যেখানে দিল্লির হিমেল হাওয়ায় মানুষ প্রায় জমে যাওয়ার জোগাড়, সেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাজধানীর রাজনীতিতে বারবার গরম ছেঁকা দিয়ে চলেছেন। প্রাক্তন, কারণ আবগারি মামলায় জামিনের শর্ত অনুযায়ী তিনি দিল্লি সচিবালয় বা মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। তাছাড়া লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অনুমোদন পাওয়ার জন্য একান্ত প্রয়োজন না হলে সরকারি ফাইলে স্বাক্ষরও করতে পারবেন না। কাজেই আতিশি মারলেনাকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে এখন আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক কেজরিওয়াল কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছেন দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে।

প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতীয় জনতা পার্টি। কাজেই কেজরিওয়াল যে বিজেপিকেই তাঁর আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য করবেন তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সাধারণত নেতারা যেভাবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে থাকেন, আপ সুপ্রিমোর শৈলী তার থেকে একটু আলাদা। সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবতকে বিজেপির বিরুদ্ধে নালিশ করে চিঠি লিখে বসেছেন। একথা সর্বজনবিদিত যে সংঘ বিজেপির আদর্শগত অভিভাবক আর তাদের আলাদা আলাদা সংগঠনগুলো বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপিকে রাজনৈতিক সাহায্য জুগিয়ে থাকে। তাছাড়া বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য স্তরে সাংগঠনিক পদেও আরএসএসের প্রতিনিধিরা থাকেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে আর তার ফল বিজেপি পাচ্ছে। যেমন আদিবাসী এলাকায় বনবাসী কল্যাণ আশ্রম বহুদিন ধরে কর্মরত, তেমনি কৃষকদের মধ্যে ভারতীয় কিষান সংঘ ইত্যাদি। আবার বিজেপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটা সাধারণত সংঘকেই বরাদ্দ করা হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেও এককালে আরএসএস প্রচারক ছিলেন। ইদানীং অবশ্য অনেকেই মনে করেন, মোদীর শাসনকালে সংঘ আগের প্রতিপত্তি কিছুটা খুইয়েছে। কারণ যাকে মোদী ম্যাজিক বা ক্যারিশমা আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, সেটাই ভোট টানতে যথেষ্ট সক্ষম। অবশ্য এসব কথা বিজেপি বা আরএসএস মানতে নারাজ। তাঁদের মতে সংঘ একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিজেপির রাজনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তাঁরা শুধু নীতিগত বা আদর্শগতভাবে বিজেপির কার্যপ্রণালীকে সমর্থন জানিয়ে থাকেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সে যা-ই হোক, চিঠিতে কেজরিওয়াল ভাগবতকে প্রশ্ন করেছেন আরএসএস রাজধানীতে বিজেপির জন্য ভোট চাইবে কিনা এবং তারা ওই দলের ‘অন্যায়’ সমর্থন করে কিনা।

তিনি তাঁর ৩০ ডিসেম্বরে লেখা এই চিঠিতে বলেন ‘মিডিয়ায় খবর যে দিল্লি নির্বাচনে বিজেপির জন্য ভোট চাইবে আরএসএস। এটা কি সত্যি? তার আগে মানুষ জানতে চায় যে অতীতে বিজেপি যেসব খারাপ কাজকর্ম করেছে আরএসএস কি সেসব সমর্থন করে?’

তারপর আবার প্রশ্ন ‘বিজেপি নেতারা খোলাখুলি পয়সা দিয়ে ভোট কিনছেন। আরএসএস কি তা সমর্থন করে?’ আরও অভিযোগ ‘গরিব, দলিত, পূর্বাঞ্চলি (মূলত বিহার, উত্তরপ্রদেশের প্রবাসী শ্রমিক) এবং বস্তিবাসীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অথচ এই মানুষগুলো বহুবছর ধরে এখানে [দিল্লিতে] বসবাস করছেন। আরএসএস কি মনে করে এটা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য সঠিক কাজ? আপনার কি মনে হয় না বিজেপি এভাবে ভারতীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে?’

সংঘের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানালেন, আরএসএস এই চিঠিটাকে উপেক্ষা করতে চায়। এসব কথা তাদের বলার মানেই হয় না। তাদের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্বন্ধ নেই, তাই ভোট চাওয়ার কোনো ব্যাপারও নেই। তাঁর বক্তব্য আরএসএস অজাতশত্রু আর আজ যাঁরা তাদের দিকে আঙুল তুলছেন তাঁরা একদিন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তাদের পথই বেছে নেবেন। কাজেই ‘বিভ্রান্তিকর, তথ্যবিহীন’ অভিযোগকে আরএসএস গুরুত্ব দিতে চায় না।

