একটি জাতীয় চ্যানেলের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শুটিং সদ্য শেষ হয়েছে। ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেলেও আলো তখনো নেভানো হয়নি। অফ দ্য রেকর্ড আলাপচারিতায় তাঁর মন্ত্রিসভার এক সহকর্মীর প্রসঙ্গ উঠেছে। জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন সেই সহকর্মী। সেই প্রসঙ্গেই কথা চলছে আর তিনি সেই সহকর্মীর বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের কথা বলছেন। দাবি করছেন, কীভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করেছেন সেই মন্ত্রী। বলেই চলেছেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, সেই সাক্ষাৎকার নেওয়া সর্বভারতীয় চ্যানেলের সম্পাদক মোটেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ নন। রোজ দেখা বা কথাও তাঁদের মধ্যে হয় না। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার তিনি মুখোমুখি হয়েছেন সেই সম্পাদকের। ঘরে তখনো সম্পাদকের সঙ্গে আমি এবং আমাদের ক্যামেরাম্যানরা রয়েছেন। আমার সঙ্গেও তাঁর ‘ঘরের কথা’ বলার মতো ঘনিষ্ঠতা নেই। তবু তিনি বলে চলেছেন। অবলীলায়। তিনি – পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
এটি যে সময়কার কথা সেই সময়ে তিনি শিল্পায়নের স্বপ্নে বিভোর। তাই শিল্পায়নবিরোধী কোনও পদক্ষেপই তাঁর সহ্য না হওয়ারই কথা। কিন্তু মন্ত্রিসভার সদস্য তো তাঁর দলেরই লোক। তাঁকেও বাগে আনতে তিনি এবং তাঁর দল তখন হিমশিম খাচ্ছেন। শুধু তো নিজের দল নয়, শরিক দলের নেতা-মন্ত্রীদের নিয়েও তিনি বেজায় চাপে। আর সেই কথা তিনি একজন আধা-পরিচিত সম্পাদককে গুছিয়ে বলছেন। সেইসময় সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরেই আমরা ক্যামেরা নিয়ে ছুটছি শরিক দলের মন্ত্রীদের কাছে। তাঁরা বৈঠকের ‘স্কুপ’ তুলে দিচ্ছেন একের পর এক এবং সঙ্গে তাঁদের নানা অসন্তোষের কথা সামনে রাখছেন। একদিকে রিলায়েন্সের মতো সংস্থাকে পশ্চিমবঙ্গে খুচরো ব্যবসা করার অনুমতি দিতে চাইছেন বুদ্ধদেব, অন্যদিকে শরিক দলের মন্ত্রী এই সাংবাদিককে অফিসে ডেকে নথি দেখাচ্ছেন, যে কোন শিথিল শর্তে রিলায়েন্স ব্যবসা করার ছাড়পত্র পাচ্ছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এসব তো ঘরের কথা। ঘরের বাইরে তো জ্বালাময়ী আন্দোলন করে রাজ্যকে তাতিয়ে রেখেছেন তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি। হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে বৃষ্টির দুপুরে তাজ বেঙ্গল হোটেলের লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সালেম গোষ্ঠীর কর্তা বেনী সান্তোসার কলকাতা সফরের প্রতিবাদ করা দিয়ে যার শুরু।
আজ বুদ্ধদেবের প্রয়াণে যে তিনটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে উপরে রয়েছে তাঁর শিল্পায়ন-স্বপ্ন। অন্য দুটি তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও সাংস্কৃতিক জীবন। কিন্তু এই শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখতে গিয়েই তিনি যেন বামফ্রন্ট সরকার, এবং এক দিক থেকে দেখতে গেলে, রাজ্যের বিপদ ডেকে আনলেন। এখনো প্রায় সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন, শিল্প আনার যে সৎ প্রচেষ্টা বুদ্ধদেব করেছিলেন তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আপত্তি তাঁর শিল্পায়নের পথ নিয়ে।
