শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে লেখার এটা ঠিক সময় নয়। কারণ সোশাল মিডিয়া, সংবাদপত্র ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে তাঁকে ঘিরে শোক ও ভাবালুতার উচ্ছ্বাসে নৈর্ব্যক্তিকতা চাপা পড়তে বাধ্য। আর নিছক তরল শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে আজীবন কমিউনিস্ট বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সম্ভবত কিছু এসে যেত না। বাঙালির মূল্যায়নের রিডাকশনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি ধরলে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের নবজোয়ারের কাণ্ডারি বা শিল্পায়নের অগ্রদূত জাতীয় বিশেষণে আটকে রাখতে হয়, ফলত বাধাপ্রাপ্ত হয় নৈর্ব্যক্তিক বিচার। আমি যদি বলি, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মানে, সমরেশ বসুর প্রয়াণের পর গণশক্তি-র পাতায় তাঁকে নিয়ে যে অসামান্য লেখাটা লিখেছিলেন, ডায়লেক্টিকাল বিশ্লেষণের ওরকম উদাহরণ বাংলায় কম দেখেছি, অথবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মানে মায়াকভস্কি, মার্কেজের চমৎকার অনুবাদক, সেটাও খণ্ডদর্শনই হবে।
নিজস্ব বিচারে, যতটা সম্ভব বিস্তারে যদি যেতে চাই, তাহলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে একজন ‘গ্রেট কমিউনিস্ট’ হিসাবে ভাবতে পছন্দ করব। ‘গ্রেট’ মানে ভাল – এই সরলীকরণে যাচ্ছি না। ‘গ্রেট’ মানে, একটা যুগ এবং পার্টির ভাঙাগড়াকে নিজের অস্তিত্বে ধারণ করেন যে কমিউনিস্ট। ‘গ্রেট’ এই কারণে যে পার্টির দরকারে, সার্বিকভাবে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে বুদ্ধদেব ধারালো অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন, সেই অস্ত্রে নিজে একসময় খণ্ডিত হয়ে যাবেন জেনেও। শুনেছি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা হিসাবে তাঁর উত্থান ছিল নকশালপন্থীদের দিকে ততদিনে ঝুঁকে যাওয়া আরেক প্রবাদপ্রতিম নেতা শৈবাল মিত্রকে আটকাবার জন্য। পরবর্তীকালেও দেখব, বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোয় পার্টি বুদ্ধদেবেরই যোগ্য ছিল। বুদ্ধদেব নিজে কী ভেবেছিলেন জানি না। বামফ্রন্টের উত্থান ও স্থায়িত্বের অংশীদার হওয়াটা তাঁর দায় ছিল, পতনেরও, বরং আরও বেশি করে। যদি ১৯৯৬ সালকে একটা বিভাজনরেখা হিসাবে ধরি, তাহলে সেই ৩০ বছর বা তারও আগে থেকে পার্টি নিজের ভিতরে যে তিক্ত সংগ্রাম করে আসছিল, উঠতি মধ্যশ্রেণির চিন্তার শাসনকে কতটা জায়গা দেবার পরিবর্তে নিজস্ব শ্রেণিভিত্তিকে কতখানি তরলীকৃত করা যেতে পারে, তার ফলশ্রুতি হিসাবে সাম্প্রদায়িকতাকে রোখার প্রশ্নে কতটা ঝুঁকি নেওয়া যায় – সেই দ্বন্দ্বে বুদ্ধদেব আনখশির চরমপন্থী অবস্থান নিলেও পরবর্তীকালে তাঁকেই সম্পূর্ণ উলটো অবস্থানে চলে যেতে হল। সেটাও ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। আধা সামন্ততান্ত্রিক একটা দেশে বিশ্ববাজার খুলে দেওয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি মতাদর্শগত সংগ্রামের কোন জায়গায় কতটা আপোস করতে বাধ্য হয় নিজেদের টিকিয়ে রাখার তাগিদে আর সেটা করতে গিয়ে জনপ্রিয়তার স্রোতে ভাসে কিনা, সে প্রশ্ন ভবিষ্যতের। কারণ তার সঙ্গে একা ভারতবর্ষ নয়, চীন, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার পরিস্থিতি তুলনীয়। কিন্তু পার্টি যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বুদ্ধদেবরা তা প্রয়োগ করবেন, করবেনই। তাঁরা নিজেরা কী ভেবেছিলেন সেসব একপাশে সরিয়ে রেখে। ফলত মধ্যশ্রেণির উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাণ্ডারি হিসাবে তাঁর আবির্ভাব এক হিসাবে পার্টির আভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত সংগ্রামের ফলশ্রুতি। দুটোকে আলাদা করে দেখা