অভিজিৎ খাঁ

বাংলার মাটি, বাংলার জল,  বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
     পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান॥
     বাংলার ঘর, বাংলার হাট,  বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
     পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান॥
     বাঙালির পণ, বাঙালির আশা,  বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
     সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান॥
     বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন,  বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন—
     এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান॥

২০ ডিসেম্বর ১৯৩৮ তারিখে জানকীনাথ বসুর প্রতি একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন “আজকালকার অনেক রেডিয়োগায়কও অহংকার করে বলে থাকেন তাঁরা আমার গানের উন্নতি করে থাকেন। মনে মনে বলি পরের গানের উন্নতি সাধনে প্রতিভার অপব্যয় না করে নিজের গানের রচনায় মন দিলে তাঁরা ধন্য হতে পারেন। সংসারে যদি উপদ্রব করতেই হয় তবে হিটলার প্রভৃতির ন্যায় নিজের নামের জোরে করাই ভালো।”

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তারপরেও রচনার ১১৮ বছর পর একজন প্রশাসনিক প্রধানের প্রস্তাবে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানের মধ্যে সাতবার উচ্চারিত ‘বাঙালি’ শব্দটাকে নির্মূল করে ‘বাংলা’ করে দেওয়া হল। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা পরিবর্তন করে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গাওয়ানো হল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নিজে সরকারি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে তাতে শিলমোহর দিয়ে দিলেন। নিজের নির্বোধ ইচ্ছাকে পূরণ করার তাগিদ অথবা ভোটার তোষণের উদগ্র বাসনায় যে এতদূর যাওয়া সম্ভব, তা আমাদের ধারণার অতীত ছিল। পাশাপাশি আমরা দেখলাম, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও রাষ্ট্রশক্তি কতখানি বেপরোয়া হতে পারে, কতখানি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজেদের মূর্খামিকে উৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত বলে মনে করতে পারে।

এবছরের সেপ্টেম্বর মাসেই মুখ্যমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথের এই গানটিকে রাজ্য সঙ্গীত হিসাবে নির্ধারণ করেন এবং গানের শব্দ পরিবর্তন করা নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এত দ্রুততার সঙ্গে এই উদ্ভট ভাবনা বাস্তবায়িত হয়ে উপস্থাপিত হবে তা আমার মত অনেকেই বোধহয় আশা করেননি। এক্ষেত্রে শাসকের উদ্দেশ্য এবং যুক্তি খুব পরিষ্কার। আজকের বাংলায় বাঙালি ছাড়াও অসংখ্য অবাঙালি বসবাস করেন, তাই বাঙালি তথা মানবতা বিরোধী শক্তি ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অবাঙালি তোষণ করতে হবে। এর জন্য রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছেন তাও বদলে দেওয়া যায়! তা করতে গিয়ে যদি বঙ্গভঙ্গের মত মূল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে গানটি বিচ্ছিন্ন হয়ে, স্বয়ং স্রষ্টার পরিকল্পনাও মাটি হয়ে যায়, কুছ পরোয়া নেহি। কারণ ভোটবাক্স সুরক্ষিত করতে অথবা নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য এই সরকার সমস্ত অধিকারের সীমা অতিক্রম করতে পারে।

‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ বাংলার নয়, বাঙালির গান। এটা ভুলে যাওয়া অন্যায়, কারণ এটা ঐতিহাসিক সত্য। এই বদলের অধিকার স্রষ্টা ছাড়া কারোর নেই, সে তিনি যত বড় পদাধিকারীই হোন না কেন। কারণ গানটির স্রষ্টা নিজেই ১৬ আষাঢ় ১৩৪৭ তারিখে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন “নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সব-কিছু সইতে হয়, এও যেন আমার পক্ষে সেই রকম।”

