বিজেপির সব চাই! বিরোধী দলের নেতাদের নিজেদের দলে নিয়ে নিতে যেমন তাদের কুণ্ঠা নেই, তেমনই বিরোধী সরকার ভেঙে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠাতেও তাদের কোনো সংকোচ নেই। গেরুয়া শিবিরের হাত যতদূর বাড়ানো যায়, নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা ততদূর ক্ষমতার হাত বাড়াতে কোনো দ্বিধা করেন না। তা সে নৈতিকভাবে হোক বা অনৈতিকভাবে।
‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’ – বিজেপি সম্বন্ধে এই প্রসঙ্গের অবতারণার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটটি হল রাজ্যসভা নির্বাচন এবং আবার লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতাদের নিজেদের দলে তুলে আনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। ফেব্রুয়ারি মাসেই উত্তরপ্রদেশ ও হিমাচল প্রদেশে বিরোধী দলের বিধায়কদের ভোট ‘কিনে’ নিজেদের প্রার্থীদের জিতিয়েছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশে সাতজন সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। একজন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অন্যদিকে হিমাচল প্রদেশে একটিমাত্র রাজ্যসভা আসনের জন্য ভোট হয়েছিল। সেখানে বিজেপি প্রার্থীর জেতার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ ৬৮ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেসের ৪০ জন এবং বিজেপির ২৫ জন বিধায়ক আছেন। সরল অঙ্কের হিসেবে কংগ্রেস প্রার্থীরই হেসে খেলে জিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু ছজন কংগ্রেস বিধায়ক নিজেদের প্রার্থী অভিষেক মনু সিংভির বদলে বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন এই নির্বাচনে। তিনজন নির্দল বিধায়কও বিজেপি প্রার্থী হর্ষ মহাজনকে ভোট দেন। ফলে অভিষেক ও হর্ষের ভোট সমান সমান হয়ে যায়। শেষে লটারির মাধ্যমে হর্ষ মহাজন নির্বাচিত হন, হেরে যান কংগ্রেসের অভিষেক। তিনি তৃণমূলের সমর্থনে গতবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় গেলেও এবার আর মমতা ব্যানার্জির সমর্থন জোগাড় করতে পারেননি।
রাজ্যসভা নির্বাচন নিয়ে বিজেপির যে কোনো মূল্যে জেতার আকুতি সহজে বোঝা যায়। ২০১৪ থেকে লোকসভায় গরিষ্ঠতা থাকলেও, ২৫০ আসনের রাজ্যসভায় এখনও বিজেপি ১০০ আসনের গণ্ডি পেরিয়ে উঠতে পারেনি। এনডিএ শরিকদের নিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পাঁচজন মনোনীত সদস্য (যাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) নিয়েও বিজেপির সদস্যসংখ্যা এখন ৯৭। সুতরাং রাজ্যসভায় নিজেদের সদস্য বাড়াতে যা খুশি তাই করতে পারেন বিজেপি নেতৃত্ব। এ নিয়ে তাঁদের কোনো রাখঢাক নেই।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়ায় বিজেপির কোনো জুড়ি নেই। বিহারে নীতীশ কুমারকে ইন্ডিয়া জোট থেকে ভাঙিয়ে নিয়ে এসে সরকার গড়া হোক, বা মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার অনুগামীদের ভাঙিয়ে কংগ্রেসের সরকার ভেঙে বিজেপি সরকার গড়া হোক। মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে ভেঙে দু টুকরো করে একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়া, পরে শরদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টিকেও একই কায়দায় দুই ভাগে ভাগ করে অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীকে সরকারে নিয়ে এসে মহারাষ্ট্র সরকারকে শক্তিশালী করা হোক – বিজেপির হাতযশের এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ শুধু গত দশবছরেই রয়েছে।
আবার মুকুল রায় বা শুভেন্দু অধিকারীর মতো সারদা-নারদ কাণ্ডে অভিযুক্তদের নিজেদের দলে নিয়ে আসা বা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া, একইভাবে ইডির খাতায় অভিযুক্ত অজিত পাওয়ারকে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী বানানো – এরকম উদাহরণও অসংখ্য।
আরো পড়ুন মতাদর্শের রাজনীতি ছাড়া বিজেপিকে হারানো যাবে না
কিন্তু বিজেপি এটা কেন করে? দল ভাঙানো, বিধায়ক কেনাবেচা, সরকার ফেলে দেওয়া, বিরোধী দলের নেতাদের নিজেদের দলে নিয়ে আসা – এসব করার দরকার কেন পড়ে নরেন্দ্র মোদীদের?
