সেদিন ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরিয়েছে। কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জির বাড়ি লোকে লোকারণ্য। বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট অফিসে সাংবাদিক ও দলের নেতাদের নিয়ে বসে রয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। একে একে নেতা, বিধায়কেরা আসছেন নেত্রীকে অভিনন্দন জানাতে। এমনই অভিনন্দের স্রোতে গা ভাসিয়ে এলেন বিধায়ক সাধন পাণ্ডে। হাতে ফুলের তোড়া। নেত্রীর দিকে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন সাধন। খুশির আবহেই মমতা মুখ ঝামটা দিয়ে সাধনের উদ্দেশে বলে উঠলেন ‘আমি জানি আপনি কী করেছেন। সব খবর আমার কাছে আছে।’ সম্ভবত নির্বাচনের সময়ে নিজের দলের প্রার্থীর জন্য যথেষ্ট কাজ করেননি উনি। পরিচিত, অপরিচিত সবার মাঝে এই ধরনের তিরস্কারের মুখে পড়ে সাধন তখন আমতা আমতা করছেন। এহেন সাধনকে কিন্তু মমতা ক্ষমতায় এসে মন্ত্রী করেছেন এবং আজীবন মন্ত্রিত্বে রেখেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে সাধনের স্ত্রীকে বিধায়ক হিসাবে জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন মানিকতলা থেকে।

এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি রয়েছে তৃণমূল দলে। নেত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেও, দলবিরোধী কাজ করেও আবার নেত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে জায়গা করে নেওয়া নেতা, নেত্রীর সংখ্যা কম নয়। ধমকে চমকে, তিরস্কার পুরস্কারে দল চালিয়ে যাচ্ছেন মমতা। তাঁর রাজনীতির অনেকটাই আবেগনির্ভর। তিনি জানেন তৃণমূল দলটাও আবেগেই চলছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুযোগ পেলে মমতার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি কিন্তু ঠিক উলটোটা করতেন। পিসির পথে প্রশ্রয়ের রাজনীতি তাঁর না-পসন্দ। তাঁর রাজনীতি অনেক বেশি বুদ্ধিনির্ভর। আবেগকে প্রশ্রয় দেন না বিশেষ। ঝামেলার কিছু দেখলেই তিনি সেই নেতাকে ছেঁটে ফেলতে দ্বিধা করেন না। নয়ত প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপিতে গিয়ে ফের তৃণমূলে ফিরে এলেও তাঁকে ত্রিপুরায় পাঠিয়ে দিতেন না। এখন পর্যন্ত রাজীব তৃণমূলে আগের মত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। অথবা অর্জুন সিংকে বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফিরিয়ে নিয়েও ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর পাতাটি কেটে দিতেন না। অর্জুনকে ব্যারাকপুর থেকে প্রার্থী না করে নিজের কাছের লোক পার্থ ভৌমিকের হাতে টিকিট তুলে দিয়েছিলেন অভিষেক।

ধান ভানতে শিবের গীতের একটাই কারণ। আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী ডাক্তার-ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় কেন অভিষেক নীরব রয়েছেন, তা বোঝার জন্য এটা জানা জরুরি যে মমতা ও অভিষেকের রাজনীতি করার ধরনের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

পাশাপাশি এটাও জানা জরুরি, যে রাজনীতির ধরনে ফারাক থাকলেও তাঁদের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব বা দূরত্ব নেই। একটা কথা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া যাক। বিভিন্ন ইস্যুতে মতান্তর ও রাজনীতি করার ধরনে ফারাক থাকলেও মমতা ও অভিষেকের মধ্যে দূরত্ব রাজনৈতিক কল্পনা মাত্র। পুরোটাই একটা নীরব বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে চলে। কাজেই এটা মনে করার কোনও কারণ নেই, যে যা হয় বা যা হচ্ছে তাতে মমতার কোনো অসম্মতি রয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য এক – মমতার পরে ক্ষমতায় আসুন অভিষেক। সেই পথ সচেতনভাবে পরিষ্কার রেখেছেন মমতা। সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর পরে অভিষেকই দলের, এবং দরকারে সরকারের, হাল ধরবেন।

