স্রেফ সন্দেহের বশে এক দলকে জেলে পোরা যায়, অত্যাচার করা যায়, মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়া যায়, এমনকি চাইলে জোর করে সীমান্তের ওপারেও ছুড়ে দেওয়া যায়। তাঁদের থাকার জায়গায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া, ঘরদোর ভেঙে দেওয়া তো বুলডোজাররাজের যুগে জলভাত। দেশের নাগরিক কিনা তা ভাল করে যাচাই করারও দরকার নেই, রাষ্ট্রের দেওয়া নানা কিসিমের পরিচয়পত্রকে বিশ্বাস করতেও পুলিশের বয়ে গেছে। বাংলাভাষী শ্রমিক হলেই অনুপ্রবেশকারী বলে খেয়াল খুশি মত এমন নিপীড়ন চালাতে পারে রাষ্ট্র। অপরাধ প্রমাণ করার দরকার পড়ে না, সন্দেহ হলেই হল। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পেরিয়ে এমনই এক দাপুটে রাষ্ট্রের মুখোমুখি আমরা। বাংলাভাষী কিংবা অসংগঠিত ক্ষেত্রের চালচুলোহীন শ্রমিক না হলেও চলবে। কোথাকার রোষ যে কার উপর গিয়ে পড়বে তা একমাত্র রাষ্ট্রই জানে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ঐতিহাসিক মূহূর্তে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু, যার নাম হয়েছে ‘নিয়তির সঙ্গে অভিসার’। দেশভাগের দগদগে ঘা সত্ত্বেও দেশবাসীকে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন নেহরু। সে তো খুব আনন্দের সময় ছিল না। তারপর সংবিধান শুনিয়েছিল সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিতে ভাষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, রাজ্য পুনর্গঠনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল ভাষাকে। তাই তো ভারতে কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই। আমরা ভারতীয় – এটাই ছিল নাগরিকত্বের একমাত্র মাপকাঠি। কিন্তু রাষ্ট্রনেতাদের সেইসব অঙ্গীকার, নাগরিকদের প্রতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্তব্য – এসব বহুকাল বিস্মৃত। রাষ্ট্র দাপট দেখাবে, নিত্যনতুন নিয়ম বানাবে, পরিচয়পত্রের ধাঁধায় আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে। এখন তো বেনাগরিক বলে যখন তখন স্রেফ অস্তিত্বটাই বেমালুম গায়েব করে দেওয়ার আতঙ্ক দেশবাসীকে গ্রাস করেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কোনো অভ্যুত্থান ঘটেনি, কেউ দেশটাকে দখল করে নেয়নি। কিন্তু সংবিধান মতে ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসে রাতারাতি একটা দল দেশের সংবিধানটাকেই এমনভাবে উলটো পথে চালাতে পারে? আজকের ভারতকে দেখলে কোনো কিছুই অবিশ্বাস করা যায় না। এমনভাবে চললে অদূর ভবিষ্যতে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক মত, এক খাদ্যাভ্যাসের লোক না হলে হয়ত কোনো ফন্দি ফিকিরে বেনাগরিক হয়ে যাব আমরা। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের রাষ্ট্রনীতিতে আমরা বেমানান লোকেরা হয়ে যাব রাষ্ট্রের নিশানা। রাষ্ট্রের সুরে সুর মিলিয়ে, বাধ্য সন্তান হয়েও কি মুক্তি মিলবে? এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বলে দেন – বাঙালি মানেই বাংলাদেশি। শাসক দলের কেন্দ্রীয় নেতা বাংলা ভাষার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেন। আসামে ভাষাগত হিংসা, নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে অনেক ধর্মীয় সংখ্যালঘু বাঙালি, নিজেদের অসমিয়াভাষী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাতেও কিন্তু তাঁরা বিদ্বেষের রাজনীতির রোষ থেকে পরিত্রাণ পাননি।