প্রথমত, বিজেপি চায় সারা দেশেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে। রাজ্য সরকারগুলির যত বেশি সম্ভব নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায় তারা। বিজেপি নেতৃত্ব শুধুই যে ভোটারদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি রূপায়ণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে এরকম কাজ করে তা নয়। সরকারে থাকলে পুলিস প্রশাসন এবং সে রাজ্যের সম্পদের উপরেও বিজেপি নেতাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকে। অন্যদিকে সরকার হাতে থাকলে রাজনৈতিক দল হিসাবে নিজেদের প্রভাব ও সংগঠন বাড়াতেও সুবিধা হয়।
এর পাশাপাশি বিরোধীদের দুরমুশ করতেও এটা কাজে লাগে। বিরোধীদের ছত্রখান করে দাও, যাতে তারা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। বিশেষত কোনো নির্বাচনের আগে এই বার্তা সাধারণ জনগণ ও নিজেদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, যে বিরোধীরা রাজনৈতিক লড়াইয়ে অক্ষম। বিরোধীরা নিজেদের সরকার বাঁচাতে পারে না, তারা নিজেদের বিধায়কদের দলের অনুগত রাখতে পারে না, তারা দলের নেতাদের সন্তুষ্ট রাখতে পারে না। এই ‘পারে না’ বার্তাটি বিরোধীদের কমজোর করে দেয়। তখন আর অনৈতিক কৌশলের প্রচার বেশি হয় না।
আইন থাকা সত্ত্বেও রাজ্যসভা নির্বাচনে বিরোধী বিধায়করা ড্যাং ড্যাং করে কেন্দ্রীয় শাসক দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে এবং এটা যে অনৈতিক, সেই প্রচার ছাপিয়ে সামনে আসে কীভাবে কংগ্রেস তাদের বিধায়কদের সামলে রাখতে পারে না বা সামলানোর জন্য কীভাবে বিধায়কদের একসঙ্গে হোটেলে আটকে রাখতে হয়।
বিশেষত লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধীদের দুর্বল ও মোদীকে সর্বশক্তিমান প্রমাণ করতে পারলে লাভ বিজেপিরই। এটা দেখানো সহজ হয় যে মোদী এত শক্তিমান, যে সবাইকে তাঁর কাছেই আসতে হয়। তিনিই পারেন সবাইকে মাথা নত করিয়ে নিজের পায়ের কাছে রাখতে। এরকম নেতা আর একজনও নেই। মোদীর ভাবমূর্তির এরকম প্রচার বিজেপির পক্ষে লাভজনক। তাই দলবদলু নেতারা জনতার দরবারে গিয়ে নির্বাচনে জিতেও যান। আবার এমনও নয় যে অন্য দল থেকে ভাঙিয়ে আনা নেতাদের সবসময় গুরুত্ব দিয়ে মাথার উপরে তুলে রাখেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এঁদের মধ্যে অনেকে হেরেও যান নির্বাচনে। তাই দরকার পড়লে তাঁদের ব্যবহার করেন বিজেপি নেতৃত্ব, দরকার ফুরিয়ে গেলে একপাশে সরিয়ে রাখেন।
এই সর্বগ্রাসী কৌশলের সঙ্গে অবশ্য দলের আদর্শের কোনো দ্বন্দ্ব নেই, আবার আপোষের ব্যাপারও নেই। নিজেদের মূল আদর্শগত ভিত্তিতে কোনোরকম সমঝোতা না করেই মোদী-অমিত শাহরা এগিয়ে যান। যাঁরা দলে আসছেন বা যাঁদের নিয়ে সরকার গড়ছেন, তাঁদের সঙ্গে বিজেপি ও আরএসএসের আদর্শগত মিল না-ও থাকতে পারে। দলবদলু নেতারা বিজেপির আদর্শকে মন থেকে মেনে নিলে ভাল, না মেনে নিলেও ক্ষতি নেই। তাঁরা শুধু বিজেপিকে ক্ষমতায় পৌঁছতে বা থাকতে সাহায্য করছেন মাত্র। ক্ষমতায় থাকলে বিজেপি-আরএসএসের অ্যাজেন্ডাকে তরান্বিত করা যাবে। তাই এই নিয়ে সংঘ পরিবারের কর্তাদেরও কোনও ছুঁতমার্গ নেই। মূল আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ক্ষমতার সমীকরণের রাজনীতির থেকে আলাদা করে চালনা করেন মোদীরা। খানিকটা সমান্তরালভাবে।
একই ভাবে এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকেও চালনা করেন মমতা। তাঁর সব চাই। দরকার না থাকলেও পঞ্চায়েত চাই, পৌরসভা চাই, বিধায়ক চাই। বিরোধীদের তছনছ করে দিয়ে তাঁর সব চাই। তবে মোদীদের সঙ্গে একটি পার্থক্য রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। এই সর্বগ্রাসী, সর্বত্র বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এই রাজ্যেও একইভাবে বয়ে নিয়ে চললেও বা বিজেপির সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টেক্কা দিলেও, তৃণমূল কংগ্রেসের আদর্শগত কোনো ভিত্তি না থাকায় এটি শুধুই ক্ষমতার রাজনীতির কৌশলেই আটকে থাকে।
কংগ্রেসের মত বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রে ক্ষমতায় না থাকায় এই আগ্রাসী মনোভাব দেখাতে সক্ষম হয় না সবসময়। অন্যের দল ভাঙানো তো দূরের কথা, নিজেদের দলের নেতা-বিধায়ক-সাংসদদেরও একসঙ্গে রাখার কৌশলে বারবার ব্যর্থই হন কংগ্রেস নেতৃত্ব। রাহুল গান্ধী এমনিতেই ভাব-ভালবাসা দেখিয়ে অন্য দলে পা বাড়ানো নেতাদের আটকাতে পছন্দ করেন না। তাই কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা, সে অমরিন্দর সিং হোন বা দিগম্বর কামাত বা এসএম কৃষ্ণ বা কিরণ রেড্ডি – দল ছেড়ে বিজেপিতে যান। হালের জ্যোতিরাদিত্য থেকে শুরু করে জিতিন প্রসাদ, আরপিএন সিংয়ের মত নবীনরাও দলে দলে বিজেপিতে যোগ দেন।
নৈতিক হোক বা অনৈতিক, এই দল ভাঙানোর খেলায় নির্বাচনী রাজনীতিতে বিরোধীদের দুর্বল দেখানোর প্রচেষ্টা জনমানসে বিশেষ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধীদের এই ছবি, যা মিডিয়ার কল্যাণে আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে, তা এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য ভাল খবর নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








