সিপিআই (মাওবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড নাম্বালা কেশব রাও সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শহিদ হওয়ার পর কর্ণাটক বিজেপির এক্স হ্যান্ডেল, আরেক বাম দল সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেওয়া একটি বিবৃতির উত্তরে একটা মিম পোস্ট করে। সে মিম অনেকেই দেখেছেন। তাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একখানা ফুলকপি হাতে নিয়ে হাসিমুখে কবরস্থানে একটা বিশেষ কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সেই কবরে ইংরিজিতে লেখা আছে, ‘নকশালিজম রেস্ট ইন পিস’। এই মিম যে বেশ উচ্চস্তরের শিল্পচর্চা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই মিমে অনেক কথা বলা হয়েছে। ফুলকপি এসেছে, কবরখানা এসেছে, নকশালবাদ এসেছে, স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন, সর্বোপরি এই মিম বানানো হয়েছে লিবারেশনের বিবৃতির প্রত্যুত্তরে।

ফুলকপি কেন? কবরখানাই বা কেন? হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদীরা বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ঘটনায় এই ফুলকপির ছবি ব্যবহার করে হুমকি দিয়ে আসছে। কিছুদিন আগে ঔরঙ্গজেবের সমাধি ভেঙে ফেলার দাবিতে এরা যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করেছিল, সেই সূত্রে মুসলমানদের উপর চড়াও হওয়া, হত্যা করা, বাড়িঘর মসজিদ ভাংচুর ও অগ্নিকাণ্ড – এসব কার্যকলাপ চালিয়েও ফুলকপির ছবি ব্যবহার করে তারা বলেছিল ‘নাগপুর পথ দেখাচ্ছে!’ তাহলে এই ফুলকপির অর্থ কী?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এ হল ১৯৮৯ সালের ভাগলপুর দাঙ্গা (গণহত্যা) স্মরণ করিয়ে দেওয়া। বাবরি মসজিদ ভাঙার আগে বিজেপি দেশজুড়ে যে রথযাত্রা করেছিল, তার ফলে বিহারের ভাগলপুরে এক গণহত্যা সংঘটিত হয়। প্রায় দু হাজার লোককে হত্যা করা হয়, যার ৯৭ শতাংশই মুসলমান। সেখানকার এক গ্রামের ফুলকপি খেতে শয়ে শয়ে মুসলমানের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। ফুলকপির ছবি ব্যবহার করার অর্থ সেই ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেওয়া। ওই মিমে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে, নকশালদের অবস্থা হচ্ছে এবং হবে ভাগলপুরের মুসলমানদের মতই। অর্থাৎ বিজেপির শত্রু হল ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলমান, এবং কমিউনিস্টরা, বিশেষ করে বিভিন্ন ধারার নকশালরা। লিবারেশনের বিবৃতির জবাবে এই মিম ছড়িয়ে একথাই বলে দেওয়া হল যে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে তারা কোনো বাছবিচার করে না। সিপিএম, সিপিআইয়ের মত দলগুলোকেও যে তারা একই চোখে দেখে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ত্রিপুরা তার হাতেগরম প্রমাণ। অর্থাৎ কি বৌদ্ধিকভাবে, কি শারীরিকভাবে – আক্রমণের লক্ষ্য কিন্তু সব ধারার কমিউনিস্টরাই। এতে কারোর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এখন প্রশ্ন হল, এই আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের প্রতিক্রিয়া কী?

এটা জানতে বিরাট গবেষণার প্রয়োজন নেই। যে কোনো সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়, কমিউনিস্টদের চিন্তা চৈতন্যের অবস্থা। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট ধারার মধ্যে সর্বাপেক্ষা সক্রিয় হল দুটো শক্তি। সিপিএম এবং নকশালপন্থী বিভিন্ন দল। বিভিন্ন ঘটনায় ফেসবুকে এই দুই দলের মধ্যে বিস্তত তর্ক বিতর্ক, ঝগড়াবিবাদ, কূটকচালি চলে। সময়ে সময়ে তা অশালীন এবং অরাজনৈতিকও হয়ে দাঁড়ায়। এ পারলে ওকে নিকেশ করে তো ও পারলে একে নিকেশ করে। এদিকে দক্ষিণপন্থা কিন্তু এদের মধ্যে তফাত করে না। তারা এই দুই শক্তিকেই নিকেশ করার পরিকল্পনা নিয়ে চলে। এ এক আশ্চর্য অবস্থা।

