পাড়ায় পাড়ায় মহিলারা, ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায়। কাজ থেকে ফিরে নিছক আড্ডা না দিয়ে বা বাড়িতে না ঢুকে কেউ কেউ যোগ দিচ্ছেন মিছিল, মানববন্ধন কিংবা প্রতিবাদসভায়। রোজই কোথাও না কোথাও কোনো কর্মসূচিতে ব্যস্ত যুবতী-যুবক। রাজনৈতিক বা সমাজকর্মীরা শুধু নন, তার বাইরে থাকা মানুষের একটা বড় অংশ রাস্তায় নামছেন। নামতে না পারলে মন মানছে না। কলকাতা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামবাংলা এভাবেই উত্তাল হয়ে উঠেছে তিলোত্তমার বিচার চেয়ে। তাঁকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার পরেই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, যা বিস্তৃত হয় ১৪ অগাস্ট রাতে। এলাকায় এলাকায় সংগঠকরাও ভাবতে পারেননি, এত মানুষ সেদিন জড়ো হবেন। কোনো দক্ষ সংগঠক বা সংগঠনের ডাকে নয়। যে যেমনভাবে অনুভব করছেন, উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাতেই মানুষ রাস্তায় নামছেন।

প্রথম থেকে একের পর এক সন্দেহজনক, আপত্তিকর পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে রাজ্য সরকার। প্রথমে সব চলছিল চেনা ছকে। তদন্ত না করেই আত্মহত্যার তত্ত্ব সামনে আনা, তিলোত্তমার বাবা-মার সঙ্গে আর জি কর মেডিকাল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের দানবীয় (অমানবিক বলা ঠিক নয়, মানুষ ছাড়া অন্য জীবের আচরণেও মূল্যবোধ আছে) আচরণ, প্রতিবাদকে চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেওয়ার অপকৌশল। বিরোধী দলগুলিও রাস্তায় নেমেছে তাদের রাজনৈতিক কর্তব্যের খাতিরে। শাসক দলকে মোক্ষম প্যাঁচে ফেলতে কে-ই বা না চায়। কিন্তু সাধারণ মানুষও যে তাঁদের নিজেদের মত করে, কোনো দল বা নেতার অপেক্ষা না করে এভাবে রাস্তায় নামবেন – তা শাসক বা বিরোধী কোনো পক্ষই বুঝতে পারেনি। এরপর একের পর এক পদক্ষেপে সরকার বা তার মন্ত্রীসান্ত্রীরা প্রমাণ করে দিলেন, তাঁরা ভয় পেয়েছেন। মানুষের ভয় ভাঙলে ক্ষমতা ভয় পায়। এটাই ক্ষমতার স্বাভাবিক চরিত্র। কারণ মানুষের ভয় একবার ভাঙলে অনেক হিসেব ওলটপালট হয়ে যায়। প্রচলিত রাজনীতির ছকে তার ব্যাখ্যা সবসময় খুঁজে পাওয়া যায় না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আর জি কর মেডিকাল কলেজের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ভূমিকা নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। তা সত্ত্বেও ইস্তফার পরে চটজলদি তাঁকে কলকাতারই আরেকটি মেডিকাল কলেজে নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁকে আড়াল করতে রাজ্য সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে কারোরই সন্দেহ নেই। ১৪ অগাস্ট মানুষ যখন রাস্তায়, তখন আর জি করে তাণ্ডব, পুলিসের নিষ্ক্রিয়তা, পুলিস কমিশনারের দম্ভোক্তি প্রমাণ করল যে আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকার কতটা মরিয়া। তার আগে হঠাৎ ঘর সংস্কারের নামে ঘটনাস্থলের কাছেই ভাংচুরের চেষ্টা। ময়না তদন্তের রিপোর্ট সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে, অপরাধের জায়গা সেমিনার রুম ছাড়া অন্যত্রও নয় তো? তাহলে প্রমাণ লোপাটের জন্য ঘর সংস্কারের নামে তা কি ইতিমধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে? সব মিলিয়ে অপরাধের রহস্য আড়াল করতে মেডিকাল কলেজ কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও শাসকের এই মরিয়া প্রচেষ্টাই মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলল। বড় ম্যাচ বাতিল করা, সেদিন বিক্ষোভ দমনের নামে আন্দোলনকারীদের দমনের চেষ্টা, দুজন চিকিৎসককে পুলিসি তলব, বিভিন্ন স্থানে রীতিমত সভা করে আন্দোলনকারীদের প্রতি শাসক দলের নেতাদের হুমকি প্রমাণ করছে তারা ভয় পেয়েছে।

