নিজেকে ছাড়া কাউকে নিয়ে ভাবে না, জোটসঙ্গীকে নিয়েও নয় – ইদানীং রাজনৈতিক মহলে কংগ্রেস সম্পর্কে এভাবেই ভাবা হচ্ছে। কেন? কারণ কদিন আগে হয়ে যাওয়া দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। কংগ্রেস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দিল্লির কমপক্ষে ১৩ খানা বিধানসভা আসনে কংগ্রেস প্রার্থীরা জয়ী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে পরাজিত আম আদমি পার্টির ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। এর ফলে এমনকি আপের সর্বোচ্চ নেতা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও পরাজিত হয়েছেন। নতুন দিল্লি নির্বাচন কেন্দ্রে তিনি বিজেপির পরভেশ সিং ভার্মার বিরুদ্ধে পরাজিত হন ৪,০৮৯ ভোটে; ওদিকে কংগ্রেস প্রার্থী সন্দীপ দীক্ষিত ৪,৫৬৮ ভোট পেয়ে তিন নম্বর স্থানে শেষ করেন।
এসব এখন পুরনো কাসুন্দি, কিন্তু এই কাসুন্দিই আগামীদিনে বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্সের (ইন্ডিয়া) শরিকদের মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে। তার মাসুল হয়ত কংগ্রেসকেই দিতে হবে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে কংগ্রেস বিপাকে পড়তে পারে, কারণ রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থে রাজ্যের দলগুলো দরকারে কংগ্রেসকে চাপে ফেলার সুযোগ পেয়ে গেল। ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ দল তৃণমূল কংগ্রেস। তার নেত্রী মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে আগে থেকেই কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। কংগ্রেস তাদের একদা মহাশত্রু বামপন্থীদের হাত ধরে নির্বাচনে লড়ে। তার ফল সর্বজনবিদিত। না বিধানসভা, না লোকসভা – কোথাও কিছু করে ওঠা যায়নি। কংগ্রেস একটা মাত্র আসন পেয়েছিল লোকসভায়, বিধানসভায় শূন্য।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পশ্চিমবঙ্গে জোট না হলেও, দিল্লিতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিল আপ। কিন্তু পরে পশ্চিমবঙ্গের মতই একা বিধানসভা ভোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তৃণমূলকে ভোটযুদ্ধে চাপে ফেলতে পারেনি, দিল্লিতে ভাগাভাগিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে আপের। একটা আসনে আবার আপের ক্ষতি করেছে আসাদউদ্দিন ওয়েসির অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন। অনুমান করা যাক, আপ (অথবা তার জোটসঙ্গী দল) যদি ওই ১৪ খানা আসনে জয়লাভ করতে পারত, তাহলে তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়াত ৩৬। মানে সেই ম্যাজিক সংখ্যা, যা থাকলে সরকার গঠন করার দাবি জানানো যায়। এমনটা ঘটলে হয়ত বিজেপি পেত ৩৪ খানা আসন।
ভবিষ্যতের দিকে তাকাবার আগে একবার আরও পিছনে তাকানো যাক। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল প্রায় ১২ বছর আগে। ২০১৩ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন প্রথম আপ সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিল কংগ্রেস। সেবার আম আদমি পার্টি ২৮ খানা আসন পেলেও কংগ্রেসের আট সদস্যের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু সরকার টিকেছিল মাত্র ৪৯ দিন। সে তো ইতিহাস। বর্তমান পরিস্থিতিতে ধারণা করা হচ্ছে, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিলে জোট আছে কি নেই তাতে কিছু এসে যায় না। যেমনটা দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে।
কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে তাদের খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে হবে। আজকে নির্বাচনী যুদ্ধে তাদের অন্যের হাত ধরতে হবে বৈকি, বিশেষ করে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ও উত্তরপ্রদেশে। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে মমতার মন পরিবর্তন হবে এবং কংগ্রেসকে শরিক হিসাবে স্বীকার করে নেবেন, এমনটা নিশ্চয়ই আশা করা যায় না। যদিও মমতা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেই প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। অন্যদিকে কেজরিওয়ালের রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষিত কারণ ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ। তাঁর আক্রমণেরও প্রধান লক্ষ্য ছিল কংগ্রেস, যে দল তখন কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি সরকারে। কিন্তু এখন মমতা ও কেজরিওয়াল বিজেপিকেই প্রধান প্রতিপক্ষ বলে মনে করছেন। হতে পারে কংগ্রেস ক্ষয়িষ্ণু, কিন্তু প্রধান শত্রুর শত্রুকে মিত্র হিসাবে বিবেচনা করা চিরকালীন কৌশল। তবে যদি প্রয়োজন হয়।
এদিকে কংগ্রেসের কিন্তু আগামী বিধানসভা নির্বাচনগুলোর মধ্যে কেরালা ছাড়া আর কোথাও তেমন আশা নেই। এবছরের শেষদিকে বিহারে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে প্রধান বিরোধী দল লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) এবং বামপন্থী দলগুলো টিকিট ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। গত বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডি বিহারে একক বৃহত্তম দল হয়েছিল ২৪৩ আসনের মধ্যে ৭৫ খানা আসন জিতে। শরিক সিপিআই ছটা আসনে প্রার্থী দিয়ে জেতে দুটো, সিপিএম চারটের মধ্যে দুটো আর লিবারেশন ১৯ আসন প্রার্থী দিয়ে ১২ আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে এই ‘মহাগঠবন্ধন’-এর আরেক শরিক কংগ্রেস ঝুলোঝুলি করে ৭০ খানা আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে মাত্র ১৯ আসনে জেতে। পশ্চিমবঙ্গ কেন, বিহারেও একা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মত অবস্থায় তারা এখনো নেই। আসনসংখ্যা নিয়ে জোর গলায় কথা বলার জায়গাও নেই।
উত্তরপ্রদেশেও একই অবস্থা। উল্লেখ্য, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, কেজরিওয়াল আর মমতাকে একত্রে ইন্ডিয়া জোটের অভ্যন্তরে এমন এক ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে মনে করা হয়ে থাকে, যাদের প্রধান লক্ষ্য কংগ্রেসকে আক্রমণ করা। এই তিনজনের জোটকে দুষ্টু লোকে নামের আদ্যক্ষর দিয়ে আড়ালে ‘আম’ বলে। একাধিকবার এই তিনজন একজোট হয়ে কংগ্রেসকে চাপে ফেলেছেন।
আরো পড়ুন বিজেপির আত্মবিশ্বাসের বিপরীতে অদৃশ্য শক্তিতে ভরসা রাখছে কংগ্রেস?
সংসদ অধিবেশন চলাকালীন কেবল বিরোধী দলের বৈঠকেই নয়, এই তিন দলের সাংসদদের মধ্যেও সৌহার্দ্য দেখা যায়। আবার দিল্লি ভোটের সময়ে অখিলেশ কেজরিওয়ালের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যোগ দিয়েছিলেন নির্বাচনী সভায়। মমতাও সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা দিল্লিতে আপের কিছু জনসভায় বক্তব্যও রেখেছিলেন। ফলে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস অন্য বিরোধী দলগুলোর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফিরে যাওয়া যাক উত্তরপ্রদেশের কথায়। সেখানে সমাজবাদী পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে এর আগে জোটে গেলেও তা কিন্তু কোনো শরিকের পক্ষেই ভাল হয়নি। তাই ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অখিলেশও একাই মাঠে নামতে পারেন। যদিও সে নির্বাচনের দেরি আছে। তবু রাজ্য বিধানসভায় কংগ্রেসের বর্তমান শক্তি (৪০৩ সদস্যের সভার মধ্যে মাত্র দুজন বিধায়ক) বিবেচনা করলে মনে হয়, ২০২৭ সালে জোটের আবদার করা সমাজবাদী পার্টির চেয়ে কংগ্রেসের জন্য বেশি জরুরি।
মনে রাখতে হবে, এই রাজ্যগুলোর কোনোটাতেই এখনো কংগ্রেস দিল্লির মত ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের কয়েকটা আসনে চাপে ফেলার অবস্থায় নেই। দিল্লির তুলনায় এই রাজ্যগুলোতে বিধানসভার আসনসংখ্যাও অনেক বেশি। ফলে এ কথা মেনে নিতেই হচ্ছে যে আগামী কয়েকটা বিধানসভা নির্বাচন কংগ্রেসের জন্য কঠিন পরীক্ষা। আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের কথা বলেন, ইন্ডিয়া জোটের ‘আম’-ও যেন তাই চায় বলে মনে হচ্ছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








