নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অবশেষে কার্যকর করা হল। ২০১৯ সালে সংশোধিত আইন পাস হওয়ার প্রায় সাড়ে চার বছর পরে এই সংক্রান্ত বিধি চূড়ান্ত করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই এই বিজ্ঞপ্তি জারির জন্য স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস) এবং সিএএ অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়েছিল। সারা দেশে এনআরসি চালু করার কথা বলেছিল বিজেপি। তার পাশাপাশি ছিল সিএএ-র মাধ্যমে মূলত হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আশ্বাস। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর সংসদে পাস হয় সিএএ। এনআরসি এবং সিএএ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকলেও, দুটিকে আলাদা করে দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এবারেও সিএএ-র বিজ্ঞপ্তি জারির পর একই খেলায় নেমেছে বিজেপি।

সংশোধনীতে আপত্তি কোথায়?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সংশোধনী অনুসারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি সম্প্রদায়ের কেউ ভারতে আশ্রয়ে নিয়ে থাকলে তাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মুসলমানরা এই সুযোগ পাবে না। কারণ তারা ওই তিনটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রতিবেশী তিনটি দেশের কথাই বলা হয়েছে। ২০১৫ সালে মোদি সরকার পাসপোর্ট আইন ও বিদেশি নাগরিক আইন সংশোধন করে। সংশোধনীতে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে এই তিনটি দেশ থেকে এইসব সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে এলে তাঁদের শাস্তি না দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে হয়েছিল। সেই অনুসারেই ২০১৬ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের খসড়া বিল আকারে আনা হয়েছিল।

বিজেপির দাবি এটি নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার নয়, দেওয়ার আইন। শুনতে খুবই ভাল। যাঁরা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলে আপত্তির কিছু থাকে না। কিন্তু নাগরিকত্ব নিঃশর্তভাবে দেওয়া হচ্ছে না। তার জন্য চাই প্রামাণ্য নথি। চাকরির পরীক্ষায় আবেদন করলেই চাকরি পাওয়ার যেমন নিশ্চয়তা থাকে না, তেমন আবেদন করলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বিধি অনুসারে, যে দেশ থেকে আবেদনকারী এসেছেন সেই দেশে বসবাসের নথি, এই দেশে কবে থেকে আছেন তার নথি এবং ব্যক্তিগত হলফনামা দিতে হবে। তিনি যে ধর্মীয় নিপীড়নেরই শিকার তা প্রমাণ করতে হবে।

প্রামাণ্য নথিগুলি কী কী তাও বলা আছে। কিন্তু কোনো আবেদনকারীর নথি যদি গ্রাহ্য না হয়, আবেদন খারিজ হয়ে যায়, তবে তাঁর অবস্থা কী হবে তা বলা নেই। অর্থাৎ প্রথমে আবেদনকারীকে স্বীকার করে নিতে হবে, যে তিনি এই দেশের নাগরিক নন। এরপর আবেদন খারিজ হওয়ার অর্থ হল, তিনি বেনাগরিক হয়ে গেলেন। যাও বা ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ছিল, সেগুলোও বাতিল হয়ে গেল। নাগরিকত্ব নিয়ে এতদিন বিশেষ মাথা ঘামানোর দরকার ছিল না। দেশজুড়ে এনআরসির আশঙ্কায় তা মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ থেকে যাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন, তাঁদের কিছু সমস্যায় পড়তে হত। তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও, এখন নিয়মের জটিলতায় নাগরিকত্ব চলে গিয়ে বেনাগরিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০১৫ সালের সংশোধনী অনুসারে, তিনি যে শাস্তি পাবেন না সেই নিশ্চয়তাও থাকবে না। আসামে এনআরসির মাধ্যমে এইভাবেই অনেকে নাগরিকত্ব পাওয়ার আশা করলেও, নথির জটিলতায় উল্টে ফেঁসে গেছেন।

প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের অনেকে উচ্ছ্বসিত হলেও, এখন আশঙ্কিত। আবেদন করবেন কিনা তা নিয়ে বিভ্রান্ত। রাজ্য বিজেপির কিছু নেতার কাজ ও মন্তব্য বিভ্রান্তি আরও বাড়াচ্ছে। একজন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অনেককে এমন কার্ড দিয়ে বেড়াচ্ছেন, যার কোনো বৈধতা নেই। আবার সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, তিনি নাকি নিজে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন। যদিও তিনি এবং তাঁর বাবা-মা এখানেই জন্মেছেন। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি কাটাতেই নাকি তিনি আবেদন করবেন। প্রশ্ন হল, ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে এদেশে না এসে থাকলে তিনি আবেদন করবেন কীভাবে? তিনি কি মিথ্যাচারের আশ্রয় নেবেন? আবার আরেকজন বিজেপি বিধায়ক নাকি ইতিমধ্যেই আবেদন করে বসে আছেন। বিজেপি নেতাদের এইসব কাজে সংশয় বাড়ছে। সিএএ আদৌ নাগরিকত্ব দেবে, নাকি ফাঁদে ফেলে নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে – তা নিয়ে অনেকেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। সিএএ যে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না তা স্পষ্ট হচ্ছে।

