“… তারপর কী হল জানো? একদল দাঙ্গাবাজ আমাকে ঘিরে ফেলল। আমি একা পড়ে গিয়েছি তখন। ওরা আমায় একটানা গালিগালাজ করল, চড় থাপ্পড় মারল। তারপর পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল। আগুনে ফেলবে বলে তুলল। এক্কেবারে যাকে বলে জীবন-মরণ সংকট…”

“তারপর?”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“তার আর পর কী? মরিনি, সে তো দেখতেই পাচ্ছ। হল কি, কড়েয়া থানার একজন পুলিশ অফিসার বিষয়টা বুঝতে পেরে এন্ট্রি নিলেন। শূন্যে ফায়ার করলেন পর পর। তখন ওরা পালাল আর আমারও জীবন বেঁচে গেল।”

কান্তি গাঙ্গুলি হাসছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর সঙ্গে নাগরিক ডট নেটের লম্বা আলাপচারিতায় সবচেয়ে গৌণ যেন নির্বাচনের প্রসঙ্গই। কথা শুরু হল বরিশালের নদী, মাঠ, ফেলে আসা গ্রাম, গাছপালা নিয়ে। তারপর তাতে ঢুকে পড়ল ছেচল্লিশের দাঙ্গা — লাশের স্তুপ আর চাপ চাপ রক্ত পেরিয়ে চলে আসা বেলেঘাটার বস্তিতে। টাকা নেই, সুস্থভাবে থাকার জায়গা নেই, তার মাঝেই বাবার মৃত্যু। মৃতদেহটাকে নিয়ে দুই ভাই চললেন বেলেঘাটা ব্রিজে। হাজার মানুষের চোখের সামনে বাবার লাশ বিছিয়ে ভিক্ষা করলেন সৎকারের টাকা। তারপর গরুর গাড়িতে চেপে চলে আসা গড়ফা এলাকায়। উদ্বাস্তু কলোনির এক চিলতে ঘর। আর এস পি দলের ‘তরুণ তীর্থ’ সংগঠনে যুক্ত হয়ে পড়া। সেখান থেকে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে। খাদ্য আন্দোলনে মার খেয়ে পোড় খাওয়া কিশোর কান্তি তখন এলাকায় ইউ সি আর সি-র কাজে মগ্ন। ১৯৬১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেলেন। তার আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে আশু মজুমদারের সঙ্গে তাঁর বহু আলোচিত বন্ধুত্ব। প্রায় এক দশক পরে সিআরপি-র গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে থাকবেন নকশালপন্থী আশু। কান্তি তখন সিপিএমের লড়াকু সৈনিক।

“আশু মজুমদারের মৃত্যুর খবরে কষ্ট পেয়েছিলেন, কান্তিদা? নাকি খুশি হয়েছিলেন রেনিগেডের মৃত্যুতে?”

“তোমরা মানুষকে কী ভাবো বলো তো? কমিউনিস্টরা মানুষ। তাদের হৃদয়টা খুব ছোট নয়। অনেকের চেয়ে বড়। আর তার চেয়েও বড় তাদের আদর্শ। বন্ধুর চেয়ে পার্টি বড়। আর পার্টির চেয়েও বড় কী বল তো? লাল ঝান্ডা।”

নির্বাচনের আগে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে কান্তিভূষণ গঙ্গোপাধ্যায় পৌঁছে গেলেন বরিশালে। তখনো দেশভাগ হয়নি। কিন্তু বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক হাওয়ায় ছেয়ে গিয়েছে চরাচর। কান্তি বলছেন, “দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। উফ্! সে কি বীভৎস দাঙ্গা! আমি তখন খুব ছোট। আমাদের বাড়িতে একজন মুনিষ কাজ করতেন, তিনি মুসলমান। ঐ মানুষটি আমাদের লুকিয়ে রেখে দিলেন কয়েকটা দিন। প্রাণে বাঁচালাম, কিন্তু ভিটের পাট চুকল। আমাদের শৈশবের সেই গ্রাম, কীর্তনখোলা নদী, গাছপালা- সব ছেড়ে এক বস্ত্রে চলে এলাম কলকাতায়, বেলেঘাটা বস্তির একটা ঘরে। ভয়ঙ্কর রকমের নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা শুরু হল… বাবার শরীরটা দেশে থাকতেই খারাপ ছিল। এত ধকল নিতে পারলেন না।”

