অশান্তির মণিপুরে নির্বাচন হয়ে গেল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল কি? শান্তি ফিরল কি? বহু ভাষা, বহু জাতিগোষ্ঠীর এই প্রাচীন জনপদে মানুষ কি শান্তির ঘুম ঘুমোতে পারবে এখন? প্রশ্নগুলো আমাদের না ভাবিয়ে পারে না। আমরা যে বাঙালিরা মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা, কর্মসূত্রে বা বেড়াতে যাওয়া ছাড়া দেশের অন্যান্য অংশের সাথে আর কোনো যোগাযোগ নেই, তাদের প্রায়শই দেশের অন্যান্য অংশের মানুষের সুখ দুঃখ যন্ত্রণা ইতিহাস কিছুই জানা থাকে না, বোঝা থাকে না। মণিপুরও এমন একটি রাজ্য, যা বলতে আমাদের মাথায় কখনো ইরম শর্মিলা বা কখনও মেরি কমের ছবি ভেসে ওঠে, তার থেকে বেশি কিছু নয়। ইদানীং হয়ত কেউ কেউ সাম্প্রতিক কুকি-মৈতেয়ী জাতিদাঙ্গার বীভৎস ছবিগুলি মানসপটে দেখে থাকেন মণিপুরের ছবি হিসাবে। আসুন, এর বাইরে মণিপুরকে আরও একটু গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি আমরা।
প্রেক্ষাপট
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে জাতিগত সমস্যা অত্যন্ত গভীর। এর ফলে তজ্জনিত জাতি-হিংসা এবং জাতি-সংঘাতের ইতিহাসও অনেকদিনের। আমরা জানি জাতি-সংঘাতের প্রধান কারণই হল ক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই। একটি রাষ্ট্রে একটি জাতি থাকলে জাতি-সংঘাতের কোনো প্রশ্নই থাকে না। কিন্তু রাষ্ট্রটিতে অনেকগুলি জাতির অস্তিত্ব থাকলে পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যে তখনই তৈরি হবে একটি আধিপত্যকারী জাতি, যা অন্য জাতিগুলিকে নিষ্পেষিত ও অবদমিত করে রাখবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাতি-হিংসা ও জাতি-দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হবে। ভারত একটি বিশাল, বৈচিত্র্যময়, বহুভাষিক, বহুজাতিক দেশ। সুতরাং এখানে সমস্যা অত্যন্ত গভীর। এই বিষয়গুলি একেবারে মৌলিক বিষয়, যা আমরা অনেক আগে থেকেই জেনে এসেছি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গায়ের জোরে এই মৌলিক বিষয়গুলিকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা হচ্ছে বলে আবার নতুন করে স্মরণ করা দরকার হয়ে পড়ছে।
জাতিগত সমস্যার দিক থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত ভারতের অন্যান্য অংশের থেকে বহুগুণ জটিল। এই অঞ্চলের রাজ্যগুলিতে সর্বমোট প্রায় আড়াইশোটি জাতিগোষ্ঠী এবং চারশোর কাছাকাছি ভাষাগোষ্ঠী রয়েছে। একটি দেশের একটি অঞ্চলে এতগুলি জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অবশ্যই সামগ্রিক বিষয়টিকে অত্যন্ত জটিল করে রেখেছে। এই অবস্থায় অনেককিছু নির্ভর করে দেশের শাসক শ্রেণি এবং শাসক দলের উপর। আমাদের দেশের শাসকরা চিরকালই চেয়েছেন এই জাতিগোষ্ঠীগুলি পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ ও সংঘাতে ব্যস্ত থাকুক, যাতে তাদের উপর কেন্দ্রীয় আধিপত্য বজায় রাখতে সুবিধা হয়। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আগে এই কাজ ইংরেজরা করেছে, স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেস করেছে। এখন বিজেপি তাকে গুণে ও মাত্রায় এক জটিলতর চেহারা দান করেছে।
