বারাণসীতে বুলডোজার রাষ্ট্র, গান্ধীভাবনার প্রতিষ্ঠান সর্ব সেবা সংঘের পরিসর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে গান্ধীজনেরা ১০০ দিনের অনশন করেছিলেন। সেই ১০০ দিনের সত্যাগ্রহে একদিন যোগ দিতে গিয়ে দেখা হয়েছিল বুনকর সংগঠনের নেতা আনসারির সঙ্গে। এঁরাই বুনতেন বিশ্ববিখ্যাত বেনারসী শাড়ি, কিন্তু বর্তমানে সাম্প্রদায়িক নিগ্রহ ও সরকারের নীতির ফলে তাঁরা কোণঠাসা হয়ে আছেন। তিনি বলছিলেন, এখানে লোকসভা নির্বাচন ভারি গোলমেলে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন ক্ষেত্র এটি, কিন্তু সারাদিনে যতজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সবারই এক প্রশ্ন – তাঁকে ভোট দিল কে? নিরঙ্কুশ হওয়ার জন্য ত্রিশের বেশি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়, শেষপর্যন্ত ঘন্টা দুয়েক গণনা মুলতুবি রেখে ২০১৪ ও ২০১৯ সালের চেয়ে অনেক কম ব্যবধানে জিতেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ফলে সেখানকার ভোটের ফল নিয়ে ধন্দ ছিল কারো কারো মনে।
১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান পরিষদ যখন সংবিধান রচনা সম্পূর্ণ করল এবং এদেশের নাগরিকরা নিজেরাই নিজেদের এই সংবিধান দিলেন, তখনই কিন্তু জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত হয়েছিল। তাই স্বাধীন ভারতের প্রাথমিক প্রশাসনিক কাজগুলোর অন্যতম ছিল গোটা দেশের ভোটারদের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন, কোনো অফিসারের খামখেয়ালিপনার জন্য যেন কারোর নাম বাদ না পড়ে। প্রসঙ্গত বলা ভাল, ১৯২৮ সাল থেকেই জাতীয় কংগ্রেস সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি তুলে আসছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সেই সংবিধান চালু হল ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি, এ বছর তার ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। আর এবছরেই নির্বাচন কমিশন – যাদের কাজ ভোট সুসম্পন্ন করা এবং দেখা যেন কোনো ভোটার বাদ না পড়েন – তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে ভোটার বাদ দিতে বসেছে। অর্থাৎ আম্বেদকর যে খামখেয়ালিপনার আশঙ্কা করেছিলেন, সাত দশক পরে আমরা সেটা দেখছি। কারা বাদ পড়ছেন আজকের ভারতে, তা সহজেই অনুমেয়। মূলত মুসলমান, তবে তার সঙ্গে সব ধর্মের মহিলা এবং বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ। কোনো কাগজই আর কাজে আসছে না। নির্বাচন কমিশন নিজে মানুষকে ভোট দেওয়ার জন্য যে কার্ড দিয়েছে, সেটাও নাকি অবৈধ। বৈধতার জন্য এমনভাবে জলঘোলা করা হচ্ছে যে মুজতবা আলির সেই পাসপোর্টের প্রশ্নাবলী মনে পড়ে যায়, যার প্রথমটা হল – আপনার জন্মের সময়ে যে কাঁচি দিয়ে মায়ের নাড়ি কাটা হয়েছিল, তার ওজন কত? শেষ প্রশ্ন – আপনার মৃত্যুর তারিখ ও সময় লিখুন।
এতই বিভ্রান্তিকর সব নির্দেশ যে মানুষজন দৌড়চ্ছেন অতীতের দিকে। প্রতিদিন আমাদের স্কুলে আতঙ্কিত মহিলারা আসছেন তাঁদের জন্মতারিখের সার্টিফিকেট চাইতে। মহাফেজখানার ঝুরঝুরে কাগজ এখন নিরাপত্তার একমাত্র উপায়। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা অবশ্য ভাবিত নন। বিশেষ করে উচ্চবর্গীয় হিন্দু হলে তিনি সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত। ব্রিটিশ ভারতেও তাঁদের ভোটদানের কৌলীন্য ছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি খেদানো হলেও তাঁরা চুপ। কারণ তাড়া তো খাবে শ্রমিকের দল, বিশেষ করে মুসলমান ও দলিত, তাঁরা ও নিয়ে কেন ভাবতে যাবেন? এদিকে খবর পাওয়া যাচ্ছে, হঠাৎ করে পেনশনভোগীদেরও কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। প্রমাণ সবাইকেই দিতে হবে। ঘুরিয়ে এনআরসি করার এই ফন্দির পাশাপাশি আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে গেল।
