অভিজ্ঞতাকে যুক্তি হিসাবে খাড়া করায় যাদের আপত্তি আছে, তাদের এ লেখা না পড়াই ভাল। কারণ দর্শন বলে একটা বিষয় সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয়। জ্ঞান কী করে আহরণ করা যায়, বা সহজ করে বললে, সত্য জানার উপায় কী, তা দর্শনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। নানা দার্শনিক ঘরানা এ নিয়ে নানা কথা বললেও কেউই সত্য জানার উপায় হিসাবে অভিজ্ঞতাকে একেবারে অগ্রাহ্য করে না। কিন্তু দর্শন-টর্শন, মাননীয়া রেডিও জকি অয়ন্তিকা ফেসবুক লাইভে যাদের আঁতেল বলেছেন, তাদের বিষয়। কারণ দর্শন নিয়ে গবেষণা করে কর্পোরেটে চাকরি পাওয়া যায় না। দর্শনের ছাত্রছাত্রীরা বিলক্ষণ কর্পোরেটের চাকরি পেতে পারে এবং পায়, কিন্তু তা অন্য কোনো পারদর্শিতার জন্য। উপরন্তু কেবল অয়ন্তিকার সমর্থকরাই যে দর্শনকে আঁতেল ব্যাপার মনে করেন তা নয়, যাঁরা তাঁর বিপক্ষে তাঁরাও দর্শন-ফর্শনের ধার ধারেন না। কিন্তু বর্তমান লেখকের তাতে বয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার দস্তুর মেনে অয়ন্তিকার পক্ষে বা বিপক্ষে মুচমুচে কথা লিখে চটজলদি লাইক কুড়োনো এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। অয়ন্তিকা যা বলেছেন তার মধ্যে সার কিছু আছে কি, না সবটাই ঘুঁটে? যতটা ঘুঁটে তা দিয়ে উনুন জ্বালানো চলবে কি, নাকি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে? সেসব তলিয়ে দেখাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

যাঁরা অয়ন্তিকার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত, তাঁদের অনেকের অনেক যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য দেখলাম। কিন্তু একটা কথা চোখে পড়ল না। মাননীয়াকে কেউই ধরিয়ে দিচ্ছেন না, যে কর্পোরেটের চাকরি না পেলেই শিক্ষা বৃথা – এর চেয়ে বড় ভুল ধারণা আর হয় না। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য জগতকে জানা, জীবিকা অর্জন করা নয় – রচনাবই মুখস্থ করা এরকম কোনো বক্তব্য রাখছি না। এই চূড়ান্ত বেসরকারিকরণের যুগেও কর্পোরেটের চাকরি নয়, এরকম কত চাকরি আছে নিজেই একবার ভেবে দেখুন। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের আমলারা কি কর্পোরেটের চাকরি করেন? একেবারে উচ্চপদস্থদের বাদ দিলে, আমলাদের মাইনেপত্তর, অন্যান্য সুযোগসুবিধা কিন্তু এখনো ভারতে যারা বহুজাতিকের চাকরি করে তাদের সমান বা তার চেয়েও ভাল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরাও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কর্পোরেটের চাকুরে ছিলেন না। তাঁদের লেখাপড়া কি বৃথা গিয়েছে? ডাক্তার, নার্সরা অনেকেই কর্পোরেটের চাকুরে নন। বস্তুত কর্পোরেট হাসপাতালে যে ডাক্তারদের আমরা দেখাই, তাঁরা অনেকেই আসলে সরকারি হাসপাতালে চাকুরিরত। সেই পরিচয়ের কারণে, সেখানে অর্জিত সুনামের ফলেই কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা ওঁদের নিজের হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক ডাক্তার আবার হাজার পীড়াপীড়ি করলেও যান না। যাঁরা পুলিসে চাকরি করেন তাঁরাও কর্পোরেটের চাকুরে নন, সেনাবাহিনীর লোকেরা তো ননই। স্বাধীনোত্তর ভারতে সম্ভবত সাংবাদিকতাই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে দূরদর্শন আর অল ইন্ডিয়া রেডিও বাদ দিলে পুরোটাই কর্পোরেটের হাতে (কর্পোরেট শব্দটা যদিও তুলনায় নবীন, আগে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি ক্ষেত্র বলা হত) ছিল। সেই ক্ষেত্রের চেহারাও বদলাচ্ছে, যদিও গতি এখনো মন্থর। ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’ বলে অশ্রুতপূর্ব একটা কথা উঠে এসেছে, বিশাল কর্পোরেট হাউসের বাইরে ছোট ছোট ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর গড়ে উঠছে। আগামীদিনে সাংবাদিকতার চাকরির জন্যও হয়ত সেগুলোর দিকে যেতে হবে ছেলেমেয়েদের।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুতরাং বাংলা মাধ্যমে পড়লে কর্পোরেটের চাকরি পাওয়া যাবে না, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে – এই কথাটা আসলে পারিবারিক হোয়াটস্যাপ গ্রুপ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত বন্ধুদের সমসত্ত্ব জনগোষ্ঠীর মতামত, তার বেশি কিছু নয়। তাছাড়া সবাই চাকরি করবেই বা কেন? কেউ খেলোয়াড় হতে পারে। শুধু ক্রিকেট নয়, যত দিন যাচ্ছে এ দেশে অন্য খেলাধুলোতেও রোজগারের পরিমাণ বাড়ছে। কেউ অভিনেতা হবে, কেউ গায়ক বা বাজিয়ে হবে। সকলেরই চোস্ত ইংরেজি বলার দরকার পড়বে কি? কল্পনা করুন, একটি বাঙালি ছেলে শতরান করেছে আর অয়ন্তিকার মত কোনো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ধারাভাষ্যকার নাক সিঁটকে বলছেন “ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না বলে দ্বিশতরান করতে পারল না।” বা ধরুন একটি মেয়ে চমৎকার গান গায়। বলিউডে অডিশন দিতে গেল, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক সঙ্গীত পরিচালক বললেন “ইংরেজিটা ঠিক বলতে পারে না তো, তাই সা থেকে পা-তে পৌঁছতে পারছে না।”

