অর্ক মুখার্জি

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেলার যুদ্ধে জিতে তাঁর সেনেটকে সগর্বে যা লিখেছিলেন, তা আজ প্রবাদে পরিণত। শব্দগুলো ছিল ‘ভিনি, ভিডি, ভিসি’। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’। লায়োনেল মেসির কলকাতায় আসার কথা এবারে যখন ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন মনে হয়েছিল – তিনি দেখা দেবেন, হাত নাড়বেন, হয়ত কিছু খানিক ফুটবল জাদু দেখাবেন এবং যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে উপস্থিত হওয়া দর্শকদের জয় করবেন। কিন্তু সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে একপ্রকার প্রতারণার কারণে মেসি উদযাপন যে ম্যাসাকারে পরিণত হবে, তা ভাবা যায়নি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যুবভারতীতে সেদিনের অনুষ্ঠানের টিকিটের দাম ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা থেকে প্রায় বারো হাজার টাকার। বিশেষ ‘মীট অ্যান্ড গ্রীট’ সেশনে মেসির সঙ্গে করমর্দন এবং ছবি তোলার মূল্য দশ লাখ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। মনে রাখা দরকার, এই টিকিট মেসি, ডি পল ও উরুগুয়ের তারকা লুই সুয়ারেজকে দেখার জন্য, কোনো খেলা দেখার জন্য নয়। কলকাতার অনুষ্ঠানের আয়োজক শতদ্রু দত্ত সোশাল মিডিয়ায় নানারকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং মেসিকে বাঙালি পোশাকে যুবভারতীতে হাজির করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। দর্শকরাও দাবি করেছিলেন সাতদিন ধরে কখন কী হবে, তাঁদের নাকি ইমেল করে জানানো হয়েছিল।

বাস্তবে দেখা গেল, এত টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মেসিকে বেশিরভাগ দর্শক দেখতেই পাননি বলে অভিযোগ উঠল, ভাগ্যবানরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁকে গ্যালারি থেকে চাক্ষুষ করেছেন। মেসি, সুয়ারেজ এবং ডি পলদের মাঠে থাকার কথা ছিল এক ঘন্টার মত। সেই এক ঘন্টায় মাঠ প্রদক্ষিণ, কিছু শট নেওয়া, দর্শকদের দিকে বল মারা আর কিছু পায়ের কাজ দেখানোর কথা ছিল এই ত্রয়ীর। মেসি মাঠে নামেন সকাল সাড়ে এগারোটায়। নামতেই তাঁকে ওস্তাদ ডিফেন্ডারের মত ‘ম্যান মার্কিং’ করতে শুরু করেন বাংলার ক্রীড়ামন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা অরূপ বিশ্বাস। সঙ্গে ছিলেন একগাদা তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ লোকজন। প্রায় ৭০-৮০ জনের মেসিকে ঘিরে থাকা, সেলফি নেওয়ার আবদার এবং ছোঁয়ার চেষ্টায় মেসি বিব্রত বোধ করতে শুরু করেন। মেসির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দলও হয়ত মনে করেছিল, এরকম পরিস্থিতিতে তাঁর মাঠে থাকা উচিত নয়। কুড়ি-বাইশ মিনিটের মধ্যেই মাঠে উপস্থিত মন্ত্রী ও অন্যান্যদের অপেশাদার ও অভদ্র হুড়োহুড়িতে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন মেসি ও তাঁর সঙ্গী দুই ফুটবলার। ওইটুকু সময়েও মেসিকে ঠিকভাবে দেখতে না পাওয়ার জন্য ক্রমশ ক্রুদ্ধ হতে থাকে গ্যালারি। মেসির দ্রুত প্রস্থান আগুনে ঘি ঢালে, শুরু হয় প্রতিবাদ। শুরু হয় চেয়ার ভাঙা, আগুন লাগানো, গেট ভেঙে মাঠে প্রবেশ, বোতল বৃষ্টি, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের দিকে বোতল ও ভাঙা চেয়ার ছোড়া, অবাধ লুঠপাট।

