পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল বনাম বিজেপির রাজনীতি থেকে শিক্ষা নিয়েই কি কেরালায় কংগ্রেস ও বাম নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে ধুন্ধুমার লড়াই করছেন? কংগ্রেস ও সিপিএম বা সিপিআইয়ের নেতারা কি চাইছেন যে এই লড়াই আরও তীব্র হোক বা আরও কদর্য?

দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার দেখে এমনটা মনে হওয়াই বোধহয় স্বাভাবিক। কেরালায় মূল লড়াই বরাবরই সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ বনাম কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের। এ রাজ্যে মহম্মদ সেলিমরা যতই রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার পথে তাঁর সঙ্গে একটিবার দেখা করতে উদ্যোগী হোন বা আসন সমঝোতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করুন কংগ্রেসের ডাকের, কিংবা অধীর চৌধুরীর হাত ধরে মুর্শিদাবাদে সভা করুন মহম্মদ সেলিম, কেরালায় কিন্তু কংগ্রেস ও বামেদের সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গে ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি বামফ্রন্টে থাকলেও কেরালায় কিন্তু তারা কংগ্রেসের জোটসঙ্গী। তারাও সিপিআই, সিপিএমের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে ওস্তাদ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে ওয়ায়নাড় থেকে আবার প্রার্থী করা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। কেরালার সিপিএম নেতারা প্রশ্ন করেছেন, উত্তর ভারত থেকে বা আরও স্পষ্টভাবে আমেথি বা রায়বেরিলি থেকে কেন প্রার্থী হলেন না রাহুল? যেখানে কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের মনে বল জোগানো দরকার, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে কেন কেরালায় আসার দরকার হল রাহুলের? রাহুলের নাম ঘোষণার আগেই বামেরা সিপিআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ডি রাজার স্ত্রী অ্যানি রাজাকে রাহুলের বিরুদ্ধে ওয়ায়নাড়ে প্রার্থী করে দিয়েছিল। অবশ্য দিল্লি থেকে কেরালায় এসে রাহুল কেন ভোটে লড়ছেন – এই প্রশ্ন উঠতেই পাল্টা কথা উঠেছে যে অ্যানিও তো দিল্লি থেকেই সর্বভারতীয় স্তরে রাজনীতি করেন। এখানে উল্লেখ্য, অ্যানিই এক তথ্য অনুসন্ধানী দল নিয়ে মণিপুরে গিয়েছিলেন এবং জাতিদাঙ্গাকে রাষ্ট্রপোষিত বলায় অ্যানি ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে পুলিস মামলা করে।

উল্টোদিকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা সরাসরি আঙুল তুলেছেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী এবং সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য পিনারাই বিজয়নের দিকে। বিজয়ন জবাব দিন, কেন ইডি, সিবিআই অন্য রাজনৈতিক নেতাদের জেরা করতে ডাকলেও, দুজন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করলেও, দুর্নীতির মামলায় বিজয়নকে ছাড় দিচ্ছে? পাল্টা বিজয়ন বলেছেন, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার ঠাকুমা জরুরি অবস্থার সময়ে তাঁকে জেলে পুরেছিলেন। কাজেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে তিনি ভয় পান না। কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভিএস অচ্যুতানন্দন রাহুল গান্ধীকে একবার ‘আমুল বেবি’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। বিজয়ন সেই ‘পুরনো নাম’ মনে করিয়ে দিয়েছেন রাহুলকে। এ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি।

আরো পড়ুন ভারতে পাঠ্যপুস্তকে ‘জেন্ডার ইনক্লুসিভিটি’: পিনারাই বিজয়ন কি সফল হবেন?

