হঠাৎই নিখোঁজ সে। তরুণ সাংবাদিকের মৃতদেহ শেষমেশ পাওয়া গেল একটি সেপটিক ট্যাংকে। ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তার অভ্যাসমতই খুচরো সম্প্রচারের আড়ালে শেষকৃত্য করে দিল মুকেশ চন্দ্রকরের।
বয়স ৩২, ছত্তিসগড়ের একজন সুপরিচিত স্বাধীন সাংবাদিক ছিলেন তিনি। দেশের কিছু বড় কর্পোরেট মিডিয়ার হয়েও তিনি প্রতিবেদকের কাজ করতেন। নিজের জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে স্থানীয় নির্মাণ প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির ব্যাপারে ব্যাপকভাবে রিপোর্ট করছিলেন শেষ কয়েকদিনে। নতুন বছরের প্রথম দিনেই মুকেশ নিখোঁজ হওয়ার খবর জানিয়েছিল তাঁর পরিবার। গত শুক্রবার বিজাপুর শহরের এক নির্মাণ ঠিকাদারের কম্পাউন্ডে পুলিস তাঁর মৃতদেহ দেখতে পায়। মৃতদেহের হদিশ মিলতেই স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ছত্তিসগড়ের সাংবাদিকরা তো প্রতিবাদ করছেনই, এক বিবৃতিতে প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়াও চন্দ্রকরের হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ‘মামলায় উল্লিখিত ঘটনা’ নিয়ে সরকারি বিবৃতির দাবি জানিয়েছে। বাস্তার সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মনীশ গুপ্ত ঘটনাটিকে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং রাজ্যের বিপজ্জনক পরিবেশে কর্মরত সাংবাদিকদের আরও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিস ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ছত্তিসগড়ের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই চন্দ্রকরের মৃত্যুকে হৃদয়বিদারক বলে অভিহিত করেছেন এবং দায়ীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে ভারত সাংবাদিকদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে নিজেদের কাজের কারণে প্রায় ২৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। মহুয়া বিক্রেতা এবং মেকানিক হিসাবে কাজ করা থেকে শুরু করে সাংবাদিকতা করার জন্য একটি অফিস ভাড়া নেওয়া, নিজের ইউটিউব চ্যানেল চালু করা পর্যন্ত ৩২ বছর বয়সী মুকেশের জীবন ছিল একটি অনন্য পরিক্রমা, যা অকালে বলপূর্বক থামিয়ে দেওয়া হল।
মুকেশের জন্ম ছত্তিসগড়ের বিজাপুর জেলার বাসাগুদায় – একটি গ্রামে। ওই এলাকা গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যখন রাষ্ট্রীয় মদতপ্রাপ্ত সশস্ত্র সামন্তবাদী বাহিনী সালওয়া জুড়ম এবং মাওবাদীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুকেশের পরিবার সেই হিংসার কারণে বাস্তুচ্যুত হয় এবং বিজাপুরে একটি সরকারি আশ্রয়ে চলে যায়। শৈশবে বাবা মারা যাওয়ার পর মুকেশ ও তাঁর বড় ভাইকে বড় করেন তাঁদের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মা। পরে তিনিও ক্যান্সারে মারা যান। অন্যান্য স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণায় মুকেশ চালু করেন তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল বাস্তার জংশন, এখন যার প্রায় ১.৭৪ লক্ষ গ্রাহক।
মুকেশ সেই সাত সাংবাদিকের একজন, যাঁরা আলোচনার মাধ্যমে টেকালগুদায় মাওবাদীদের হাতে বন্দি এক কোবরা জওয়ানকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিলেন। মুকেশ গত ২৫ ডিসেম্বর এনডিটিভির হয়ে একটি প্রতিবেদনে বিজাপুরের একটি রাস্তার খারাপ অবস্থা তুলে ধরেছিলেন, যা নিয়ে ছত্তিসগড় সরকার পরবর্তীকালে তদন্ত শুরু করে। এই রাস্তার ঠিকাদার ছিলেন মুকেশের খুড়তুতো ভাই সুরেশ চন্দ্রকর। তাঁর প্রতিবেদনে ক্ষুব্ধ হয়ে সুরেশের ভাই ঋতেশই মুকেশকে হত্যা করেছে বলে পুলিস আপাতত জানিয়েছে। কিন্তু এহেন সরল সমীকরণেই যে মুকেশ-হত্যার সমাধান রয়েছে – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য?