তাছাড়া গানটির শেষে ‘বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন এক হোক’ – এই প্রার্থনা শুধুই বাঙালির ঐক্যলাভের কামনা তো নয়। ‘যত’ শব্দ ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ বাংলা পক্ষ নির্ধারিত ভূমিসন্তান বাঙালি প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ এই গান মুখ্যমন্ত্রীর শব্দ বদলের আগে থেকেই বাংলা নামক স্থানে বাঙালি নামক জাতির সঙ্গে আরও যারা জীবনযাপন করে তাদের সবার ঐক্য প্রার্থনা করেছে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটো ভোটের জন্য এমন নির্লজ্জ তোষণ করে গানের রাজনীতিটা না বদলালেই পারতেন। খোদার ওপর খোদকারি করার অধিকার নিজের আছে বলে যিনি মনে করেন, তিনি মূর্খ।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়

পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই দুষ্কর্মটি করেছেন তাও বোধহয় সফল হওয়ার নয়। যতই ‘বাঙালি’ পালটে ‘বাংলা’ করে দেওয়া হোক না কেন, একটা বহুভাষী রাজ্যের রাজ্যসঙ্গীত যদি এক বিশেষ ভাষার হয়, তবে বাকিরা এমনিতেই তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সমস্যায় পড়বেন। যদি না তাদের ওই বিশেষ ভাষার প্রতি বিশেষ অনুরাগ থাকে। মুখ্যমন্ত্রী যাদের চাঁদমারি করেছেন তারা বোধহয় এ বিষয়ে ততটা আগ্রহী নয়।

মূর্খতা আর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতা এক আধারে এলে তা কতখানি বিপজ্জনক হতে পারে, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানের বাণী বদল তা প্রমাণ করেছে। পাশাপাশি যেসব বিখ্যাত শিল্পী পাশে দাঁড়িয়ে সেই বিকৃত গানে কন্ঠ মেলালেন, যাঁরা শুনলেন, এমনকি যে সাংবাদিক বন্ধুরা হিরণ্ময় নীরবতা পালন করলেন তাঁরাও দায় মুক্ত নন। নজরুলগীতিকে বাঁচাতে সবাই মিলে এ আর রহমানকে শূলে চড়াও, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত বাঁচাতে গেলে তো স্বয়ং মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে যেতে হবে। বাঙালি সে সাহস কবেই হারিয়েছে। এখন অধিকাংশ ‘বুদ্ধিজীবী’, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মানুষের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সংবেদনশীলতার থেকে মমতা বন্দনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার সৃজনশীলতার দেউলিয়াপনা আজ কোন জায়গায় পৌঁছেছে তার নমুনা সঙ্গীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তী বা মনোময় ভট্টাচার্যের জবাবদিহিতে স্পষ্ট। তাঁরা বলছেন, “.. স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে গাইতে ডেকেছেন, এটা গৌরবের। আমাদের যা গাইতে হবে তার বাণী দেওয়া হয়েছিল। সেটা দেখেই গাই। তখন আর কিছু খেয়াল হয়নি।” আর রূপঙ্করবাবু বলছেন, “কাগজে যা লেখা ছিল, সেটাই গেয়েছি।” ক্ষমতালোভী সুযোগসন্ধানীরা যখন শাসকের এমন নির্লজ্জ চাটুকারিতা করে তখন শাসক ধরাকে সরা জ্ঞান করে, এরকম ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে লালন করে।

অনেকেই বলছেন একাধিক রাজ্যের নিজস্ব রাজ্য সঙ্গীত আছে, বাংলার হলেই সমস্যা? না, কোনো সমস্যা নেই। অন্যান্য রাজ্যগুলোর মত নতুন একটা গান কাউকে দিয়ে লিখিয়ে, সুর করিয়ে গাইলেই হত। যে মানুষটা বেঁচে নেই আজ প্রায় ৮৩ বছর, তাঁর প্রতি আমাদের এইরকম নির্মম হতে হবে! রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই বাণী বদল আসলে সীমাহীন ঔদ্ধত্য, নির্বাচনমুখী তোষণ এবং নির্লজ্জ চাটুকারিতারই উৎকৃষ্ট ফসল। দুই বাংলার বাঙালির প্রাণাধিক প্ৰিয় একটা ঐতিহাসিক গানে অতিরিক্ত রাজনৈতিক শুদ্ধতা ঢোকানোর বিরোধিতা আমাদের যে কোনো মূল্যে করা উচিত। তিনি কিন্তু বলে গিয়েছিলেন “আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো।”

পেশায় স্কুলশিক্ষক, সাহিত্যের ছাত্র। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.