অথচ ওয়ায়নাড় থেকে গতবার ৪,৩১,০০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন রাহুল। হারিয়েছিলেন এলডিএফ প্রার্থী পিপি সুনীরকে। এবারও অঘটন না ঘটলে একই ফলের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা।

শুধু রাহুল-বিজয়ন তরজা নয়, কেরলের তিরুবনন্তপুরমের তিনবারের কংগ্রেস সাংসদ এবং এবারের প্রার্থী শশী থারুরও সিপিএমকে পাত্তা দিতে চাননি। এই আসনে গতবার দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিজেপি। এবার বিদায়ী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব চন্দ্রশেখরকে থারুরের বিরুদ্ধে লড়তে পাঠিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। এর মাঝেও সিপিএমের সঙ্গে বাকযুদ্ধে জড়িয়েছেন থারুর।

ত্রিশূর পুরম ভাড়াক্কুমানাথন মন্দিরের বার্ষিক উৎসবের অব্যবস্থা নিয়ে কংগ্রেস-সিপিএম তরজা তুঙ্গে উঠেছে। উৎসবের উদ্যোক্তাদের গাফিলতিতে সেখানে আতসবাজির প্রদর্শন বাতিল করতে হয় বলে অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিকভাবে এমনই চাপে পড়ে বিজয়ন সরকার, যে তারা বাধ্য হয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লেখে যে তারা ত্রিশূরের পুলিশ কর্তাকে শাস্তি দিতে সেখান থেকে সরাতে চায়। এই ত্রিশূরকেও পাখির চোখ করেছে বিজেপি।

ভাড়াকারায় সিপিএম প্রার্থী এবং কোভিড অতিমারীর সময়ে দারুণ কাজ করার জন্য বিখ্যাত কেরালার প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজা অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিকৃত ছবি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও কংগ্রেস-বাম তরজা থামেনি।

বিজেপি কিন্তু ক্রমাগত প্রশ্ন করে চলেছে, বিরোধীরা ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া করে যখন এত লাফাল, তাহলে ‘দিল্লিতে দোস্তি আর কেরালায় কুস্তি’ করতে হচ্ছে কেন? বাংলা তো ছেড়েই দিন, কেরালার প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুতে যখন ডিএমকের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটে কংগ্রেস আর সিপিএম সামিল, রাজস্থানে যখন কংগ্রেস শিকারা আসন সিপিএমকে ছেড়ে দিচ্ছে, তখন কেরালায় এমন তীব্র লড়াই কেন? এটা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু কেরালার রাজনীতি বলছে, ভোটারদের টনটনে জ্ঞান। তাঁরা জানেন কাকে বেছে নিতে হবে। কংগ্রেস আর বামেরাও জানে, এই লড়াইয়ে তাদের যে প্রার্থীই জয়ী হোন, আখেরে লাভ তাদেরই। এখানেই কেরালার রাজনীতির গূঢ় সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে।

সারা ভারত থেকে ৪০০ আসন নিয়ে আবার সংসদে প্রবেশ করার স্বপ্ন দেখছেন মোদী। সেই স্বপ্ন সফল করতে তাঁর দরকার দক্ষিণের রাজ্যগুলো থেকে বেশকিছু আসন। কেরালায় আরএসএসের দীর্ঘদিনের সংগঠন থাকলেও দাঁত ফোটাতে পারেনি বিজেপি। তার কারণ কেরালার রাজনীতিতে বাম ও কংগ্রেসের আধিপত্য। সেখানে হয় সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ, নয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ সরকার গড়ে। ২০১৯ সালে ২০ লোকসভার আসনের মধ্যে ইউডিএফ ১৯ আসনে জয় লাভ করে। এলডিএফ পেয়েছিল একটা আসন।

বিজেপি গতবার ১২ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল কেরলে। এবার তারা সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চন্দ্রশেখরের মত হেভিওয়েট প্রার্থী ছাড়াও ওয়ায়নাড়ে রাহুলের বিরুদ্ধে বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে সুরেন্দ্রনকে দাঁড় করিয়েছে বিজেপি। ত্রিশূর আসনকে পাখির চোখ করে মোদীর দল এখানে জনপ্রিয় অভিনেতা সুরেশ গোপীকে প্রার্থী করেছে। সারা রাজ্যের মধ্যে পালাক্কাড়েই একমাত্র বিজেপি পরিচালিত পৌরসভা রয়েছে। যদিও এখানে গতবার কংগ্রেস প্রার্থী ভিকে শ্রীকানন্দন জিতেছিলেন। এই আসনে পালাক্কাড় পৌরসভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান সি কৃষ্ণকুমারকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। আট্টিঙ্গল আসনে গতবার বিজেপির লড়াকু নেত্রী শোভা সুরেন্দ্রন বিজেপির ভোট ১০.৫% থেকে ২৫ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবার শোভাকে প্রার্থী না করলেও বিজেপি চমক দেওয়ার আশা করছে। মোদীও ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে, কেরালার খ্রিস্টানদের একাংশের মধ্যে বিদ্যমান মুসলমানবিরোধী আবেগকে কাজে লাগিয়ে এবং আরএসএসের সংগঠনকে ব্যবহার করে কেরালায় পদ্ম ফোটাতে চাইছেন।