সরকার অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করতে, ধৃত অভিযুক্তের ফাঁসির দাবিতে সরব হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রবিবারের (অর্থাৎ ১৮ অগাস্টের) মধ্যে পুলিস সুরাহা না করতে পারলে সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়া হবে। কলকাতা হাইকোর্ট সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিতেই তিনি সেই রবিবারের মধ্যে অপরাধীর ফাঁসির দাবিতে মিছিল করলেন। প্রশ্ন উঠেছে, ১৮ অগাস্ট অবধি কলকাতা পুলিসকে সময় দেওয়া বা পরে একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে ফাঁসির দাবি তোলার কারণ কী? ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর এই কাজে একাধিক ব্যক্তির যুক্ত থাকার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছিল। একাধিক ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ সেই অনুমানের কথা বলেছিলেন। যদিও এখন কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে, সিবিআইয়ের মতে নাকি গণধর্ষণ হয়নি। কিন্তু যতক্ষণ না আদালত তেমন কিছু জানাচ্ছে, সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে – একজনকে ফাঁসি দিয়ে অন্য কাউকে বা আসল অপরাধীদেরই কি বাঁচাতে চাইছেন মমতা? এই কাণ্ডের পিছনে আরও গভীর ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই বলছেন। সেসব প্রকাশ্যে এলে কি শাসক দলের ঘোর বিপদ? তাই কি এহেন কর্মকাণ্ড?

ইতিমধ্যে মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে রাজ্য সরকার ১৭ দফা পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে অন্যতম রাতের কাজ থেকে মহিলা কর্মীদের যথাসম্ভব অব্যাহতি দেওয়া। হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসক ও সেবিকাদের কীভাবে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব? অন্যত্র বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত মহিলা কর্মীদের কাজ হারানোর সম্ভাবনাই এতে বাড়বে। বহু কাজের ক্ষেত্রেই মহিলাদের রাতে কর্মস্থলে থাকতে হয়। তথ্য বলছে, করোনা অতিমারীর পর কর্মরতা মহিলার সংখ্যা কমেছে। তারই মধ্যে এই সিদ্ধান্ত শ্রমজীবী মহিলাদের কাজের অধিকার আরও খর্ব করবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে এভাবে মহিলাদের ঘরে আটকে রাখার সরকারি নিদান সমানাধিকার তথা লিঙ্গসাম্যের ধারণার বিরোধী। অপরাধীরা রাস্তায় থাকবে আর মহিলারা ঘরের ভিতর – এই মনুবাদী মানসিকতা কাদের হাত শক্ত করছে?

