গত রবিবার (২১ এপ্রিল) রাজস্থানের এক নির্বাচনী প্রচারসভায় তাঁর জীবনের অন্যতম বিতর্কিত এবং বিভেদমূলক বক্তৃতাটি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘যাদের বেশি সন্তান’ – এই দুটি বৈশিষ্ট্যের দ্বারা দেশের আপামর মুসলমান জনসাধারণকে চিহ্নিত করে মোদী বলেন যে বিরোধীরা অর্থাৎ জাতীয় কংগ্রেস জিতলে হিন্দুদের সব সম্পত্তি মুসলমানদের হাতে চলে যাবে।

মুসলমানরা ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪.২%। হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার ৭৯.৮%।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারতীয় জনতা পার্টির হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের মুখ হয়ে ওঠা মোদী তাঁর বিভেদ ও মেরুকরণের রাজনীতির জন্য প্রসিদ্ধ তো বরাবরই। কিন্তু রবিবারের ওই বক্তৃতা তাঁর সেই বরাবরের প্রসিদ্ধিকেও বলতে গেলে একটু ছাপিয়েই গেছে। শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে সেদিন মোদী বলেন ‘ওরা (কংগ্রেস) যখন ক্ষমতায় ছিল, ওরা বলেছিল যে দেশের সম্পত্তির উপর প্রথম অধিকার মুসলমানদের। এর অর্থ হল, যাদের সন্তানের সংখ্যা বেশি, দেশের সম্পদ ওরা তাদের মধ্যেই বিলি করে দেবে। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিলি করে দেবে। আপনাদের কষ্টার্জিত সম্পদ কি অনুপ্রবেশকারীদের দিয়ে দেওয়া উচিত? আপনারা কি সেটা মেনে নেবেন?’

যদিও ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের ইউপিএ সরকারের আমলে, কখনোই এমন কোনো কথা বলেননি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। জাতীয় কংগ্রেসও এমন কোনো আশ্বাস কোনোকালে দেয়নি। কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায়ের কথা বলা হয়েছে। আর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তাঁর এক সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন যে তাঁর দল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এলে, একটি জাতীয় সমীক্ষার মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশগুলির ক্ষমতা ও আর্থসামাজিক অবস্থান নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় অনুপাতে সম্পদ, কাজ ও জনকল্যাণ প্রকল্পের সুবিধা বন্টন করা হবে। এই পিছিয়ে পড়া অংশ বলতে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিভিন্ন উপজাতি ও জনজাতি, দলিত এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কথা বুঝিয়েছেন।

কিন্তু রবিবারের জমায়েতে মোদী বলেন যে কংগ্রেসের ইশতেহারে বলা আছে হিন্দু মা-বোনেদের সোনাদানার হিসাব নিয়ে তারা তা মুসলমানদের মধ্যে বিলি করে দেবে। আরও এককাঠি এগিয়ে তিনি এও বলেন যে ‘আরবান নকশাল’-দের এইসব ভাবনা কিন্তু মা-বোনেদের গলার মঙ্গলসূত্রকেও রেহাই দেবে না।

নাগরিক অধিকার এবং মানবাধিকার কর্মীদের অতি বাম মাওবাদী হিসাবে দাগিয়ে দিতে এই ‘আরবান নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে থাকে বিজেপি। হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের সঙ্গে ‘আরবান নকশাল’-দের জড়িয়ে ফেলা এই মন্তব্য নানা প্রশ্ন তুলছে। প্রথম দফার নির্বাচনের ঠিক পরে পরেই কেন এমন মন্তব্য – তা ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। লোকসভার মোট ৫৪৩ কেন্দ্রের মধ্যে ১০২ কেন্দ্রে নির্বাচন হয় ১৯ এপ্রিল। এর আগে পর্যন্ত মোদীর প্রচারে মুখ্য বিষয় ছিল উন্নয়ন। এমনকি অন্যান্য মন্ত্রীদেরও তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন তথ্যের ভিত্তিতে সতর্কভাবে কথা বলার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই আর তথ্যের ধার ধরলেন না মোদী।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহারের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের পুরনো কৌশল। কারণ এই প্রচারের মাধ্যমে সহজেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করা যায়। যদিও তথ্যের ভিত্তিতে দেখলে এই দাবি বিতর্কের অবকাশ রাখে। কেন না, একদিকে যেমন মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মের হার ক্রমশ কমেছে, তেমনই অঞ্চল ভেদে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মের হারে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে।

