বিজেপির সুরাট মডেল ব্যর্থ হয়ে গেল মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর লোকসভা কেন্দ্রে। কেন্দ্রের শাসক দল চেয়েছিল গুজরাটের সুরাট লোকসভা কেন্দ্রের মত কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের খাসতালুক ইন্দোরেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে। জমি তৈরিই ছিল। কংগ্রেসের প্রার্থী অক্ষয় বম মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। শুধু তাই নয়, শিবির বদল করে যোগ দেন বিজেপিতে। সমস্ত নির্দল এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে রাজি করিয়ে ফেলে বিজেপি। কিন্তু বিনাযুদ্ধে বিজেপিকে জিততে দিতে রাজি ছিলেন না ৩৪ বছরের এক যুবক। তাঁর নাম অজিত সিং পানওয়ার। বামপন্থী দল এসইউসিআই কমিউনিস্টের হয়ে তিনি লড়ছেন ইন্দোর লোকসভা কেন্দ্রে। প্রভূত চাপ সত্ত্বেও তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। সোমবার ইন্দোরে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। অত্যন্ত সীমিত শক্তি নিয়েও সংগঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচনের ময়দানে থেকেছেন অজিত ও তাঁর সহকর্মীরা। আরেক বামপন্থী দল সিপিআই সমর্থন জানিয়েছে তাঁকে। অজিত কত শতাংশ ভোট পাবেন, এক শতাংশ ভোটও পাবেন কিনা সে উত্তর পাওয়া যাবে ৪ জুন। কিন্তু কংগ্রেসের মত প্রধান বিরোধী দল যখন বিজেপির চাপের মুখে ইন্দোরের নির্বাচনী ময়দান ছেড়ে চলে গেল, তখন এসইউসির এই তরুণ নেতার লড়াকু মনোভাব নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। ২০২৪ সালের ভারতবর্ষে এমন রাজনৈতিক কর্মীর প্রয়োজন আছে বৈকি।

ইন্দোর লোকসভা কেন্দ্রের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২৯ এপ্রিল। তার আগেই কংগ্রেস প্রার্থীর সঙ্গে ‘ডিল’ চূড়ান্ত করে ফেলে বিজেপি। অন্য প্রার্থীদের ব্যবস্থাও করে ফেলেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। এরপর চেষ্টা শুরু হয় অজিতকে বাগে আনার। এসইউসি প্রার্থী জানাচ্ছেন, ২৭ এবং ২৮ এপ্রিল মিলিয়ে কয়েকশো ফোন কল আসে তাঁর ফোনে। ২৯ এপ্রিলও ভোর থেকে ফোন করতে থাকেন বিজেপি নেতারা। তিনি কোথায় আছেন তা জানাতে বলা হয়। হুমকি, প্রলোভন – কোনোটারই কমতি ছিল না। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার, কেবলমাত্র বিজেপি নেতারাই যে চাপ দিচ্ছিলেন তা কিন্তু নয়। সরকারি আমলা থেকে শুরু করে এলাকার প্রভাবশালী, বড় ব্যবসায়ীদের চাপও আসতে থাকে বিভিন্ন মহল থেকে। এসইউসি কর্মীদের বাড়ি বাড়িতে হানা দিতে থাকেন বিজেপি নেতারা। অজিতের প্রস্তাবকদের উপরেও প্রবল চাপ দেওয়া হয়। তাঁদের আত্মীয়স্বজনকে লাগাতার হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অটল থাকেন ‘ছোট’ বামপন্থী দল হিসাবে পরিচিত এসইউসির কর্মীরা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুরাটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুকেশ দালাল নির্বাচিত হওয়ার পর ইন্দোরের বিজেপিও সুরাট মডেল প্রয়োগ করা নিয়ে আশাবাদী ছিল। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকেই যখন সরিয়ে দেওয়া গেছে, তখন এসইউসি তো তুচ্ছ শক্তি। এমনিতে ইন্দোর বিজেপির পক্ষে নিরাপদ আসন। গত লোকসভা নির্বাচনে ১০ লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছিল তারা। গোটা লোকসভা এলাকার সর্বত্র গেরুয়া শিবিরের প্রবল উপস্থিতি। সবকটা বিধানসভাই তাদের দখলে। কাজেই গেরুয়া সমুদ্রের সামনে একঘটি জলের সমান এসইউসি যে এমন নাছোড় মনোভাব দেখাবে, তা বিজেপির কল্পনাতীত ছিল।