অনেকে বলছেন, সরকার একের পর এক ভুল করে চলেছে। ভুল বললে সরকারের অপরাধকে খাটো করা হয়। সরকার যা করছে, ভীত শাসক হিসাবে করছে। চেনা ছকে কাজ না হলে ক্ষমতা এভাবেই ভয় পায়। যত ভয় পায়, তত স্বেচ্ছাচারী হয়। শাসক যত ভয় দেখাতে চাইছে, মানুষ তত ক্ষিপ্ত হয়ে রাস্তায় নামছেন। ফুটবলপ্রেমী মানুষের মধ্যে যাঁরা প্রথমে নির্লিপ্ত ছিলেন, তাঁরাও অনেকে বড় ম্যাচ বাতিল এবং সমর্থকদের উপর পুলিসি নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। চিকিৎসকদ্বয়কে তলব করার বিরুদ্ধে চিকিৎসক ও আইনজীবীরা এক হয়েছেন। কোথাও বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি নিচ্ছেন। কোথাও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একযোগে প্রতিবাদ করছেন। এমনকি কলকাতার তিন প্রধান ফুটবল দলকে একপ্রকার দখল করে ফেলার পরেও শাসক দল স্বস্তিতে নেই। বড় ম্যাচ বাতিল করার পরেও নয়। কারণ ইস্টবেঙ্গলের পরের ম্যাচেই মাঠে উঠেছে আর জি করের পাশে থাকার ব্যানার। এমনকি গোল করার পর ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররাও সে আওয়াজই তাঁদের মত করে তুলেছেন।

যে প্রজন্ম মোবাইল ফোনে বা কেরিয়ার গঠনে বুঁদ হয়ে আছে বলে আমরা অনেকে বিশ্বাস করতে শিখেছিলাম, তারাই হয়ে উঠছে আন্দোলনের মুখ। টিভি সিরিয়ালে না মজে মহিলারা প্রতিবাদ করছেন (মুখ্যমন্ত্রী একদা মহিলাদের টিভি সিরিয়াল দেখার কুপরামর্শ দিয়েছিলেন)। স্বাধীনতা দিবস বা রাখীবন্ধন হয়ে উঠছে প্রতিবাদের মাধ্যম। এবার বিগত কয়েক বছরের মত ১৪ অগাস্ট মধ্যরাতে শব্দবাজির তাণ্ডব বিশেষ শোনা যায়নি। ১৫ অগাস্টের উৎসবের আমেজে অনেকখানি ভাটা পড়েছিল। কেউ এসব করতে বারণ করেনি। কিন্তু কোথাও একটা বিষাদ এবং প্রতিবাদের পরিবেশ গড়ে উঠেছে। রাখীবন্ধন উৎসবেও আমরা তাই দেখলাম। শুধু শহরেই নয়, বহু গ্রামেও মানুষ প্রতিবাদের জন্য এই সামাজিক উৎসবকে বেছে নিলেন। রাজ্যের বহু জায়গায় কালো রঙের রাখী অথবা সুবিচারের দাবি জানিয়ে রাখী পরানো হল। হল নাগরিক উদ্যোগে মিছিল।

কর্মসূচির সময় ঠিক করা হচ্ছে মানুষের অংশগ্রহণের সুবিধার কথা ভেবে, এলাকার পরিবেশ অনুযায়ী। রাত আটটা বা নটাতেও কোথাও কোথাও কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। গ্রামেও সন্ধ্যাবেলায় মোমবাতি বা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে মিছিল হচ্ছে। আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিলের মত প্রকল্পের মহিলা কর্মীরা রাতে মহিলাদের কাজে ঘুরিয়ে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছেন। জীবিকার সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, বিবেকের ডাক – সব মিলেমিশে প্রতিবাদ হয়ে আছড়ে পড়ছে রাজপথ থেকে গ্রামের পথে।

