মেঘমল্লার বসু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা। শেখ হাসিনার প্রস্থান এবং আওয়ামী লিগ সরকারের পতন পরবর্তী অবস্থা নিয়ে তিনি কথা বললেন নাগরিক ডট নেটের সঙ্গে।

মেঘমল্লার, আপনি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন ছাত্রছাত্রীরা শুরু করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই তা সমর্থন করেছিলেন৷ কিন্তু গত ৫ আগস্ট হাসিনার পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরেই প্রবল নৈরাজ্যের খবর আসতে থাকে। বিশেষত সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর আক্রমণের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ উদ্বিগ্ন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সমাজে সাম্প্রদায়িকতা যে প্রবলভাবেই আছে, তা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কেবল বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই সাম্প্রদায়িকতা এক গভীর অসুখ। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার পর দেশে কয়েকদিনের জন্য কোনো প্রশাসন ছিল না। সম্পূর্ণ অরাজক পরিস্থিতি। পুলিশ নেই, আইনশৃঙ্খলা বলে কিছুই নেই, অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্য। এই অবস্থায় কে আন্দোলনকারী, কে লুটেরা – বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন।

একথাও আমি বলতে চাই, এই বিষয়ে আমাদের আন্দোলনেরও ব্যর্থতা ছিল। আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে যতখানি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, তা করা যায়নি। আন্দোলন মূলত জেলাশহরগুলিতে শক্তিশালী ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বৃত্তদের হামলার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। তবে দ্রুতই বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছে। এখন সরকার গঠিত হয়েছে, পুলিশও সক্রিয় হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

 

সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণের বিষয়ে আমাদের আন্দোলনেরও ব্যর্থতা ছিল। আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে যতখানি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, তা করা যায়নি। আন্দোলন মূলত জেলাশহরগুলিতে শক্তিশালী ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বৃত্তদের হামলার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। তবে দ্রুতই বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছে।

 

অনেকেই পরিস্থিতি দেখে বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলেই সংখ্যালঘুরা ভালো ছিলেন। আপনার এ বিষয়ে কী মত? আগামীদিনের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা কেমন থাকবেন?

হাস্যকর বক্তব্য। আওয়ামী লীগ আমলে হিন্দুদের উপর অত্যাচার, হিন্দু সম্পত্তি লুঠ কিছু কম হয়নি। আওয়ামী লীগ যেটা করত, তাকে বলা যায়, সাপ হয়ে দংশন করত, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ত। একদিকে হিন্দুদের উপর চরম নিপীড়ন করত, আবার একধরনের ব্ল্যাকমেলিং করত, যে তারা চলে গেলেই বিএনপি-জামাত চলে আসবে, হিন্দুদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। আওয়ামী লীগের পতনের পর বামপন্থীদের দায়িত্ব বাড়ল। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁরা যাতে আমাদের উপর ভরসা করতে পারেন, তা দেখতেই হবে।

আমরা যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, সেখানে সংখ্যালঘু নির্যাতন হবে না। আর কিছুদিন পরেই পুজো। নতুন সরকার যেন সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তার জন্য নজর রাখতে হবে। আশার কথা হল, আমাদের দুজন সহযোদ্ধা সরকারে আছেন (নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া)। মতভেদ থাকলেও আমরা একসঙ্গে লড়েছি। ওঁদের উপর বিশ্বাস ও ভরসা রাখছি। আমরা বামপন্থীরা চিরকাল সংখ্যালঘুর অধিকারের পক্ষে। আগামীতেও তাই থাকব। গণঅভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে মন্দির পাহারা দিচ্ছেন, মৌলবাদের বিরোধিতা করছেন – এটাও এক নতুন প্রবণতা।

নতুন সরকারের যিনি প্রধান, তিনি আমেরিকা ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। সরকারে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা এনজিও চালান। এই নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, বিশেষত বাম মহল থেকে। বামপন্থী ছাত্রনেতা হিসাবে আপনার কী মত?