রাষ্ট্রের অহরহ মিথ্যা প্রচারে বিদ্বেষের রাজনীতি পরিপুষ্ট হয়। আসাম সরকার যখন বলে, কয়েকটা জেলায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুপ্রবেশের অকাট্য প্রমাণ, আমরা অনেকেই সেই ভাষ্যকে বিশ্বাস করে ফেলি। ১৮৭৪ সালে সিলেট, কাছাড় ও গোয়ালপাড়াকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে আসাম কমিশনার প্রভিন্স গঠিত হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোতে বাঙালি মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাধীনতার পর সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলেও, বাকি দুই জেলায় (যা এখন একাধিক জেলায় বিভক্ত) বাঙালি মুসলমানরা স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং মূলবাসী। আবার ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ থেকে অনেককে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় চাষবাসের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁদের সিংহভাগ বাঙালি মুসলমান। তাঁদেরই চরুয়া, মিয়াঁ ইত্যাদি নানা নামে দাগিয়ে এখন অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে। ভাষার সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের সংমিশ্রণে বিভেদের রাজনীতি ডালপালা ছড়িয়ে আজ সে রাজ্যে হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। বাংলাভাষীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন এনে ভাষা আন্দোলনকে দুর্বল করে, হিন্দু বাঙালিদের ত্রাতা সাজার পর, এখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী বাঙালিদের বিদেশি বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন। নাগরিকদের অনুপ্রবেশকারী বলে উচ্ছেদ করে কর্পোরেটকে জমি দেওয়ার মডেল হাজির করেছে আসাম সরকার। সেই মডেলই এখন দেশজুড়ে অনুসরণ করার চেষ্টা চলছে।
বাঙালি শ্রমিকদের উপর বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে আক্রমণ এর অঙ্গ। মুসলমানরা তো বটেই, হিন্দু বাঙালিরাও রেহাই পাচ্ছেন না। সংবাদমাধ্যমেই আমরা জেনেছি, বিজেপি সাংসদের দেওয়া মতুয়া পরিচয়পত্রেও নিস্তার মেলেনি। তবুও আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাব, হিন্দু বা মুসলমান যে-ই হোন, কেন স্রেফ সন্দেহের বশে রাষ্ট্র এমন আক্রমণ চালাবে? অন্য দেশে জোর করে পাঠিয়ে দেবে? রাষ্ট্রের নিপীড়নের শিকার অনেকেই এই দেশের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের, নাগরিক বলে প্রমাণিত হয়েছেন। তাহলে যারা অত্যাচার চালাল, তাদের শাস্তি হবে না কেন? অভিযুক্তকে এমনভাবে অত্যাচার করার অধিকার রাষ্ট্রকে সংবিধান দেয়নি। এমনকি কেউ সত্যিই অনুপ্রবেশকারী হলেও তার উপর অত্যাচার করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। বিদ্বেষ, অপরকে সন্দেহ করার এই বাতাবরণে এসব প্রশ্ন করা চরম অপরাধ। এখন দেশের সংবিধান নয়, শাসকের নির্দেশই শেষ কথা।
তাই দিল্লি পুলিস আধিকারিক বাংলা ভাষার মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভাজন করেন। তার সপক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বিজেপি নেতা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। সেই নেতার হয়ে সাফাই গাইতে আবার এই রাজ্যের বিজেপি নেতা থেকে শুরু করে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী এপার আর ওপার বাংলার ভাষাগত পার্থক্যের কথা বলেন। ভাষা, উপভাষা, অঞ্চল ভেদে উচ্চারণের পার্থক্য এঁরা সকলেই ভাল মত বোঝেন। তার চেয়েও ভাল বোঝেন কীভাবে জল ঘুলিয়ে দিয়ে সেই ঘোলা জলে মাছ ধরতে হয়। তাই প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণ হলে বাঙালি আক্রান্ত হয়নি বলে দাবি করেন। নয়ডার হোটেলে নিউটাউনের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীকে বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে থাকতে না দেওয়া সম্পর্কে অবশ্য এই বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আসলে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির চরম ভক্ত বিজেপি যতটা বাঙালিবিদ্বেষী, তার চেয়েও বেশি যাবতীয় বিদ্বেষের রাজনীতির দক্ষ খেলোয়াড়।
