বিতর্কিত কৃষি আইন তিনটি বাতিলের পর দিল্লি ঘেরাও তুলে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা ফিরে যাবার প্রায় দুবছর পর আবার রাস্তায় নেমেছে কিছু কৃষক ইউনিয়ন। তাদের দাবির তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) সংশোধন এবং তার আইনি স্বীকৃতি। এই এমএসপি প্রতি বছর কেন্দ্রীয় সরকার কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল কস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি)-এর সুপারিশ অনুসারে ২২টি বাধ্যতামূলক ফসলের জন্য (তাছাড়া আখের জন্য ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য বা এফআরপি) স্থির করে থাকে। কিন্তু এই নির্ধারিত মূল্য ২৩টি ফসলের মধ্যেও মূলত ধান, গম, আর কিছুটা আখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই এর মাধ্যমে উপকৃত কৃষকের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১০-১২ শতাংশের বেশি নয়। আবার সব রাজ্য এর আওতাভুক্ত নয়, অর্থাৎ তারা এই মূল্যে ফসল কিনতে বাধ্য নয়, কারণ সংবিধান অনুযায়ী কৃষি রাজ্য তালিকাভুক্ত।
কেন্দ্রীয় সরকার ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এফসিআই) এবং কিছু রাজ্য সংস্থার মাধ্যমে ধান ও গমের সহায়ক মূল্য দিয়ে থাকে। তাছাড়া তৈলবীজ, ডাল এবং কোপরা (শুকনো নারকেল শাঁস) জাতীয় কিছু পণ্যের বাজার মূল্য এমএসপির নিচে নেমে এলে পিএম-আশা প্রকল্পের অধীনে নথিভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। আর তা হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের পরামর্শে এবং ন্যূনতম মূল্যের নির্দেশিকা অনুসারে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সব রাজ্যে না থাকার ফলে দেশে এক ধরনের অঞ্চলভেদ বা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যেমন বিহারের অনেক কৃষক বা কিছু এজেন্টও ওই রাজ্যে এমএসপি না থাকার ফলে সুদূর পাঞ্জাবের দিকে পাড়ি দেন প্রতিবছর। বিহারে ২০০৬ সালে এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেটিং কমিটি (এপিএমসি) আইন বাতিল করা হয়। তাই সেখানে কৃষকরা ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে সরকার পরিচালিত প্রাইমারি এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট সোসাইটির (প্যাকস) কাছে ফসল বিক্রি করেন। কিন্তু বিহারে প্যাকসের সংগ্রহ অত্যন্ত কম, ফলে কৃষকরা ফসলের সিংহভাগ কমিশন এজেন্টদের বিক্রি করতে বাধ্য হন।
প্রসঙ্গত, ভর্তুকি খাদ্য ও গণবণ্টন দফতরের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ। ২০২৪ আর্থিক বছরে এতে প্রায় ৯৬% বরাদ্দ করতে হয়েছিল। চলতি অর্থবর্ষে ভারতের মোট ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা বাজেট ব্যয়ের প্রায় এক-নবমাংশ এই ভর্তুকি। খাদ্য ভর্তুকির ফলে বাজারে দাম পড়লে কৃষকেরা আর্থিক রক্ষাকবচ পায় এবং অন্যদিকে পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (পিডিএস) মাধ্যমে কম দামে খাদ্যশস্য সরবরাহ করাও হয়ে থাকে।
একদিকে যেমন কৃষি দেশের মোট মূল্য সংযোজনের (জিভিএ) ১৫% এবং কর্মসংস্থানের বৃহত্তম উৎস, আবার কোভিডের পর দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হলেও কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষেত্রগুলিতে ২০২০-২১ সালে ৩.৪% বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে রুগ্ন থেকে রুগ্নতর হয়ে পড়ছে কৃষি। অর্ধেকেরও বেশি শ্রমশক্তি নিয়োগ করা সত্ত্বেও একজন সাধারণ কৃষকের গড় মাসিক আয় দাঁড়ায় মাত্র ১০,৩০০ টাকার মত।