সংশোধনী নিয়ে নীতিগত আপত্তিও যথার্থ। আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ। তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে একটি সম্প্রদায়কে কীভাবে আবেদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায়? আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে মুসলমানরা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার। তাঁদের কিন্তু এই সুযোগ দেওয়া হবে না। অপর প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা থেকে কোনো তামিল জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে এদেশে আশ্রয় নিলে তিনিও নাগরিকত্ব পাবেন না। আবার বাংলাদেশের মুক্তমনা নাস্তিক, যাঁরা প্রতিনিয়ত মৌলবাদীদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, প্রাণ দিচ্ছেন, তাঁরাও বাদ।

এনআরসি আর সিএএ-র সম্পর্ক

কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি দাবি করছে, এনআরসির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই দাবি ডাহা জুমলাবাজি ছাড়া কিছু নয়। সিএএ আসলে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী। আর দেশজুড়ে এনআরসির কথাও বলা হচ্ছে সেই নাগরিকত্ব আইন অনুসারেই। শুধু কোনটা আগে হবে, কোনটা পরে হবে সেটাই প্রশ্ন ছিল। সেই ‘ক্রনোলজি’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন।

https://youtu.be/B2msXJrUrbg?si=oGQ2CptLXFoX9j8Z

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বারবার বলেছিলেন, আগে সিএএ হবে, তারপর এনআরসি হবে। দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেও সেই কথাই বলে চলেছিলেন। পাশাপাশি ২০১৯ সালের মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দুটি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হয়েছিল যে, দেশজুড়ে এনআরসির প্রস্তুতি চলছে। একটি বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসক এমনকি জেলাশাসকদেরও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠনের অধিকার দেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালের এক আদেশনামা অনুসারে, আসামে এনআরসির জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। এখানে ব্রিটিশ আমলের বিদেশি নাগরিক আইন, ১৯৪৬ অনুসারে বিচার হয়। সেই আইনে বিদেশি বলে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে, তিনি বিদেশি নন। সারা দেশে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন ও তার বিকেন্দ্রীকরণের বিজ্ঞপ্তি প্রমাণ করে যে, দেশজুড়ে এনআরসির প্রস্তুতি চলছে। আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনপিআর) আপডেট করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এনপিআর আসলে এনআরসির প্রাথমিক ধাপ। ২০০৩ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের আমলে নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত হয়েছিল। সেই অনুসারে দেশজুড়ে এনআরসি প্রস্তুত করার বিধি জারি হয়েছিল। সেই বিধিতেই বলা হয়েছিল, দেশের প্রত্যেক বাসিন্দার এনপিআর ও এনআরসি করা আবশ্যক। মানুষকে না বুঝতে দেওয়ার জন্য এনপিআরকে জনগণনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। বিধি অনুসারে জনগণনার নির্দেশকই এনআরসির নির্দেশক হবেন। এনপিআর থেকে নাগরিকদের সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যাবে তার ভিত্তিতেই এনআরসি তৈরির মতলব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের। অথচ প্রচার হচ্ছে, এনপিআর এবং এনআরসি এক নয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও সেই প্রচার শুরু করেছিল।

অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়টিকে কেবল জটিলই করেনি, এনআরসির কথা বলে অনুপ্রবেশ নিয়ে রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। বাংলাতেও এটা তাদের অন্যতম প্রধান ইস্যু। তৃণমূলের জোটসঙ্গী হিসাবে লোকসভায় একাধিক আসন জিতে তখন বিজেপি রাজ্যজুড়ে এই প্রচার শুরু করেছিল। একই সুরে তৃণমূল কংগ্রেসও প্রচার করেছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় নাম তুলে বামফ্রন্ট ভোটে জিতছে। যে কারণে সংসদে আজকের মুখ্যমন্ত্রী এনআরসির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি অবশ্য মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী আর হিন্দুদের শরণার্থী বলত। ২০১৫ সালে পাসপোর্ট আইন ও বিদেশি নাগরিক আইন সংশোধন, ২০১৬ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই করা হয়েছিল। দেশজুড়ে এনআরসি এবং সিএএ ২০১৯ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বলা যেতে পারে, ২০০৩ সালের সংশোধনীরই পরবর্তী ধাপ।