কান্তি বলছেন, “বাবা যখন মারা গেলেন, তখন ঘরে একটা পয়সা নেই। আমরা দু ভাই মিলে বডিটা নিয়ে গেলাম বেলেঘাটা ব্রিজে। চিৎকার করে সৎকারের টাকা ভিক্ষে চাইতে লাগলাম।” সিপিএমের বিতর্কিত নেতা, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী একটু যেন থমকান। সাত দশকের তামাদি স্মৃতির গায়ে এবার কলোনি পাড়ার হাওয়া। “আমরা তার কিছুদিন পরে চলে এলাম গড়ফায়। নিচু জমি। জল ঢোকে। কিন্তু মাথা গোঁজা তো যাবে। সেই থেকে শুরু হল আমার কলোনির জীবন।”

যাদবপুর তো তখন আজকের মতো নয়। আলো নেই। জল নেই। শিয়াল ঘুরে বেড়ায়। জলাজঙ্গলে ভরা জায়গা। এলাকায় শক্তিশালী দুই বামপন্থী দল — আরএসপি এবং সিপিআই। কান্তি যুক্ত হলেন আরএসপি প্রভাবিত কিশোর কিশোরীদের সংগঠন তরুণ তীর্থে।

“তখন তো অত কিছু বুঝতাম না, লাল ঝান্ডা ভাল লাগত। লাল পতাকা মানেই আমাদের পার্টি — গরীব আর রিফিউজিদের পার্টি। কিছুদিন আরএসপি করার পর যোগ দিলাম সিপিআইতে। আমি আর আশু মজুমদার একসঙ্গেই পার্টিতে এলাম প্রায়। লোকে আমাদের যমজ ভাইদের মতো দেখত। আশু-কান্তি, কান্তি-আশু বলত…”।

১৯৬১ সাল। কান্তি পার্টির সদস্যপদ পেলেন, আশু পেলেন না। ষাট বছর পরও কান্তির মুখে অস্বস্তি যেন।

“ও পেল না, এটা ফ্যাক্ট। কেন পেল না, আমি এখন বলতে চাই না। তবে পেলে হয়তো ও চলে যেত না…”

১৯৬২ আর ১৯৬৪। দু বছরে তিন ধাক্কা। প্রথমে চিন-ভারত যুদ্ধ। তারপর পার্টি ভাগ আর দাঙ্গা। “দেশদ্রোহী” কমিউনিস্টদের প্রতি ’৬২ সালে উপচে পড়ছে গণ ঘৃণা। কলেজ স্ট্রিটে পোড়ানো হচ্ছে বামপন্থী বইপত্র। কালিঘাটে কুশপুতুলের দোকান বসছে। সেখানে স্বল্প মূল্যে মিলছে জ্যোতি বসু, চৌ এন লাইয়ের কুশপুতুল। সে সব দিনের কথা বলতে বলতে কান্তির গলায় তৃপ্তি আর আক্ষেপের আলোছায়া। “তখনো, ঐ প্রবল বামবিরোধী হাওয়াতেও যাদবপুরে রিফিউজিরা ছিলেন পার্টির আশ্রয়। আমাদের আগলে রেখেছিলেন উদ্বাস্তু মানুষ। কিন্তু দু বছর পরেই সব বদলে গেল। মারাত্মক দাঙ্গা শুরু হল। ওদিকে পার্টিও ভেঙে গেল। আমি, আশু সহ বন্ধুরা সবাই চলে এলাম সিপিএমে।”

এই দাঙ্গাতেই দু বার মরতে বসেছিলেন কান্তি৷ একবার তো হিন্দুরা আগুনে ফেলে দিচ্ছিলেন প্রায়। অন্যবার মুসলিমরা।

“এলাকার শ তিনেক মুসলিমকে বাঁচিয়ে পার্ক সার্কাসে নিয়ে গেলাম। ও মা, ফেরার সময় দেখি স্থানীয় লোকজন গলা কাটতে আসছে! তারপর আমরা যাঁদের নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁরাই কোনরকমে বাঁচালেন। চা-টা খেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলাম।”