গত কয়েকমাস ধরে বাস্তারে চলা সামরিক বাহিনীর মাওবাদী গেরিলাবিরোধী ‘অপারেশন প্রহার’ নিজের ইউটিউব চ্যানেলে কীভাবে দেখাচ্ছিলেন মুকেশ? ১৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম দফার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে, ছত্তিশগড়ের কাঙ্কের অঞ্চলের হাপটোলা জঙ্গলটি নকশালপন্থী সশস্ত্র গেরিলাদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। অপারেশন প্রহারে ২৯ জন মাওবাদীকে নির্মূল করা হয়েছে বলে বাস্তার পুলিশের দাবি। নিহতদের মধ্যে মাথার দাম ধার্য হওয়া শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী কমান্ডারদের নামও রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই অভিযানে জড়িত সমস্ত নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে ভারত শীঘ্রই নকশালমুক্ত দেশে পরিণত হবে। ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুসারে, কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারি বাহিনীর ৩,০০০ জনেরও বেশি জওয়ান, ২২ জন রাজনীতিবিদ এবং ১,১০০ জন পুলিসের গুপ্তচর নকশালদের হাতে মারা গিয়েছেন। যদিও অপারেশন প্রহারের মত রাষ্ট্রীয় আক্রমণে মৃত ও লাঞ্ছিত আদিবাসী জনতা, স্থানীয় সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের হিসাব কোনোদিনই কোনো রাষ্ট্রীয় সমীক্ষায় পেশ করা হয়নি।
অপারেশন প্রহার এখন ভারতরাষ্ট্রের নকশাল দমনের সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৭ সালে চালু করা অপারেশন প্রহার হল নকশালদের বিরুদ্ধে সিআরপিএফ ও ছত্তিসগড় পুলিশের একটি যৌথ উদ্যোগ। যদিও অপারেশন প্রহারকে অনেকাংশে অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অবৈধ মদ বিক্রি এবং অন্যান্য বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে একটি পুলিসি পদক্ষেপ হিসাবে দেখানো হয়, এটি আদতে ছত্তিসগড়, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র সহ বিভিন্ন রাজ্যে নকশাল গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে বিস্তৃত সামরিক সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যে চালিত। এর লক্ষ্য ছত্তিসগড়ের বাস্তার অঞ্চলের উপর জোর দিয়ে মাওবাদী গেরিলাদের তাদের আস্তানা থেকে সরিয়ে দেওয়া।
২০২৪ সালের শুরু থেকে বিভিন্ন এনকাউন্টারে ৭৯টিরও বেশি নকশালপন্থী রাজনৈতিক কর্মীকে নিকেশ করা হয়েছে। কয়েকবছর ধরে সংঘটিত বিভিন্ন অপারেশন থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। মাওবাদী রাজনৈতিক কর্মীদের নিরস্ত্র ও ছত্রভঙ্গ করতে সফল হওয়া সত্ত্বেও অপারেশন প্রহার বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে ভুল সমন্বয়ের জন্য সমালোচিতও হয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, অপারেশনটি খারাপভাবে পরিকল্পিত এবং এর পরিচালনা অযোগ্যতার নিদর্শন। ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’, ‘অপারেশন হিল বিজয়’, ‘অপারেশন সমাধান-প্রহার’ এবং ‘অপারেশন থান্ডার’ এর মতই ‘অপারেশন প্রহার’ ভারত সরকারের আরেকটি সামরিক কায়দায় নকশাল নির্মূল করার প্রকল্প, যাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক-সংবাদপ্রণেতা হিসাবে দৃশ্যগতভাবে নথিবদ্ধ করছিলেন মুকেশ।
অন্যদিকে গতবছর মুক্তিপ্রাপ্ত বাস্তার: দ্য নকশাল স্টোরি জাতীয় বলিউডি সংস্কৃতির কারখানায় তৈরি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রনির্মাণাকাঙ্ক্ষী ছদ্ম সিনেমার কথা যদি মনে করি তাহলে দেখব, নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকে বাস্তারে মাওবাদী বিদ্রোহকে বাঁচিয়ে রাখার পিছনে রাজনৈতিক প্রভু এবং সরকারি কর্মীদের উদ্দেশ্য নিয়ে সঠিকভাবে কোনো প্রশ্নই তোলা হয়নি। আদিবাসী মানুষের আবাসস্থল জঙ্গলকে কর্পোরেট স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের কাজ হাসিল করা রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে সবিস্তার সহিংসতার দৃশ্য এবং বিধ্বংসী আবহসঙ্গীত দিয়ে দর্শকের ইন্দ্রিয়গুলিকে অসাড় করে, নির্মাতারা নিজেদের একতরফা আখ্যান চালিয়ে গেছেন। ছবিতে রক্তাক্ত দৃশ্যগুলির বিশদ বিবরণধর্মিতা, বাস্তারের মাটিতে সমস্ত সংঘাতের সামাজিক-রাজনৈতিক দায় পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সশস্ত্র নকশালপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের ঘাড়ে।
আরো পড়ুন প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্রের খোঁয়ারি কাটায় ভিদুথালাই
এহেন বহুমাত্রিক লড়াইয়ে ছিন্নভিন্ন বাস্তারে মুকেশের জীবন ও মৃত্যু একজন সাংবাদিকের সংগ্রামকে প্রতিফলিত করে এবং তাঁর অকালমৃত্যু ওই পেশার সমস্ত মানুষের ওই তথাকথিত ‘মুক্তাঞ্চলে’ সত্যান্বেষণের ঝুঁকি তুলে ধরে। গোদি মিডিয়ার রমরমা বাজারে মুকেশ এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং মাওবাদী গেরিলা বাহিনীর বন্দুকের মাঝে, হাজার হাজার জল-জঙ্গল-জমি হারানো আদিবাসী জনতার আর্তনাদের মাঝে, সামরিক বিমানের লাগাতার বোমাবর্ষণের মাঝে একলা দাঁড়িয়ে, মুকেশ মরে প্রমাণ করলেন ভারতীয় উপমহাদেশের রুগ্ন সাংবাদিকতা এখনো মরেনি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