ঠিক কী করা হয়েছিল এসইউসি প্রার্থীর প্রতি? অজিত বলেন, ‘প্রথম ফোনটি করেছিলেন একজন আইনজীবী। নাম মোহর সিং। তিনি আমার পরিচিত। ওই আইনজীবী বলেন, একজন বিজেপি বিধায়ক আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী। আমি জানাই, দেখা করা সম্ভব নয়। তখনই মনে হয়েছিল হয়তো ইন্দোরেও সুরাট মডেল প্রয়োগ করতে চায় বিজেপি। খানিকক্ষণ পরেই বুঝতে পারি, আমি ঠিকই ভেবেছিলাম।’ এরপর শয়ে শয়ে কল ঢুকতে থাকে এসইউসি প্রার্থীর ফোনে। তাঁর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ আধিকারিকরা ফোন করতে থাকে। সরকারি আমলারাও ফোন করেন। কেউ বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন, কেউ সরাসরি মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে বলেন। প্রথমে ‘ইন্দোরের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে’ না লড়ার অনুরোধ। রাজি না হওয়ায় শুরু হয় হুমকি, চাপ দেওয়া।

অজিতকে কিছুতেই নিরস্ত করতে না পেরে বিজেপি তাঁর এজেন্ট ও প্রস্তাবকদের লক্ষ করে আক্রমণ শানায়। গুনা শহরের এক এসইউসি কর্মীর বাড়িতে পৌঁছে যান বিজেপি নেতারা। ওই ব্যক্তি ছিলেন অজিতের অন্যতম প্রস্তাবক। তাঁকে বলা হয় তখনই কালেক্টরেটে গিয়ে বলতে হবে তিনি অজিতের প্রস্তাবক হতে নারাজ। ওই কর্মীর কথায়, ‘বিজেপির নেতারা আমার উপর প্রবল চাপ দিতে থাকেন। হুমকি দেন পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে। তাতেও কাজ না হলে বলেন, আমার যা ‘চাহিদা’ সবই মিটিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আমি নিজের অবস্থানে অনড় থাকি।’ এরপর গোটা ইন্দোর লোকসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় এসইউসি কর্মীদের বাড়ি খুঁজে বার করে অজিতের মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিতে থাকে বিজেপি। বলা হয়, প্রয়োজনে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অজিত সমেত এসইউসি কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি। অজিতের কথায়, ‘ওঁরা বলেন, ১৩ জন নির্দল প্রার্থী ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। কংগ্রেসও ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। তুমি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে দাও। বাকি সব আমরা দেখে নেব। প্রয়োজনে মাঝরাতে তোমার সঙ্গে বসতে চাই আমরা।’ এসইউসি প্রার্থী বলেন, ‘আমি বিজেপির লোকজন এবং পুলিশ, সরকারি আধিকারিকদের জানাই, আমরা একটি সংগ্রামী বামপন্থী দল। নেতৃত্বের নির্দেশে আমরা লড়ছি। প্রয়োজনে প্রাণ দেব, কিন্তু লড়াই ছাড়ব না।’

আরো পড়ুন বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন: জুটিতে লুটি

এসইউসির এমন নাছোড় মনোভাব নজর কেড়েছে ইন্দোরে। সিপিআইয়ের স্থানীয় নেতৃত্ব অজিতের সমর্থনে প্রচারে নেমেছেন। স্থানীয় সোশালিস্টরাও অজিতকে সমর্থন করছেন। ভোটের দিনও ময়দানে ছিলেন এসইউসি কর্মীরা। বিশেষত সংখ্যালঘু এলাকায় অজিত নজরকাড়া সমর্থন পেয়েছেন। তাঁর ছোট ছোট পথসভাগুলি জনসভায় পরিণত হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশের এসইউসি নেতা সুনীল গোপাল বলেন, ‘আমরা মার্কসবাদ লেনিনবাদ শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে রাজনীতি করি। আমাদের হুমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরানো যাবে না। আমরা কংগ্রেস নই, আমরা কমিউনিস্ট।’ তাঁর কথায়, ‘ইন্ডিয়া জোট এবং এনডিএ – দুটিই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি। আমরা তাই স্বাধীনভাবে লড়ছি। বিজেপি এই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা খতম করতে চাইছে। আমরা সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ে তুলছি। ইন্দোরের সংগ্রাম সেই সামগ্রিক প্রতিরোধেরই অংশ।’

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.