এরপর যুক্তফ্রন্ট, এরপর নকশালবাড়ি। কান্তি খুব বিশদ হলেন না। ততদিনে আশু মজুমদার এলাকার দুর্দান্ত সিপিআই-এমএল নেতা। পাড়ায় পাড়ায় খুনোখুনি।

“আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, জানো? বলেছিলাম, এভাবে বিপ্লব হয় না। মানুষকে বাদ দিয়ে, গণসংগঠন ছাড়া.. হয় না.. ফিরে আয়.. যাস না… ও কথা শুনল না…”।

কান্তি বলতে থাকেন, “গড়ফা ওদের, সন্তোষপুর আমাদের। খুন, পাল্টা খুন চলছে। একদিন আমাদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ল আশু। মরেই যেত। আমি চিৎকার করে বললাম ‘তোরা করছিসটা কী! ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি দিয়ে বিপ্লব! লজ্জা করে না?’… আশু বুঝল আমি ওকে সতর্ক করে দিচ্ছি। ও পালাল। সেদিনটার জন্য বেঁচে গেল আশু।”

কান্তি চুপ করে যান। মুহূর্তগুলো বড় হতে হতে ফেটে যায়।

প্রথম যুক্তফ্রন্ট, দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট পেরিয়ে বাহাত্তর সাল। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমল। নির্বাচনের নামে প্রহসন। পার্টির নির্দেশে নাম ভাঁড়িয়ে কান্তি গেলেন জঙ্গলমহলে, শুরু হল আত্মগোপন পর্ব। সব মিলিয়ে প্রায় আট বছর আত্মগোপন করে থেকেছেন তিনি। সেই অবস্থাতেই কেন্দুপাতা নিয়ে আন্দোলন, আদিবাসীদের সংগঠিত করা। পার্টির নির্দেশে ফিরে আসা যাদবপুরে। এরপর সাতাত্তর। লোকসভায় ধাক্কা খেল কংগ্রেস, বিধানসভায় তৈরি হল বামফ্রন্ট সরকার। কান্তি লেগে পড়লেন যাদবপুরের উন্নয়নের কাজে। নতুন করে সাজালেন গোটা এলাকা। লোকের মুখে মুখে ফিরল যাদবপুরের “রূপকার” কান্তি গাঙ্গুলি।

আশির দশকের মাঝামাঝি ফের নতুন মিশন, আর একটা জীবনে ঢুকে পড়া। জয়নগর, কুলতলিতে তখন এসইউসি-র দুর্ভেদ্য সংগঠন। না থাকার মতো করে টিমটিম করছে সিপিএম। পার্টির নির্দেশে কলোনির চেনা মাঠ ছেড়ে কান্তি যুদ্ধে নামলেন নোনা মাটির রণাঙ্গনে, আর এক লাল পতাকার বিরুদ্ধে। সেই শুরু, তারপর থেকে কান্তি গাঙ্গুলি আর সুন্দরবন একাকার।

“কান্তিদা, আপনি নাকি অনেক খুন করিয়েছেন? এস ইউ সির দেড়শোর বেশি কমরেডকে নাকি খুন করিয়েছেন আপনি। সত্যি?”

প্রাথমিক অস্বস্তি কাটিয়ে সরাসরি প্রশ্নটা করে ফেলা গেল।

“বাজে কথা। আমি কেন খুন করাব? ওই এলাকায় এসইউসি-র দাপটে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত৷ আমাদের কমরেডরা আক্রান্ত হয়েছেন, গ্রামছাড়া হয়েছেন। হ্যাঁ, আমরাও এরপর রুখে দাঁড়িয়েছি। সংঘর্ষ হয়েছে, লড়াই হয়েছে, আমরাও প্রতিরোধ গড়েছি। এসইউসি আমার নামে দেওয়াল লিখত: কান্তি গাঙ্গুলির মুণ্ডু চাই। আমার ভাল লাগত। মনে হত পার্টির দেয়া দায়িত্ব পালন করতে পারছি।”

একটানা প্রায় আড়াই দশক কুলতলি, জয়নগর, রায়দিঘির একাংশে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছে সিপিএম, এসইউসির-। ঐ এলাকায় এখনো মোড়ে মোড়ে শহীদ বেদী, দু দলেরই। কিন্তু এই ২০২১ সালে নির্বাচনী পাটিগণিতে দুই কেন্দ্রেই বেশ পিছিয়ে এই দুই বাম দল।

“কান্তিদা, কী লাভ হল আরেকটা বাম দলের সঙ্গে এত লড়াই করে? দুজনেই তো শেষ হয়ে গেলেন?”

