বাজারে আনাজের দামে আগুন। এদিকে কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ৫ এপ্রিল কলকাতার মানিকতলা বাজারে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি। হুগলি জেলার শহরের বাজারে ‘দেশি’ পেঁয়াজ ২৫ থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ, কৃষক বেচছেন ছয় থেকে আট টাকা কেজি দরে। হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ – একই চিত্র। পেঁয়াজ গাছ বসানোর পরেই গত ডিসেম্বর মাসের সাইক্লোন জাওয়াদে অনেকের ক্ষতি হয়েছিল। সার, কীটনাশক বেশি ব্যবহার করায় চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। জাওয়াদে অনেকের ফলন কমেছে। ফলন যাদের কমেনি, তাঁরাও অভাবী বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ খরচ বাড়লেও কৃষক দাম পাচ্ছেন গত মরসুমের থেকে কম।

হুগলি জেলার বলাগড় ব্লক পেঁয়াজ চাষের জন্য বিখ্যাত। গত বছর বহু কৃষক লাভের মুখ দেখেছিলেন। এই ব্লকের সোমড়ার একজন কৃষকের গত মরসুমে বিঘে প্রতি খরচ হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা, ফলন হয়েছিল ৪৪ কুইন্টাল। কেজি প্রতি পেঁয়াজের দাম পেয়েছিলেন প্রায় ১৫ টাকা। এ মরসুমে পেঁয়াজ গাছ বসাতেই বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, ট্রাক্টর, লেবার বাবদ মোট খরচ হয়েছিল বিঘে প্রতি ১৫,৪০০ টাকা। জাওয়াদের পর সার, কীটনাশক বেশি দিতে হয়েছে। সারের কালোবাজারির কারণেও খরচ বেড়েছে। বিঘে প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৩৪,০০০ টাকা। তিনি অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষ করেন। বিঘে পিছু লিজে খরচ হয়েছে দু হাজার টাকা। মাইক্রোফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণের সুদ দিতে খরচ আরও প্রায় চার হাজার টাকা। অর্থাৎ তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এবারে তাঁর ফলন হয়েছে ৩০ কুইন্টালের কম। কেজি প্রতি গড়ে ৬.৭৫ টাকা দরে বিক্রি করে ২০,০০০ টাকা দামও পাননি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই গ্রামেরই আরেকজন কৃষকের গত মরসুমে নিজের এক বিঘে জমিতে পেঁয়াজ চাষে খরচ হয়েছিল ১৭,০০০ টাকার কম, ফলন হয়েছিল প্রায় ৩৩ কুইন্টাল। এবারে ফলন হয়েছে ২৭ কুইন্টাল। গত মরসুমে তাঁর ২০,০০০ টাকারও বেশি লাভ হয়। এই মরসুমে পেঁয়াজ গাছ বসাতেই ২০,০০০ টাকার বেশি খরচ হয়। সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে সারে। গত বছর যেখানে সারে তাঁর খরচ হয়েছিল ৪,৫০০ টাকা, এই মরসুমে শুরুতেই খরচ হয় ৮,৮০০ টাকা। তারপর জাওয়াদের ফলে সারের খরচ আরও বেড়েছে। আট টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রিতে বিপুল লোকসান হয়েছে। পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা, পূর্বস্থলিতেও একই চিত্র। মুর্শিদাবাদ জেলার নওদায় অনেক কৃষক ছ টাকা কেজি দরেও দাম পাননি, অথচ গতবারের থেকে অনেকের ফলন বেশি হয়েছে।

সারের দাম এমনিতেই বেড়েছে। যেমন, এনপিকে ১০:২৬:২৬ এর দাম বস্তা (৫০ কেজিতে এক বস্তা) পিছু বেড়েছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। এটা কোম্পানির নির্দিষ্ট করা দাম। কিন্তু কালোবাজারিতে সেই দাম আরও বেশি হয়েছে। এই সারের প্যাকেটে দাম ১৩৫০ টাকা উল্লেখ থাকলেও, অনেক কৃষককে জাওয়াদের পর ১৯০০-২০০০ টাকা দামে কিনতে হয়েছিল। বিঘে প্রতি তিন বস্তা লাগলে, শুধুমাত্র এই সারেই বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় ৬০০০ টাকা। বেশি দামে কিনতে হলেও কৃষকের প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকে কম। অনেকেই ধারে সার, কীটনাশক কেনেন। প্রতিবাদ করলে ধারে কিনতে পারবেন না। কৃষি দপ্তর থেকেও এইসব উপকরণ কৃষকরা খুব কমই পান। বীজ, সার, কীটনাশকের কালোবাজারি এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই কৃষকের নিত্যসঙ্গী।

অনেক কৃষক খড়ের চালার তলায় বিশেষ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। তাতে খরচ আছে। ছোট, প্রান্তিক কৃষকদের সেই সামর্থ নেই। দ্রুত বিক্রি করে অর্থ পেতে হবে, ধার শোধের তাড়া থাকে। অনেকে পেঁয়াজ বিক্রির টাকা পাট চাষে খরচ করেন। আবার যত পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, তার পুরোটা এই পদ্ধতিতে রাখা সম্ভবও নয়। হিমঘরের অভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা। সমবায় সমিতির হিমঘর পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে কৃষকদের লোকসান হয় না। অনেক কৃষকই সরাসরি মাঠেই ফড়েদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করেন, কেউ বা বাজারে আসেন। বাজারে দাম সামান্য বেশি মিললেও, নিয়ে আসার খরচ আছে, সময়ও নষ্ট হয়। মাঠ থেকে ফসল তোলার সময় ফড়ে, মহাজনদের দেখা পাওয়া যায়; সরকারের দেখা মেলে না।

কৃষককে নির্ভর করতে হয় বাজার অর্থনীতির উপর। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে কৃষকদের থেকে সরাসরি পেঁয়াজ কেনার সরকারি ব্যবস্থা নেই। দেশজোড়া ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে এই দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজ্যে সবটাই নিয়ন্ত্রণ করে ফড়ে ও আড়তদাররা। কৃষি উপকরণের কালোবাজারি রুখতে সরকার নেই, হিমঘর করে ফসল সংরক্ষণে সরকার নেই, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কৃষকের থেকে ফসল কিনতেও সরকার নেই। সরকারকে তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য না করলে, লোকসানই হবে কৃষকদের নিত্যসঙ্গী।

মতামত ব্যক্তিগত। তথ্যের দায় লেখকের

আরও পড়ুন

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিপন্ন কৃষিব্যবস্থা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.