ভারতের অন্যান্য রাজন্যশাসিত অঞ্চলগুলির মত মণিপুরেরও অন্য একটি সমস্যা রয়েছে। তা হল ধারাবাহিকভাবে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা ও গ্রাস করার কেন্দ্রীয় চক্রান্ত। স্বাধীন ভারতে এটি এমন এক সমস্যা যা আমাদের আলাদা করে আলোচনা করা দরকার। কিন্তু কাশ্মীরের মতই ভারতভুক্তির পর থেকেই দেশের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা মণিপুর একদিকে অবহেলিত, অন্যদিকে দমিত হয়েছে। ১৯৪৯ সালে রাজন্যশাসিত মণিপুর ভারতে যুক্ত হয়, কিন্তু পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পায় ১৯৭২ সালে। ভারতের শাসকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ২৩ বছর মণিপুরকে পূর্ণ রাজ্যের স্বীকৃতিদান থেকে বঞ্চিত করে ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত রাজ্য হিসাবে একপ্রকার কেন্দ্রীয় শাসনাধীন অঞ্চলে পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র রাজ্য হিসাবে যেটুকু স্বশাসন পাওয়া সম্ভব, সেটুকুও না দিয়ে প্রভূত অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছিলেন। এই সমস্যা নাগাদেরও ছিল। নাগারা এর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে ১৯৬৩ সালে পূর্ণ রাজ্যের স্বীকৃতি আদায় করেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক পথে লড়াই করে মণিপুরীদের সময় লাগে আরও নবছর। এই শিক্ষা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রশ্নে মণিপুরী তরুণদের মধ্যে অস্ত্রের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। এটি একান্তভাবেই ভারতের শাসকশ্রেণির অবদান। ১৯৭২ সালে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মণিপুরে দশবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট, অর্থাৎ আফস্পার মত স্বৈরতান্ত্রিক দমনমূলক আইন লাগু করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অত্যাচার, গুলি চালনা, মনোরমা হত্যাকাণ্ড, শর্মিলা চানুর অনশন প্রভৃতি ঘটনায় লাগাতার উত্তপ্ত হয়েছে মণিপুর। ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকবর্গের সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত থাকতে হয়েছে মণিপুরকে।
আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে
মণিপুরের এই সংগ্রামকে ভারতের শাসকরা যেমন একদিকে দমন করেছে আর অন্যদিকে মণিপুর সমাজে ইতিমধ্যেই থাকা জাতিদ্বন্দ্বকে উস্কে দিয়ে, একের সঙ্গে অন্যের বিরোধকে চাগিয়ে দিয়ে অনৈক্য সৃষ্টি করে দুর্বল করতে চেয়েছে। মণিপুরে জাতি, জাতিসত্তা ও উপজাতি মিলিয়ে প্রায় ৩৫টি মানবগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে সংখ্যাগুরু হল মৈতেয়ীরা। ‘মৈতেয়ী’ শব্দটি দুটি শব্দ থেকে এসেছে, ‘মৈ’ আর ‘তেয়ি’ বা ‘থি’। বর্মী ভাষায় ‘মৈ’ শব্দটির অর্থ হল মানুষ এবং ‘তেয়ি’ বা ‘থি’ বা ‘থাই’ শব্দটির অর্থ হল থাই জনগোষ্ঠী, যাঁরা চিনের মধ্যাঞ্চল থেকে এসেছিলেন। অন্য একটি মত হল ‘থি’ শব্দটি সাতটি গোষ্ঠীর মানুষের মিশ্রণের ফলে উদ্ভূত একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়কে বোঝায়। এই সাতটি গোষ্ঠী হল মইরাং, নিংথৌজা, অঙ্গম, চেংলি, নাংগবা, লোয়াং এবং খুমন। মৈতেয়ীরা মণিপুরে শুধু সংখ্যাগুরুই নয়, শিক্ষা সংস্কৃতি রাজনীতিতে এগিয়ে থাকা আধিপত্যকারী জাতি। ফলে মৈতেয়ীদের সঙ্গে মণিপুরের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগুলির দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের লম্বা ইতিহাস রয়েছে।