প্রশ্ন উঠেছে, এর আগেও রাজ্যে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তখন মানুষ কেন এভাবে প্রতিবাদে করেননি? আসলে আন্দোলন বা প্রতিবাদ দানা বাঁধার পিছনে অনেক শর্ত কাজ করে। কলকাতা বা তার আশপাশের অঞ্চলের ঘটনা যতটা প্রচার পায়, দূরের ঘটনা পায় না। যেমন ১৪ অগাস্ট রাতেই পূর্ব বর্ধমানে এক আদিবাসী মহিলার খুন ততটা গুরুত্ব পায়নি। তবে আন্দোলনে অনেক জায়গাতেই তাঁর হত্যাকারীদেরও দ্রুত শাস্তির দাবি উঠছে। আবার, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাও এই আন্দোলনে অনুঘটকের কাজ করেছে। কেউ কেউ বলছেন, আন্দোলনে এলিটিজমের উপাদান রয়েছে। কিন্তু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট কোচিং সেন্টার বা সোশাল মিডিয়ায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যে ছাত্রছাত্রীরা কর্মসূচি ঠিক করছেন অথবা কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন, যে গৃহবধূরা বাড়ির ঘেরাটোপ ছেড়ে রাস্তায় নামছেন – তাঁদের ওসব ভাবতে বয়েই গেছে। বরং আন্দোলন আরও অনেক ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসছে। যেমন চারিদিকে মাদকদ্রব্যের ঠেক, নারীদের কাজের জায়গায় বা রাস্তায় নিরাপত্তা, শ্রমজীবী মহিলাদের অধিকার – আরও কতকিছু। মানুষ আজ এই সামাজিক ব্যাধিগুলিকে নিজের বিপদ বলে ভাবছেন। একটি নৃশংস ঘটনাতেই এসব হয়নি, হয় না। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতা, জীবনের অনিশ্চয়তা – সব একদিন এভাবেই প্রতিবাদে, প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয়। অন্ধকার রাস্তায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে উদ্বিগ্ন মহিলা, কন্যা সন্তানের বাবা-মার সঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, সেবিকা ও ছাত্রছাত্রীর নিরাপত্তাহীনতা এক হয়ে যায়।

নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন ঘটিয়ে, তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়া শাসকের বহু যুগের কৌশল। আমাদের রাজ্যে এসব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক-রোগী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যেন একে অপরের শত্রু। কেউ কারোর উপর নির্ভরশীল নন। এই আন্দোলন সেই নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলি অনেকখানি জোড়া লাগিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে পাড়ার ক্লাব পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শাসকের দখলদারির বিরুদ্ধেও যেন এই প্রতিবাদ।

বিজেপি স্বাভাবিকভাবেই ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টায় আছে। কাঠুয়া, উন্নাও, হাথরস, মণিপুরে মহিলাদের বিরুদ্ধে এবং ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়ানো বিজেপি এখন রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি তুলছে। জনজাগরণ দমন করার এও আরেক চেষ্টা। কারণ এই প্রতিবাদ এখন রাজ্যের সীমা ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যে, এমনকি বিদেশেও প্রভাব ফেলছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলাদের নিরাপত্তা বা সরকারি হাসপাতালের অবস্থা মোটেই গর্ব করার মত নয়। তৃণমূল-বিজেপি মেরুকরণের রাজনীতিকে এই কদিনে অনেকখানি অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে এই জনজাগরণ। এখন রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি তুললে শুভেন্দু অধিকারীদের ভাগ্যে ক্ষমতার শিকে ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে। আবার বিজেপি সামনে চলে এলে আন্দোলনেও ভাঙন ধরবে। কারণ এই আন্দোলনের সুযোগ বিজেপি পাক, তা অধিকাংশ রাজ্যবাসী চান না। ফলে জনজাগরণকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বৃত্তে এনে ফেলতে না পারলে তৃণমূল বা বিজেপি কেউই স্বস্তিতে থাকতে পারবে না।

আরো পড়ুন বিজেপিবিরোধিতার ব্যাটন রইল তৃণমূল কংগ্রেসের হাতেই

এই গণআন্দোলন রাজনৈতিক না অরাজনৈতিক – তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। অধিকারের দাবিতে, ন্যায়বিচারের দাবিতে চলা কোনো আন্দোলনই অরাজনৈতিক হতে পারে না। কিন্তু দলীয় রাজনীতির পরিসরের বাইরেও এই আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছে। যা এই রাজ্যে অভূতপূর্ব বললে অত্যুক্তি হবে না। কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের বাইরেও মানুষ নিজেদের মত করে কর্মসূচি নিচ্ছেন। আলাদা আলাদা কর্মসূচিও হচ্ছে। আবার রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও বিভিন্ন দলহীন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। মানুষ যেন রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি ভরসা রাখতে পারছেন না, নিজেরাই নিজেদের অধিকার বুঝতে চাইছেন। কেউ বা অত না ভেবেও একটা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।