কান্তি এবার যেন ঈষৎ উত্তেজিত।

“শেষ হয়ে গেলাম মানে! কে বলেছে আমরা শেষ? কুলতলিতে আমরা লড়াইতেও আছি। আর তাছাড়াও শোনো, এসইউসি-র সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক লড়াই হত, এলাকা দখলের লড়াই হত। এখন কী হচ্ছে? হিন্দু-মুসলমান ভোট হচ্ছে। এসব নোংরা হাওয়াকে রোখা কি সহজ? কিন্তু মানুষ একদিন বুঝবে ধর্ম দিয়ে পেট ভরে না। তখন এই লাল পতাকাই থাকবে। এ অনিবার্য, এ হবেই।”

“আপনারা এই গেরুয়া আন্ডার কারেন্ট আটকাতে পারছেন না কেন?”

“পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পূর্ণ অনুধাবন করতে পারছি না বলে। অতিরিক্ত আশাবাদ আসলে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রমাণ। এই জেলায় বিজেপি নোংরা বিভাজনের খেলা খেলছে। ওদের সংগঠন নেই, আছে ঘৃণার রাজনীতি। ভোট আসবে, যাবে। কমিউনিস্টদের এই আন্ডার কারেন্টটা বুঝতেই হবে। নইলে এই মাটিতে যে বিষের চাষ করবে, তা রোখা কঠিন হবে।”

“আপনি নাকি জিতেই গিয়েছেন? অন্তত সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের লোকজন তো তেমনই বলছে…”

“যে বলছে বলুক, আমি বলছি না। লড়াই কঠিন। লড়াই হবে। আমি পার্টিকে বলেছিলাম লড়ব না, নতুন কেউ লড়ুক। পার্টি আমাকেই লড়তে বলেছে, আমি লড়ছি। আমি কান্তি গাঙ্গুলি। পার্টিজান। সিপিএমের কান্তি গাঙ্গুলি। দল যে দায়িত্ব দেবে, করব। কিন্তু লড়াই জিতে গিয়েছি, সহজ জয় — এসব বলব না।”

“কান্তিদা, কংগ্রেস, নকশাল,এস ইউ সির সাথে লড়ে গত দুবার দেবশ্রী রায়ের কাছে হার?”

“হ্যাঁ, হেরেছি। কী হয়েছে তাতে? আমি সুন্দরবনের মাটিতে মিশে আছি। গতবার আমি ৪৬% ভোট পেয়ে হেরেছি। বিজেপি, এস ইউ সির ভোট জোড়াফুলে গিয়েছিল আমাকে হারাতে। কিন্তু এই মাটির থেকে আমাকে আলাদা করা যাবে না। ম্যানগ্রোভের শিকড়ে, নদীবাঁধে, মৎস্যজীবীদের প্রতিদিনের সমস্যায় আমি থাকব, সিপিএমের কান্তি গাঙ্গুলি থাকবে। হারা জেতার তোয়াক্কা করি না আমি।”

কান্তি একটু হাঁপান। জল খান। তারপর বলেন, “একটা কথা বলি, রেকর্ড করে নাও। আমাদের রাস্তায় থাকতে হবে। আমরা যারা নেতা তারা যেন সেফ সিট না খুঁজি। একের পর এক কেন্দ্র না বদলে মাটি কামড়ে লড়াই করি যেন। তাহলেই আমরা আবার ফিরে আসব।”

সাক্ষাৎকার শেষ। কান্তি আবার ডাকলেন।

“জলের মধ্যে মাছের মতো থাকতে হবে আমাদের। সিপিএমের নেতা হওয়া সহজ, মানুষের নেতা হওয়া সহজ নয়। এটাও রেকর্ড করে নিও।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.