বেশিরভাগ কৃষকনেতার দাবি, কৃষকদের অবস্থার উন্নতির জন্য এমএসপিকে আইনি অধিকারে পরিণত করা হোক। তাঁরা C2+50 হারে ন্যূনতম মূল্যের দাবি করছেন, যেখানে সরকার তাঁদের A2+FL হারে মূল্যের ওপর আরও দেড় গুণ যুক্ত করে দিয়ে থাকে। এখানে A2 বলতে একটি নির্দিষ্ট ফসলের উৎপাদনের মূল্যকে বোঝায়। যেমন বীজ, সার, কীটনাশক, ইজারা নেওয়া জমি, ভাড়া করা শ্রম, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ইত্যাদি। A2+FL অর্থাৎ A2-র সঙ্গে পারিবারিক শ্রমের মূল্য যোগ করা।
C2 আরও ব্যাপক ব্যয়ের হিসাব, যা A2+FL-এর উপর নিজের জমি হলেও তার ভাড়া, মূলধনের উপর সুদ, ইজারাকৃত জমির জন্য প্রদত্ত খাজনা ইত্যাদির যোগফল। কৃষকদের দাবি, এমএসপি সংশোধন করা হোক এবং ব্যয়ের বিপরীতে মুনাফা হিসাবে আরো ৫০% C2-র উপর যুক্ত করে এমএসপি দেওয়া হোক।
মুশকিল হল, জমির ভাড়া অঞ্চল, রাজ্য এবং জমির অবস্থান অনুসারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এক হতে পারে না। সুতরাং C2+50-র প্রকৃত মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়। এবার দেখা যাক এমএসপি সংশোধন করে একে আইনে পরিণত করলে রাজকোষের উপর কী প্রভাব পড়বে। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড ৩,২৯৬.৮৭ লাখ টন। যথারীতি সবচেয়ে বেশি ছিল চাল (১,৩৫৭.৫৫ লাখ টন) এবং গম (১,১০৫.৫৪ লাখ টন)। আন্দাজ করা যায় যে খরচ বাড়বে প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকার বেশি।
সরকার নিযুক্ত একটি কমিটি বর্তমানে এমএসপি এবং কৃষক কল্যাণ সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছে। বাকি বিষয়গুলোতে মোটামুটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেও কমিটির সদস্যদের মধ্যে এমএসপি নিয়ে এখনো কোনো সম্মতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দুর্ভাগ্যবশত, কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। প্রায় ৮৫% কৃষক ছোট ও প্রান্তিক, অর্থাৎ তাঁদের গড় জমির পরিমাণ দুই হেক্টরেরও কম। বেশিরভাগই কোনোমতে পেট চালাবার মত উৎপাদন করতে পারেন। তাই প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, ভাল মানের বীজ, সার, ইত্যাদির মত জরুরি জিনিস থেকে তাঁরা বঞ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁরা মাল নিয়ে বাজার পর্যন্ত যেতে পারেন না অর্থের অভাবে।
আরো পড়ুন ট্র্যাক্টর ফের রাজপথে, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বড় নির্বাচনী ইস্যু
এই জাতীয় কৃষকরা এজেন্টদের দয়ায় বেঁচে থাকেন। এমএসপি কেন, প্রায় খরচের যোগানই পান না। আবার এমএসপি পাওয়ার জন্য কৃষকরা ফসলের ধরন বিকৃত করে ফেলছেন বলে অভিযোগ, যার ফলে প্রতিবছর তাড়াহুড়োয় জমি সাফ করতে খড় পোড়ানো হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা এমন ফসল ফলাতে পছন্দ করেন যা তাঁদের বেশি এমএসপি দেবে। এইভাবে মাটির উপকারের জন্য প্রয়োজনীয় ফসল পরিবর্তন উপেক্ষিত হয়।
এখানেই শেষ নয়। এমএসপি মুদ্রাস্ফীতিতেও ইন্ধন জোগায় বলে অভিযোগ আছে। গত বছর অগাস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক ও বিভাগগুলি ২০২৩-২৪ মরসুমে খরিফ ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের কাছে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। সম্প্রতি দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনেও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশে করা হয়েছে।
অনেক দেরি হয়ে গিয়ে থাকলেও এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির এক জায়গায় বসে কৃষকদের সমস্যাগুলির এমনভাবে সমাধান করা উচিত যাতে কৃষিকার্যে লাভ হয়। শুধুমাত্র এমএসপি কৃষি সংকটের কারণ নয়, আবার প্রতিকারও নয়। কৃষক আত্মহত্যার দিন শেষ হোক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