বিজেপি প্রথমে এনআরসি নিয়েই ব্যাপক প্রচারে নেমেছিল। তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল সাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু আসামের এনআরসির ফল নিয়ে চর্চা শুরু হতেই তাদের ‘ক্রনোলজি’ গেল বদলে। ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এক জনস্বার্থ মামলায় আসামে এনআরসি পুনর্নবীকরণের আদেশ দেয়। ২০১৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় অসম্পূর্ণ খসড়া তালিকা। পরের বছর ৩১ অগাস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় ১৯,০৬,৬৫৭ জনের নাম বাদ যায়। এঁদের মধ্যে আনুমানিক ১৪ লক্ষ হিন্দু। প্রমাণিত হয়ে যায়, এনআরসি করলে হিন্দুরাই বেশি আক্রান্ত হবেন। ২০১৬ সালে বিজেপি আসামে ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে সফল করতে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এনআরসিতে অধিকাংশ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ যাওয়ায় তাদের মেরুকরণের প্রয়াস ব্যুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আসামে এখনো এনআরসির ব্যাপারে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বহু মানুষের ভোটাধিকার চলে গেছে, তাঁরা ডি-ভোটার হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন। অনেকের স্থান হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে। অনেকের আধার কার্ড নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পরিষেবা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

আরো পড়ুন আধার ও ভোটার কার্ড লিঙ্ক: ভয়াবহ বিপদ

পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি নিয়ে চর্চায় উঠে আসে, যে এই রাজ্যের মানুষের বিপদ আরও বেশি। কারণ ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অনুসারে, আসামে নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। তার আগে যাঁরা এসেছেন, এনআরসি তালিকায় তাঁদের নাম থাকার কথা। কিন্তু প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে না পারায়, তার আগে এসেও অনেকের নাম বাদ গেছে। আসামের এই ভিত্তি বছরের জন্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ৬(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্য রাজ্যে ভিত্তি বছর ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই। তার আগে ভারতে কেউ এলে নাগরিক হবেন। এরপর কেউ এলে নাগরিকত্বের জন্য তাঁদের নাম নথিভুক্ত করতে হবে। এরপর ১৯৫৫ সালে নাগরিকত্ব আইন আসে। সেটি একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। ২০১৯ সালের সংশোধনের আগে পর্যন্ত নাগরিকত্বের যোগ্যতার মাপকাঠি হল

  • ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারির আগে যাঁদের অবিভক্ত ভারতে জন্ম, ভারতেই থেকে গেছেন এবং ওই সময়ের মধ্যে ভারতে পাকাপাকিভাবে থেকে গেছেন।
  • ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি বা তারপর থেকে ১৯৮৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যাঁরা ভারতে জন্মেছেন।
  • ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০০৩ কার্যকর হওয়ার আগে পর্যন্ত (অর্থাৎ ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের আগে) যাঁরা ভারতে জন্মেছেন ,তাঁদের বাবা-মায়ের মধ্যে যে কোনো একজনকে সন্তানের জন্মের সময়ে ভারতের নাগরিক হতে হবে।
  • নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০০৩ কার্যকর হওয়ার পরে যাঁদের জন্ম (অর্থাৎ ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর এবং তারপরে), তাঁদের বাবা-মা উভয়কেই সন্তানের জন্মের সময় ভারতের নাগরিক হতে হবে। যদি তাঁদের মধ্যে একজন নাগরিক হন, তবে অন্যজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হলে চলবে না।
  • উত্তরাধিকার সূত্রে নাগরিকত্ব পেতেও বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব প্রয়োজন।