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। সরকারের প্রধান মোহাম্মদ ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে আমাদের, বামপন্থীদের, তীব্র সমালোচনা আছে। দারিদ্র্যকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে আমরা। সরকারে অনেকেই এনজিও প্রধান। ফলে সিআইএর প্রভাব অনেক বাড়ল। এটা নিঃসন্দেহে আশঙ্কার, উদ্বেগের। কিন্তু আশার কথা হল, এই সরকারকে অভ্যুত্থানের পক্ষ থেকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। আমরা এই সরকারের উপর অনেক বেশি চাপ দিতে পারব। একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করার সুযোগ নেই সরকারের। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার যদি মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে যায়, ছাত্ররা কোনোভাবেই চুপ করে থাকবে না। বাংলাদেশের মানুষ নিজের দেশের স্বার্থ বুঝে নেবে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়েছে। সেই শক্তিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি।

 

সরকারের প্রধান মোহাম্মদ ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে আমাদের, বামপন্থীদের, তীব্র সমালোচনা আছে। দারিদ্র্যকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে আমরা। সরকারে অনেকেই এনজিও প্রধান। ফলে সিআইএর প্রভাব অনেক বাড়ল। এটা নিঃসন্দেহে আশঙ্কার, উদ্বেগের।
কিন্তু আশার কথা হল, এই সরকারকে অভ্যুত্থানের পক্ষ
থেকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। আমরা এই সরকারের উপর
অনেক বেশি চাপ দিতে পারব।

 

অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় বসতে না বসতেই ইসলামিস্টদের সঙ্গে বামপন্থীদের সংঘাত শুরু হয়েছে বলে খবর আসছে। কোথাও আপনাদের গ্রাফিতি মুছে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ, কোথাও আবার আপনারা ইসলামিস্টদের গ্রাফিতি মুছে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে। আগামীদিনে কি বাম-ডান সংঘাত বাড়বে?

দেখুন, আমরা এই বিষয়টি নিয়ে যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করছি। অতি দক্ষিণপন্থী তৎপরতা তো অবশ্যই আছে। বিক্ষিপ্ত সংঘাতও হচ্ছে। তবে এটাও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, বহু সংঘাতই আসলে পরিকল্পিত। শহিদ মিনারে একদল লোক আরবি ভাষায় গ্রাফিতি করতে এলেন। আসতেই পারেন। আরবি কেন, যে কোনো ভাষায় গ্রাফিতি করা তাঁদের অধিকার। সমস্যা হল ওঁরা বেছে বেছে ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দেওয়াল লিখনের উপরেই গ্রাফিতি করতে গেলেন! ’৫২ মুছে লিখবেন ’২৪! খুব সহজেই বোঝা যায় কোন উদ্দেশ্য থেকে এটা করার চেষ্টা হচ্ছে। এসব করতে দিলে দেশে আগুন জ্বলে যেত। ফলে আমরা প্রতিরোধ করেছি।

আরো পড়ুন বাংলাদেশের বিপন্ন গণতন্ত্রের সংকট বাড়াবে একতরফা নির্বাচন

ইসলামিস্টদের সঙ্গে আমরা রাজনৈতিক লড়াই করতে চাই৷ তাঁদের রাজনীতি যে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর – এটা বলতে চাই। আমরা চাই না লড়াইটা গ্রাফিতি, ভাস্কর্য নিয়ে হোক। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যে চেতনা, তার পক্ষের মানুষ অনেক বেশি। এটা ভুললে চলবে না৷

ভারতের জনগণের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে আপনারা ভারতবিরোধী।