কিন্তু বিজেপি যতই আশা করুক, কংগ্রেস ও বামেদের দাবি, মোদীকে এবারেও খালি হাতে ফেরাবে কেরালা। এই দাবির পক্ষে তাদের হাতিয়ার কিন্তু কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে তীব্র লড়াই। পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলোর নেতা ও সমর্থকেরা একটা শব্দ খুব ব্যবহার করেন – বাইনারি। অর্থাৎ এ রাজ্যে হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি – এই দ্বৈরথেই সবাই ব্যস্ত। ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভার নির্বাচনের পর বাংলায় সংসদীয় রাজনীতিতে বামেরা শূন্য হয়ে যাওয়ার পর এ রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিই মূল বিরোধী শক্তি হয়ে গেছে। তৃতীয় শক্তি হিসাবে বাম ও কংগ্রেসের অস্তিত্ব যে এখনো রয়েছে, তা সহজে স্বীকার করেন না বিজেপি ও তৃণমূলের নেতারা বা কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম।

একইসঙ্গে বাম সমর্থকরা গোপনে ও প্রকাশ্যে বিজেপি-তৃণমূলের গোপন আঁতাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। কোনোভাবেই মমতা ব্যানার্জি বা মোদীরা চান না যে বামেরা মাথা তুলে দাঁড়াক। বরং তাঁরা চান, ক্ষমতা ভাগাভাগি হোক বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে। যদিও সাগরদীঘি-পরবর্তী রাজনীতিতে বামেরা রাজ্য রাজনীতিতে জায়গা ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। কেরালায় আবার এই বাইনারির আশ্রয়েই নিজেদের রাজনৈতিক জমি ধরে রাখতে চায় সিপিএম এবং কংগ্রেস। বিজেপি যাতে তৃতীয় শক্তি হিসাবে মাথা চাড়া না দিতে পারে, তার জন্যই বোধহয় সিপিএম আর কংগ্রেসের এই তীব্র লড়াই।

কংগ্রেসের প্রাক্তন মন্ত্রী কে সি জোসেফ ঠিক এই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন দ্য প্রিন্টের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেছেন, কেরালায় কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে সমঝোতার কোনো প্রশ্নই নেই। একজোট হওয়া মানেই রাজ্যে বিজেপির জন্য দরজা হাট করে খুলে দেওয়া। বিজেপি যাতে বিরোধী পরিসরও দখল করতে না পারে, তার জন্যেই বাম বনাম কংগ্রেসের এমন তীব্র ও কদর্য লড়াই।

জাতীয় স্তরে দুই দলেরই প্রধান শত্রু বিজেপি। কাজেই কেরালা থেকে বাম বা কংগ্রেস, যে-ই জিতুক, দিল্লিতে বিজেপিবিরোধী শক্তিরই হাত শক্ত হবে। সুতরাং দিল্লিতে দোস্তি আর কেরালায় কুস্তি চলতে থাকুক। কারণ ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ভাল ফল করলেও, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা (এই প্রথম পর পর দুবার) সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সরকার গড়েছে। নেতাদের আশা, কেরালার মানুষ কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনীতির ফারাক বুঝতে পারেন। দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই জারি থাকলে রাজ্যে ক্ষমতা তৃতীয় শক্তির হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপি নেতারা ভাবেন বলে অভিযোগ। বাম ও কংগ্রেসের বিশ্বাস, এবারও কেরালায় ২০১৯ সালের ফলের অন্যথা হবে না। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল-বিজেপি মডেলেই কেরালায় বাম ও কংগ্রেস লাভবান হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.