আগেই আলোচনা করেছি, ২০০৩ সালের সংশোধনীতে অনুপ্রবেশকারীর বিষয়টি এনে এবং সারা দেশে এনআরসির কথা বলে বিষয়টিকে জটিল করে তোলা হয়। প্রামাণ্য নথি না থাকলে এমনকি বহু প্রজন্ম ধরে এখানকার বাসিন্দা হলেও যে নাগরিকত্ব চলে যেতে পারে তার প্রমাণ আসাম। ফলে বিজেপিকে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ধর্মের বিষয়টিকে জুড়ে দিতে হল। অথচ ২০০৩ সালের সংশোধনী না আনলে, এনআরসির কথা না বললে এর প্রয়োজনই ছিল না। অনেকটা সাপ হয়ে কেটে, ওঝা হয়ে ঝাড়ার মত নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে, তারপর বিশেষ শর্তে নাগরিকত্ব দেওয়ার আয়োজন।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের আশ্বস্ত করতেই আগে সিএএ বিধি আনা হল, পরে এনআরসির কথা বলা হবে। আসামে এনআরসিতে বাদ পড়া হিন্দুদের এখন নাগরিকত্ব দেওয়ার টোপ দেখিয়ে ভোট নেওয়া যাবে। তাই সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, সিএএর পর যাঁদের আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে তাঁদের সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আবেদনের পর তিনি নাগরিক বলে গণ্য হলে তবেই যে তা সক্রিয় হবে সে কথা বলেননি। যেমন এই রাজ্যের উদ্বাস্তুদের আবেদন করলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তেমনই অবস্থা আসাম সহ অন্যান্য রাজ্যের মানুষের।

ভোটের আগেই বিধি আনার উদ্দেশ্য

এতদিন পর ভোটের ঠিক আগেই বিধি এনে সিএএ ২০১৯ কার্যকর করার পিছনে যে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলনে দেশ একসময়ে উত্তাল হয়েছিল। আবার অনেক এনআরসি সমর্থক সিএএ-র বিরোধিতা করেছিলেন। উত্তর-পূর্ব ভারতে সেই আন্দোলনে আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিলেন বাঙালিরা। অনেকে আবার সিএএ সমর্থন করলেও এনআরসির বিরোধী ছিলেন। এনআরসি আর সিএএ যে একই প্রক্রিয়ার দুটি অংশ তা বিজেপি গুলিয়ে দিয়েছিল। তবুও সারা দেশে দুটির বিরুদ্ধেই আন্দোলন হয়েছিল। সরকার আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করে। অনেক আন্দোলনকারীকে ইউএপিএ ধারায় কারারুদ্ধ করা হয়। দিল্লিতে দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এতকিছুর পরেও কিন্তু বিদ্বেষের রাজনীতিতে বিজেপি তখন সফল হয়নি। বরং আন্দোলন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নজির গড়েছিল।

বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনো আলোচনা হয়নি, বিধিও প্রস্তুত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী মন্তব্য ছিল কৌশল। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ভবিষ্যতে এনআরসি হবে না – এমন কোনো আশ্বাস দেননি। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সিএএ লাগু করার কথা বলা হয়েছিল উদ্বাস্তুদের ভোট পেতে। ২০১৯ সালে তাঁরা অনেকে নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ এগোয়নি। অতিমারির জন্য জনগণনার সঙ্গে সঙ্গে এনপিআরের কাজও স্থগিত হয়ে যায়।

লোকসভা নির্বাচনের আগেই সিএএ নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে নতুন করে জলঘোলা করতে চাইছে বিজেপি। এমনিতেই দেশের আর্থিক পরিস্থিতি করুণ। বেকার সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পরিচয় সত্তা ও বিদ্বেষের রাজনীতি ছাড়া তাদের উপায় নেই। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যখন বিজেপির নাজেহাল অবস্থা, তখন ভোটের আগে আবার বিদ্বেষের তাস খেলল বিজেপি। যাতে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই, বরং আবেদন খারিজ হলে বিপদের আশঙ্কাই রয়েছে। তবু অনেকেই নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় বিজেপিকে ভোট দিতে বাধ্য হবেন। আসামের এনআরসিতে নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কাতেও অনেকে তাই করবেন। জম্মুতে যাঁরা পাকিস্তান থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদেরও ভোট পাওয়ার আশা বাড়ল। পাশাপাশি এই সুযোগে মুসলিম বিদ্বেষের রাজনীতিকেও হাতিয়ার করা যাবে।