আমরা ভারতের জনগণের বিরোধী নই। ভারতের মানুষ আমাদের বন্ধু। দিল্লি এবং ঢাকার শাসনক্ষমতায় যাঁরা বসে থাকেন, তাঁদের মধ্যেকার সম্পর্কের ভিত্তিতে দুদেশের সম্পর্ক নির্ধারিত হবে না। আবার বাংলাদেশের সরকার যদি ভারতের সামনে নতজানু হয়েও থাকে, বাংলাদেশের মানুষ নতজানু হবে না। গত ৮-১০ বছরে বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধিতা কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেমন নদীর পানির সঠিক হিস্যার প্রশ্ন, মংলা বন্দর কেন ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেই প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত কেন হস্তক্ষেপ করবে, সেই প্রশ্ন। বাংলাদেশের জনতার পক্ষে এগুলি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশিদের সম্পর্কে অধিকাংশ ভারতীয়ের ধারণা ভুল। বাংলাদেশি মানেই তালিবান বা আল কায়দা – এমন অদ্ভুত ধারণা নিয়ে তাঁরা চলেন। এই ধারণার নির্মাণ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে ভারতের মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। এগুলি দুর্ভাগ্যজনক।

 

আমরা ভারতের জনগণের বিরোধী নই। ভারতের মানুষ আমাদের বন্ধু। দিল্লি এবং ঢাকার শাসনক্ষমতায় যাঁরা বসে থাকেন, তাঁদের মধ্যেকার সম্পর্কের ভিত্তিতে দুদেশের সম্পর্ক নির্ধারিত হবে না।

 

আমরা ভারতীয় জনগনের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করি। ১৯৭১ সালে ভারত সরকার তার নিজস্ব ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনে, পাকিস্তানকে দু টুকরো করতে চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় জনগণ প্রাণের টানে, ভালবেসে মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অসংখ্য মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। তাঁরা তো কেবল হিন্দু নন, মুসলিমও। ভারতীয় জনগণ তাঁদের আপন করে নিয়েছিলেন। আমরা একথা ভুলব না। আবার ভারত রাষ্ট্রের আগ্রাসনও মেনে নেব না।

বহু ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার খবর আসছে। এই প্রসঙ্গে আপনার অবস্থান কী?

আমরা ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করার জন্য ছাত্র রাজনীতি করি। কারোর লেজুড়বৃত্তি করার জন্য নয়। যদি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ মনে করে এতদিন ধরে চলে আসা ছাত্র রাজনীতির কাঠামোর পরিবর্তে অন্য কোনো কাঠামোয়, অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে রাজনীতি হলে ছাত্রছাত্রীদের ভালো হবে, আমাদের তা মেনে নিতে কোনো অসুবিধা নেই। বাংলাদেশের বহু ক্যাম্পাসে জামাতে ইসলামির ছাত্র শিবির নিষিদ্ধ, এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ। ছাত্রলীগ যা নির্যাতন করেছে, তাতে তাদেরও নিষিদ্ধ হওয়া সময়ের অপেক্ষা। আমার ধারণা ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ হওয়া শক্তিগুলি, ১/১১-র সঙ্গে যুক্ত কিছু শক্তি এই বিষয়টা করতে চাইছে। তারা সংগঠিত ছাত্র রাজনীতিকে দুর্বল করতে চায়।

আমরা ‘মব জাস্টিস’ কোনোভাবেই মেনে নেব না৷ তবে যদি ছাত্রছাত্রীরা মনে করেন বামপন্থী, প্রগতিশীলদের শক্তি এই তথাকথিত ছাত্র সংগঠনগুলির সন্ত্রাসী চরিত্র মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়, এদের রুখতে গোটা প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র রাজনীতির কাঠামোটাই তুলে দিতে হবে, অন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে, তাহলে আমাদের মানতে অসুবিধা নেই। কিন্তু আমরা যারা বিরোধী ছাত্র সংগঠন করি, গত ১৬ বছর ধরে আমাদের কাজই করতে দেওয়া হয়নি। আমাদের বক্তব্য ছাত্রছাত্রীদের কাছে নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। আমরা আমাদের কথাগুলি বলতে চাই। আমরা সেই কথাগুলি বলবও।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.