই যুক্তিতে ভুটান, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের তেমন কোনো উদাহরণ নেই, সেখানেও সংখ্যাগুরুবাদ বিপজ্জনক স্তরে রয়েছে। কারণ তালিকা অনুসারে ভুটানে ওই অনুপাত বৃদ্ধির হার প্রায় ১৮%। এমন চমৎকার বিশ্লেষণ ওই উপদেষ্টাদের যুক্তি অনুসরণ করলে পাওয়া যায়। ওঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে ভারতে সংখ্যাগুরুবাদ নেই, সেটা অবশ্য প্রকাশ্য উদ্দেশ্য। তবে যে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তা করতে চেয়েছেন তা হাস্যকর সিদ্ধান্ত সমূহে পৌঁছে দিচ্ছে।
তবে সিংহদরজা দিয়ে ওই উদ্দেশ্য দেখা গেলেও ভিতরের ঘরে উঁকি দিলেই অন্য উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। নির্বাচন চলাকালীন হঠাৎ জনসংখ্যার অনুপাত নিয়ে এত আগ্রহ কেন হল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের? দেশের মুদ্রাস্ফীতি, বৈষম্য, কর্মহীনতা ইত্যাদি সমস্যাগুলির সমাধান করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে উপদেশ দেওয়ার কাজটা কি মিটে গেছে, নাকি সেগুলি অত গুরুত্বের নয়? তাঁদের কি অজানা যে, যে ধর্মাবলম্বীদের অর্থনৈতিক অবস্থা যত সঙ্গিন তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম হারে হ্রাস পায়? মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত বাড়ছে, কারণ মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও তা হিন্দু জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান বৃদ্ধির হারের তুলনায় কম। কেন না, মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা হিন্দুদের তুলনায় বেশি সঙ্গিন। ফলে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তনের ধনাত্মক উচ্চ হার আসলে তাঁদের খারাপ অবস্থার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষজ্ঞ অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছে পরে তার সমর্থনে তথ্য সন্নিবেশিত করতে গিয়ে খেই হারিয়েছেন মনে হচ্ছে। নতুবা ওই বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে অজ্ঞ বলে ধরতে হয়।
১৯৫০-২০১৫: সার্ক দেশগুলির সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বীদের জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তন
| ক্রমিক নং | দেশ | গরিষ্ঠের ধর্ম | ১৯৫০ (শতাংশ) | ২০১৫ (শতাংশ) | পরিবর্তন |
| ১ | মায়ানমার | বৌদ্ধ | ৭৮.৫৩ | ৭০.৮০ | -৯.৮৪ |
| ২ | ভারত | হিন্দু | ৮৪.৬৮ | ৭৮.০৬ | -৭.৮২ |
| ৩ | নেপাল | হিন্দু | ৮৪.৩০ | ৮১.২৬ | -৩.৬১ |
| ৪ | মালদ্বীপ | সৈফি সুন্নি মুসলমান | ৯৯.৮৩ | ৯৮.৩৬ | -১.৪৭ |
| ৫ | আফগানিস্তান | হানাফি মুসলমান | ৮৮.৭৫ | ৮৯.০১ | ০.২৯ |
| ৬ | পাকিস্তান | হানাফি মুসলমান | ৭৭.৪৫ | ৮০.৩৬ | ৩.৭৫ |
| ৭ | শ্রীলঙ্কা | বৌদ্ধ | ৬৪.২৮ | ৬৭.৬৫ | ৫.২৫ |
| ৮ | ভুটান | বৌদ্ধ | ৭১.৪৪ | ৮৪.০৭ | ১৭.৬৭ |
| ৯ | বাংলাদেশ | হানাফি মুসলমান | ৭৪.২৪ | ৮৮.০২ | ১৮.৫৫ |
অন্যদিকে, উপদেষ্টাদের এই প্রতিবেদন মনে হয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে অভিপ্রেত অস্ত্র তুলে দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা ওখান থেকে উদ্দিষ্ট তথ্যটিকে সংগ্রহ করেছেন, অবশ্যই অসত্য মোড়কে জড়িয়ে। তারপর প্রচার শুরু হয়েছে – দেখেছ? মুসলমান জনসংখ্যা ৪৩.১৫% বেড়েছে, হিন্দুদের ৭.৮২% কমেছে। এভাবে চললে ভারতে হিন্দুরা অচিরেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা কি জানেন না, যে কোনো দেশের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের জনসংখ্যা অপর কোনো ধর্মাবলম্বীদের জনসংখ্যা টপকাবে কিনা, বা টপকালেও কত দ্রুত টপকাবে তা নির্ভর করে মহিলাদের সামগ্রিক গর্ভধারণের হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর)-এর উপর? এদেশে জনসংখ্যা বাড়লেও টিএফআর ক্রমাগত কমছে। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস)-র প্রতিবেদনগুলি থেকে তা একদম পরিষ্কার।

তবে উপদেষ্টাদের অন্য একটি দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল। টিএফআর রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বা প্রতিস্থাপন হারের, অর্থাৎ ২.১-এর নিচে নেমে গেছে। ফলে জনবিন্যাসে ক্রমাগত তুলনামূলকভাবে প্রবীণ তথা বৃদ্ধদের অনুপাত বাড়বে। সেই সমস্যা কীভাবে সামলানো যাবে সেই কথা বিবেচনা করা উচিত ছিল। সেসব কথা ভাবার সময় তাঁদের আছে কি? রাজার পারিষদদের উপর রাজার রাজত্ব টেকানোর গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তাঁরা দেশের ভালর জন্য পরামর্শ দিতে যাবেন কেন?
নিবন্ধকার অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