দর্শক হিসাবে মানুষ প্রতারিত হয়েছেন, ফলে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। সেই ক্ষোভের হিংসাত্মক প্রকাশ কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। স্টেডিয়ামের যে ক্ষতি হয়েছে তা কয়েক কোটি টাকার। শুধু তাই নয়, মাঠের অ্যাথেলেটিক ট্র্যাকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে কলকাতায় ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টে দর্শকদের ক্ষোভে মাঠে আগুন জ্বলেছে, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচে কয়েকজন দর্শকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মাঝপথে বন্ধ করে দিতে হয়েছে, ১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান টেস্টে উন্মত্ত দর্শকদের মাঠ থেকে বের করে দিয়ে খেলা শেষ করতে হয়েছে। কিন্তু কোনোটারই কারণ এই ছিল না যে, দর্শকরা এসেছিলেন এক জিনিস দেখতে আর দেখানো হয়েছে নেতা, মন্ত্রী আর তাঁদের পরিবার পরিজনের ভিড়।

রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীদের এই দখলদারির অপসংস্কৃতি এখন গোটা ভারত জুড়েই সংক্রমিত হয়েছে। রাহুল গান্ধীর মত কিছু বিরল রাজনীতিবিদ নিজেকে এর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পেরেছেন। তবে ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গের মত সর্বগ্রাসী আর কোথাও হয়নি। মেসি কলকাতা ছাড়াও হায়দরাবাদ, মুম্বাই এবং দিল্লিতে গিয়েছিলেন। কোথাও এমন বিশৃঙ্খলা হয়নি। কলকাতায় মরিয়া সেলফি-শিকারীদের একজনের কনুইয়ের গুঁতো খান সুয়ারেজ। কোনো একজনের নখে নাকি ছড়ে যায় ডি পলের হাত। স্বাভাবিকভাবেই মেসির নিরাপত্তারক্ষীরা আর ঝুঁকি নেননি।

আসলে আয়োজক শতদ্রু সম্ভবত অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী উঠেছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনায় চরম অপেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর মনে রাখা উচিত ছিল, তাঁর আয়োজনে বহু মানুষ মদত দিয়েছেন শুধুমাত্র মেসিকে দেখার জন্য। তাঁরা একটু বেশি দাবি করবেনই।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে জল বা ঠান্ডা পানীয়ের বোতল নিয়ে প্রবেশের উপর নিষেধ অনেকদিন হল চালু হয়েছে। কিন্তু সেদিন মাঠের ভিতর দুটোই দেদার বিক্রি হয়েছে। কুড়ি টাকার জল বিক্রি হয়েছে ১৫০-২০০ টাকায়।  অব্যবস্থা, আয়োজনে পরিকল্পনার অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক দখলদারি, অপেশাদারিত্ব এবং এসবের ফলে মেসিকে দেখতে না পাওয়ার রাগ, অভিমান, যন্ত্রণা এবং ক্ষোভের কারণেই মেসির প্রস্থানের পর দেখা গেল ভাংচুর, মাঠে অবাধ প্রবেশ, চেয়ার-কার্পেট-ফুলের টব নিয়ে মাঠ ছাড়ার লজ্জাজনক দৃশ্য।