সেই বিতর্কিত পথ খোঁজার সমস্যা বোধহয় আসলে বুদ্ধবাবুর রাজনীতির কারণেই। একটি পুঁজিবাদী কাঠামোয় থেকে একটি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে জনগণকে যতটা স্বস্তি দেওয়া যায় তার চেষ্টাই বামফ্রন্ট জোট হিসাবে এবং সিপিএম দলগতভাবে করে এসেছে। ১৯৭৭ সালে যখন বামফ্রন্ট প্রথমবারের জন্য সরকার গড়ছে, তখনো আধা সামন্ত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।
কৃষকদের নিয়ে আন্দোলনের স্বাভাবিক ফলস্বরূপ ভূমি সংস্কারকেই সেই সরকার জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার প্রধান স্তম্ভ করল। সেই কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের উপর ভরসা করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে দৃঢ় করলেন বাম নেতারা। খাতায় কলমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের ক্ষমতায়ন হলেও আসলে তা দলের আধিপত্যের প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়াল।
অন্যদিকে মার্কসবাদী তত্ত্বে বিশ্বাসী কমিউনিস্টদের কাছে শ্রমিকশ্রেণিই বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। সুতরাং পুঁজিপতিদের সঙ্গে দর কষাকষিতে শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গ দেবে সিপিএম – এ খুব স্বাভাবিক। এর পাশাপাশি শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালিদের মধ্যে শিল্প, বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করল বাম গণসংগঠনগুলি। কিন্তু নয়ের দশক আসতে না আসতেই সবটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল।
পুরো পশ্চিমবঙ্গে ‘পার্টি সমাজ’ হয়ে দাঁড়াল। মূল দল, গণসংগঠন, ইউনিয়ন – সব ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে থাকতে দুধে জল মিশে গেল। গ্রামে গ্রামে সিপিএমের বিরোধীদের উপর অত্যাচারের খবর আসতে লাগল। জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে শিল্পে আঘাত লাগল। প্রোমোটার রাজ, দলীয় নেতা-কর্মীদের দাদাগিরি অন্য মাত্রা পেল। কিন্তু জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দলকে ক্ষমতায় রাখাই একমাত্র উদ্দেশ্য হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। তাতে রাজ্য গোল্লায় গেলে যাক।
বুদ্ধদেব যখন মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন রাজ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মমতা নিজের দল তৈরি করে তীব্র সিপিএমবিরোধিতার আয়োজন করেছেন। শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটাররা সিপিএমের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করছেন। তার অন্যতম কারণ দেশের খোলা বাজারের খোলা হাওয়া হু হু করে ঢুকছে এ রাজ্যেও । ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য খুলে দিয়েছে। কেন্দ্রের লাইসেন্স রাজ উঠে গেছে। মধ্যবিত্তের তখন উচ্চবিত্তের মত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা বাড়াচ্ছে বহুজাতিক সংস্থাগুলি এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলি। সামাজিকভাবেও ১৯৯২ সালের পরে ভারতবর্ষ মণ্ডল-কমণ্ডলুর সাঁড়াশি আক্রমণে ধ্বস্ত।