হাসছেন তো? হাসবেন না। কোনো ধারাভাষ্যকার এত বোকা নন, কোনো সঙ্গীত পরিচালকও এত মূর্খ নন। তাঁরা পেশাদার লোক, যোগ্যতার দাম দিতে জানেন। ফলে এমনটা কখনো ঘটবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা (কেবল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া নয়) বাঙালি এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত, অর্থাৎ ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা একটা যোগ্যতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। অয়ন্তিকা যা বলেছেন সেই অভ্যাস থেকেই বলেছেন। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি যে দীর্ঘ ফেসবুক লাইভ করেছেন সেখানে এই ভাবনাটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলা মাধ্যমে পড়ে যারা ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না, তারা নির্ঘাত হীনমন্যতায় ভোগে।

কথাটা ঠিক। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া অনেকেও যে জঘন্য ইংরেজি বলে, কেবল টের পায় না যে ভুলভাল বলছে, সে কথা থাক। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় দারুণ সফল অনেককেই চিনি যারা এই হীনমন্যতায় ভুগছে। কদিন আগেই আমার মত বাংলা মাধ্যমে পড়া এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে কথা হল। সে-ও বলল, মনে হয় আরও উন্নতি করতে পারতাম গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারলে। এই হীনমন্যতার কারণ কী? কারণ অন্য বাঙালিরা। আমি কাজ করতাম ইংরেজি কাগজে, বেশকিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রতিবেদন লেখার সুযোগ পেয়েছি। লক্ষ করেছি, সাংবাদিক সম্মেলনে সব রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাই ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে গিয়ে হোঁচট খান। উত্তর ভারতীয়রা সেই কারণে সাধারণত হিন্দিতে প্রশ্ন করেন বা হিন্দি মিশিয়ে বলেন। দক্ষিণ ভারতের অনেকে আবার হিন্দিতেও সড়গড় নন। তাঁরা কিন্তু বুক ফুলিয়ে যেমন ইংরেজি আসে, তেমন ইংরেজিতেই প্রশ্ন করেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব যিনি উত্তর দেবেন তাঁর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মিডিয়া ম্যানেজারের। ইংরেজিটা নেহাত দুর্বোধ্য হলে ওই সাংবাদিকের রাজ্যের ভাল ইংরেজি জানা অন্য সাংবাদিকরা দেখেছি সাহায্য করেন। মাতৃভাষায় প্রশ্নটা জেনে নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলে দেন। অথচ কলকাতার বাংলা কাগজ, চ্যানেলের সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে দেখেছি ইংরেজি বলতে গিয়ে দরদর করে ঘামছেন। যাঁরা ফরসা তাঁদের মুখচোখ লাল হয়ে যেতে দেখেছি। কারণটা আর কিছুই নয়। উনি জানেন ওঁকে নিয়ে পরে হাসাহাসি করবে ওঁর নিজের শহরের সাংবাদিকরাই। হাতে গোনা দু-একজন ভাল ইংরেজি বলা সাংবাদিক সাহায্য করেন, বাকিরা জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে সান্ধ্য মদ্যপানের আসরের হাসির খোরাক সংগ্রহ করেন। কারণ তাঁরাও অয়ন্তিকার দলে। মনে করেন কে কত ভাল ইংরেজি বলে তা দিয়ে প্রমাণ হয় কে কত ভাল সাংবাদিক। কলকাতার এক বহুল প্রচারিত বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদক তো এই সেদিনও বলে বেড়াতেন, তাঁর ভাল বাংলা জানা তরুণ সাংবাদিক দরকার নেই। দরকার ভাল ইংরেজি বলতে পারা সাংবাদিক। সে কাগজের প্রতিবেদনের মান এবং ভাষার মান পাল্লা দিয়ে নেমেছে।