কুকি-মৈতেয়ী দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে উঠে পড়ে লাগে। অনেক আগে থেকেই তারা এই অঞ্চলে সক্রিয়, তবু ২০১৪ সালের পর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরএসএসের ‘সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে যায়। গতবছর ১৪ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়, মৈতেয়ীদের তফসিলভুক্ত আদিবাসী হিসাবে গণ্য করার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে। এরপরেই মণিপুরে শুরু হয়ে যায় অশান্তি। ৩ মে মণিপুরের আদিবাসী ছাত্র ইউনিয়ন মৈতেয়ীদের আদিবাসী তকমা পাওয়ার দাবির বিরুদ্ধে মিছিল ডাকে। মিছিলের পরই চূড়াচাঁদপুর, বিষ্ণুপুর, সেনাপতি প্রভৃতি জেলায় সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। অনতিবিলম্বে সেই সংঘর্ষ এক ভয়ানক জাতিদাঙ্গায় পরিণত হয়। কাগজে কলমে ২২০ জন নিহত, ৩২ জন নিখোঁজ, পঞ্চাশ হাজার মানুষ উদ্বাস্তু, বহু ঘরবাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। মৈতেয়ীদের মত একটি এগিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করা, হাইকোর্টের প্রশ্রয় পাওয়া আর কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের অদৃশ্য সুতোর খেলা মণিপুরকে অশান্ত করে তুলল।
বিজেপি যে শুধু মৈতেয়ী-কুকি দ্বন্দ্ব খুঁচিয়ে তুলল তাই নয়, তারা এই দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করল খ্রিস্টান কুকিদের বিরুদ্ধে হিন্দু মৈতেয়ীদের পক্ষ নিয়ে। বস্তুত মণিপুরের জাতিদ্বন্দ্বে এই ধর্মীয় মাত্রা যোগ করা অভিনব ব্যাপার। এর মধ্যে দিয়ে শুধু যে মৈতেয়ী-কুকি দ্বন্দ্ব খুঁচিয়ে তোলা গেল এবং তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে তাকে আরও জটিল করা গেল তা নয়, ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে মৈতেয়ীদের ধারাবাহিক দ্বন্দ্বকে একভাবে প্রশমিতও করা গেল। এক ঢিলে বিজেপি কতগুলো পাখি মারল দেখুন। সাধে কি আর বলা হয়, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনকামী শক্তির কাছে বিজেপি হল নেতিবাচক শিক্ষক?
প্রাচীনকাল থেকে মণিপুর ছিল প্রকৃতপক্ষে লোকায়তিক সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের জায়গা। মানুষ সাধারণভাবে প্রকৃতি পূজা ও দেহতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিল। বঙ্গ-কলিঙ্গ-আসামে যা তন্ত্রদর্শন, তা-ই মণিপুরে লাই-হরোবা উৎসবে প্রতিফলিত হতে
দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে লাই-উমাংগ থেকে আসে লাই-হরোবা। লাই মানে
দেবতা আর উমাংগ মানে অরণ্য।
মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্মের সম্প্রসারণ কবে হয়েছিল তা বিতর্কিত। মণিপুরের একটি জেলা বিষ্ণুপুর নামে পরিচিত। এখানে প্রধানত বিষ্ণুপ্রিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। মণিপুরী বলতে সাধারণত মৈতেয়ী এবং বিষ্ণুপ্রিয়াদের একত্রে বোঝানো হয়। কিন্তু অনেক মৈতেয়ী তা মানতে চান না। তাঁরা বিষ্ণুপ্রিয়াদেরও বহিরাগত বা মায়াং বলে মনে করেন। মণিপুর সহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে এ এক গভীর সমস্যা। সবাই অন্যকে বহিরাগত বলে চিহ্নিত করতে চায়। ইতিহাসবিদদের মতে যদিও মণিপুর ছিল আদতে নাগাদের জায়গা। মৈতেয়ীরাই এখানে এসেছে পরে। তবু মৈতেয়ীরা অন্য সবাইকে মায়াং বলে অভিহিত করে থাকে। যা-ই হোক, ইতিহাস এবং রাজনীতির এই জটিলতার মধ্যে আমাদের আপাতত ঢোকার দরকার নেই। কিন্তু যা বলতে চাইছিলাম তা হল, বিষ্ণুপুরে পঞ্চদশ শতাব্দীর বিষ্ণু মন্দির এই সাক্ষ্য দেয় যে মণিপুরে তখন থেকেই বিষ্ণু পুজো প্রচলিত। মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া গোষ্ঠীর আগমনও সম্ভবত সেই সময়। যা-ই হোক, অষ্টাদশ শতাব্দীতে মহারাজা ঘরিব নিউওয়াজের সময়ে শান্তিদাস গোস্বামী রাজার হাত ধরে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তন করেন। সর্বত্র যা হয় এখানেও তাই হল। রাজার ধর্ম ক্রমে প্রজার ধর্ম হয়ে দাঁড়াল। রাজকার্যে বাংলা লিপির প্রচলন বাড়ল। পরবর্তীকালে শিক্ষাদীক্ষা সবেতেই বাংলা লিপি জায়গা করে নিল। সংবাদপত্রের ভাষাতেও বাংলা লিপির আধিপত্য তৈরি হল।
প্রাচীনকাল থেকে মণিপুর ছিল প্রকৃতপক্ষে লোকায়তিক সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের জায়গা। মানুষ সাধারণভাবে প্রকৃতি পূজা ও দেহতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিল। বঙ্গ-কলিঙ্গ-আসামে যা তন্ত্রদর্শন, তা-ই মণিপুরে লাই-হরোবা উৎসবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে লাই-উমাংগ থেকে আসে লাই-হরোবা। লাই মানে দেবতা আর উমাংগ মানে অরণ্য। লাই-হরোবা উৎসব হল দেবতাদের সঙ্গে খেলাধুলো। এই উৎসবে কোনো ভেদাভেদ নেই। উচ্চনিচ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ তার অংশীদার। বছরের প্রথম দিকে গোটা মণিপুর জুড়ে নাটক, গান, কুস্তি, তলোয়ার খেলা, মুষ্টিযুদ্ধ, দড়ি টানাটানি, হকি প্রভৃতি খেলা নিয়ে এই উৎসব চলে। এই উৎসবের দার্শনিক ভিত্তি কিন্তু দেহতত্ত্ব। নংপোক্-নিংথৌ এবং পানথৌবির (সাংখ্য দর্শনে যা পুরুষ ও প্রকৃতি, তন্ত্রে যা নর ও নারী, সহজিয়াতে সাধনসঙ্গী) মিলন এবং তার মধ্যে দিয়ে সমস্ত সৃষ্টি, এই জগৎ, এই ভূমা এবং সবকিছু।
লাই-হরোবার পাশাপাশি মণিপুরে ছিল সন্মাহি পূজা। সন্মাহিই সেখানকার আদি দেবতা। কিন্তু অষ্টাদশ শতক থেকে সেখানে ক্রমে জাঁকিয়ে বসে বৈষ্ণব ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। মণিপুরের অধিকাংশ মানুষই কিন্তু এই পরিবর্তনকে ভাল চোখে নেননি। অন্যদিকে পাহাড় জঙ্গলের দুর্গম এলাকায় নাগা, কুকিরা কিন্তু ইংরেজ জমানা থেকেই মিশনারিদের প্রভাবে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে থাকেন। কিন্তু মণিপুরের জাতিদ্বন্দ্বে অতীতে ধর্মের প্রশ্ন কখনোই খুব বড় আকারে উঠে আসেনি। বরং ধর্মের প্রশ্ন ভিতরে ভিতরে জড়িয়ে থেকেছে রাজতন্ত্রবিরোধী এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রবিরোধী লড়াইয়ে, মনোভাবে। ব্যাপারটা কেমন?
