সবাইকে চমকে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। একটি বড় গুগলি তিনি ছেড়েছেন তেলেঙ্গানার ভেমুলাওয়াড়া থেকে। এতবছর ধরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শিল্পপতি গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ তুললেও প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে রা কাড়েননি। আজ ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের মাঝপথে এসে মোদীকে তেলেঙ্গানার প্রকাশ্য জনসভা থেকে আদানি-আম্বানিদের নাম কেন টেনে আনতে হল, তা সকলকেই বিস্মিত করেছে।

তিনি অভিযোগ করেছেন যে রাহুল এতদিন ধরে আদানি-আম্বানিদের নাম করলেও নির্বাচনের সময়ে তাঁদের সম্পর্কে চুপ। কেন? তবে কি রাহুল আর এই শিল্পপতিদের মধ্যে কোনো গোপন চুক্তি হয়েছে? টেম্পোতে করে এঁরা কি কংগ্রেসের কাছে টাকা পৌঁছে দিয়েছেন?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একদম পাড়ার দাদার ঢঙে রাহুলও এর উত্তর দিয়েছেন – তবে কি মোদীজি ভয় পেয়ে গেছেন? তাঁর কি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে এভাবে টাকা নেওয়ার?

মোদীর এই ধরনের মন্তব্য শুনে মনে হতে পারে তবে কি আদানি-আম্বানিরা তাঁর মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছেন? কারণ নির্বাচনী বন্ডের তথ্য সামনে আসার পরে প্রমাণিত হয়েছে যে শিল্পপতিরা ‘কিছু’-র বিনিময়েই মূলত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদান দিয়ে এসেছেন। শিল্পপতিদের টাকায় নির্বাচনে লড়া নতুন কিছু নয়। কোন শিল্পপতি কাদের দিকে বেশি টাকা ঢালছেন তার উপর প্রচারের জৌলুসও নির্ভর করে। অবশ্যই শিল্পপতিরা তাঁর দিকেই টাকা ঢালবেন যাঁর সরকার গড়ার সম্ভাবনা বেশি। কাজেই মোদীর বক্তব্য শুনে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়, যে এই দুই শিল্পপতি হয়ত বিজেপিকে ছেড়ে কংগ্রেসকে এই নির্বাচনে টাকা দিয়ে লড়তে সাহায্য করছেন।

তা যদি হয়েও থাকে, তাহলেই বা মোদী একথা প্রকাশ্যে বলতে গেলেন কেন? বিশেষত যখন এটা নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়? তাছাড়া এতবছর ধরে রাহুল সংসদের বাইরে ও ভিতরে এতবার অভিযোগ করার পরেও মোদী যখন নীরব থেকেছেন? তাহলে রাহুলকে আবার সেই অভিযোগ তোলার সুযোগ দিলেন কেন?

কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে যেমন মিথ্যা প্রচার করেছেন মোদী ও বিজেপির অন্য নেতারা, তেমন এটিও অর্ধসত্য যে রাহুল নির্বাচনী প্রচারে আম্বানি-আদানিদের কথা একেবারেই তুলছেন না। তিনি প্রায় প্রতিটি প্রচারেই তাঁদের কথা তুলছেন।

শুধু রাহুল যা করছেন তা হল, আম্বানি-আদানিদের কথা প্রচারের আলোয় সেভাবে না এনে মহিলা, যুবক, দলিত এবং পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষ আর কর্মসংস্থান নিয়ে কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতির কথা বেশি করে বলছেন। সেটাই সংবাদমাধ্যমে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এখানেই মোদী খানিকটা পিছিয়ে পড়েছেন। ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ দিয়ে প্রচার শুরু করেও (এখনো ডিজিটাল মাধ্যমে বা বিলবোর্ডে সেই প্রচার দেখা যাচ্ছে) কিন্তু মোদীর প্রতিশ্রুতির ইস্যুকে বিজেপি সারা ভারতের ইস্যু করে তুলতে পারেনি বা চায়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া ছিল। তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের দুর্নীতি সম্পর্কে বিরক্ত ছিলেন সাধারণ মানুষ। সেখানে মোদী নিজেকে গুজরাট মডেলের আড়ালে নতুন মুখ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে মোদী নিজেকে ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। পুলওয়ামা-বালাকোট, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং সংঘ পরিবারের সংগঠনের উপর ভরসা করে তরী পার করেছিলেন।