অভিষেক বনাম মমতা – মিডিয়া হোক বা জনমানসে এই কল্পিত যুদ্ধের আখ্যানের অন্ত নেই। সেই ২০১৬ সালে যখন মমতা দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে গেলেন, তখন থেকেই প্রায় পিসি-ভাইপোর দ্বন্দ্ব-দূরত্বের কথা ঘুরে ফিরে আসে। সেবার অভিষেক মমতার শপথ অনুষ্ঠান ‘বয়কট’ করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা মত কাউকে কাউকে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়নি। তারপর পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচন হোক, দলের মধ্যে ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি নিয়ে হোক, নবীন-প্রবীণ লড়াই হোক, লোকসভা নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ হোক – বিভিন্ন ইস্যুতে কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিটের ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব’ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে উঠে যায় মাঝেমধ্যেই।

সাম্প্রতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে ট্রেনি ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নিয়ে অভিষেক ব্যানার্জির অদ্ভুত নীরবতা নিয়ে। তবে কি আবার পিসি-ভাইপো মুখ দেখাদেখি বন্ধ? তৃণমূলে একটি অভ্যুত্থান কি আসন্ন?

এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে আর জি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে নিয়ে যে ধরনের আত্মঘাতী গোল দিয়েছে মমতা ব্যানার্জির সরকার, তা নিশ্চয়ই অভিষেকের পছন্দ হয়নি। তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী হলে হয়ত সন্দীপকে প্রথম দিনই ছেঁটে ফেলতে দ্বিধা করতেন না। কিন্তু আর জি করের ঘটনা নিয়ে সরকারি অব্যবস্থার মাঝে যে ভাবে গণবিক্ষোভের সামনে পড়ল তৃণমূল সরকার, তার আঁচ বুঝেই অভিষেক নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এক্স হ্যান্ডেল থেকে একটা-দুটো পোস্ট করা ছাড়া তিনি চুপ করেই রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে তাঁর ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর আর এটাও ঠিক করছে না যে কোন নেতা কোন চ্যানেলে যাবেন দলের পক্ষে কথা বলতে।

আর জি কর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পিসির উপর ক্ষোভ থাকলেও তা কখনোই দ্বন্দ্ব নয়। পিসিও নিশ্চয়ই চাইছেন ভাইপোকে আড়ালে রাখতে। দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও অভিষেক সরকারের কেউ নন। কাজেই সরকারের গায়ে আঁচড় পড়লেও অভিষেককে কেউ ছুঁতে পারবে না। এই মুহূর্তে অভিষেক দলের বিবেক হয়ে উঠেছেন। অদূর ভবিষ্যতে যদি তৃণমূল সরকারে তাজা হাওয়া আনতে হয়, তাহলে অভিষেককে সামনে এগিয়ে দেবেন মমতা। অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।

এই দিনটার জন্যই তো তৃণমূল নেত্রী অভিষেকের পথ প্রশস্ত করেছেন। নিজের বিশ্বস্ত সাথীদের একে একে বিদায় করেছেন বা তাঁরা নিজেরাই বিদায় নিয়েছেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় হোক বা মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী হোক বা হালের জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কিংবা সুব্রত বক্সী – একে একে সবার হাত ছেড়ে দিয়েছেন বা দিতে বাধ্য হয়েছেন মমতা। হ্যাঁ, সুব্রত এখনো দলের রাজ্য সভাপতি এবং তাঁর মমতা-আনুগত্য প্রশ্নাতীত হলেও সব ক্ষমতা অভিষেকের হাতেই সব উজাড় করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনিও। দলের নিচুতলার কর্মীরাও বুঝে গেছেন – যুবরাজই সব, বক্সীদা এখন দুধে ভাতে। ব্যারাকপুরে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামাল দিতে গিয়ে যেভাবে দলের বিধায়ক সোমনাথ শ্যাম সুব্রতকে বসিয়ে রেখে ‘শান্তি বৈঠকে’ আসেননি, তাতে বক্সী বুঝে গেছেন দলে কার কথা চলছে।