এমন সময়ে ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবির সংস্কৃতি চর্চাকারী বুদ্ধদেব সিপিএমের জন্য শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসাবে উঠে এলেন। তিনিই হয়ে উঠলেন মধ্যবিত্ত বাঙালীর মসিহা। জ্যোতিবাবুর ১৯৯৪ সালের শিল্পনীতির পথ ধরেই এগিয়ে চলার অঙ্গীকার করলেন বুদ্ধদেব। ২০০১ নির্বাচনের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে নেমে পড়লেন নিজের লক্ষ্যে। ভূমি সংস্কার যে আর বামফ্রন্ট সরকারকে কোনো সুবিধা দেবে না, নতুন কোনো প্রকল্পের কথা ভাবতে হবে – তা বুদ্ধবাবুরা বুঝেছিলেন। কৃষিক্ষেত্রে যে অচিরেই স্থবিরতা আসবে আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী শহুরে মধ্যবিত্তের মত গ্রামের ছেলেমেয়েরাও অন্য কাজ চাইবে তা বিলক্ষণ জানতেন বাম নেতৃত্ব।
২০০১ সালে প্রথম সিপিএম শিল্প মন্ত্রক নিজেদের দলের কাউকে দেয়। বুদ্ধবাবু বেছে নিলেন বর্ধমানের প্রাক্তন জেলা সম্পাদক নিরুপম সেনকে। যিনি তার আগে কোনোদিন মন্ত্রী হননি। আর তাঁকে দিয়েই ব্রিটিশ সরকারের ডিএফআইডি-র সহায়তায় রুগ্ন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের সংস্কার শুরু করলেন। হয় বেচে দেওয়ার পরিকল্পনা হল, অথবা পুনরুজ্জীবনের। বুদ্ধবাবু নিজের দল সাজিয়ে নিলেন।
সেই বুদ্ধবাবুর স্বপ্ন দেখা শুরু। ২০০৬ সালের আগে ব্রিগেড সমাবেশ থেকে স্লোগান উঠল – কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু বুদ্ধবাবু কখনোই জ্যোতিবাবু নন। বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়ে এলেও, দীর্ঘদিন ধরে রেল শ্রমিকদের সঙ্গে আন্দোলন-কর্মসূচিতে থেকে আসা জ্যোতিবাবুর মত মাটির রাজনীতির অভিজ্ঞতা কোনোদিনই বুদ্ধবাবুর ছিল না। তাঁর রাজনীতি ছিল মূলত কলকাতা-নির্ভর। ছাত্র ও যুব সংগঠনে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। শিল্পায়নের স্বপ্নে বিভোর বুদ্ধদেব বিস্মৃত হলেন যে তাঁর দলটি মূলত কৃষক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০০১ ও ২০০৬ সালে তাঁর বিপুল জয় গ্রামের সমর্থনেই। ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যে ৩০টি আসন পেয়েছিল তার মধ্যে প্রায় ১৫টি কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলেই ছিল।
অথচ তিনি যে বড় দুটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করলেন – সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা আর ইন্দোনেশিয়ার সালেম গোষ্ঠীর রাস্তা-ব্রিজ-টাউনশিপ তৈরির সঙ্গে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব – সেগুলি গ্রামাঞ্চলেই। সালেম গোষ্ঠীর প্রকল্পগুলি আবার সংখ্যালঘুগরিষ্ঠ অঞ্চলে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলিকে চটিয়ে রাজ্যে কর্মসংস্কৃতি ফেরানোর ডাক দিলেন তিনি। স্লোগান তুললেন, ‘ডু ইট নাও’। প্রকাশ্য সভায় নিজের দলের শ্রমিক সংগঠন সিটুর ডাকা বনধ নিয়ে লজ্জা প্রকাশ করলেন।
আরো পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদি সিপিএমকে খোলা চিঠি
তিনি হয়ত বিস্মৃত হয়েছিলেন, যে সরকারের প্রধান হিসাবে তিনি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে গেলেও, তাঁর সতীর্থ অনিল বিশ্বাস দল সামলাচ্ছেন। ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগেই বিশ্বাস প্রয়াত। বিমান বসু সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হয়ে সংগঠন সামলাতে হিমশিম খেলেন। কাজেই দলের শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনকে উপেক্ষা করে যে শিল্পায়নের কাজে বুদ্ধদেব নামলেন, তাতে পার্টিকে সম্পূর্ণ পাশে পেলেন না।