তবে জলঘোলা করে কেবল মুসলিম বিদ্বেষই নয়, নানা ভাষার মানুষের মধ্যে, নানা জাতির মধ্যে, পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সঙ্গে নানা জনজাতি, মূলনিবাসীদের মধ্যেও বিদ্বেষের রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করা হবে। যেমন আসামের একটা অংশ সিএএ নিয়ে অসন্তুষ্ট। সেখানে এনআরসির কথা বলা হবে। আবার উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মিজোরামের ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত এলাকাকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে বাঙালিদের সঙ্গে সেখানকার উপজাতি, জনজাতিদের সম্পর্কে অবনতির আশঙ্কা। ত্রিপুরায় উপজাতিদের পরিচয় সত্তার রাজনীতিকে গ্রাস করেছে বিজেপি। উত্তরবঙ্গেও নানা জনজাতি গোষ্ঠী, মূলনিবাসীদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের মধ্যে সম্পর্কে অবনতির আশঙ্কা। বিজেপি অনেকদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে পরিচয় সত্তার রাজনীতির মাধ্যমে সেখানে বিদ্বেষের পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলেরও এতে লাভ হবে। পরিচয় সত্তার রাজনীতি তাদেরও অস্ত্র। কেবল মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরই নয়, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেও তৃণমূল রক্ষাকর্তা হিসাবে নিজেকে জাহির করছে। পরিচয় সত্তার রাজনীতিতে এভাবেই রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি আরও পাকাপোক্ত হবে। রুটিরুজির প্রসঙ্গ, আর্থিক ইস্যু, নির্বাচনী বন্ড কেলেঙ্কারি, রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি, মানুষের অধিকারের বিপন্নতা – এসব গৌণ হয়ে গিয়ে ধর্ম, ভাষা, জাতের ভিত্তিতে বিদ্বেষ ও মেরুকরণই হয়ে দাঁড়াবে ভোটের প্রধান ইস্যু।

কেবল ভোট নয়, হিন্দুত্ববাদীদের এই এজেন্ডা দীর্ঘমেয়াদি

বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের কাজের বিচার কেবল ভোটের দিকে তাকিয়ে করলে ভুল হবে। তাদের এজেন্ডা দীর্ঘমেয়াদি। সংশোধনী অনুসারে ধর্মকে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে। জাতি, ভাষার জন্য কেউ নিপীড়নের শিকার হলে এই দেশের নাগরিকত্ব পাবেন না। আবার মুসলমানবিদ্বেষকেও এই আইনে সূক্ষ্মভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একবার ধর্মীয় পরিচয়কে স্বীকৃতি দিলে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ম্লান করা যাবে। যা আগামীদিনে বিজেপির হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার কাজে সহায়ক হবে। বিজেপি চায় ইজরায়েল যেমন ইহুদিদের স্বাভাবিক বাসভূমি, তেমন ভারত হবে হিন্দুদের স্বাভাবিক বাসভূমি। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ যেখানে কার্যত ব্রাত্য, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। অনুপ্রবেশকারীদের সমস্যাকে মূলধন করে বিজেপি হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করতে চাইছে।

পরিচয় সত্তার রাজনীতি যত পাকাপোক্ত হয়, তত তাদের সুবিধা। রাষ্ট্রের আধিপত্যকামী চরিত্রকে সামনে এনে নাগরিকদের সন্ত্রস্ত রাখা যায়। জীবন, জীবিকার সঙ্কটে বিপন্ন মানুষের মনে একবার যদি বেনাগরিক করার ভয় ধরানো যায়, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বাড়ে। দীর্ঘদিন ভোট দিয়ে যাওয়া, নানা সুযোগসুবিধা, অধিকার পাওয়ার পর যদি নাগরিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে তাহলে নাগরিকের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। তখন তাঁদের রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য করা যায়। প্রতিবাদ, বিরোধিতার গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া যায়। যে রাষ্ট্র এনআরসি, সিএএ-র বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেই ইউএপিএ ধারায় বন্দি করে, সেই রাষ্ট্র বেনাগরিক বলে একজনকে চিহ্নিত করে চরম শাস্তি দিতে পারে। রাষ্ট্র তার সেই ক্ষমতার আস্ফালন নাগরিককে দেখাতে চায়।

শরণার্থী সমস্যা নিয়ে রাজনীতি আজ বিশ্বব্যাপী বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা জমি শক্ত করছে। ভারতে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মের ভিত্তিতে শরণার্থীদের মধ্যে বিভাজন। তাই এখানে উগ্র দক্ষিণপন্থার সুযোগ আরও বেশি। পুঁজিবাদের সংকট যত বাড়ছে, তত বিশ্বজুড়ে শরণার্থী, বিদেশিদের নিয়ে ঘৃণার রাজনীতি বাড়ছে। বিজেপি সেই রাজনীতিরই অংশীদার। ভোটের আগে সেই রাজনীতি দিয়ে ফায়দা তোলাই শুধু নয়, সমস্যাটিকে বিজেপি জিইয়েও রাখবে। সিএএ প্রক্রিয়া শুরু হলেই বের করা হবে এনআরসির অস্ত্র। সিএএ আসলে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দিতে নয়, ঘৃণার রাজনীতিকে পুষ্ট করতেই আনা হয়েছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.