পৃথিবীর কটা জাতি ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা যোগ্যতা মনে করে সন্দেহ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করতে যাওয়া এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, প্রথম দিকে টক দিতে উঠে সে ঘেমে নেয়ে যেত। তারপর তার রিসার্চ গাইড, যাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি, একদিন জিজ্ঞেস করেন, তুমি তো যথেষ্ট ভাল ফিজিক্স জানো। বলতে গিয়ে অত ঘাবড়ে যাও কেন? সে উত্তরে জানায়, ইংরেজিটা ভুলভাল হয়ে যায় যদি? ভয় লাগে। তিনি তখন তাকে বলেন, ইংরেজি তোমার মাতৃভাষা নয়। তোমাকে আমরা নিয়েছি পদার্থবিদ্যার জন্যে, ইংরেজির জন্যে তো নয়। ও নিয়ে অত ভেবো না, কাজ চালিয়ে নিলেই হল। বাঙালি অধ্যাপক হলে ও কথা বলতেন না বোধহয়। আমার তো ইদানীং সন্দেহ হয়, সত্যজিৎ রায়ের ইংরেজি উচ্চারণ সাহেবদের মত না হলে বাঙালি বোধহয় তাঁকে বড় পরিচালক বলে মানত না।

এবার অন্য দিকটা দেখা যাক। অয়ন্তিকার বিরোধিতায় বাংলা মাধ্যমে পড়া জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল, এমনকি কর্পোরেট চাকরিতেই বহুদূর উঠেছেন এমন অনেক মানুষকে মুখ খুলতে দেখা গেছে। এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। মাননীয়ার কথায় যে যুক্তির য আর মেধার ম নেই সে তো আগেই বললাম। নিজের পিঠ বাঁচাতে যিনি বাংলাপক্ষের বাংলায় বাঙালিদের জন্য কাজ সংরক্ষণের দাবিকে সমর্থন করেন, তাঁর যুক্তিবোধ নিয়ে আর শব্দ খরচ করব না। কিন্তু কথা হল এই যে এত বাংলাপ্রেমী ও বাংলা মাধ্যমপ্রেমীর দেখা পাওয়া গেছে, এঁদের অনেকের প্রেমই যে দুষ্মন্তের শকুন্তলার প্রতি প্রেমের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানে অভিজ্ঞানটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজে পড়েছেন বাংলা মাধ্যমে, তার জন্যে কোথাও হোঁচট খেতেও হয়নি। কিন্তু নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমে। শুধু কি তাই? সন্তানের দ্বিতীয় ভাষা করেছেন হিন্দি। ছেলের ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় কোনো ছিদ্র দিয়ে যাতে বাংলা ঢুকতে না পারে, সে জন্য টিভিতে বাংলা অনুষ্ঠান দেখাও নিষিদ্ধ – এমন বাড়ি মফস্বলেও হয়েছে আজকাল। অয়ন্তিকা জনপ্রিয় এফ এম চ্যানেলে কাজ করেন। মুখের ভাষা শুনলেই বোঝা যায় বাংলা কোনোদিন ঠিক করে শেখেননি, তার জন্যে কিঞ্চিৎ গর্বও আছে। তা সত্ত্বেও ভাঙব তবু মচকাব না ফেসবুক লাইভটি করতে হল কেন? বাজারের চাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বাজার সমীক্ষা করে থাকেন, ফলে জানেন এফ এম চ্যানেলের শ্রোতাদের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের মফস্বল ও গ্রামের বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা মানুষজন, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা। তারা শোনে কিন্তু হিন্দি গান, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়ে ইংরেজি, হিন্দি মিশিয়েই কথা বলে। কারণ ওই খিচুড়ি ভাষা না বললে গ্রামের বন্ধুরাও গাঁইয়া ভাববে। এরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে না, কারণ পড়ার সুযোগ পায় না। হয় বাবা-মায়ের সে সামর্থ্য নেই, নয় এলাকায় তেমন স্কুল নেই। এদের চটিয়ে ফেললে এফ এম চ্যানেলের সমূহ ক্ষতি। আর জে ভদ্রমহিলা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েও এমনই অশিক্ষিত, অভব্য যে জানেন না, মানুষকে তার দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দিতে নেই। সেই অভব্যতার দায় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নেবেন কেন? জবাবদিহির আসল কারণ বোধহয় সেইটা।