বাঙালি শ্রমিকরা আক্রান্ত হলেও, তাঁরাই একমাত্র নিশানা নন। অসমিয়াভাষীরাও কি ভারতে নিরাপদ? কয়েক বছর আগেই করোনা অতিমারীর সময়ে চীনের লোকেদের সঙ্গে চেহারার মিল থাকার ‘অপরাধে’ উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেকে ভিনরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দেশ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞানগম্যি না থাকলে এমন উগ্র জাতীয়তাবাদী দাপট দেখানো যায়। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ভারতে কোনো ধর্ম, ভাষা বা রাজ্যের শ্রমজীবীই নিরাপদ নন। এমনকি হিন্দিভাষীরাও নন। বিহারে এসআইআর-এর মাধ্যমে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম ছেঁটে দেওয়াই তার বড় প্রমাণ। আর যা-ই হোক, এত রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি (রোহিঙ্গারা যে বাংলাদেশি আর হিন্দিভাষীদের সঙ্গে এমন মিল যে বিহারে ঘাপটি মেরে থাকতে পারেন, তা রাষ্ট্র না জানালে আমরা জানতেই পারতাম না) যে বিহারে থাকেন না, তা বুঝতে কারোর অসুবিধা হয় না। সে কারণেই নির্বাচন কমিশন বাদ যাওয়া মানুষের তালিকা প্রকাশ করছিল না, সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হল। দেশজুড়ে হিন্দি ভাষার আগ্রাসন আসলে বিদ্বেষের রাজনীতিকেই পুষ্ট করার অস্ত্র। তার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দিভাষীদের প্রতি বিদ্বেষের জন্ম হচ্ছে। মুম্বাইতে হিন্দিভাষীদের হেনস্থা করার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের উপরেই আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের নিশানা করা খুব সোজা। খুঁটির জোর নেই, রাষ্ট্রের উপর নির্ভরতাও বেশি। আবার শ্রমের বাজারে এঁদের জোগান অফুরান। নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই, ভেসে বেড়ানোই যেন ভবিতব্য। ভাষা, ধর্মের ভিত্তিতে শ্রমিকদের মধ্যে বিভেদ লাগিয়ে দিলে লাভ নানাবিধ। চাকরির বাজারে ভিড় জমানো মানুষকে নিজেদের মধ্যে লড়িয়ে দেওয়া যাবে। যাঁরা টিকে থাকবেন, তাঁরা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হবেন। তাঁদের সামনে বেনাগরিক করে দেওয়ার খাঁড়া ঝুলিয়ে রাখলে আরও সুবিধা। শস্তায় খাটানো যাবে, উচ্ছেদ করা যাবে। আগামীদিনে বন্দি করে প্রায় বিনা মজুরিতে খাটানোও অসম্ভব নয়। শ্রমিক বা নাগরিক হিসাবে কোনো অধিকারের দাবি তাঁরা তুলতে পারবেন না। পুঁজিবাদের জন্যে এটাই তো রামরাজ্য।
সেই লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন প্রবাসী শ্রমিকদের কাজের জায়গায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার কথা বলছে। যাঁরা এখানে ওখানে ভেসে বেড়ান, তাঁদের কাজের জায়গা নির্দিষ্ট থাকে না। অনেকেরই বাসস্থান বলতে কোনো মতে বানানো ঝুপড়ি, যা অবৈধ বলে সহজেই ভেঙে দেওয়া যায়। যেমন ভাঙা হচ্ছে বাঙালি শ্রমিকদের বসতি। ২০২৩ সালে জলাভিষেক যাত্রাকে কেন্দ্র করে হরিয়ানায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। তার জেরে সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের ঝুপড়ি ভেঙে দিয়েছিল। সেবছর উত্তরাখণ্ডে কাজ করতে গিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছিলেন খনি শ্রমিকরা। উদ্ধারকারী খনি শ্রমিকদের মধ্যে অন্যতম ওয়কীল হাসান। তাঁর বাড়ি তার কয়েক মাস পরেই ভেঙে দিয়েছিল দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। উদ্ধার কাজের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।