এটি ‘পার্টি খারাপ, বুদ্ধদেব ভাল’ জাতীয় কোনো মূল্যায়ন নয়। বরং বুদ্ধদেবের দুর্বলতার সুযোগ কীভাবে দলের একাংশ ও বিরোধীরা নিয়ে গেলেন, তারই অতি সংক্ষিপ্ত আলেখ্য। বর্ধমান লবির প্ররোচনায় এবং আমলাদের নির্ভরতায় সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা তৈরি করার জমি চিহ্নিত করে প্রথম বিপদ ডেকে আনলেন বুদ্ধদেব।
সিঙ্গুরের জমি ২০০৬ সালের আগেই বেছে রেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই সিঙ্গুরে ২০০৬ নির্বাচনে তৃণমূলের ‘মাস্টারমশাই’ রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য জিতেছিলেন মাত্র ১,৭৮৭ ভোটের ব্যবধানে। তার মানে সেখানকার বিরাট অংশের মানুষ তখনো বামফ্রন্টের সমর্থক। তবু কেন সেখানে এই অবস্থার মধ্যে পড়তে হল? শিল্পায়নের স্লোগানকে সমর্থন করা আর নিজের কৃষিজমি খোয়ানোর মধ্যে অনেক ফারাক। কিন্তু ‘ওরা ৩৫, আমরা ২৩৫’-এর গরিমায় বুদ্ধদেব ধরে নিলেন তাঁর পিছনে রাজ্যের মানুষের সমর্থন রয়েছে। অতএব তিনি যদৃচ্ছা শিল্পায়ন করতে পারেন কোনোদিকে না তাকিয়ে। কিন্তু সিঙ্গুরে স্থানীয় পার্টি নেতৃত্ব, বিশেষত কৃষকসভার নেতাদের অন্ধকারে রেখে, জনমত তৈরি না করে টাটাদের কারখানা তৈরি করতে যাওয়া একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসাবেই গণ্য করা হবে।
আসলে বর্ধমান লবির কিছু নেতার মত বুদ্ধদেবের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না টাটার কারখানা তৈরিতে। তিনি রাজ্যের যুবক, যুবতীদের স্বার্থই দেখেছিলেন। তাঁদের কর্মসংস্থানই বুদ্ধবাবুর একমাত্র স্বার্থ ছিল। আর সেই স্বার্থে তিনি ১০০ মিটার স্প্রিন্টে নেমেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তাড়াতাড়ি না করলে শিল্প অন্য রাজ্যে তো যাবেই, নিজের রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ তৈরি না হলে বিপদ হয়ে যাবে। অথচ এক্ষেত্রে আদর্শ হচ্ছে ম্যারাথন দৌড়। শহুরে মধ্যবিত্ত মুখ্যমন্ত্রী গ্রামের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলেন। একদল আমলা ও দলের কয়েকজনের পরামর্শেই তিনি বধ্যভূমিতে অবতীর্ণ হলেন। যে কৃষক চাষ করে, যে ক্ষেতমজুর মাঠে কাজ করে জীবন চালায়, সে হঠাৎ করে জমি ছেড়ে দিতে রাজি হবে কী করে? রাজারহাটের মত শহর-লাগোয়া গ্রামাঞ্চলেও এই কাজ করতে বছরের পর বছর সময় লেগেছে। আর কলকাতা থেকে দূরের গ্রামাঞ্চলে শিল্পায়নের জন্য কৃষিজমি বিক্রি করে দেওয়ার সচেতনতা তৈরি করতে সময় লাগবে – এমনটাই স্বাভাবিক।
আমলা নির্ভরতা এবং দলকে উপেক্ষা করা অবশ্য সিঙ্গুর থেকে শুরু হয়নি। এর আগেও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছোট জমি নেওয়া বা সরকারি কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্বকে উপেক্ষা করেছে বুদ্ধদেবের সরকার। এ কাজ জ্যোতিবাবু কখনো করেননি। তাই সিঙ্গুরে টাটা কর্তাদের ঝাঁটা হাতে তাড়া খাওয়ার ঘটনার পরে বুদ্ধদেব এবং অন্য নেতাদের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সভাতেই বকেছিলেন বর্ষীয়ান নেতা। পরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি তো শুনলাম সেখানে কৃষকসভার নেতা ঘুমাচ্ছিলেন’ (যখন টাটা কর্তারা গ্রামে যান)।