একথায় নকশালপন্থীদের একটা বড় অংশই অবশ্য একমত হবেন না। তাঁরা বলবেন, সে কি কথা? কেরালায় কি সিপিএম নরেন্দ্র মোদীর পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত করছে না? মৎস্যজীবীদের বিক্ষোভের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভিজিনজাম বন্দর গৌতম আদানির হাতে তুলে দিতে আদানির ডানদিকে বিজেপি আর বাঁদিকে সিপিএম দাঁড়ায়নি? তাঁরা বলবেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের বিপুল সংখ্যক ক্যাডার মমতা ব্যানার্জিকে শায়েস্তা করতে বিজেপির হাত ধরতেও দ্বিধাহীন নয় কি? দলিল দস্তাবেজে যা বলা আছে তাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে ফলিত রাজনীতিতে বারবার কি এটা প্রমাণ হয়নি যে, বিজেপি আর সিপিএম পরস্পরের বন্ধু শক্তি?

অন্যদিকে সিপিএমের বন্ধুরাও একই সুরে এসব কথার বিরোধিতা করবেন। তাঁরা বলবেন, কী যে বলেন! দক্ষিণপন্থী বলতে তো শুধু বিজেপিকে বোঝায় না। তৃণমূলও তো দক্ষিণপন্থী (তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী বিজেপি আর তৃণমূল এক)। নকশালপন্থীরা তো তৃণমূলকে সমর্থন করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে জিতে মমতা কি ‘ফ্যাসিবাদী আরএসএস/বিজেপি বিরোধী বাংলা’ মঞ্চকে এবং আলাদা করে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ জানাননি?

সুতরাং উভয় পক্ষই এই সিদ্ধান্তে অটল থাকবে যে, অপর পক্ষ নামেই বামপন্থী। ওরা প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণপন্থীদের সাহায্যকারী শক্তি। দক্ষিণপন্থীরা ওঁদের কখনোই শত্রু হিসাবে দেখে না, বরং লালনপালন করে। নিকেশ করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কমিউনিজম এবং কমিউনিস্টদের সম্পর্কে বেশকিছু সাক্ষাৎকারে, বক্তৃতায় মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। আপনি যদি সেগুলোকে সংগ্রহ করে একটা ছোট্ট গবেষণা করেন, তাহলে দেখবেন যে তিনি কখনোই সিপিএম আর নকশালপন্থীদের মধ্যে খুব তফাত করেননি। পার্থক্য কি নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সে পার্থক্য মোদীর কাছে খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়, গুরুত্বপূর্ণও নয়। লাল ঝান্ডা যাঁরাই ধরেন, তাঁরাই তাঁর কাছে ফলিত রাজনীতিতে একইরকম। কমিউনিজম যে একটা বিপজ্জনক মতবাদ সেকথা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মোদী বলেছেন, এই কারণেই শুধুমাত্র দেশের এক কোণে কেরালায় সরকারে থাকলেও, অর্থাৎ, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব না থাকলেও, তিনি কমিউনিস্টদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকেন। কারণ মতবাদ হিসাবে ওটা বিপজ্জনক। তিনি কিন্তু বিচার করতে বসেননি, সিপিএম কতটা বাম, তাদের সরকার কতটা বামপন্থী। লাল ঝান্ডাটাই তাঁর কাছে বিপদ। এই ঝান্ডা যাঁরাই ধরেন, তাঁরাই মোদীর অবিশ্বাসের পাত্র। কমিউনিস্টরা ভারতের সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধাশীল নয় – একথা বোঝাতে মোদী কেরালার বাম সরকারের শবরিমালা মন্দিরের পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুন সযত্নে রক্ষা না করার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন। রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বি প্রমুখ কমিউনিস্ট ইতিহাসবিদদের তিনি চাঁদমারি করেছেন ভারতের ইতিহাসের বামায়ন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্ত বাম মনোভাবাপন্ন অধ্যাপক আজ ফ্যাসিবাদী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। কে সিপিএম সমর্থক আর কে নকশাল বা মাওবাদীদের সমর্থক – তা দেখা হয় না। গোটা অংশটাকেই ‘আরবান নকশাল’ বলে চিহ্নিত করে থাকেন মোদী এবং তাঁর দল সমেত গোটা সংঘ পরিবার। তারা এমনও বলে যে, এঁরা জঙ্গলে অস্ত্র হাতে লড়াই করা মাওবাদীদের থেকেও বেশি বিপজ্জনক, কারণ এঁরা হাজার হাজার মনকে ‘কলুষিত’ করছেন। ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছেন। মোদীর কাছে সব ধরনের কমিউনিস্টই সমান। তাই কর্ণাটক বিজেপি লিবারেশনের বিবৃতির উত্তরে পূর্বোল্লিখিত হুমকিযুক্ত মিমটা পরিবেশন করেছে। সুতরাং ‘মাওবাদীদের সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য আছে’ বলে মন্তব্য করে আজ নিজেকে ফ্যাসিবাদীদের চাঁদমারি হওয়া থেকে বাঁচানো যাবে না।