সারা পৃথিবীর নামকরা বিদেশি সংবাদমাধ্যম এই বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছে। ফলে আমাদের রাজ্যের যে ব্যাপক বদনাম হল তা বলাই বাহুল্য। এই সময়ে অনেকে আবার নতুন করে ২০১১ সালে যুবভারতীতে হওয়া মেসি সহ আর্জেন্টিনা-ভেনিজুয়েলা ম্যাচের কথা তুলছেন। অধুনা তৃণমূলে প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া মদন মিত্র ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী। কিন্তু সে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ফিফা, কোনো বেসরকারি আয়োজক সংস্থা নয়। সিপিএমের কর্মী, সমর্থকরা আবার সোশাল মিডিয়া জুড়ে টানছেন এই ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় নেতা এবং বামফ্রন্টের অন্যতম স্তম্ভ প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর কথা। তিনি কেমন দক্ষভাবে মারাদোনাকে এনেছিলেন বা বায়ার্ন মিউনিখকে যুবভারতীতে মোহনবাগানের সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলিয়েছিলেন কোন ঝামেলা ছাড়াই, সেকথা আলোচিত হচ্ছে। কিংবদন্তি অলিভার কান এবং পরবর্তীকালে জার্মানি দলের তারকা থমাস মুলার সেই ম্যাচ খেলেছিলেন। এক লক্ষের উপর দর্শক ছিলেন সেদিন। সুভাষবাবু অবশ্যই অরূপবাবুকে আয়োজক হিসাবে কয়েক ডজন গোলের ব্যবধানে হারাতেন। তবে সেইসময়  সেলফি সংস্কৃতি ছিল না। সোশাল মিডিয়ার যুগে বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে সেলফি হল নিজের ক্ষমতার প্রকাশ। এই ধরনের কাণ্ড না ঘটাতে হলে যে পরিণতমনস্কতা থাকা দরকার, সোশাল মিডিয়ার আত্মরতিপ্রবণতা তা দূর করে দিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী যথারীতি তদন্ত কমিটি গড়ে দিয়েছেন, শতদ্রু আপাতত পুলিশি হেফাজতে, অরূপ আপাতত পদ হারালেও ফের বিধানসভার টিকিট পাবেন সম্ভবত, মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে কিছু লোককে বলির পাঁঠা করা হবে। কিন্তু দর্শকরা কি টাকা ফেরত পাবেন? গোলমালের পর শতদ্রু দত্ত তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে পোস্ট করলেও পরে মুছে দেন। এখন পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মেসির  কাছে দুঃখপ্রকাশ করে পোস্ট করা ছাড়া কিছু বলতে শোনা যায়নি। মেসিকে ঘিরে দুই মন্ত্রীর দড়ি টানাটানিও স্পষ্ট। সুজিত বসু মেসি কলকাতায় আসতেই তাঁর দখল নেন এবং মূর্তি উদ্বোধন থেকে হায়াতে যাওয়া পর্যন্ত মেসির সঙ্গে সঙ্গেই ছিলেন। তারপর যুবভারতীতে অরূপের শাসন অপশাসনে পরিণর হয় ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে। যুবভারতী কাণ্ডে মানুষের ক্ষোভ স্বভাবতই অরূপবাবুর বিরুদ্ধে, সুজিতবাবুর নাম আসছে না।

রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা কেমন তদন্ত করবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। অতীত অভিজ্ঞতা তো ভালো নয়।

দর্শকরা প্রতারিত হয়েছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে না অনিচ্ছাকৃতভাবে, প্রশ্ন সেটুকুই। কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে টিকিট বিক্রি করা  হয়েছিল, তা যে পূরণ হয়নি সেকথা অনস্বীকার্য। এর জন্য অবশ্যই টিকিটের দাম ফেরত দেওয়া উচিত। কিন্তু যারা স্টেডিয়ামের ক্ষতি করল, তাদেরও শাস্তি দরকার। ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে মাঠ পবিত্রতম জায়গা। কোন অবস্থাতেই একজন প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমী মাঠে ভাংচুর করে রাগ মেটাবার চেষ্টা করেন না। ওটা অসুস্থ সংস্কৃতি। টাকা দিলেই টিকিট কেটে মাঠে ঢোকা যায়, কিন্তু ক্রীড়াপ্রেমী হতে গেলে মাঠের প্রতি স্পর্শকাতরতা বা আবেগ থাকা দরকার।

আবার রাজনীতিকে হাতিয়ার করে বিখ্যাত খেলোয়াড়কে জড়িয়ে ধরা যায়, ছবি তোলা যায়। কিন্তু তাঁর অস্বস্তি বুঝতে বা রাজনীতিবিদ হিসাবে নিজের ক্ষমতার গণ্ডি বুঝতে, ক্ষমতার ব্যবহার আর অপব্যবহারের তফাত বুঝতে যে বোধশক্তি দরকার, সেই বোধ আজকের ভারতের রাজনীতিতে বিরল, পশ্চিমবঙ্গে বোধহয় সবচেয়ে বিরল।

মতামত ব্যক্তিগত                          

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. রুচির অভাবের কথা বলছে কমরেডরা ???
    তাদের কি memory hole হয়েছে.. প্রথমবার leftfront ক্ষমতায় এসে যতিন চক্কোত্তী শহিদ মিনার কে কদর্য ভাবে লাল মলাটে ভরাট করে দিয়েছিল…
    Jottosob.. pot calling kettle black

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.