যে নির্বাচন কমিশন ভুয়ো ভোটার তাড়ানোর জন্য কাগজ দেখতে চাইছে, সেই কমিশনের অধীনে হওয়া নির্বাচন নিয়ে রীতিমত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী। একশো-দুশো নয়, লাখো লাখো অলৌকিক ভোটার এখন সবখানে। তিনি কেবল কর্ণাটকের একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একটা বিধানসভার ভোটার তালিকার তথ্য তুলে ধরতেই চোখ কপালে উঠল। তারপর থেকে বহু ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যমের উদ্যোগে যেসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাই সন্দেহের মুখে। রাহুল দেখিয়েছেন যে বেঙ্গালুরু সেন্ট্রালের মহাদেবপুরা বিধানসভা ক্ষেত্রেই এক লাখের বেশি ভুয়ো ভোটার। তারা আবার পাঁচ রকমের। হাজার বারো ডুপ্লিকেট, হাজার চারেকের ঠিকানা ভুয়ো, একই ঠিকানায় এক দঙ্গল ভোটার, আরও অনেকের ছবি চেনা শিবের অসাধ্য। তার উপর ৩৩,৬০০ জন ফর্ম নং ৬ ব্যবহার করে প্রথমবারের ভোটার সেজেছেন। এঁদের কারো কারো বয়সের গাছপাথর নেই। শতাব্দী পেরিয়ে প্রথমবার ভোটার হয়েছেন। যেমন শকুন রানী বলে সত্তরোর্ধ্ব এক নতুন ভোটারকে পাওয়া গেছে। তিনি নতুন ভোটার, কিন্তু একাই দুই জায়গায় ভোট দিয়েছেন। এক সংবাদমাধ্যম ওই মহিলার কাছে পৌঁছেছিল। তিনি বেজায় গোলমেলে উত্তর দিয়েছেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন নিজেদের কাণ্ডকারখানার কোনো কারণ না দর্শিয়ে রাহুলকে বলল হলফনামা জমা দিতে। তারপর আবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নাম না করে রাহুলকে হুমকি দিয়েছেন – হয় সাতদিনের মধ্যে হলফনামা দিতে হবে অথবা দেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
একটি প্রশ্নেরও উত্তর নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। উল্লেখ্য, মহাদেবপুরা কেন্দ্রে কংগ্রেসের মনসুর আলি ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পি সি মোহনের কাছে ৩২,৭০৭ ভোটে হেরেছিলেন। রাহুলের হিসাব অনুযায়ী ভুতুড়ে ভোটের সংখ্যা ১,০০,২৫০।
কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়েছে। বারাণসীর মানুষজন কেন বলছিলেন, কে মোদীকে ভোট দিল জানি না, তা এখন বোঝা যাচ্ছে। রামকমল দাস বলে এক অবিবাহিত বাবাজির সন্ধান পাওয়া গেছে ভোটার তালিকায়। তাঁর সন্তানসন্ততি ৫০ জন। সবচেয়ে বড়জনের বয়স মোদীজির কাছাকাছি – ৭২। সবচেয়ে ছোটটিও ভোটার, ২৮ বছর বয়স। এইভাবে চলতে থাকলে সাবিত্রী, সত্যবানকে হারিয়ে দেওয়ার গল্পও পাওয়া যাবে নিশ্চয়। জয় বাবা ভোটনাথ!
আরো পড়ুন বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন: জুটিতে লুটি
এত ভুতুড়ে নাগরিক থাকার পরেও রোহিঙ্গার খোঁজে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে লাগিয়ে রাখার কী দরকার কে জানে! ওদিকে বিহারে ৬৫ লক্ষ ভোটার বাতিল, যার মধ্যে বিরাট সংখ্যক নাকি মৃত। রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলনের পর বিহারের অনলাইন ভোটার তালিকা স্পষ্ট থেকে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। অতঃপর রাহুল সেইসব মৃত নাগরিকদের কয়েকজনকে ডেকে চা খেয়েছেন দেখা গেল।
বিহারের পরই বাংলা। এখানে অল্প জলে সফরীর মত ফরফর করে স্থানীয় বিরোধী নেতা যত রোহিঙ্গা তাড়ানোর শপথ নিচ্ছেন, তত রোহিঙ্গা গোটা পৃথিবীতে নেই। বোঝাই যাচ্ছে, দেশের নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়াই ওঁদের উদ্দেশ্য। এই পরিকল্পনা সংবিধান পরিষদের ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। যারা ভোট চুরি করে জেতে, তারা এখন মানুষের ভোটাধিকার কাড়তে চাইছে। এদের ভূত ঝাড়তে সেই জনগণকেই পথে নামতে হবে, যারা এই স্বাধীন দেশটার জন্মের সময়ে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ভোটাধিকার দিয়েছিল। এদেশের মেয়েদের ভোটাধিকার অর্জনের জন্য ইউরোপের মেয়েদের মত মরণপণ সংগ্রাম করতে হয়নি; দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু – সবাই ভোটাধিকার পেয়েছিলেন একসঙ্গেই। কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী কারচুপি নিয়ে যিনি সরব, তথ্যসন্ধানী সেই পুনম আগরওয়াল বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এই বিশাল অভিযোগের মুখে নির্বাচন কমিশনের উত্তরহীনতা।
আজ সংবিধানের পরীক্ষা, আজ গণতন্ত্রের পরীক্ষা। আমরা ভারতের জনগণ এই দেশকে স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজবাদী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার শপথ নিয়েছিলাম ৭৫ বছর আগে। আজ সময় এসেছে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