দ্য ওয়্যার ওয়েবসাইটের রাজনৈতিক বিভাগের সম্পাদক অজয় আশীর্বাদ মহাপ্রশস্তের মতে গত ২০ বছরের মধ্যে মোদীকে এতটা মরিয়া হতে দেখা যায়নি। তিনি বলেন ‘২০০১-০২ সালে, প্রথম দফায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন, মুসলমানদের সরাসরি পাকিস্তানি বা পঁচিশটি করে সন্তানের জন্ম দেয় যারা ইত্যাদি বলতেন মোদী। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় দফা (২০০২-০৭) থেকে এইসব সরাসরি আক্রমণাত্মক বক্তব্যের ভার তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও মন্ত্রী অমিত শাহের উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজে বলতেন উন্নয়নের কথা এবং মুসলমান সম্প্রদায় সম্বন্ধে কেবল ইঙ্গিতমূলক কিছু কথা। এখন আবার তিনি স্বমূর্তি ধরেছেন।’

রবিবারের বক্তব্যের পর বিভিন্ন গণমাধ্যম যখন তাঁর তথ্য বিকৃতির বিষয়ে আলোকপাত করছে, মোদী কিন্তু তখনো তাঁর আক্রমণ জারি রেখেছেন। উত্তরপ্রদেশের আলিগড়, যেখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বসবাস করেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, সেখানকার একটি জনসভাতেও মোদী বলেছেন যে কংগ্রেস তথা ইন্ডিয়া ব্লকের উদ্দেশ্য মানুষের আয়, সম্পদ, গাড়ি বাড়ির সমীক্ষা করে তা কমিউনিস্ট আদর্শ অনুযায়ী বিলি বন্টন করে দেওয়া। ২৩ এপ্রিল রাজস্থানের একটি জমায়েতেও তিনি আবার বলেন যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন দেশের সম্পদের উপর প্রথম অধিকার মুসলমানদের। এমনকি, উপজাতি ও নিম্নবর্ণের হিন্দু তথা দলিত সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে তাদের সাংবিধানিক অধিকারও মুসলমান সম্প্রদায়কে বিলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন তিনি বিরোধীদের, বিশেষত কংগ্রেসের, বিরুদ্ধে।

প্রশ্ন হল, কী কারণে মোদীর নির্বাচনী প্রচারের সুর হঠাৎ এমন বিষম চড়া হয়ে উঠল?

বহু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতেই এই নির্বাচনে তেমন জোরালো কোনো হাওয়া নেই। অর্থাৎ মোদীর পক্ষে বিশাল কোনো মাতামাতি নেই, যেমনটা ছিল ২০১৪ বা ২০১৯ সালে, আবার ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেও বিরাট কোনো ক্ষোভ নেই। একটি জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্রের কেন্দ্রীয় দফতরের একজন সম্পাদকের মতে বিজেপির উদ্বেগের কারণ আছে এবং ভোট যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে এই উদ্বেগ। ‘নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় বিষয়গুলি প্রাধান্য পাচ্ছে। লোকসভায় মানুষ যাদের প্রতিনিধি করে পাঠাচ্ছেন, তাদের কাছে ভাল কাজের প্রত্যাশা করছেন। এতে বিজেপির মনে জয় নিয়ে সংশয় বাড়ছে।’

হিন্দু জাতীয়তাবাদ নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তার মধ্যে একটি বই নরেন্দ্র মোদী: দ্য ম্যান, দ্য টাইমস। তাঁর মতে অবশ্য মোদীর বক্তব্যে বরাবরই অন্তত একটা সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ নিহিত থাকে এবং নতুন বক্তব্যটিও খুব ব্যতিক্রমী কিছু নয়। নীলাঞ্জন এই প্রতিবেদককে বললেন ‘মোদীর হাতে সবসময় দুটো তাস থাকে – উন্নয়ন আর সাম্প্রদায়িকতা। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কোন তাসটা তিনি খেলবেন। উদ্বিগ্ন ও বিচলিত থাকলে সাম্প্রদায়িক তাসটাই তাঁর প্রথম পছন্দ।’ এই উদ্বেগের একটা কারণ হতে পারে প্রথম দফার নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে কম ভোটদান। কংগ্রেসের ইশতেহারের সামাজিক ন্যায়ের প্রসঙ্গটির মধ্যেও সাম্প্রদায়িক বিভেদ টেনে আনা কি রাহুল গান্ধীর প্রতি মোদীর দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনেরই প্রতিফলন নয়? নীলাঞ্জন আরও বলেন ‘আগে ওরা (বিজেপি) রাহুলকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করত। এখন তাঁকে নীতি নিয়ে আক্রমণ করছে। এর থেকেই বোঝা যায় যে তারাও জানে রাহুলকে নিয়ে বিদ্রূপ করে আগের মত লাভ নেই, কেন না জনগণের মধ্যে তাঁর গুরুত্ব এবং তাঁর প্রস্তাবগুলির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এটাও তাদের উদ্বেগের আরেকটা কারণ।’