মণিপুরে যখন থেকে রাজার হাত ধরে বৈষ্ণব ধর্মের রমরমা শুরু হয় তবে থেকেই ভিতরে ভিতরে বহু মানুষ ছিলেন বৈষ্ণববিরোধী। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার একটা রূপ ছিল বৈষ্ণব ধর্মের বিরোধিতা। পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর মণিপুরের ভারতভুক্তির পর থেকে ধীরে ধীরে ভারতরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকরণও হয়ে ওঠে এই বৈষ্ণববিরোধিতা। ১৯৬৭ সালে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের সময়ে মৈতেয়ী স্টেট কমিটি নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়, যার প্রধান দাবি ছিল স্বাধীন মণিপুর। মৈতেয়ী মরূপ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন মণিপুরে সংস্কৃত, বাংলা ইত্যাদির পরিবর্তে মাতৃভাষা মণিপুরীতে শিক্ষাদানের দাবিকে সামনে রেখে প্রচার আন্দোলন চালাত। সন্মাহির পুজো বা প্রাচীন মেরা-মেন্তোংবা উৎসব প্রচলনের চেষ্টা, বৈষ্ণব ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ, জনপ্রিয় রাসলীলা নৃত্য বন্ধ করার দাবি, মেয়েদের দেবী পদবি এবং পুরুষদের সিংহ পদবি বন্ধ করার আহ্বান, তিলক-ফোঁটা, শাড়ি প্রভৃতি পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা – সবকিছুই ছিল মণিপুরের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের সংগ্রামের সাংস্কৃতিক রূপ।
রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার একটা রূপ ছিল বৈষ্ণব ধর্মের বিরোধিতা। পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর মণিপুরের ভারতভুক্তির পর থেকে ধীরে ধীরে ভারতরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকরণও হয়ে ওঠে এই বৈষ্ণববিরোধিতা।
মণিপুরের ভারতভুক্তির সময় থেকে সাম্প্রতিককালে বিজেপির রমরমা শুরু হওয়া পর্যন্ত এই ছিল অবস্থা। কিন্তু বিজেপি মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মৈতেয়ী জনগণকে বোঝায়, মৈতেয়ীরা যদি বৈষ্ণব হওয়ার সুবাদে নিজেদের হিন্দু পরিচয় মেনে নেয় তাহলে মোদী সরকারের কাছ থেকে রাজ্যের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় মৈতেয়ীরাই বেশি সুযোগসুবিধা ও অধিকার পাবে। ২০১৭ সালে এই প্রচারের ভিত্তিতেই বিজেপি মণিপুরের ৬০ সদস্যবিশিষ্ট বিধানসভায় শূন্য থেকে লাফ দিয়ে ২১টি আসন করায়ত্ত করে মিলিজুলি সরকার গঠন করার জায়গায় পৌঁছে যায়। স্বাভাবিকভাবেই নাগা-কুকি-জোদের সঙ্গে মৈতেয়ীদের দ্বন্দ্ব যেমন ভিন্ন মাত্রা অর্জন করে তেমনই ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে মৈতেয়ীদের দ্বন্দ্বও সাময়িকভাবে প্রশমিত হয়।
বিজেপির সাফল্য ক্ষণস্থায়ী
তীব্র জাতিগত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও আদতে মণিপুর ছিল একটা সহনশীল রাজ্য। মানবতা, সহনশীলতা, উদারতায় মণিপুরের বিশিষ্ট স্থান ছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামেরও বড় ক্ষেত্র ছিল মণিপুর। আজকের বিজেপি-আরএসএসের পূর্বসূরীরা যেখানে ব্রিটিশের কাছে মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে, সেখানে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একরোখা বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে মণিপুর ছিল সামনের সারিতে। প্রগতিশীল তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও বড় জায়গা ছিল মণিপুর। সেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত হয় যাঁর হাত ধরে, তাঁর নাম হিজম ইরাবৎ সিংহ। তিনি মণিপুরের রাজপরিবারের আত্মীয় ছিলেন। মহারাজ চূড়াচাঁদ সিংহের ভাইঝির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু প্রজাদের দারিদ্র্য ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রবল সংগ্রাম করেন। ব্রিটিশদের পরামর্শে মহারাজ চূড়াচাঁদ ইরাবৎকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামে বেঁধে রাখার জন্য ১৯৩৪ সালে নিখিল মণিপুর হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই তার সভাপতি হন। ইরাবৎকে সহসভাপতি করে দেন। কিন্তু কালক্রমে ইরাবৎ প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তাঁকেই সভাপতি করতে হয়। ১৯৩৮ সালে হিন্দু মহাসভার সভাপতি হয়েই ইরাবৎ সংগঠনের নাম থেকে ‘হিন্দু’ কথাটি বাদ দিয়ে দেন এবং অত্যন্ত দ্রুত একে ব্রিটিশবিরোধী ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রবিরোধী এক জঙ্গি সংগঠনে রূপান্তরিত করেন। চূড়াচাঁদের চালাকি তাঁর নিজের বিরুদ্ধে চলে গেছে দেখে অবশেষে ইরাবৎকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বিরুদ্ধে প্রজারা ভয়ানক বিদ্রোহ শুরু করলে সবরকম বিক্ষোভ কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এবার ইংরেজরা মহারাজকে আরেকটি এমন পরামর্শ দেয় যার পরিণতি রাজশক্তি ও ব্রিটিশশক্তির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ইরাবৎকে মণিপুরের জেলে না রেখে সিলেট জেলে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সিলেট জেলে তখন বীরেশ মিশ্র, জ্যোতির্ময় নন্দের মত একগুচ্ছ কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন। তাঁদের সংস্পর্শে এসে ইরাবৎ দ্রুত মার্কসবাদী হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৪২ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রথমে আসামে এবং পরে মণিপুরে ইরাবৎ কমিউনিস্ট পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মণিপুরে কমিউনিস্ট পার্টি এবং কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই হাত ধরে। আজও ইরাবৎ মণিপুরের সাধারণ মানুষের চোখে একজন জাতীয় নায়ক হয়ে রয়েছেন।
১৯৪২ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রথমে আসামে এবং পরে মণিপুরে ইরাবৎ কমিউনিস্ট পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মণিপুরে কমিউনিস্ট পার্টি এবং কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই হাত ধরে। আজও ইরাবৎ মণিপুরের সাধারণ মানুষের চোখে একজন জাতীয় নায়ক হয়ে রয়েছেন।
সবদিক থেকে মণিপুর আক্ষরিক অর্থেই ভারতের মণি হিসাবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রগতিশীল ভাবনাচিন্তা ও দর্শন এখানকার মাটিতে প্রোথিত আছে। ১৯৭২ সালে পূর্ণ রাজ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর মণিপুরের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন একজন মুসলমান – মহম্মদ আলিমুদ্দিন। বৈষ্ণব ও সন্মাহী ধর্মের অধিকাংশ মানুষ কিন্তু তা সহজেই মেনে নিয়েছিলেন, যদিও রাজ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা সাত শতাংশেরও কম। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নাগা বা কুকিরাও তাতে কোনো আপত্তি করেননি। সহনশীলতা, উদারতার এ এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই সহনশীলতা, উদারতাকে ভারতের শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিনষ্ট করেছে নিজেদের শাসনের স্বার্থে, শোষণের স্বার্থে। এ তাদের ঐতিহাসিক অপরাধ। নাগা, কুকি, জো, মৈতেয়ীরা যাতে কখনই পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে না পারে তার জন্য চক্রান্তের শেষ নেই। আজ সবাই চাইছে তাদের আলাদা ভূখণ্ড। নাগারা চাইছে নাগালিম, কুকিরা চাইছে জালেন-গাম বা কুকি রাজ্য। একেকটি জাতি আবার তাদের মধ্যেকার গোষ্ঠীগুলির মধ্যেকার সংগ্রাম ও অন্তর্কলহে বিদীর্ণ। আজ বিজেপি সেখানে আমদানি করেছে ধর্মীয় সংঘাত। কিন্তু মণিপুরের মাটির গভীরে প্রগতিবাদ, মানবতাবাদ ও রাষ্ট্র তথা শাসকবিরোধী প্রতিবাদী, সংগ্রামী চেতনা বিরাজ করে। ফিনিক্স পাখির মত সে আবার তার চিতাভস্ম থেকে সোনালি রৌদ্রে উড়ে যাবে। বিজেপির সাফল্য তাই ক্ষণস্থায়ী। খুব বেশিদিন মণিপুরকে তারা নিজেদের কব্জায় রাখতে পারবে না। মৈতেয়ীদের মত একটি মহান জাতি, যাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে, তাদের চিরকাল নিজেদের ভক্ত বানর সেনা বানিয়ে রাখা যাবে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