তবে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দিল্লির রাজনৈতিক আবহাওয়া কিন্তু এই চিঠির ফলে গরম হয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে যে কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়ে আপ দিল্লির সাতটার মধ্যে শরিক দলের জন্য তিনটে ছেড়ে দিয়ে বাকি চারটে কেন্দ্রে বিজেপির বিপক্ষে প্রার্থী দিয়েছিল, সেই কংগ্রেসও এই নির্বাচনে আপের বিপক্ষে প্রার্থী দিচ্ছে। ফলে বিজেপিবিরোধী ভোট কিছুটা ভাগাভাগির সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এমন বিভাজন নতুন নয়। বিজেপিবিরোধী ভোটাররা ২০২০ বিধানসভা নির্বাচনে কেজরিওয়ালকেই সমর্থন করেছিলেন। বিধানসভার ৭০ আসনের মধ্যে আপ ৬২ খানা জিতেছিল সেবার। কংগ্রেস একটা আসনেও জিততে পারেনি। ওদিকে লোকসভা নির্বাচনে দুই দল মিলে সাতটার একটা আসনও বিজেপির থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। কিন্তু এবার দিল্লিতে টানা দশ বছর সরকারে থাকার ফলে অনেক মানুষের অসন্তোষ, অভাব-অভিযোগ প্রবল হয়ে উঠছে। এছাড়া কেজরিওয়ালের একচ্ছত্র নেতৃত্ব, তারপর দুর্নীতির অভিযোগ – যেমন আবগারি মামলা, মুখ্যমন্ত্রীর আবাসের মেরামতি ও সাজসজ্জার পিছনে অত্যধিক ব্যয় – নিয়ে কথা উঠছে। তাই বিজেপিবিরোধী ভোটের ভাগাভাগির সম্ভাবনা কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছিল। তাই নিজেকে সুসংহত করতে নির্বাচনের আগে কেজরিওয়াল পরপর চমক দেওয়ার চেষ্টায় আছেন। এই প্রয়াস কতটা কার্যকরী হবে তা অবশ্য ফেব্রুয়ারিতে বোঝা যাবে।

তবে ঢিল যে নেহাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি তা বোঝা যাচ্ছে ভাগবতকে লেখা চিঠির রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায়। খবর মশলা দিয়ে রেঁধে পাতে দিতে টক-ঝাল বাইট, মন্তব্যের যুগ এখন। সেটা যত গরম, যত আক্রমণাত্মক হয় ততই খবরের রেটিং বাড়ে। কাজেই কেজরিওয়ালের চিঠি সামনে আসতেই মিডিয়ার ক্যামেরা দিকে দিকে ছুটল। প্রথমে বিজেপি।

পার্টির দিল্লি নেতৃত্ব মনে করে কেজরিওয়ালের মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা (‘অওকাত’) নেই। কেউ বলছে এ শুধু আরএসএসকে কলঙ্কিত করার প্রচেষ্টা। কেউ আবার দুর্নীতি মামলা, টাকার জোগান ইত্যাদি নিয়ে উল্টে কেজরিওয়ালকেই জব্দ করতে চায়। কেউ কেউ উপদেশ দিচ্ছেন, কেজরিওয়াল সংঘকে চিঠি না লিখে, ফালতু রাজনীতি না করে, তাদের ভাল দিকগুলো থেকে কিছু শিখুন।

আরো পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

বিশ্লেষকরা ধরে নিচ্ছেন, যা ছিল বিজেপির অস্ত্র, অর্থাৎ অভিযোগের প্রথম তির ছুঁড়ে বিপক্ষকে নির্বাচনের ময়দানে শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক খেলতে বাধ্য করা, তা এবার কেজরিওয়াল নিজের হাতে তুলে নিলেন। ওদিকে কংগ্রেস আবার কেজরিওয়ালকে ‘সংঘী’, অর্থাৎ আরএসএসের কর্মী আখ্যা দিয়ে ফেলল। কংগ্রেস চিঠির অভিযোগকে অসত্য বলতে পারছে না, আবার কেজরিওয়ালকে সমর্থন করতেও পারছে না। যদিও চিঠিটার ভাষা প্রায় মা-বাবার কাছে ছেলের অভিযোগ জানানোর মত, তবু অস্বীকার করার উপায় নেই যে কেজরিওয়াল ওই এক পাতার ঢিলে বেশ কয়েকটা পাখি মেরেছেন। প্রথমত, সংঘ-বিজেপির প্রধান চ্যালেঞ্জার হিসাবে তিনি নিজের জায়গা পোক্ত করলেন। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের মত অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলতে পারলেন। এছাড়া বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ একেবারে সংঘের দুয়ারে গিয়ে রাখলেন, একইসঙ্গে সোজাসুজি আরএসএসকে রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিলেন।

মূল প্রচেষ্টা অবশ্যই অভিযোগের আঙুল তাঁর নিজের এবং সরকারের দিক থেকে ঘুরিয়ে মুখ্য প্রতিপক্ষের দিকে তাক করা। ছক ভাঙা রাজনীতিতে কেজরিওয়াল অত্যন্ত পারদর্শী। তাই তাঁর রাজনীতির চাল অন্যান্য নেতার রাজনীতির থেকে অনেকটাই আলাদা। বিজেপিকে সংঘের সাহায্য করা নিয়ে অনেকবার কথা উঠেছে, কিন্তু এভাবে সেই প্রশ্ন তোলা নজিরবিহীন।

এবার অপেক্ষা – দিল্লির প্রায় দেড় কোটি ভোটার কোনদিকে রায় দেন। আপকে সমর্থন দিলেও তা কি আগের দুবারের মত বিপুল সমর্থন হবে, নাকি এবার হাড্ডাহাডি লড়াই? কংগ্রেস কি এবার দিল্লির কিছু আসন দখল করতে পারবে? সময় বলবে। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে ততই রাজধানীর তাপমাত্রা বাড়বে। গরমটা মনে হয় এবার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিই এসে যাবে দিল্লিতে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.