অনৈতিহাসিক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই সংকট জ্যোতি বসুর ছিল না, অন্তত শুরুর দিকটায়, কারণ এক বিশাল জনগোষ্ঠীর যে আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি পার্টি করেছেন, পরবর্তীকালে সরকারে এসেছেন, তার শ্রেণিভিত্তি সরল ছিল। কিন্তু নয়ের দশকের জটিলতার গল্প অন্য, যার সমাধান অশীতিপর ও ততদিনে রণক্লান্ত বসু করতে পারতেন না। ফলত সন্ধিক্ষণ, ফলত বুদ্ধদেব। তিনিও সমাধান করেছেন এমন নয়, কিন্তু ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। যে দায়িত্ব ব্রিটেনে লেবার পার্টির নিল কিনক ও পরবর্তীকালে টোনি ব্লেয়ার পালন করেছিলেন। সেটা হল, রাজনীতির অভিমুখ নির্ধারণ।
আরো পড়ুন শুধু ব্রাজিল নয়, গোটা পৃথিবীর সামনে আশার আলো লুলা
সেই অভিমুখ কৃষি বনাম শিল্প – এত সরল নয় কিন্তু। বুদ্ধদেবরা, তাঁদের প্রজন্ম, ছিলেন অসামান্য তাত্ত্বিক। নকশাল আন্দোলনের নেতারা যেমন ছিলেন অসামান্য তাত্ত্বিক। তাঁরা ভারতের চলমান সংকটকে সূচের ডগায় ধরেছিলেন। একইভাবে ৩০ বছর পেরিয়ে বাংলার সংকটকে অভ্রান্ত ধরতে পেরেছিলেন বুদ্ধদেব। বড় মাপের বিনিয়োগ নেই এটা একটা উপসর্গ, কিন্তু আসল ব্যারাম হল যে সরকারের নীতি স্বতঃপ্রণোদিত নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়ামূলক নীতি দিয়ে রাজনীতিতে স্থায়ী হওয়া যায় না, কয়েকবার ভোটে জিতলেও। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই তো করব, কিন্তু তার মানে এটাই যে কেন্দ্র সেই খেলার নিয়ম ও খেলার মাঠ নির্ধারিত করে দিচ্ছে। ভূমি সংস্কার ছিল এক অসামান্য স্বতঃপ্রণোদিত নীতি, যার লাভ বহুবছর পাওয়া গেছে। সেরকম স্বতঃপ্রণোদিত নীতি নিতে গিয়ে সম্ভবত বুদ্ধদেবও বুঝেছিলেন, দরকারে বাঘের পিঠে চড়তে হবে এবং নদী পেরোলে বাঘ খেয়ে ফেলবে। কিন্তু আগেই বলেছি, প্রায় নিয়তিতাড়িত পুরুষের মতই কমিউনিস্টরা ইতিহাসের দায়িত্ব পালন করে। আর এটাও ঘটনা যে তাঁর নীতিসমূহ ভালমন্দ যা-ই হোক না কেন, বিকল্প কিছু তো গত ১৩ বছরেও খুঁজে পাওয়া গেল না। তা খুঁজে পাওয়া যাবেও না, এই পরিস্থিতিতে। আর ভবিষ্যদ্বাণীর মত শোনালেও সত্যি যে পরবর্তী যে কোনো সরকারকে বুদ্ধদেবের রাস্তাই নিতে হবে। পরিবর্তন যা হবে তা আসলে কিছু মুখের পরিবর্তন।
মানুষ সবসময়েই তার অসীমতায় পৌঁছতে চায়, কিন্তু সেটা তার ইচ্ছা অনুসারে হয় না। সমাজ, অর্থনীতির নিজস্ব নিয়ম তাকে শর্ত দেয় – তুমি এতদূরই এগোতে পারবে, তার বেশি নয়। তার মধ্যে নানা প্রশ্ন থাকে – ক্ষমতা দখলের পর পরিবর্তন হয় কী করে? বা আদৌ হয় কিনা! কিছু বদলায়, আর সেই কিছু বদলাতে গিয়ে শাসন নিজেকে পাল্টে ফ্যালে। এসব নানাবিধ বিতর্ক থাকে। অঙ্গরাজ্যে ক্ষমতায় টিকে থেকে অল-আউট যাওয়া পার্টির পক্ষে সম্ভব ছিল না, আবার সময়ের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে আদর্শের ধবধবে পাতার সঙ্গে ক্রমাগত সমঝোতা করতে করতে – কেননা রিয়ালপলিটিকে তাই হয় – কমিউনিস্টরা কতদূর চলে যায় এবং ফিরে আসতে পারে কিনা, সেসব প্রশ্ন থাকে। সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরিধির বাইরে দাঁড়িয়ে করার প্রশ্ন। পরিস্থিতি ও সময়ের ভিতর দাঁড়িয়ে নিজেকে করার প্রশ্ন নয়। সেই দ্বিধা নিয়ে কমিউনিস্টদের চলে না। কারণ নিজেকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে চাওয়া সময়বিশেষে অপরাধ।
একটা যুগের অবসান ঘটল। আসবে অন্য যুগ। নতুন কমিউনিস্টরা। আমাদের আজকের মূল্যায়ন ততদিনে অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ ইতিহাসের থেকে বেশি উদাসীন আর কেউ নেই। বুদ্ধদেব যতটুকু করার ছিল, করেছেন। ভবিষ্যৎ তাঁকে কীভাবে দেখবে, সেসবে তাঁর সম্ভবত কিছু এসে যেত না।
নিবন্ধকার সাহিত্যিক এবং বামপন্থী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