এখান থেকেই তাহলে এসে গেল পরবর্তী প্রশ্নগুলো। ১) বাংলা মাধ্যমে পড়া পেশাগতভাবে সফল বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান কেন? ২) যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ে তারাও অনেকে নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমের মত করে তুলতে চায় কেন?

এসবের একটা কারণ অবশ্যই ইংরেজি বলার ক্ষমতাকে অকারণ গুরুত্ব দেওয়া, ইংরেজি শিখতে চাওয়া নয়। কারণ কোনো ভাষা শিখতে হলে সব বিষয় সেই ভাষাতেই পড়তে হয়, নইলে শেখা যায় না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণ হয়নি। তাছাড়া যে কোনো বাঙালি বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করুন, ইংলিশ মিডিয়ামে কেন পড়ান? উত্তর আসে, আজকালকার দিনে তো ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না। অর্থাৎ ইংরেজি শেখা নয়, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল বেশি ভাল করে শেখা যায় বলেও নয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা শুধু ইংরেজি বলতে শেখার জন্য। মানে স্কুলটা মূলত স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। একই যুক্তিতে আজকাল হিন্দিকে বাঙালি শিশুর দ্বিতীয় ভাষা করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র ছাড়া সবই দক্ষিণে, অথচ বাঙালির নাকি হিন্দি বলতে না পারলে চাকরি হবে না। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ হলে ভাবনা ছিল না।

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ রাজ্যে বরাবর বাংলা মাধ্যম স্কুল মানে সরকারি স্কুল (সরকারপোষিত স্কুলগুলো সমেত), আর ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মানে বেসরকারি স্কুল। ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না – এই যুক্তিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দেওয়া বরাবর ছিল। কিন্তু গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকেও, বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়তে পাঠানো এক ধরনের বিলাসিতা, সরকারি স্কুলে দিব্যি পড়াশোনা হয় – এই ধারণা চালু ছিল। ফলে এখন যারা বাবা-মা, তাদের বাবা-মায়েরা অনেকেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলেই পড়িয়েছেন। ছবিটা এই শতকের শুরু থেকে বদলাতে বদলাতে এখন এমন হয়েছে, যে অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রায় কেউই আর সরকারি স্কুলে পড়ে না। কলকাতা থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের নবগ্রাম। এখানকার সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় ছেলেদের স্কুলের এক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বছর পাঁচেক আগে আমাকে সখেদে বলেছিলেন, আগে আমাদের স্কুলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, ব্যবসাদার, মুচি, মেথর – সবার ছেলেই পড়ত। এখন শুধু রিকশাওলা, দিনমজুর, মেছো, কশাইদের ছেলেরা পড়ে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত আর নেই।

কেনই বা থাকবে? একে তো আর সবকিছুর মত স্কুলও ঝাঁ চকচকে না হলে সেখানে পড়াশোনা হয় না, এমন ধারণা বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর দিক থেকে অনেক সরকারি স্কুলই পিছিয়ে ছিল সেইসময়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই স্কুলের পড়াশোনার মান কমাতে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে প্রাইভেট টিউশন। সকালে স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত এবং বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ঘরের বাইরে চটির পাহাড় জমিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, আর স্কুলে গিয়ে অকাতরে ঝিমোচ্ছেন – এ জিনিস আমরা অনেকেই দেখেছি। স্কুলশিক্ষকদের এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা এই শতাব্দীর শুরুতে এমন ফুলে ফেঁপে উঠেছিল এবং এতরকম দুর্নীতির জন্ম দিয়েছিল যে ২০০১-০২ আর্থিক বর্ষের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক, অধ্যাপকদের প্রাইভেট টিউশন করা চলবে না। তা নিয়ে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো এবং অভিভাবক, ছাত্রছাত্রীদের প্রবল দুশ্চিন্তা ও আপত্তি নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। শেষপর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে উঠতে পারেনি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল প্রাইভেট টিউশন। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা। অর্থাৎ ব্যাঙের ছাতার মত বিপুল সংখ্যক ঝলমলে বেসরকারি স্কুল।

বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার হাল কেমন তা শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললেই জানা যায়। ক্লাস পিছু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বরাবরই অসুবিধাজনক ছিল, এ আমলে আবার স্কুলে নিয়োগেও প্রায় দাঁড়ি পড়ে গেছে। রাজ্যে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব নেই, কিন্তু তাঁরা হয় আদালত চত্বরে পড়ে আছেন, নয় অনশন করছেন কোথাও। কপাল নিতান্ত মন্দ হলে পুলিসের লাঠি, জলকামান হজম করছেন, মরেও যাচ্ছেন কেউ কেউ। যাঁরা স্কুলে আছেন তাঁরা কেবল পড়াবেন আর পরীক্ষা নেবেন, খাতা দেখবেন তার জো নেই। অশিক্ষক কর্মী নিয়োগও অনিয়মিত, ফলে তাদের কাজ ঘাড়ে চাপছে, তার উপর সরকারি প্রকল্পের করণিকও হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষাবর্ষে ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে এই শ্রী, ওই শ্রী, সেই শ্রীর হিসাব রাখতে। গরীব সরকার ওসব কাজের জন্য আলাদা লোক রাখতে পারেন না। মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস না হলে খবর হচ্ছে। কোনো স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা টিচার ইন চার্জ জমিদারি কায়েম করে নিয়োগ আটকে দিচ্ছেন। এমন গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম হয়েছে যে নিয়োগ সংক্রান্ত কেসের বিচারপতি তাঁর রায়ের উপর বারবার স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে বলে ডিভিশন বেঞ্চের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করছেন।

এত ডামাডোল দেখেও কোন বাবা-মা ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলে পড়তে পাঠাবেন? মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ভুক্তভোগী। তাই তাঁরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমে দিচ্ছেন। সরকারের পোয়া বারো। বহু স্কুল ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা খাতে খরচ আরও কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের কত খরচ বেঁচে যাচ্ছে ভাবুন। তবে মাঝে মাঝে দেখানো দরকার যে সরকার স্কুলগুলোকে নিয়ে ভাবেন। তাই কিছু সরকারি স্কুলকে ইংরেজি মাধ্যম করে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়ত আরও হবে। এর পাশাপাশি আছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল অয়ন্তিকাকে গাল পেড়ে বাংলা মাধ্যমের মান থাকবে?

ভারতের মত বহুভাষিক দেশে কেবল নিজের মাতৃভাষা শিখলে যে চলে না, তা ঠিকই। কিন্তু নিজের ভাষার বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। তার প্রমাণ তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষাভাষীরা। আজকের ভারতে কোনো বিষয়েই তারা অন্য রাজ্যের লোকেদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। শিল্প, সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞানে বাঙালিদের চেয়ে ঢের এগিয়ে। দুঃখের বিষয় খিচুড়ি ভাষায় কথা না বলেও তারা দিব্যি ইংরেজি আয়ত্ত করে ফেলছে। আর বাঙালি কর্পোরেটের চাকুরে হয়ে উঠতে এত ব্যস্ত যে একসময় বাঙালি পণ্ডিতদের যা বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলা ও ইংরেজিতে সমান মুনশিয়ানা, তা লুপ্তপ্রায়। এখন বাঙালির ভাষা চৌরঙ্গী ছবির স্যাটা বোসকে মনে পড়ায়। বাংলা শেক্সপিয়রের মত, ইংরেজি তুলসীদাসের মত আর হিন্দি রবীন্দ্রনাথের মত। মাননীয়া রেডিও জকির মত লেখাপড়া জানা কূপমণ্ডূক বাঙালি মনে করে হিন্দি, ইংরেজি ছাড়া বাংলা বলে আঁতেলরা। সে বাংলা বঙ্কিমচন্দ্রের। আর খিস্তি হল নবারুণ ভট্টাচার্যের বাংলা। কিন্তু কেবল এফ এমের আর জে নয়, আজকাল সাহিত্যিকরাও খিচুড়ি ভাষাই ব্যবহার করেন। কবিতা পত্রিকায় ওই ভাষায় বাংলা কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়। কদিন আগে বাংলা ভাষার এক ফেসবুক কাঁপানো কবি খিচুড়ি ভাষায় নামকরণ করা এক অনুষ্ঠানের বিচারক হয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় এক বাঙালি মুসলমান যুবক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কবির পাল্টা যুক্তি ছিল, আপনার নামটাই তো বাংলা নয়।

আর আপনি ভাবছেন বাংলা বিজেপি বা অয়ন্তিকার হাতে বিপন্ন?

আরো পড়ুন

শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

Leave a Reply