২০২৪ সালে এসে মোদী বুঝতে পেরেছেন, দেশজুড়ে একটা নির্দিষ্ট হাওয়া তুলতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপই হোক বা রামমন্দির তৈরির সাফল্য – সারা দেশের মানুষের মনে ভোটের ইস্যু হিসাবে এগুলোকে ঢোকাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। হিন্দু-মুসলমান বিভাজন বিজেপির মূল ভোটব্যাঙ্ককে শক্তিশালী করলেও নতুন ভোট টানতে অতটা কার্যকরী হচ্ছে না। দশবছর একটা সরকার চলার পরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একটা ক্লান্তিও আসে বড় ধামাকা না হলে।

আরো পড়ুন মোদীর মুসলমানবিদ্বেষী মন্তব্য কি বিজেপি শিবিরে আতঙ্কের প্রতিফলন?

তার উপর জাতীয় ইস্যুর থেকে স্থানীয় ইস্যু ও রাজনৈতিক সমীকরণ বড় হয়ে উঠছে এই নির্বাচনে। সে পশ্চিমবঙ্গের সন্দেশখালি হোক বা শিক্ষক-নিয়োগ দুর্নীতি বা দিল্লিতে কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি-জামিন অথবা মহারাষ্ট্রে শরদ পাওয়ার ও উদ্ধব ঠাকরের দল ভাঙানো, কিম্বা কর্ণাটকে প্রোজ্জ্বল রেবন্নার বিরুদ্ধে কয়েকশো মহিলাকে ধর্ষণ এবং তার ভিডিও করার অভিযোগ। এনডিএ শরিকদের নিয়েও খুব একটা স্বস্তিতে নেই বিজেপি। সে বিহারের নীতীশ কুমার হোন বা কর্ণাটকের কুমারস্বামী; অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু বা মহারাষ্ট্রের অজিত পাওয়ার, একনাথ শিন্ডে। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্ব ও রাহুল যুবকদের শিক্ষানবিশী ও কর্মসংস্থান, সরকারি অফিসের শূন্যপদ পূরণ, মহিলাদের জন্য মহালক্ষ্মী প্রকল্প, জাতভিত্তিক জনগণনা, পিছিয়ে পড়া জনজাতির জন্য দেশের সম্পদ সুষম বণ্টনের কথা বলছেন।

এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মোদী যে ইস্যু পাচ্ছেন তাই আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ভোটাররা এবার বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে বুথে আসছেন না। এর দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে – ১) বিজেপির মূল ভোটাররাই ভোট দিতে আসছেন, ২) বিজেপির ভোটাররা ভাবছেন মোদী তো অনায়াসেই জিতে যাবেন। ফলে এই গরমে ভোট দিতে যাওয়ার কী দরকার? দ্বিতীয়টা হলে বিজেপির জন্য চিন্তার বিষয়। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া তত তীব্র না হলেও বিরোধী ভোটাররা যদি বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে যান, তাহলে লাভ বিরোধীদের।

স্থানীয় ইস্যু, উন্নয়নের ইস্যু সামনে এলেই মোদীরা একটু ঘাবড়ে যান। কারণ সেক্ষেত্রে মোদীকে সামনে রেখে বৈতরণী পার হওয়া খুবই কষ্টকর। কর্ণাটক বা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনই এর বড় উদাহরণ। সুতরাং মোদী চান রাহুল তাঁর পুরনো ছকে ফিরে আসুন। সরকারে এলে কী করবেন সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছেড়ে আম্বানি-আদানি জপতে থাকুন। কংগ্রেসের সঙ্গে আম্বানি-আদানির সম্পর্কের কথা বলে ভোটারদেরও মোদী বিভ্রান্ত করতে চান। তাতে সুবিধা বিজেপির। অচেনা ছকে বিপাকে পড়ে গেছেন মোদী, তাই এই গুগলি ছেড়েছেন। আরও হয়ত অনেক গুগলি বাকি রয়েছে। নির্বাচন শেষ হতে এখনো দেরি আছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.