আবার যাঁরা ‘নকশালপন্থীরা তো তৃণমূলের বন্ধু, চটিচাটা’ ইত্যাদি বলে বাজার মাতিয়ে বেড়ান, তাঁরাও অতিসরলীকরণ করেন। একথা ঠিক যে মমতার কাছে ক্ষমতা হারিয়ে সিপিএমের কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একরকম প্রতিহিংসা এবং একপেশে বিরোধিতার মনোভাব তৈরি হয়েছে। এই মনোভাবের কাছে ম্লান হয়ে গেছে তাঁদের ‘বাহাত্তর থেকে সাতাত্তরে কংগ্রেসের হাতে ১,৭০০ কর্মী খুন হওয়ার কালো দিন’-এর স্লোগান ও স্মৃতি। তৃণমূলকে হারাতে কংগ্রেসের হাত ধরতে তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে না। এমনকি যখন পাশের রাজ্য ত্রিপুরায় বিজেপির কাছে হারার পর তাদের নৃশংস তাণ্ডবে অসংখ্য পার্টিকর্মী শহিদ হচ্ছেন, তখনো তা পশ্চিমবঙ্গের পার্টিকর্মীদের হৃদয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে ঘৃণা, আক্রোশ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কেরালায় বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য বলতে কখনোই তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু দেশের এক মাত্র ১% জমি এবং ৩% শতাংশ জনসংখ্যাবিশিষ্ট কেরালায় আরএসএস শাখার সংখ্যা সারা ভারতের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। কেরালাতেই সিপিএম আর আরএসএসের মধ্যে খুন এবং পালটা খুনের দীর্ঘ ও তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। এত কিছু সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের (এবং কেরালার) সিপিএমের কর্মীবাহিনীর মধ্যে আরএসএস-বিজেপি সম্পর্কে ঘৃণা ততটা নেই, যতটা তৃণমূলের বিরুদ্ধে আছে। পার্টি কমরেডদের রক্তের মূল্যের থেকেও বঙ্গীয় সিপিএমের কাছে সরকারের মূল্য বেশি। এই সরকারসর্বস্বতার রাজনীতি তাঁদের যেদিকে ঠেলে দিয়েছে, নকশালপন্থীরা স্বভাবতই সেই পাকে পড়েননি। ফলত নকশালপন্থীরা এই প্রশ্নে অনেক বাস্তবোচিত রাজনীতি করেছেন। কিন্তু খেয়াল করা দরকার, নকশালপন্থীদের বিজেপি আর তৃণমূলকে এক না ভাবার নীতি, বিজেপির বিরুদ্ধে সার্বিক অভিযানের নীতি যতই তৃণমূলের পক্ষে যাক না কেন, যতই বিধানসভা নির্বাচনে জিতে মমতা, দীপঙ্করবাবু এবং পূর্বোল্লিখিত মঞ্চকে ধন্যবাদ দিন না কেন, নকশালপন্থীদের কোনো সাংগঠনিক লাভ হয়নি। তৃণমূল নকশালদের সাংগঠনিক কাজকর্মকে একচুলও ছাড় দেয়নি। যেখানে নকশালরা কাজ করতে গেছেন, আন্দোলন গড়ে তুলতে গেছেন, সেখানেই তৃণমূল মেরে পাট করে দিয়েছে। পুলিস মিছিল করতে দেয়নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে চাঁদমারি বানানো হয়েছে, সরকারি দমনপীড়ন চলেছে। ওখানে কিন্তু একথা বলে কোনো লাভ হবে না যে, ‘এই তো মশাই দুদিন আগে ধন্যবাদ দিলেন। এখন মারছেন কেন?’ ফলিত রাজনীতিতে এই নাকিকান্নার কোনো অর্থ নেই। সিপিএম বুঝতেই পারে না, দক্ষিণপন্থীদের কাছে কোনো ধরনের বামপন্থাই বিশ্বাসভাজন নয়। দক্ষিণপন্থীরা চায় বামপন্থীদের ব্যবহার করতে, তাদের নিজেদের দাস বানিয়ে রাখতে। সেটা পশ্চিমবঙ্গে ধন্যবাদ দিয়েই হোক অথবা কেরালায় ভিজিনজাম বন্দর আদানিদের হাতে তুলে দেওয়ার পর এমন কমিউনিস্ট কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি বলে মোদীর প্রশংসা দিয়েই হোক। আমার পথে চলো, আমার কথা বলো, তাহলেই তুমি ‘ভাল কমিউনিস্ট’, নইলেই নিকেশ। ভারতবর্ষ এখন ‘ভাল মুসলমান’ আর ‘ভাল কমিউনিস্ট’ তৈরির পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। নইলে ওই ফুলকপি। এই পরিস্থিতিতে সমস্ত ধারার কমিউনিস্টদের কর্মসূচিকেন্দ্রিক ঐক্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ।