প্রবাসী অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কাজের জায়গায় নাম তোলার প্রয়োজনীয় নথি যোগাড় করা কঠিন। একমাত্র নিজেদের গ্রাম বা শহরের বাড়িই তাঁদের নির্দিষ্ট ঠিকানা। সেখান থেকে ভোটার তালিকায় নাম ছেঁটে দিলে আগামীদিনে খুব সহজেই বেনাগরিক করার খাঁড়া ঝোলানো যাবে। তারই ট্রেলার আমরা বিহারে দেখতে পাচ্ছি।
চরম দক্ষিণপন্থার প্রাণভোমরা হল বিদ্বেষ, বিভাজন। বহুত্ববাদ তার শত্রু। এই রাজনীতি সবসময় অপর খুঁজে বেড়ায়, যাদের শত্রু বলে দেগে দিয়ে লোক খেপানো যাবে। সেই অপরের ভিত্তি হতে পারে ধর্ম, ভাষা বা অন্য কিছু। আসল আক্রমণটা নেমে আসে শ্রমজীবী মানুষের উপর। আর্থিক সংকট যখন তীব্র হয়, তখন চরম দক্ষিণপন্থা পুঁজিবাদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। সারা বিশ্বেই আজ অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে চরম দক্ষিণপন্থা রাজনৈতিক জমি পোক্ত করছে। আমেরিকায় মানুষের ক্ষোভকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে, যাবতীয় সংকটের জন্য বিদেশিরা দায়ী বলে প্রচার করে আবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি শিকল পরিয়ে ভারতীয় শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠান। আবার এই দেশে অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেলে শ্রমিকদের কারারুদ্ধ হতে হয়। অনুপ্রবেশকারী বলে দিয়ে বিদেশেও ঠেলে দেওয়া হয়। বাঙালি বিদ্বেষের রাজনীতি যদি একটা হাতিয়ার হয়, তাহলে আরেক হাতিয়ার নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কাজ কারবার। আক্রমণ করা হয় নানা কায়দায়। কখনো বাঙালি, কখনো মুসলমান, কখনো অন্য কোনো ভাষা বা রাজ্যের মানুষকে নিশানা করা হচ্ছে।
শ্রমজীবী, বেকারদের নিজেদের মধ্যে লড়িয়ে দেওয়ার একটা রাস্তা হল বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাঙালিবিদ্বেষ। আরেকটা রাস্তা এই রাজ্যে তৃণমূল যা করছে, অর্থাৎ বাঙালি জাত্যভিমানের রাজনীতি। মুখ্যমন্ত্রী বারবার প্রবাসী শ্রমিকদের এই রাজ্যে ফিরে আসতে বলছেন। কিন্তু একবারও বলছেন না, কেন অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। জীবনের ঝুঁকি, বেনাগরিক হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক নিয়েও কেন এই রাজ্য থেকে অন্য রাজ্য বা দেশে যাওয়া মানুষের স্রোত কমছে না? শখ করে তো কেউ যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন পেটের জ্বালায় বাধ্য হয়ে। কৃষিতে সংকট, অন্য কাজের সুযোগ কম থাকা, মজুরির হার কম হওয়ার কারণে রাজ্যের মানুষ অন্যত্র যাচ্ছেন। রাজ্য সরকার সেইসব সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করবে না। প্রবাসী শ্রমিকদের নাম নথিভুক্ত করার কাজটাও সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করেও মূলত শ্রমিকদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ অন্য রাজ্যে কাজ করা বাঙালি শ্রমিকদের উপর অত্যাচার হলে কিংবা তাঁরা মারা গেলে যত তৎপর হয়, তাঁদের রক্ষা করতে কিন্তু তেমন উদ্যোগ নেয় না। এই রাজ্যে উপার্জনের সুযোগ করে দিতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকার জন্যে বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার নিয়ে হইচই করা হচ্ছে। তৃণমূলের ভাষা আন্দোলন আসলে ভাষাভিত্তিক জাত্যভিমানের রাজনীতিরই অঙ্গ। এই রাজনীতি বিদ্বেষ, বিভাজন বাড়িয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থাকে শক্তি যোগায়।
আরো পড়ুন হিন্দি বনাম বাংলা: নিজের ভাষাকে কোণঠাসা করেছে বাঙালিও
এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত হিন্দিভাষী শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ীদের হেনস্থা করার সঙ্কীর্ণতায় পরিণত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানিদের এ রাজ্যে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে এই জাত্যভিমানের রাজনীতি সরব হয় না। তৃণমূলের নেতারা যখন এই রাজ্যে হিন্দিসহ অন্যান্য ভাষাভাষী শ্রমিকদের নিরাপত্তা আছে বলে দাবি করেন, তখন তার মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন হুমকিও থাকে। বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকের শ্রমে যেমন অন্য রাজ্য এবং দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, তেমন এই রাজ্যে কাজ করতে আসা শ্রমিকদেরও রাজ্যের অর্থনীতিতে বড় অবদান রয়েছে। শ্রমিকরা আমেরিকা, দিল্লি বা এই রাজ্যের সরকারের দয়ার পাত্র নন। শ্রমিক হিসাবে, বিশ্বের নাগরিক হিসাবে তাঁদের নিরাপত্তা ও প্রাপ্য অধিকারগুলো দেওয়া যে কোনো সরকারের কর্তব্য। বিভেদের রাজনীতি সেটাই ভুলিয়ে দেয়।
বিশ্ব আদিবাসী দিবসে ঝাড়গ্রামে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সিধু, কানহুর সঙ্গে ডহরকেও স্মরণ করেন। আজ থেকে ১৭০ বছর আগে হুলে (যা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত) ব্রিটিশদের হাতে শহিদ হয়েছিলেন সিধু মুর্মু ও কানহু মুর্মু। ডহর কোনো ব্যক্তির নাম নয়, ডাহার শব্দের অপভ্রংশ মাত্র। যার অর্থ পথ। এর আগেও মুখ্যমন্ত্রী এই ভুল করেছিলেন, তা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। আবার একই ভুল কি অজান্তে করলেন, নাকি এটা ‘অপর’-এর প্রতি উপেক্ষা? বাংলা ভাষার অধিকারের কথা বললে, এই রাজ্যের অন্যান্য ভাষার মানুষের অধিকারকেও স্বীকৃতি দিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ মানে শুধুই বাংলাভাষীরা নন। এখানে রাজবংশী, নেপালি, কুড়মালি বা বিভিন্ন জনজাতির নিজস্ব ভাষা আছে। তাঁরা এখানকার মূলবাসী। সেই ভাষাগুলোকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষা আন্দোলন কখনো বাঙালি শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না। একটা ভাষার মর্যাদার লড়াই অন্য কোনো ভাষাকে হেয় করে চলতে পারে না। হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের বিরোধিতা মানে হিন্দিভাষীদের বিরোধিতা নয়। তেমনই ভাষা আগ্রাসনের বিরোধিতা করলে এই রাজ্যের অন্যান্য ভাষাগুলোকেও মর্যাদা দিতে হয়। বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণে যাঁরা বাংলা ভাষা নিয়ে এত হইচই করছেন, তাঁরা সকলে কি অন্য ভাষা, সংস্কৃতির মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সরব? অপ্রিয় হলেও এই প্রশ্ন আজ তোলার সময় এসেছে। বৈচিত্র্যকে মর্যাদা না দিলে, সকলের সমানাধিকারের দাবিতে সরব না হলে, আজকের এই আক্রমণ রোধ করা যাবে না।
নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিভেদের রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকে গুজরাটিদেরই আক্রমণ করে বসছেন। অনেক তথাকথিত প্রগতিশীলও বলে বেড়াচ্ছেন, গুজরাটের নাকি স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনো অবদানই ছিল না। এও ইতিহাস বিকৃতির উদাহরণ। বাংলা স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ছিল, আবার এই বাংলায় শ্যামাপ্রসাদরাও ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট গুজরাটি মহাত্মা গান্ধী কলকাতার বেলেঘাটায় ছিলেন। দাঙ্গার বীভৎসতায় তাঁর মন তখন ভারাক্রান্ত। তিনি উৎসবে মাততে পারেননি। স্বাধীনতা প্রাপ্তির এক বছর গড়ানোর আগেই তিনি শহিদ হয়েছিলেন। প্রাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, স্বাধীন ভারতে বড় বিপদ কারা। গান্ধীজির জন্মস্থান, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সবরমতী আশ্রম কিন্তু গুজরাটেই। অনেক বাঙালি আবেগে ভেসে এসব জেনেও না জানার ভান করেন। জাত্যভিমান এমনই বিষম বস্তু।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







