৮ মার্চের রাজনৈতিক ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে এক উৎসবে পরিণত করার প্রচেষ্টা বেশ কয়েকবছর ধরে চলছে। শাড়ি আর গয়নার দোকানে বিশেষ সেল, কর্পোরেট অফিসের মহিলা কর্মীদের গোলাপি বেলুন ও চকোলেট উপহার দেওয়া এবং সোশাল মিডিয়ায় ‘হ্যাপি ওমেন্স ডে’ বার্তার বন্যায় রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে নারী দিবস উদযাপন বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। গৃহশ্রমের জন্য গৃহিণীকে তার প্রাপ্য দেওয়া উচিত – এই দাবিকে সারাবছর যে মানুষটি বিদ্রুপ করেছেন, সোশাল মিডিয়ায় তাঁকেও এদিন দেখা যায় নিজের মায়ের আত্মত্যাগ নিয়ে বড়াই করতে। ৮ মার্চের ইতিহাস না জেনে অনেক শিক্ষিত মহিলাও বলেন ‘বছরে সব দিনই আমাদের, একটা দিন নিয়ে কী করব?’
এই ইতিহাস বিস্মৃতি অবশ্যই অনিচ্ছাকৃত নয়। নারীকে রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করলে ধনতন্ত্র এবং পিতৃতন্ত্রের নানাবিধ অসুবিধা। বস্ত্র শিল্পে নারী শ্রমিকদের আন্দোলনের কথা মনে করালে ৮ মার্চ ‘বিশেষ সেল’ ঘোষণা করে শাড়ি জামাকাপড় বিক্রি করতে অসুবিধা হতে পারে বইকি। আজও আমাদের দেশের নারী কর্মীরা সমান কাজে সমান মজুরি পান না – এই সত্য ভুলে থাকার প্রকৃষ্ট উপায় এইসব সেল। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে প্রসাধন সামগ্রীর বাজার আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে পৌঁছতে আর সবকিছু থেকে মেয়েদের নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এমন নয় যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা অন্যান্য নানা কাজের মধ্যে থাকলে মেয়েদের সাজগোজ করা অনুচিত। কিন্তু বেশভূষার উপর নজর দেওয়াই তাঁদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালে অবশ্যই বাকিগুলোকে তাঁরা অবহেলা করবেন। তাছাড়া বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলো তো বারবার বলছে, মহিলারা নিজেদের জন্য সাজগোজ করেন না। করেন পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। সব মিলিয়ে মেয়েদের দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ করে রেখে দেওয়ার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, রাজনীতিতে মহিলাদের যোগদান ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে এদেশের বহু নারী সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। একথা উল্লেখযোগ্য যে আরও অনেক দেশের মত ভারতীয় নারীকে ভোটদানের অধিকার পাওয়ার জন্য আলাদা লড়াই করতে হয়নি। নারী আন্দোলনের কর্মীরা অনেকেই মনে করেন, ভোটদানের অধিকারের জন্য আলাদা করে লড়তে হয়নি বলে ভারতবর্ষের শিক্ষিত মেয়েরা অনেকেই রাজনীতিতে যোগদানকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। রাজনৈতিক দলগুলো মেয়েদের সক্রিয় সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে কতটা চেষ্টা করেছে তাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পঞ্চায়েত বা পৌরসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ চালু হলেও দেখা যায়, রাজনৈতিক কর্মীদের পরিবারের মহিলাদেরই প্রার্থী করা হয়।
আরো পড়ুন কুচকাওয়াজে কেবল মহিলা বাহিনী: শুধু মিছে কথা, ছলনা
সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে ঘটল আরও এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসকের দফতর থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়, রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের নির্দেশ মেনে জেলার সমস্ত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান এবং তাঁদের স্বামীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সরকারি পয়সায় স্বামীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ানো যায় কিনা তা যেমন প্রশ্ন তোলার মত, তেমনি প্রশ্ন ওঠে নারী উন্নয়ন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে দাবি করে সেই সম্বন্ধেও। মহিলা জনপ্রতিনিধিরা, বিশেষ করে পঞ্চায়েত স্তরে যাঁরা জেতেন, তাঁদের প্রশাসনিক কাজ আসলে পরিবারের পুরুষরাই করেন – একথা সারা দেশে আলোচিত। তবে সরকারিভাবে এই ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ খুব সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গই দেখাল।
সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস হয়েছে। ফলে লোকসভা নির্বাচনেও মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ আসন সংরক্ষণ করা হবে ভবিষ্যতে। সংরক্ষণ না থাকলে কি রাজনৈতিক দলগুলো মহিলাদের টিকিট দিতে পারে না? নাকি ইচ্ছা করেই দেয় না? দলে রাজনৈতিক কর্মী থাকলেও অনেক সময়েই দেখা যাচ্ছে দলগুলো এমন মহিলাদের নির্বাচনে প্রার্থী করছে, যাঁরা অভিনয় জগতের বা খেলাধুলোর জগতের পরিচিত মুখ। সমস্যা হল, এঁরা নিজেরা মহিলা হলেও পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছুই করেননি। ফলে দেখা যায় স্মৃতি ইরানি ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। নুসরত জাহানের মত সাংসদ নিজের এলাকার সন্দেশখালির ঘটনায় চুপ করে থাকেন। তাঁদের আনুগত্য নিজের পার্টির কাছে। পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁদের কোনো বক্তব্যই নেই। কার্যত দেখা যায়, ভারতের ছোট বড় সব রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মীরাই মহিলাদের ‘মা বোন’ বলে সম্বোধন করেন। অথচ পুরুষ ভোটাররাও কিন্তু কারোর না কারোর স্বামী বা ভাই। কিন্তু ভোটের প্রচারে বলা হয় ‘মায়েদের ভোট চাইছি’, ‘বোনেদের সম্মান রক্ষা করতে চাই।’ অর্থাৎ পারিবারিক ধাঁচার বাইরে গিয়ে মহিলাদের পরিচয় থাকতে পারে – এই বিশ্বাসটাই নেতাদের নেই। মমতা ব্যানার্জি পারিবারিক সাহায্য ছাড়াই নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন, যা আমাদের দেশে বিরল। তা সত্ত্বেও মহিলাদের মা-বোন বলেই অভিহিত করেন। নিজ রাজ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে মুখ ফিরিয়ে থাকেন, কোথাও আবার ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটির প্রেম ছিল বলে বসেন।
ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্কে বলা হত ‘শি ইজ দি ওনলি ম্যান ইন হার ক্যাবিনেট’। তাহলে ক্ষমতা আর পুরুষ কি সমার্থক?
পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতি যে কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল বা সিপিএম – সব দলের মধ্যেই বিরাজ করে, সেই চেতনা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া জরুরি। অসম সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীকে যে চিরন্তন লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, সেই বোধকে নিজেদের কাজের ভিতরে জায়গা না দিলে সংরক্ষণেরও কোনো অর্থ থাকে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







