সায়ন্তন চক্রবর্তী
বাংলায় বিভাজনের রাজনীতি আমদানি করা বিজেপি আজ স্বখাতসলিলে ডুবছে। পাঁচবছর ধরে নির্বাচিত সাংসদরা নিজেদের এলাকায় মানুষের উন্নয়নের জন্য কোন কাজ করেননি। কেবল কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর অপব্যবহার করে রাজ্যের শাসক দলের নেতাদের ব্যতিব্যস্ত করা, রাজ্যের গরিব মানুষের শ্রমের ১০০ দিনের কাজের টাকা বলপূর্বক আটকে রাখা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা আটকে রাখা ইত্যাদি করার ফল যখন ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হল, তখন তারা প্রবল বিস্মিত হল।
রাজ্যের বাম জমানায় মমতা ব্যানার্জি যতবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন, তিনি রাজ্যের জন্য নানা রেল প্রকল্প শুরু করেছেন, যার সুফল আজও বাংলার মানুষ পাচ্ছেন। বাংলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে বাংলার মানুষের প্রভূত উপকার করেছিলেন তিনি। আজও বিভিন্ন পর্যটন স্থলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে রেল যোগাযোগ বড় ভূমিকা পালন করছে। অথচ বিজেপির ২০১৯ সালে নির্বাচিত সাংসদদের ভূমিকা উন্নয়নের ব্যাপারে শূন্য। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে রাজ্যে নতুন প্রকল্প স্থাপন তো দূরের কথা, পশ্চিমবঙ্গের বন্যা সমস্যা এবং অন্যান্য সমস্যা নিয়েও তাঁরা নীরব ছিলেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বাংলার মানুষের প্রাপ্য শ্রমের টাকা, বাসস্থান নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নিয়ে নীরব থাকার পাশাপাশি তাঁরা ওই টাকা আটকানোর চেষ্টাতেই বেশি সরব ছিলেন। নিজেদের রাজনৈতিক ত্রুটির কারণে এবারের লোকসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার শাস্তি পেয়ে, এখন বাংলা ভাগের নিদান দিচ্ছেন।
সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার পরে যখন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন, তখন মানুষ ভেবেছিলেন বাজেটে বাংলার বঞ্চনা নিয়ে এবং বাংলায় কোন প্রকল্পের দাবিতে হয়ত দেখা করেছেন। যখন জানা গেল যে তিনি উত্তরবঙ্গকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে জোড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, তখন নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির ভবিষ্যতের বারোটা বাজাতে তাদের নেতারাই বদ্ধপরিকর।
নির্বাচনের আগে প্রবল ঝড়ে যখন জলপাইগুড়ি বিপর্যস্ত, তখন সুকান্তবাবু অথবা তাঁর দলের জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার প্রয়োজন বোধ করেননি। কেন্দ্রীয় সরকার যখন উত্তরবঙ্গের চাষিদের কথা না ভেবেই বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর জল ভাগ করে নিতে উদ্যত হন, তখনো তিনি এবং উত্তরবঙ্গের বিজেপি সাংসদরা নীরব থাকেন। সিকিমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কারণে বাংলা বন্যায় ভেসে গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। তাঁদের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনী পরাজয়ের শোধ তোলার জন্য দেশভাগের রক্তাক্ত স্মৃতিতে জর্জরিত বাঙালিকে আবার বঙ্গভঙ্গের শাস্তি দেওয়া।
আরো পড়ুন কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত
সুকান্তবাবুর দলের ঝাড়খণ্ডের সাংসদ নিশিকান্ত দুবে আরও অদ্ভুত নিদান হেঁকেছেন। তিনি মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং বিহারের তিনটে জেলাকে একত্রিত করে আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল চাইছেন। নইলে নাকি ওই এলাকায় হিন্দুরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, উক্ত এলাকার জনবিন্যাস নাকি বদলে যাচ্ছে। এরপর পশ্চিমবঙ্গের এক বিজেপি বিধায়ক আরও এক ধাপ এগিয়ে মুর্শিদাবাদ, মালদা, দুই দিনাজপুর এবং উত্তর নদিয়াকে পশ্চিমবঙ্গে থেকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার দাবি তুলেছেন হিন্দুরা বিপন্ন – এই অজুহাতে। বস্তুত মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং দুই দিনাজপুর ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানপ্রধান জেলা। দেশভাগের সময়েই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ স্থাপনের কারণে হিন্দুগরিষ্ঠ খুলনার সঙ্গে এই দুটি জেলা বিনিময় করা হয়েছিল। এতসব ইতিহাস অবশ্য নিশিকান্তবাবুদের না জানারই কথা। কারণ সংঘের চটি বইয়ের ইতিহাসে এসব নিয়ে বিস্তারিত লেখা না থাকাই স্বাভাবিক। তবে তাঁকে একটা প্রশ্ন করা উচিত। নিশিকান্তবাবু কি বাংলার মুসলমানদের জন্মহার এবং ঝাড়খণ্ড, বিহারের জন্মহার সম্পর্কে অবহিত? নিঃসন্দেহে বলা যায়, না। মুর্শিদাবাদের একমাত্র বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ আবার নিশিকান্তর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। কিন্তু তথ্য বলছে, বাংলায় হিন্দুদের জন্মহার ১.৭ এবং মুসলমানদের ২.২, ঝাড়খণ্ডে এই হার ২.৮ এবং বিহারে ৩.১।
বাংলার মানুষ ১০০ টাকা কর দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে মাত্র ৯০ টাকা ফেরত পান। সেখানে বিহারের মানুষ ৯৩৩ টাকা এবং ঝাড়খণ্ডের মানুষ ৩০৩ টাকা ফেরত পান। শুধু গত অর্থবর্ষেই ১০০ দিনের কাজ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, এমনকি খাদ্য সুরক্ষা আইন বাবদ মোট ১,৭১,০০০ কোটি টাকা কেন্দ্রের থেকে পাওনা বাংলার।
নিশিকান্তবাবু যখন নিজের রাজ্যের উন্নয়নের জন্য আমাদের রাজ্যের ভাগ পাচ্ছেন, তখন চুপ করে থাকাই ভাল। আসলে যেহেতু বাংলার মানুষ তাদের ভোট দেননি, তাই বিজেপির অভিলাষ হল বাংলাকে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে, অবাঙালি এলাকার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ১৯৮৩ সালের নেলি গণহত্যার মত পরিস্থিতি দিকে দিকে তৈরি করে বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। বিজেপি বাঙালির ইতিহাস পড়েনি। আন্দামানের সেলুলার জেলে আটক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে বাঙালি কতজন তা গুনে দেখেনি। ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টারদা সূর্য সেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, রাসবিহারী বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুদের বিজেপি চেনে না। বাংলা ভাগের চেষ্টা করলে বাঙালি কী করতে পারে, সে ধারণাও তাদের নেই।
বাংলা এমন এক রাজ্য, যেখানে শুধু হিন্দুত্ববাদ দিয়ে নির্বাচনে জেতা যায় না। বাংলার ভোটাররা তাঁদের প্রতিনিধি হিসাবে কাজের মানুষ চান। নির্বাচনী সাফল্য পেতে বিভাজনের রাজনীতির এই প্রচেষ্টা বঙ্গ বিজেপির কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