আমি ভাল, কিন্তু দল খারাপ – এই তত্ত্বে কোনো নেতা বিশ্বাস করতে পারেন না। নেতা হিসাবে তাঁর দায়িত্ব দলকেও নিজের রাজনৈতিক লাইনে বিশ্বাসী করে তোলা। কিন্তু দলকেও নিজের পথে চালাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বুদ্ধদেব। শ্রমিক ও কৃষকদের গণসংগঠন তো দূরের কথা, একদিকে লক্ষ্মণ শেঠের মত নেতা নিজের বলে বলীয়ান হয়ে বুদ্ধবাবুর স্থানীয় সেনাপতি হিসাবে নন্দীগ্রামে শিল্পের জন্য জমি নিতে গিয়ে নিজেকে ও দলকে পর্যুদস্ত করেছেন; অন্যদিকে রাজনৈতিক হিংসার নেতৃত্ব দেওয়ায় অভিযুক্ত সুশান্ত ঘোষের মত নেতাকে বুদ্ধদেব একঘরে করতে চেয়েছেন। কৃষকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে শিল্পায়নের পথে অন্তরায় হচ্ছেন বলে রেজ্জাক মোল্লার মত মুসলমান পার্টিনেতাকে উপেক্ষা করেছেন। এতে শহুরে মধ্যবিত্ত, পুঁজিবাদের সমর্থক সংবাদপত্র গোষ্ঠী, শিল্প মহল এবং প্রগতিশীল বাম সমর্থকদের পাশে পেলেও দল ও বাম সমর্থকদের একটি বড় অংশের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বুদ্ধবাবু। তাঁর পাশে থাকা বেশির ভাগ নেতা ও আমলা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিই করেছেন।
নিজের নীতি আদর্শ ও পরিকল্পনার উপর ভরসা রাখতে গিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষোভ তৈরির জায়গাও করে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব। মাওবাদীদের সঙ্গে আদর্শগত লড়াই করবেন বলে পণ করে জঙ্গলমহলে তাদেরই মুক্তাঞ্চল তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। দার্জিলিংয়ে সুভাষ ঘিসিংকে চটাবেন না বলে বিমল গুরুংকে হিংসাত্মক আন্দোলনের পথ করে দিয়েছিলেন। সেই ২০০১ সালেই রাজ্যের কিছু মাদ্রাসা মুসলমান মৌলবাদের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে চটিয়েছিলেন তিনি। কৃষিজমি অধিগ্রহণের পর্বে যে সংখ্যালঘুরা মুখ ফেরালেন, তাঁদের বিশ্বাস আজও অর্জন করতে পারেননি সিপিএম নেতারা। প্রবল ধর্মনিরপেক্ষ হয়েও এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েও বুদ্ধদেব মুসলমানদের মন জয় করতে পারেননি।
অবশ্য সব দোষ তাঁর কেন হতে যাবে? যে কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তি নয়, দলের যৌথ নেতৃত্বের কথা বলে – তারাও বামেদের এই অবস্থার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। এত বছর প্রগতিশীল বাম সরকার চালানোর পরেও কেন বাম সমর্থকেরাই তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়ল বা এখনো কেন বামেরা ‘ঘুরে দাঁড়াতে’ পারল না, বা ইদানীং বাম সমর্থকরা কেন বিজেপির সমর্থক হয়ে উঠেছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর বুদ্ধদেবের একার দেওয়ার কথা নয়। আর আজ তিনি সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যর্থতা যা-ই থাক না কেন, বুদ্ধদেব যে একজন সৎ, স্বচ্ছ, স্পষ্টবাদী, সাধারণ জীবনচর্যায় বিশ্বাসী, সংস্কৃতি চর্চাকারী, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা এবং শেষ ভদ্রলোক বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সকলের মনে থেকে যাবেন তাতে সন্দেহ নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