এটাও ঠিক যে মমতা জানেন অভিষেকের হাতে দলের এবং পর্যায়ক্রমে সরকারের ভার তুলে দিতে হলেও, মমতার অবর্তমানে তৃণমূল দলের আস্ত থাকা দুষ্কর। যদি তখন দল সরকারে না থাকে, তাহলে তো তৃণমূল টুকরো টুকরো হতে বাধ্য। অভিষেক দলের মধ্যে নিজস্ব অনুগামীদের একটা টিম তৈরি করে নিলেও, তিনি কোনোভাবেই মমতা নন।

মমতা যে লড়াই ও আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে পুলিস আর সিপিএমের লাঠি খেতে খেতে উঠে এসেছেন, তা অভিষেক করার সুযোগ পাননি। একটা ‘বিরোধী বিরোধী’ ভাব নিয়ে ঘুরলেও অভিষেক কোনো দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল নন। যেভাবে মমতার অদম্য জেদ দেখে তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাংলার তৃণমূল কর্মী, সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষও জড়িয়ে পড়েছিলেন, অভিষেকের ক্ষেত্রে তা হয়নি। অভিষেকের অনুগামীরা ক্ষমতার অলিন্দে থেকে দল করেন। দল ক্ষমতায় থাকলে তাঁর অনুগামীরাও থাকবেন অভিষেকের সঙ্গে, কিন্তু দল ক্ষমতায় না থাকলে অনুগামীরা কী করবেন বলা মুশকিল।

আরো পড়ুন কুণাল ঘোষের সুতো আছে অন্য হাতে

কাজেই মমতা অনেক ক্ষেত্রে অভিষেককে ছেড়ে রেখেছেন। যেমন প্রবীণ-নবীনের দ্বন্দ্ব নিয়ে অভিষেককে নিজের বক্তব্য প্রকাশ্যে বা অনুগামীদের দিয়ে জানানোর ছাড়পত্র দিয়ে রাখলেও, মমতা পুরনো নেতাদের সকলের হাত এখনো ছেড়ে দেননি। সৌগত রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিমরা এখনো নেতৃত্বে রয়ে গেছেন।

সত্যিই মমতা-অভিষেকের ক্ষমতার লড়াই থাকলে এতদিনে মমতা অভিষেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নিতেন। কিন্তু অভিষেকের কোনো বক্তব্যকেই মমতা একেবারে নস্যাৎ করে দেননি, শাস্তি তো দূরের কথা। অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে অভিষেকের প্রতি।

তৃণমূল দল ও সরকারের এই বিপদের দিনে অভিষেক নিজেকে সাধু প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগের তির তাঁর দিকেও রয়েছে। অন্যদিকে এককালের মুকুল রায়ের মত প্রশাসনিক ও পুলিস পোস্টিং নিয়ে দলের তরফে অভিষেকের অঙ্গুলিহেলনের কথাও শোনা যায় কানাঘুষো। কাজেই আর জি কর কাণ্ডের ফলে যে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেই ঘুণ ধরার কথা প্রকাশ্যে আসছে, তার দায় একেবারেই অভিষেক এড়িয়ে যেতে পারেন না।

তবুও অভিষেকই তৃণমূলের শেষ অস্ত্র। ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সত্যিই পালাবদল অবশ্যম্ভাবী হলে অভিষেকের হাতেই সরকারের ব্যাটন তুলে দিতে হবে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে যেমন জ্যোতি বসুর জায়গায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে মুখ্যমন্ত্রী পদে এনে তাজা হাওয়া এনেছিলেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ, তেমনই একটা চাল চালতে পারে তৃণমূলও।

তবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির বুদ্ধদেব এবং সিপিএম পার্টির সংগঠনের উপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনটা মসৃণ করেছিল। অভিষেকের পক্ষে ব্যাপারটা অত সহজ কখনোই হবে না। তবে ততদিন পর্যন্ত স্বপ্নের ডিমে তা দিতেই পারেন তৃণমূলের যুবরাজ।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.