মানুষ এইভাবে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে চাইলে শাসনযন্ত্রের ঘোর বিপদ। কারণ সরকার বা কোনো মন্ত্রীকে বদলালেই মানুষ শান্ত হবেন না। অধিকার রক্ষার তাগিদে আবার যে কোনো মুহূর্তে এমনই গর্জে উঠতে পারেন। গণতন্ত্র মানে যে কেবল পাঁচবছর অন্তর ভোট দেওয়া নয়, তা মানুষ অনুভব করলে, অসাম্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থাটাই সঙ্কটে পড়বে। তাই, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে আরেক দলের ক্ষমতা লাভের পথ প্রশস্ত করতে বা কিছু সংস্কার, মন ভোলানো পদক্ষেপের প্রলেপে মানুষের ক্ষোভকে ধামাচাপা দিতে হয়।

স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন যেমন প্রগতিশীল পরিবর্তন এনেছে, তেমন আরও প্রতিক্রিয়াশীল স্বেচ্ছাচারীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের তাই এখন বড় দায়িত্ব। আমাদের এই লড়াই, প্রতিবাদের ফসল যাতে বিজেপির মত ভয়ঙ্কর কোনো শক্তি কাজে লাগাতে না পারে তা আমাদেরই দেখতে হবে। সেটা করতে হবে মানুষের আন্দোলনের পথেই, ধারাবাহিকভাবে রাস্তায় থেকে। বিজেপির জুজু দেখিয়ে যাঁরা এই রাজ্যে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে নীরব বা নরম থাকতে চান, তাঁরা আর যা-ই হোক বিজেপিকে আটকাতে পারবেন না। রাজ্য সরকার, তার প্রশাসনকে যেমন যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমন রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতার সুযোগে যাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ক্ষমতা না বাড়ে তা নিশ্চিত করার দাবিও আমাদের তোলা দরকার। যেভাবে বেসরকারি এজেন্সিগুলিকে হাসপাতাল সমেত নানা সরকারি দফতর ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারও বিরোধিতা দরকার। রাজ্যের এই অভূতপূর্ব আন্দোলন বরং সারা দেশকে পথ দেখাক। অন্য রাজ্যেও নারী নির্যাতন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনিয়ম প্রভৃতির বিরুদ্ধে এই পথে আন্দোলন গড়ে উঠলেই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে সেই স্তরে উন্নীত করা দরকার।

আর এখানেই বামেদের বড় ভূমিকার রয়েছে। কিন্তু বাম দলগুলি তার জন্য কতখানি প্রস্তুত? সব নিজেদের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করলে বা একে নিছক নির্বাচনী সাফল্যে পরিবর্তিত করতে চাইলে সেই ভূমিকা পালন করা যায় না। বামেদের প্রথমে বুঝতে হবে এই সময়কে। মানুষ স্বার্থপর বা সরকারি প্রকল্পে মজে আছেন – এই অজুহাত দিয়ে হতাশ হওয়ার সময় এটা নয়। মানুষ প্রতিবাদে নামেন, প্রতিবাদ চান। বরং গণআন্দোলন দলীয় নিয়ন্ত্রণেই হবে – এই ধারণা থেকে বামেদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। দল সচেতনতায় অগ্রচারী – এই ধারণায় যে কোনো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দলীয় কাঠামোর সর্বোচ্চ স্তর থেকে কর্মসূচির নির্দেশ সর্বনিম্ন স্তর অবধি অনুসরণ করে চলবে – এই স্তরায়ন দলের অভ্যন্তরে চলতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাকে স্বীকৃতি দেবেন কেন? আমরাই সবজান্তা বা সেরা – এই ধারণা থেকে বেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন থেকেও শিক্ষা নিতে হয়। তার প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়তে হয়। সে কাজ বড় ধৈর্যের। রাতারাতি সাফল্য আসে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.