কলকাতার অন্ধকারে আরও এক তিমির সংযোজিত হল। কলকাতায় নাকি ট্রামের গতি স্তব্ধ হতে চলেছে। এমনিতেই আজকে আমার এই শহরকে একটি বিস্তৃত সমাধিক্ষেত্র মনে হয় – স্বপ্নের সমাধি। ট্রাম আমাদের জীবনে তেমনই এক স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন মুছে দেওয়া হচ্ছে। এই ট্রামে চড়েই বিষ্ণু দে প্রতিদিন মৌলানা আজাদ কলেজে পড়াতে যেতেন, অমল রায়চৌধুরী যেতেন প্রেসিডেন্সিতে। আর সমর সেনের ট্রামযাত্রা তো জ্যোতি বসুকেও অবাক করেছিল। দুরন্ত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি ট্রাম ছাড়া ফ্রন্টিয়ার অফিসে পৌঁছতে পারতেন না।

প্রত্যেক শহরের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় থাকে। শকুন্তলার এই আংটি নিউইয়র্ক শহরে যেমন, রোম শহরে যেমন, লন্ডন বা প্যারিসে যেমন, কলকাতায় কিন্তু তেমন নয়। ইট, কাঠ, পাথর নয়; কলকাতায় কিছু গুপ্ত লিপি আছে যার পাঠোদ্ধার প্রকৃত দ্রষ্টার পক্ষেই করা সম্ভব। প্রখ্যাত দার্শনিক রলাঁ বার্থ তাঁর মিথোলজিস গ্রন্থে এইজন্যেই একটি দূরপ্রসারী মন্তব্য করেছিলেন, যে আইফেল টাওয়ার পুরো প্যারিস শহরকেই একটি নিসর্গচিত্রে রূপান্তরিত করেছে। কলকাতার দৃষ্টান্ত দিলে আমরা কাকে নির্দেশ করি? আমার মনে হয় এই তিনশো বছরে কলকাতার পক্ষে ট্রাম এমন এক প্রেমপত্র হয়ে উঠেছে যাকে খেয়াল না করে উপায় নেই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের মনে পড়ে, সেই পাঁচের দশকের শেষে একটি ট্রামগাড়ির শেষ আসনটিতে বসে যুবক অপু মাঝেমাঝেই একটি চিঠি পড়ছে। আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠলেও অনতিকালের মধ্যে পরিচালক সত্যজিৎ রায় আমাদের জানিয়ে দেন, এটি বস্তুত অপুর একটি গল্প পত্রিকান্তরে মনোনীত হওয়ার বার্তা বয়ে আনা সম্পাদকীয় দফতরের একটি চিঠি। এই যে শব্দের সঙ্গে প্রথম চুম্বন – একে যে নাগরিকতার তবকে মুড়ে রাখা যায়, পল্লী থেকে শহরে আসা পর্বে সত্যজিৎ ব্যক্তি চৈতন্যের এই বিরাট প্রকাশকে যখন ট্রামের ভিড়ে আবিষ্কার করেন তখন আমরা বুঝতে পারি যে ট্রাম আমাদের শহরের গোপন গয়না। তাকে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে অথবা আত্মবিকাশের বাসরঘরে খুঁজে পেতে হয়। সত্যি কথা বলতে কি, কলকাতা শহরকে ট্রাম ছাড়া চেনা যায় না। এই ট্রামলাইন যেন বিবাহিতা রমণীর সিঁথি, ভাড়া কম হওয়ায় এবং তুলনায় মন্থর বলে লাজুক কেরানি আর অশক্ত প্রৌঢ়ের অবলম্বন। আর আমরা কী অসামান্যভাবেই তাকে না মুদ্রিত হতে দেখেছি মহানগর (১৯৬৩) ছবিতে ছয়ের দশকের শুরুতে। এমনকি আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রের শুরুতেই তো উমাপদর মুখে অশ্বচালিত ট্রামেরও বিবরণ পাওয়া যায়। আমি চারুলতা (১৯৬৪)-র কথা বলছি।

যেমন বোস্টন শহরের ক্ষেত্রে টেনেসি উইলিয়ামসের হাতে বাসনার চিত্রকল্প হয়ে ওঠে ‘স্ট্রিটকার’, তেমনভাবেই জীবনানন্দ দাশের প্রতি অবিস্মরণীয় প্রণতিতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় উপহার দিয়ে যান একটি অনশ্বর পংক্তি – ‘মৃত্যু, তুমি রাসবিহারী ট্রামলাইন।’