একথা কি তাঁরা বোঝেন না? দেখাই যাচ্ছে যে বোঝেন না। সাধারণ বাম সমর্থক এবং বামপন্থী মানসিকতার জনগণ যা বোঝেন, সর্বান্তকরণে যা চান, যা নিয়ে গলা ফাটান, দেখা যাচ্ছে বামপন্থী পার্টিগুলোর নেতৃত্ব এবং পার্টিকর্মীদের একাংশ তা বুঝতে অস্বীকার করছেন। সেটা সিপিএম, নকশাল – সব দল ও ধারার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেন? কেন এই হাল? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। ভারতের মত একটা দেশের বৈশিষ্ট্য এই প্রশ্নকে আরও অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।

খেয়াল করবেন, পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা রাজনীতি করেন, বিশেষ করে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন, তাঁদের অনেকেই বিজেপির বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। ভারত একটা রাষ্ট্র হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এটা বহু দেশের সমাহার। ব্রিটিশরা তাদের শাসনে এই দেশকে বেঁধেছিল। একজন মালয়ালি বা পাঞ্জাবির বা বাঙালির কাছে একটা সাধারণ সূত্র ছিল – তারা সবাই ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত, অবদমিত ছিল। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্য কোনো যোগসূত্র ছিল না। তাদের ইতিহাস আলাদা আলাদা। সংস্কৃতি আলাদা, ভাষা আলাদা, খাদ্যাভ্যাস আলাদা, চাহিদাও আলাদা। এই ভিন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতা আজও বর্তমান। ফলে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন বা রাজনীতি নিয়ে ভাবেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় ও মননে এখনো আরএসএস-বিজেপির বিপদ সম্পূর্ণভাবে ধরা দেয় না। অন্য রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিও তাঁদের মনে সেভাবে রেখাপাত করে না। তাঁদের কমিউনিস্ট রাজনীতি, তার উদ্দেশ্য বিপ্লব করাই হোক আর সরকার গঠন করাই হোক, এই রাজ্যকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খায়। তাঁদের যা করার তাঁরা এখানেই করেন, যা বোঝেন তা এখানকার রাজনীতি দিয়েই বোঝেন। ফলে কেরালায় বা ত্রিপুরায় যখন একজন সিপিএম কর্মী শহিদ হন, তখন সেই শেল বঙ্গীয় কর্মীর বুকে যত না বেঁধে, তার থেকে অনেক অনেক বেশি বেঁধে যখন পশ্চিমবঙ্গে একজন পার্টিকর্মী তৃণমূল বা মাওবাদীদের হাতে শহিদ হন। একজন বঙ্গীয় সিপিএম কর্মীর কাছে ত্রিপুরায় সরকার হারানোর জ্বালা যত, তার থেকে অনেক বেশি জ্বালা পশ্চিমবঙ্গে সরকার হারানোর। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পুনরুদ্ধার করা তাঁর কাছে কেরালা বা ত্রিপুরার কর্মীদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের থেকে অনেক বেশি মূল্যবান। তাই কেরালার শত্রু পশ্চিমবঙ্গে বন্ধু হয়ে যায় বা ত্রিপুরার শত্রু এখানকার সহযোগী হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে এক সার্বিক সর্বভারতীয় রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন দক্ষিণপন্থাকে পরাজিত করা পর্যন্ত বাম ঐক্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবার নেই 