দ্য ওয়্যারের মহাপ্রশস্তও মনে করছেন যে আর্থিক বৈষম্যকে ভিত্তি করে বিরোধীদের যে প্রচার, তার মোকাবিলা করতে সাম্প্রদায়িকতার বাঁশিতে ফুঁ দিয়েছেন মোদী। যে জনসভা থেকে মোদীর এই বিতর্কিত বক্তব্য, তা একটি উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা। হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের চেয়ে জল, জঙ্গল, জমির প্রশ্ন সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারের মাধ্যমে এই জল, জঙ্গল, জমির প্রশ্নটিকে লঘু করতে চাইছে বিজেপি। এছাড়া উত্তর ভারতের মানুষও বিরোধী দলের উপর বিজেপি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে লেলিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। তাঁদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোও দরকার।

আরো পড়ুন বিজেপির সব চাই, ঠিক তৃণমূলের মতই! কিন্তু কেন?

মহাপ্রশস্তের কথায় ‘প্রায় সবকটি বিরোধী দলই সম্পদ বন্টনের বৈষম্য নিয়ে কথা বলছে। মোদীর আমলে এই বৈষম্য তীব্র আকার নিয়েছে। বিরোধীদের এই সামাজিক ন্যায়ের প্রস্তাবে যারা লাভবান হতে পারে, তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করতে চাইছেন মোদী। মেরুকরণের রাজনীতি ব্যবহার করে আর্থসামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে।’

নতুন দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল বর্মা কিন্তু মোদীর বক্তব্যকে বিজেপি শিবিরে উদ্বেগের প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন না। তাঁর মতে ‘নির্বাচনী প্রচারে আবেগের মাত্রা কিছু কম ছিল। জনসমর্থন চাগিয়ে তুলতেই মোদী তাঁর চিরাচরিত সাম্প্রদায়িকতার তাসটি আবার খেলেছেন।’ এমনটাও হতে পারে যে সংবিধান পাল্টাবার উদ্দেশ্যে বিজেপি ৪০০ লোকসভা আসন জিততে চাইছে – এই মর্মে কংগ্রেসের যে প্রচার, তারই মোকাবিলা করার চেষ্টা করছেন মোদী। বর্মা বলছেন ‘জাতের বিষয়টিকে একটি নির্বাচনী প্রসঙ্গ করে তুলতে চেষ্টা করেছে কংগ্রেস। আর তা থেকে নজর ঘোরাতে হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গ এনে নিজের হিন্দু সমর্থকদের তাতিয়ে তুলছেন মোদী। বিজেপির ৪০০ লোকসভা আসনের দাবি নিয়ে কংগ্রেসের প্রচার ঠেকাতেই এই কৌশল।’

তবে মোদীর এই বক্তব্যের তেমন প্রভাব জনমানসে পড়বে বলে মনে করছেন না দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অজয় গুড়াবর্তী। তাঁর সন্দেহ যে মঙ্গলসূত্র এবং মা-বোনদের সোনার গয়না নিয়ে মোদীর মন্তব্য বিশেষভাবে মহিলা ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ানোর চেষ্টা। প্রথম দফার নির্বাচনে পুরুষদের তুলনায় মহিলা ভোটারদের বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ বিজেপিকে এই জাতীয় প্রচারে উদ্বুদ্ধ করেছে। ‘দিল্লির নির্বাচনের সময়ে বিজেপির লোকসভা সদস্যরা এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে বিরোধীরা জিতলে হিন্দু মহিলারা ধর্ষিতা হবেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে ভয় জাগিয়ে তোলা তাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এতে করে তাদের পুরনো ভোটাররা আরও উৎসাহিত হতে পারে, কিন্তু নতুন ভোটার টানা যাবে না।’

ডিপ্লোম্যাট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.