টেনেসি উইলিয়ামস
মার্লন ব্রান্ডো ও ভিভিয়েন লি অভিনীত এলিয়া কাজানের ছবির শট ইউটিউব থেকে

আসলে জীবনানন্দকে ট্রামলাইন ছাড়া ভাবাই যায় না। তিনি ভাবতেন এসপ্লানেডের ট্রামলাইনের সর্পিল রহস্য। এই ট্রামলাইনই স্কুলবালক সত্যজিৎকে বোঝায় সরলরেখার যুক্তিসিদ্ধ চলন। কার কাছে কী অর্থ? মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)-য় এই ট্রামলাইনের ধারে সুপ্রিয়া চৌধুরীর দাঁড়িয়ে থাকা যেন চন্দ্রগ্রহণ। তেমনভাবেই বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) ছবিতে ঋত্বিক ঘটক উত্তর-দেশবিভাগ কলকাতা শহরের মর্মচ্ছেদ করেছেন বালক কাঞ্চনের চোখে দেখা এই ট্রামগাড়ির শাহরিক নতুনত্ব নিয়ে। তবে ট্রামের একটি স্থায়ী অভ্যুত্থান দেখা যায় মৃণাল সেনের ইন্টারভিউ (১৯৭১) ছবিতে। সেখানে বাস্তব ও আখ্যানের মায়াজাল ছিন্ন করতে তিনি ট্রামগাড়ির আশ্রয় নেন। ভারি অদ্ভুত সেই দৃশ্য যেখানে এক তরুণী সিনেমা পত্রিকায় নায়কের ছবি দেখে আর সেই নায়ককে চোখের সামনে যাত্রী হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। এমনকি ছবির ক্যামেরাম্যান কে কে মহাজনকে দৃশ্যগ্রহণের অবস্থায় দেখা যায়। মৃণাল মনে করেছিলেন এই ধ্বংসোন্মুখ শহরে ঔপনিবেশিকতার যে অন্তিম স্মারকগুলি রয়ে গেছে, ট্রাম তার অন্যতম।

আরো পড়ুন যানজট বাড়ায় প্রাইভেট গাড়ি, রাস্তা কারও একার নয়

এ যুগের কাহিনিছবিও কলকাতাকে আবিষ্কারের সময়ে ট্রামগাড়িকে বাদ দেয় না। আমাদের জীবনযাপনে ট্রামের শব্দ মাঝেমাঝেই কড়া নাড়ে। জীবনানন্দের উপন্যাস থেকে তো সেই ধ্বনি ভেসে আসেই। যেমন পাঁচ ও ছয়ের দশক জুড়ে ট্রাম কলকাতা ও তার মধ্যবিত্ত জীবনকে অনবরত সরবরাহ করেছে শহরবাসের রূপকথা। কলকাতার দিগন্তরেখায় ট্রাম এমনভাবে সংলগ্ন যে বাংলা কেন, বৈদেশিক চলচ্চিত্রেও কলকাতা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গেলে ট্রামগাড়িকে অবশ্যই দ্রষ্টব্য ভাবতে হয়। যেমন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মিলান, বোস্টন, প্রাগ শহরের ক্ষেত্রেও ভাবে। এই তো সেদিন দেখলাম জীবনানন্দের জীবনভিত্তিক এক কাহিনিচিত্রে ট্রামলাইন নিজেই এক অভিনেতা হয়ে উঠেছে।

আধুনিক শহরে দৃশ্যের যে কুচকাওয়াজ তাতে এখন ট্রামকে হয়ত অলস গতির বলে অবহেলা করা যায়। কিন্তু পুরানো জানিয়া এই গাড়িটিকে আধেক আঁখির কোণে না দেখলে কলকাতা শহর – তার শিল্প সাহিত্য, উদ্বিগ্ন তরুণী, বিদ্রোহ, তরুণ এবং অবসরের প্রাক্কালে মাস্টারমশাইকেও চেনা মুশকিল। আবার বলছি, জোব চার্নকের এই শহরের ট্রামই হল শকুন্তলার আংটি। ট্রাম যদি বিদায় নেয়, কলকাতা ক্রমশ দুর্বোধ্য চিঠির মত দূরে সরে যাবে। কলকাতার হৃদয় বিদীর্ণ করে তার খোলস বদলে নিলে শহরটার আর কতটুকু পড়ে থাকে? যা পড়ে থাকবে তা মৃত রূপসীর হাসির মত, উন্নয়নের কঙ্কাল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.