দ্বিতীয়ত, যে কোনো ঐক্যের পথে অন্যতম প্রধান বাধা হল যাদের সঙ্গে ঐক্যস্থাপন করছি তাদের উপর আধিপত্য করার আকাঙ্ক্ষা, তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ফলে সিপিএম নকশালদের উপর আধিপত্য করতে চায়, নকশালরা সিপিএমের উপর আধিপত্য করতে চায়। এই টানাটানিতে বহু ক্ষেত্রেই ঐক্যের সুতো ছিঁড়ে যায়। সম্প্রতি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটাই ঘটেছে। সবাই জানেন, কেন্দ্রের ফ্যাসিবাদী সরকার দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কবজা করার চেষ্টা অনেকদিন ধরেই করছে। প্রশাসনে সরাসরি নিজেদের লোকেদের বসিয়েছে, এখন ছাত্র সংসদের নির্বাচনে নিজেদের সংগঠনকে জেতানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই জেএনইউতে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) প্রচণ্ড বেগ দিচ্ছে বামপন্থীদের। এই পরিস্থিতিতে সেখানে ঐক্যবদ্ধ বাম প্যানেলের প্রয়োজনীয়তা সকলেই স্বীকার করেন। কিন্তু সমস্যা ওই দড়ি টানাটানি। এবারে ঐক্যবদ্ধ বাম প্যানেল হয়নি। ফলে ভোটগণনার দিন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়েছে ক্যাম্পাসের বামপন্থীদের এবং তাই বাইরের সমস্ত বাম মনোভাবাপন্ন মানুষকেও। শেষে একখানা পোর্টফোলিও এবিভিপির কাছে খুইয়ে বামেরা কান ঘেঁসে জিতেছে। অতঃপর সিপিএম দোষারোপ করেছে লিবারেশনকে আর লিবারেশন দোষারোপ করেছে সিপিএমকে। আমরা জেনেছি যে ফ্যাসিবাদের চরিত্র নিয়ে বিতর্কের কারণে নাকি জোট ভেস্তে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই ছেলে ভোলানো কথায় বিশ্বাস করবেন না, করেননি। যেকালে কমিউনিস্টদের তত্ত্বের সঙ্গে কর্মের সামান্য যোগাযোগও নেই, সেকালে ফ্যসিবাদ নিয়ে বিতর্কের কারণে জোট হয়নি – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? আসলে এখানেও আছে আধিপত্যের সমীকরণ। কে কত বড় দাদা, তা অন্যকে বুঝিয়ে দেওয়া এবং তার পালটা দেওয়ার সুযোগ পেলেই দিয়ে দেওয়া – এই চক্করেই জোট হয়নি জেএনইউতে। তাতে যে ইউনিয়নটাই হাতছাড়া হতে বসেছিল, তা খুব সম্ভবত কমরেডদের চিন্তায় ফেলেনি। যতক্ষণ না ইউনিয়নটা সত্যিই চলে যাচ্ছে, ততক্ষণ ফেলবেও না।

এই যে মার যতক্ষণ পর্যন্ত একেবারে পিঠে এসে না পড়ছে, ততক্ষণ সচেতন না হওয়া, এটা কমিউনিস্টদের তৃতীয় বড় সমস্যা। সাধারণ মানুষের মতই তাঁরা পিঠের চামড়া দিয়েই জগৎকে বোঝেন, চৈতন্য দিয়ে নয়। যাকে বলে দূরদর্শিতা, তার কিছুই তাঁদের নেই। তাঁরা জগৎ দেখেন চর্মচক্ষু দিয়েই, মধ্যের তৃতীয় নয়নটা তাঁরা অনেকদিন হল খুইয়েছেন। সর্বনাশ যে হতে চলেছে তা বোঝার ক্ষেত্রে তাঁরা চরম মূর্খ। আবার সর্বনাশ যখন শিয়রে এসে পড়বে এবং তাঁদের চর্মচক্ষুতে ধরা দেবে, তখন আবার তড়িঘড়ি নাম আর নিশান ত্যাগ করে হঠাৎ পণ্ডিত হয়ে যাবেন। তখন তাঁদের মন্ত্র হবে – সর্বনাশে সমুৎপন্নে অর্ধং ত্যজতি পন্ডিতঃ। তখন অর্ধেক কেন, প্রায় সবটাই ত্যাগ করতে রাজি হয়ে যাবেন। এটাই পৃথিবীর বহু দেশের কমিউনিস্টদের ইতিহাস।

সুতরাং এহেন বামপন্থীদের নিয়ে এখুনি খুব একটা আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে যদি এমন একটা ধারা গড়ে তোলা যায় যা উচ্চস্তরের কমিউনিস্ট রাজনীতি গড়ে তুলবে, তা প্রতিষ্ঠা করবে, তাহলে অন্যরকম কিছু হতে পারে। এ এক দীর্ঘমেয়াদি কাজ, রাতারাতি হবার নয়। কিন্তু আজ কিছু মানুষ যে এ নিয়ে ভাবছেন, ঝুঁকি নিচ্ছেন – এটাই বাম রাজনীতির পক্ষে একমাত্র আশার জায়গা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.